শনিবার, জুন ২২

আন্তর্জাতিক ও অন্যান্য কবিতা : হিন্দোল ভট্টাচার্য

0

Motif-01

আন্তর্জাতিক


একটি নদীর মধ্যে কোনোদিন পিছুটান নেই
ভাঙন, জলের ধর্ম, যেমন যুদ্ধের দিন ভেসে আসে বারুদের মৃত
পোড়া নগ্ন গায়ে নশ্বরতা,— সেভাবেই তুমি
গ্রাম বাঁধো, শহরের নক্সা লেখো প্রাচীন কাগজে।
কিছু রাখতে চাইলে কিছু রাখা যায় না আসলে সেভাবে;
ক্ষণস্থায়ী ঘাট থেকে প্রদীপ ভাসিয়ে দেওয়া ভালো।
এখানে তোমার জন্য কোনো ঘন্টা বাজে না আরতি,—
মাথায় রক্তাক্ত ফুল নিয়ে যায় কিশোরীর ভয়
কে যেন ছিনিয়ে গেছে তার পরনের জমি
আমরা তো রাস্তা চাই না, খুঁটি চাই না সাহেব, মাই বাপ
এ মাটির ঘর বড় ঠান্ডা থাকে খরার রোদ্দুরে
প্রতিটি গ্রামের নাম ইরাক, এ কথা
বোঝো কি শহর? শুধু আমেরিকা আমেরিকা সাজ।
যেন যে কলকাতা শুধু কলকাতার ভিতরে থাকে না!
জলের স্বভাব, বুঝি, ঘাট ছুঁয়ে
চলে গেছে দূরে।
এখন নতুন করে ডাইনোসর আততায়ী গুপ্তধন খোঁজ।

এ জীবন পলিমাটি হয়ে থাকে স্রোতের কিনারে।


একটি ভৌতিক কবিতা


যখন তোমার কথা ভাবি, জানি, কেউ ভালো নেই
এত যে হলুদ নীল লাল বেগুনির বাল্ব, তোমাকে বোঝে না।
আগডুম আগডুম বলো, গরুচোর, মহীতলে যৌনজাল পাতা,—
যে কোনো শহরে আছে ভালো-মন্দে মেশানো ব্যাঙ্কক।
খুচরো ধান ঝরে পড়ছে তামাটে বুকের মধ্যে আমাদের আরও…
ভালো নেই কেউ,— ভালো থাকা কি সম্ভব?
একদিন রাস্তাঘাট ভালো হয়ে যাবে আশা করি।
একদিন শারুখ এসে বদলে দেবে কেলেকুলো পতঙ্গজীবন,—
এই ভেবে বেঁচে থাকা, রিয়েলিটি শো-এর পৃথিবী।
খিদেও মেটে না এতে, চোখের তলায় কালি, ঘুম
হয়নি বহুকাল, মৃত্যুভয় মৃত্যুভয়
কে এসে ধর্মের লাশ গুঁজে দেয় আলেয়াপাড়ায়
খড়ের জীবন কোনো আগুনেই শেষ হতে পারে।
ভালো নেই আমরা কেউ, কীভাবে মধুসূদন বলি—
পাখিদের মৃতদেহ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।


ম্যাগট


নিষ্প্রাণ দেহেই ঠিক ম্যাগটের খিদে বেড়ে যায়
আমরা বলি, প্রাণ নেই। এবার ছড়িয়ে পড়বে পোকা।
শরীর, শুধুই দেহ, ক্ষণস্থায়ী, যশের দোকান।

কয়েকটা দিনের পর যশের শরীরে জমে ম্যাগটসংসার।

তখন সাইরেন বাজে মাথার ভিতরে ঘনঘন,
জল থেকে উঠে আসে অনিবার্য প্রাচীন ড্রাকুলা—
এত যে শ্যাওলার গল্প লেখা হলো এতদিন ধরে
কিছুই রইল না আর। ঠান্ডা বরফের দেহে
যশ খ্যাতি ম্যাগট থাকে না।

বুক পেট চিরে চিরে পোস্টমর্টেম দেখে নেয়
স্বাভাবিক মৃত্যু হলো কি না!

