শুক্রবার, অক্টোবর ১৬

প্রেমে স্বাধীন কে?

0

আপনি যাকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলে মনে করেন, তাঁর সঙ্গে যদি আপনার দেখা হতো ঠিক এক সপ্তাহ আগে—আপনি কি তাঁকেই এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন? প্রশ্নটা শুনতে একটু অন্যায় রকমের নিষ্ঠুর। কারণ প্রেম নিয়ে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ধারণাগুলোর একটি হলো—‘আমরা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছি।’ যেন পৃথিবীর কয়েকশো কোটি মানুষের ভিড়ের মধ্যে দুজন মানুষ কোনো এক অলৌকিক জিপিএস-এর নির্দেশে ঠিক পরস্পরের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর চোখে চোখ পড়ল, একটু কথা হলো, এবং মস্তিষ্ক কোথাও গোপনে ঘণ্টা বাজিয়ে দিলো—‘এই মানুষটি।’ কিন্তু বিজ্ঞানের দিকে একটু তাকালে ব্যাপারটা এত রোমান্টিক থাকে না। বরং আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ প্রেমের সেই বিখ্যাত ‘রসায়ন’ সত্যিই রসায়নের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্ক রাখে—যদিও ব্যাপারটি ‘দুজনের হরমোন মিলে গেল, অতএব বিয়ে পাকা’ ধরনের সরল সমীকরণ নয়।

প্রথমে একটি ছোট্ট বৈজ্ঞানিক সংশোধন দরকার। মানুষের আকর্ষণকে ঠিক দুইটি তরঙ্গের ব্যতিচারের মতো বলা যায় না। পদার্থবিজ্ঞানে দুটি সমান বিস্তারের তরঙ্গ একই দশায় মিললে লব্ধ বিস্তার দ্বিগুণ হয়—অর্থাৎ A+A=2A; আর বিপরীত দশায় হলে তারা পরস্পরকে বাতিল করে শূন্যও করতে পারে। তাই ‘দুটি তরঙ্গ মিলে 4A’ বলা ঠিক হবে তখনই, যখন আমরা বিস্তার নয়, তীব্রতার কথা বলছি—কারণ তীব্রতা সাধারণভাবে বিস্তারের বর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গ-উপমাটি আক্ষরিক বিজ্ঞান নয়; এটি একটি চমৎকার রূপক। কারণ আমাদের শরীর, মস্তিষ্ক, হরমোন, ঘুম, মানসিক অবস্থা, সামাজিক পরিস্থিতি, পূর্ব-অভিজ্ঞতা এবং অপর মানুষটির আচরণ—সব মিলিয়ে আকর্ষণের মুহূর্তটি তৈরি হয়। দুটি মানুষ শুধু পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে না; তারা দেখা করে দুটি পরিবর্তনশীল জৈব-মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার সঙ্গে।

এখানে ঋতুচক্র বা ডিম্বস্ফোটন-চক্রের কথাও আসে। দীর্ঘদিন ধরে গবেষকরা পরীক্ষা করেছেন, নারীর মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সঙ্গী-পছন্দ বা যৌন আকর্ষণের কিছু পরিবর্তন ঘটে কি না। একসময়ের গবেষণায় ডিম্বস্ফোটনের কাছাকাছি সময়ে নির্দিষ্ট কিছু পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল; ২০১৪ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণও কিছু ধরনের স্বল্পমেয়াদি আকর্ষণে চক্র-সম্পর্কিত পরিবর্তনের পক্ষে ফল পেয়েছিল। কিন্তু এখানেই থামলে ভুল হবে। পরবর্তী বড়ো, পূর্ব-নিবন্ধিত গবেষণাগুলির কিছু এই ফল পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি; ২০২১ সালের একটি গবেষণায় ২৫৭ জন নারীর ১,০২৮টি পর্ব বিশ্লেষণ করে চক্র জুড়ে সঙ্গী-পছন্দের পরিবর্তনের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আরেকটি বড়ো গবেষণাতেও আচরণগত আকর্ষণ বা সঙ্গী-পছন্দের নির্ভরযোগ্য চক্রভিত্তিক পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ বিজ্ঞান আমাদের খুব সুন্দর একটা শিক্ষা দিচ্ছে: হরমোনের প্রভাব আছে বলেই তার প্রভাব সরল, সর্বজনীন এবং ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য—এমন নয়।

এই ‘নয়’-টিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনপ্রিয় সংস্কৃতি বিজ্ঞানের একটি সম্ভাবনাকে নিয়ে এমনভাবে গল্প বানাতে ভালোবাসে যেন প্রেমের অ্যালগরিদম আমরা আবিষ্কার করে ফেলেছি। ‘মাসের ২০ তারিখে দেখা হলে কিছু হতো না, ২৮ তারিখে দেখা হওয়ায় প্রেম হয়ে গেল’—এমন দাবি আকর্ষণীয়, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে অতিরিক্ত নিশ্চিত। বাস্তবে আকর্ষণ আরও জটিল। হরমোনজনিত অবস্থা তার একটি সম্ভাব্য উপাদান; কিন্তু তার সঙ্গে কাজ করে মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থা, উপলব্ধি, স্মৃতি, প্রেক্ষাপট, পরিচিতি, ব্যক্তিত্ব, প্রত্যাশা এবং সামাজিক পরিস্থিতি। প্রেমকে এক্সেল শিটে ঢোকালে স্প্রেডশিট সম্ভবত কিছুক্ষণ পরেই পদত্যাগ করবে।

তবু প্রশ্নটি থেকে যায়: আমরা যাকে ‘আমার পছন্দ’ বলি, তার কতটা সত্যিই ‘আমার’?

স্নায়ুবিজ্ঞান এখানে আরও অস্বস্তিকর উত্তর দেয়। রোমান্টিক প্রেম কোনো অলৌকিক, শরীরবিহীন আত্মিক ঘটনা নয়; এর সঙ্গে মস্তিষ্কের পুরস্কার ও প্রেরণা-ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক আছে। এফএমআরআই গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন গভীর প্রেমে থাকে এবং প্রিয় মানুষটির ছবি দেখে, তখন ডোপামিন-সমৃদ্ধ ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া বা ভিটিএ-সহ পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্ক-অঞ্চল সক্রিয় হয়। সাম্প্রতিক স্নায়ু-চিত্রণ বিষয়ক মেটা-বিশ্লেষণও তীব্র প্রেমের সঙ্গে ডোপামিনভিত্তিক প্রেরণা-সংযোগতন্ত্রের সম্পর্কের কথা বলছে। অর্থাৎ আমরা যখন বলি, ‘ওকে দেখলেই আমার ভেতর অন্যরকম কিছু হয়,’ তখন কথাটা কাব্যিক হলেও পুরোপুরি অধিবিদ্যক নয়। সত্যিই আপনার মস্তিষ্কের কিছু অংশ বলছে—এই মানুষটির দিকে মনোযোগ দাও।

সাম্প্রতিক স্নায়ু-চিত্রণ বিষয়ক মেটা-বিশ্লেষণও তীব্র প্রেমের সঙ্গে ডোপামিনভিত্তিক প্রেরণা-সংযোগতন্ত্রের সম্পর্কের কথা বলছে। অর্থাৎ আমরা যখন বলি, ‘ওকে দেখলেই আমার ভেতর অন্যরকম কিছু হয়,’ তখন কথাটা কাব্যিক হলেও পুরোপুরি অধিবিদ্যক নয়। সত্যিই আপনার মস্তিষ্কের কিছু অংশ বলছে—এই মানুষটির দিকে মনোযোগ দাও।