তবু কাটাকুটি চলে, তন্নতন্ন, গোয়েন্দাকাহিনি
দেহ খুঁড়ে খুঁড়ে ভাবে
হত্যাদৃশ্য পুনরায় অভিনীত হোক।


ক্লেদজ কুসুম


তোমাকে পড়েছি আমি, জলের উপর লাশ যেভাবে ঘুমোয়
বায়সপক্ষীরা এসে খুঁটে খায় প্রেম, ধর্ম, উপাসনাগুলি
রোদে পোড়ে, ঝাপসা হয়, তলে তলে এত যে গভীর
মাছেদের অলৌকিক স্পর্শ পেয়েও সে ঘুম ভাঙে না।

তোমাকে পড়েছি এই স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময়।
আকাশ সহজ হয়ে কিশোরীর কাদম্বরী চোখ
যার কোনো অর্থ নেই, ছন্দ নেই, রসাতল থেকে
পাথরকঠিন মধু খেতে আসে যতিচিহ্নগুলো।

তোমাকে পড়েছি আমি, জাতকুল খুইয়ে কাটাকুটি
এখন একঘরে হয়ে দেখছি ভগবান আলুথালু
তোমার অক্ষর থেকে স্নান করতে কলতলা আসেন।
বয়স হয়েছে, তবু, এখনো তরুণী উন্মোচন।

দেখে দেখে আঁখি ফিরে আসবে না আমার অপভাষা,—
শব্দের ভিতরে আছে প্রতিধ্বনি, স্বভাব-কুয়াশা।


নস্ট্রাডামুস


বলেছে সমুদ্র এসে সূর্যোদয় ঢেকে দিতে পারে
হাতের রেখায় ধূ ধূ এতবার নিম্নচাপ হলো
ভেসে গেল ভ্যাবলা চোখে মেথিশাক ভেজানো যৌবন।

কেন যে তোমার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে রোজ!

আমিও টগরগাছে ফুটে থাকি বলে চিরদিন
এ রাস্তা ও রাস্তা করি, বুঝি দাঁড়াবার জায়গা নেই।
আকাশে থিকথিকে ভিড়, উপগ্রহে হাঙর শকুন।
বরফ যে গলে যাবে, বলেছিল মেষপালক সেই—
ওয়দিপাউস আজও, দুচোখ নিজের হাতে নিয়ে।

কেন যে তোমার কাছে উড়ে আসে শালপাতার ধুলো

এখন মাটির বুকে কান পেতে শুনেছি পাহাড়
ভেঙে যাবে অচিরেই, কী রক্ত কী রক্ত ভাসমান
নিছক ধারণা নিয়ে অমরত্ব ভোজের আসরে
ছাইভস্ম মাখা মেঘ যখন সমুদ্র ঢেলে দেয়।

তখন তোমার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় রোজ—
বোঝ না তুমিও, ভাবো, রক্তে কেন জীবাণু আগুন!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৭৮। কলকাতায়। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লেখালেখির শুরু নয়ের দশকের প্রথমার্ধে। প্রথম বই লেখালেখি, শুরুর দশ বছর পর ‘তুমি, অরক্ষিত’। এর পর একে একে বেরিয়েছে ‘তারামণির হার’, ‘তালপাতার পুথি’, ‘মেডুসার চোখ’, ‘জগৎগৌরী কাব্য’, ‘তৃতীয় নয়নে জাগো’, ‘যে গান রাতের’ প্রভৃতি।  মোট ষোলটি কাব্যগ্রন্থ, একটি উপন্যাস ও তিনটি গল্পগ্রন্থের রচয়িতা। ‘জগৎগৌরী’ কাব্যের জন্য পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার ও ‘যে গান রাতের’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি পুরস্কার। বর্তমানে ১০০০ বছরের জার্মান কবিতার অনুবাদে রত।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।