এখানে ডোপামিনকে অবশ্য ‘প্রেমের রাসায়নিক’ বলে ফেললে আবার বিপদ। ডোপামিন কেবল প্রেমের রাসায়নিক নয়; প্রেরণা, পুরস্কারের প্রত্যাশা এবং শেখার সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে। প্রেমে মস্তিষ্ক যেন শুধু বলে না, ‘এই মানুষটি সুন্দর’; বরং বলে, ‘এই মানুষটির ব্যাপারে আরও জানতে চাই, আরও কাছে যেতে চাই, আবার দেখতে চাই।’ সেই চাওয়ার মধ্যে প্রেমের একটি শক্তিশালী জৈব উপাদান আছে। হেলেন ফিশার এবং সহকর্মীদের কাজও রোমান্টিক আকর্ষণকে একটি প্রেরণা-ব্যবস্থা হিসেবে বোঝার দিকে নিয়ে গেছে—যা যৌন কামনার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তার সঙ্গে অভিন্ন নয়।

তাহলে সেই বিখ্যাত ‘রসায়ন’ কী?

সম্ভবত রসায়ন কোনো একক জিনিস নয়। এটি একটি সমাপতন। আমাদের বর্তমান শারীরবৃত্তীয় অবস্থা, অপর মানুষের আচরণ, তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর, গন্ধ, পরিচিতি, আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, সেই মুহূর্তের আবেগগত ভঙ্গুরতা, সামাজিক প্রেক্ষাপট—সবকিছু একসঙ্গে এমন একটি বিন্যাস তৈরি করতে পারে যেখানে মস্তিষ্ক হঠাৎ কাউকে ‘লক্ষণীয়’ করে তোলে। যে মানুষটি গতকাল ভিড়ের মধ্যে আর দশজনের মতো ছিলেন, আজ তাঁর একটি বাক্য কেন যেন মাথায় থেকে গেল। তিনি খুব অসাধারণ কিছু বলেননি। কিন্তু কেন যেন সেই কথাটিই মনে রয়ে গেল। এখানেই মানুষের মন বিজ্ঞানের চেয়ে একটু বেশি দুষ্টু।

আর মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা কাউকে শূন্যতার মধ্যে পছন্দ করি না। মানুষকে আমরা দেখি একটি পরিস্থিতির মধ্যে। আপনি যেদিন কারও সঙ্গে দেখা করছেন, সেদিন আপনার নিজের জীবন কেমন চলছে—আপনি একা কি না, নিরাপদ বোধ করছেন কি না, নতুন কিছু খুঁজছেন কি না, আবেগগত উন্মুক্ততা কতটা, আপনার প্রত্যাশা কী—এসবই উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি মানুষ একই থাকলেও তাকে দেখার মানুষটি একই থাকে না। তাই ‘সে তখনও একই ছিল’—এই বাক্যের মধ্যে অর্ধেক সত্য আছে। মানুষটি একই থাকতে পারে; কিন্তু দর্শকটি একই থাকে না—এখানেই দর্শনের প্রবেশ।

আমরা সাধারণত স্বাধীন ইচ্ছাকে খুব সরলভাবে বুঝি। আমি কাউকে দেখলাম, আমার ভালো লাগল, তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—’আমি এই মানুষটিকে ভালোবাসব।’ কিন্তু আমরা কি সত্যিই এভাবে সিদ্ধান্ত নিই? আমরা কি কখনও বসে বলি, ‘আজ বিকেল চারটা বত্রিশ মিনিটে আমি এই মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি’? না। আকর্ষণ প্রথমে ঘটে। তারপর মন তার ব্যাখ্যা তৈরি করে। আমরা বলি, ‘কী সুন্দর চোখ’, ‘কী বুদ্ধিমান’, ‘কী অদ্ভুতভাবে আমাকে বোঝে’—অর্থাৎ জৈবিক প্রতিক্রিয়ার পরে আখ্যান এসে বসে। মস্তিষ্ক একটি অনুভূতি পেয়েছে; মন তার জন্য একটি গল্প লিখেছে। তারপর আমরা গল্পটিকে এত বিশ্বাস করতে শুরু করি যে ভুলেই যাই, গল্পটি আমরা লিখেছি।

আর এখানেই সেই পুরোনো প্রশ্ন ফিরে আসে: আমি কোথায়?

আমার শরীর আমাকে কতটা চালায়? আমার হরমোন? আমার জিন? আমার শৈশব? আমার সংযুক্তির ধরন? আমার অতীত অভিজ্ঞতা? আমার সামাজিক অনুবন্ধন? আমার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি? আমার একাকিত্ব? সৌন্দর্য সম্পর্কে আমার সাংস্কৃতিক ধারণা? আমার মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থা? আমার সামনে থাকা মানুষটির আচরণ? আর যদি এই সবগুলো মিলে আমার ‘পছন্দ’ তৈরি করে, তাহলে আমি যে বলি ‘আমি ওকে বেছে নিয়েছি’—এই ‘আমি’টি আসলে কে?

ভারতীয় দর্শনের কাছে প্রশ্নটি নতুন নয়। উপনিষদীয় অনুসন্ধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো—অভিজ্ঞতার প্রতিটি স্তরকে ‘আমি’ বলে গ্রহণ না করে প্রশ্ন করা, ‘আমি কে?’ শরীর কি আমি? মন কি আমি? ইন্দ্রিয় কি আমি? চিন্তা কি আমি? অনুভূতি কি আমি? নাকি এগুলির প্রত্যক্ষকারী হিসেবে ‘আমি’-র আরও গভীর কোনো মাত্রা আছে? বৈদান্তিক অনুসন্ধান এই প্রশ্নকে নিছক অধিবিদ্যক ধাঁধা হিসেবে নেয় না; বরং মানুষের বন্ধন ও মুক্তির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে।

তবে এখানে একটি ভুল করা সহজ। যদি আমরা বলি, ‘আমার হরমোন আমাকে প্রেমে ফেলেছে, তাই প্রেম মিথ্যা’—তাহলে আমরা বিজ্ঞানেরও ভুল ব্যাখ্যা করছি, দর্শনেরও। কোনো অনুভূতির জৈব ভিত্তি থাকলেই সেই অনুভূতি মিথ্যা হয়ে যায় না। ক্ষুধার জৈব ভিত্তি আছে বলে দুপুরের খাবার মিথ্যা নয়। সঙ্গীত শুনে আমাদের মস্তিষ্কে স্নায়বিক ক্রিয়া ঘটে বলে রবীন্দ্রসংগীতের সৌন্দর্য বাতিল হয়ে যায় না। বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: যে অনুভূতিটি সত্যিই ঘটছে, তার অর্থ আমরা কীভাবে বুঝব?

প্রেম সত্যি হতে পারে, অথচ তার কারণ সম্পর্কে আমাদের ধারণা ভুল হতে পারে।

আমি সত্যিই কাউকে ভালোবাসতে পারি; কিন্তু ‘আমি তাঁকে ভালোবাসি কারণ তিনি আমার জন্য একমাত্র মানুষ’—এই ব্যাখ্যাটি সত্য নাও হতে পারে। আমি সত্যিই তাঁকে অসাধারণ মনে করতে পারি; কিন্তু তাঁর অসাধারণত্বের কিছু অংশ আমার নিজের মস্তিষ্কের প্রক্ষেপণও হতে পারে। আমি সত্যিই তাঁর সঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারি; কিন্তু সেই ভবিষ্যতের একটি অংশ হয়তো আমার একাকিত্ব, আমার প্রত্যাশা এবং আমার মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনের তৈরি।

এখানে প্রেমকে ছোট করা হচ্ছে না। বরং প্রেমকে আরও আকর্ষণীয় করে দেখা হচ্ছে। কারণ প্রেম তখন শুধু ‘আমি তোমাকে পছন্দ করি’ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি গবেষণাগার—যেখানে জীববিদ্যা, মনোবিদ্যা, সংস্কৃতি, স্মৃতি, কামনা এবং চেতনা একসঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছে।

ভাবুন, একই মানুষটির সঙ্গে আমাদের দেখা হলো দুই ভিন্ন সময়ে। প্রথমবার আমরা ঘুমহীন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। মানুষটি সুন্দর, ভদ্র, বুদ্ধিমান—কিন্তু আমরা বললাম, ‘হ্যাঁ, ভালোই।’ ছয় মাস পরে একই মানুষটির সঙ্গে দেখা হলো, তখন আমরা জীবনের অন্য পর্যায়ে; আমরা নতুন কিছুর জন্য উন্মুক্ত, আমাদের মনোযোগ অন্যরকম, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট অন্যরকম। একই মানুষ এবার হঠাৎ ‘অন্যরকম’ হয়ে উঠলেন। মানুষটি কি বদলেছেন? হয়তো সামান্য। কিন্তু আমাদের দেখার পদ্ধতি বদলেছে।

কোথাও একই কথোপকথন কানে ঢুকে বেরিয়ে যায়। কোথাও আমরা বলি, ‘এই মানুষটা!’ কোথাও বলি, ‘ভালো মানুষ, কিন্তু কিছু একটা নেই।’ ‘কিছু একটা নেই’—এই রহস্যময় কিছু একটা-র পেছনেই তো আমাদের জীবনের অর্ধেক দর্শন লুকিয়ে আছে।

এটাই সেই ব্যতিচারের রূপক। দুটি মানুষ নয় শুধু—দুটি তরঙ্গ: একজনের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং অন্যজনের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। তার সঙ্গে যোগ হয় সময়, স্থান, পরিস্থিতি, স্মৃতি, প্রত্যাশা। কোথাও দশার সামঞ্জস্য ঘটে, কোথাও ঘটে না। কোথাও একটা কথোপকথন মনে গিয়ে লাগে; কোথাও একই কথোপকথন কানে ঢুকে বেরিয়ে যায়। কোথাও আমরা বলি, ‘এই মানুষটা!’ কোথাও বলি, ‘ভালো মানুষ, কিন্তু কিছু একটা নেই।’ ‘কিছু একটা নেই’—এই রহস্যময় কিছু একটা-র পেছনেই তো আমাদের জীবনের অর্ধেক দর্শন লুকিয়ে আছে।

তবে বিজ্ঞান এখানে আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়: সহসম্পর্ক মানেই নিয়তি নয়। ঋতুচক্রের কোনো পর্যায়ে আকর্ষণের সামান্য পরিবর্তন থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে আমাদের প্রেম, বিয়ে বা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত কেবল হরমোন দ্বারা নির্ধারিত। সাম্প্রতিক গবেষণার মিশ্র ফলাফল বরং সতর্ক করে যে মানুষের আকর্ষণের কোনো একক জৈব ঘড়ি নেই যা মাসের ২৮ তারিখে এসে বলে, ‘আজ আপনার জীবনের মানুষটি আসবে।’

তাই বৈবাহিক বন্ধনের কথাটাও একটু অন্যভাবে ভাবা যাক। আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমি তাঁকে বেছে নিয়েছি।’ কিন্তু হয়তো আরও সঠিক বাক্য হবে: ‘আমি তাঁকে বেছে নেওয়ার মতো একটি অবস্থায় পৌঁছেছিলাম।’ পছন্দ এবং পছন্দকারী—দুটিকেই আলাদা করে দেখা দরকার। আমার পছন্দ তৈরি হয় আমার শরীর, মস্তিষ্ক, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সময়ের সমাপতন এবং অগণিত অদৃশ্য চলকের মধ্যে। তাহলে স্বাধীনতা কোথায়?

হয়তো স্বাধীনতা এই নয় যে আমাদের ওপর কোনো প্রভাব নেই। এমন স্বাধীন মানুষ সম্ভবত কল্পনাতেই আছে। বরং স্বাধীনতার একটি গভীরতর অর্থ হতে পারে—আমাদের ওপর কী কী প্রভাব কাজ করছে, তা দেখতে শেখা।

আমি আকৃষ্ট হয়েছি—এটা একটি ঘটনা।

আমি কেন আকৃষ্ট হয়েছি—এটা একটি প্রশ্ন।

আর আমি সেই আকর্ষণকে কী অর্থ দেব—এখানেই হয়তো আমার স্বাধীনতার শুরু।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনুভূতি আমাদের হাতে না-ও থাকতে পারে; কিন্তু অনুভূতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আমরা চিন্তা করতে পারি। কাউকে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যাওয়া আমাদের সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। কিন্তু সেই ভালো লাগাকে আমরা প্রেম বলব কি না, প্রেমকে সম্পর্ক বানাব কি না, সম্পর্ককে বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যাব কি না—এই স্তরগুলিতে আত্মপর্যালোচনার জায়গা তৈরি হয়। অর্থাৎ জৈবিক প্রক্রিয়া হয়তো দরজা খুলে দিতে পারে; কিন্তু দরজা দিয়ে আমরা কোথায় যাব, সেই প্রশ্নটি এখনও মানুষের।

সুতরাং হয়তো ২০ তারিখে দেখা হলে কিছুই হতো না, আর ২৮ তারিখে দেখা হয়ে সবকিছু হয়ে গেল—এমনটা কল্পনা করা যায়। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো সত্য হলো, আমরা প্রতিদিন এমন অসংখ্য ক্ষুদ্র ‘২৮ তারিখ’-এর মধ্যে বাস করি। একটি নির্দিষ্ট মেজাজ, একটি নির্দিষ্ট ঘুমের রাত, একটি নির্দিষ্ট কথোপকথন, একটি নির্দিষ্ট একাকিত্ব, একটি নির্দিষ্ট গান, একটি নির্দিষ্ট বিকেল—এসবের কোনো একটির সঙ্গে আরেকটি মিলে গিয়ে আমাদের জীবনের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

তখন প্রশ্নটা আর শুধু ‘আমি কাকে ভালোবাসি?’ নয়। প্রশ্নটা হয়— যে ‘আমি’ ভালোবাসে, সে কে?

আমার পছন্দের কতটা আমার শরীরের, কতটা আমার মস্তিষ্কের, কতটা আমার অতীতের, কতটা সমাজের শেখানো, কতটা আমার আকাঙ্ক্ষার, আর কতটা সচেতনভাবে দেখা ও বোঝার ফল? হয়তো আমরা কাউকে বেছে নিই। হয়তো আমাদের জীবদেহ আমাদের হয়ে কিছুটা বেছে নেয়। হয়তো পরিস্থিতি আরও কিছু বেছে দেয়। হয়তো সময় বাকিটা। আর তবু, এই সমস্ত নির্ধারণের মাঝখানে একটি ছোট্ট জায়গা থেকে যায়—যেখানে আমরা থামতে পারি, নিজের অনুভূতিকে দেখতে পারি, তার গল্পকে প্রশ্ন করতে পারি এবং বলতে পারি:

‘আমি অনুভব করছি—কিন্তু আমি কী দেখছি?’ সেই মুহূর্তেই প্রেম শুধু রসায়ন থাকে না; হয়ে ওঠে চেতনার প্রশ্ন। আর হয়তো মানুষের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ায় নয়। বরং নিজের অদৃশ্য নির্ধারকদের দেখতে শেখার মধ্যে। কারণ শেষ পর্যন্ত হয়তো আমরা শুধু মানুষটিকে বেছে নিই না। আমরা কোন অবস্থায় মানুষটিকে দেখেছিলাম—সেটিও আমাদের পছন্দের অংশ। আর তাই, কে জানে—২০ তারিখে দেখা হলে হয়তো সত্যিই কিছু হতো না। কিন্তু ২৮ তারিখে দেখা হয়ে যদি ‘এই মানুষটাই’ মনে হয়, তবে অন্তত একবার প্রশ্নটা করা যায়: ‘এই, এই মানুষটাই’—কথাটা কে বলছে?’

হরমোন? মস্তিষ্ক? স্মৃতি? আকাঙ্ক্ষা? পরিস্থিতি? নাকি—এই সবকিছুকে দেখতে শেখা কোনো একটু গভীরতর ‘আমি’?

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

ইংরেজি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের একজন গবেষক, শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, বেদান্ত, অস্তিত্ববাদ, আধ্যাত্মিকতা এবং মানব-অভিজ্ঞতার নন্দনতত্ত্ব। বর্তমানে তিনি পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।