ফেটানো ডিম-চিনি জেবজেবে পাউরুটি ভাজার গন্ধ সেটা, নাকি জ্যান্ত বিকালের!
১.
একদিন, সেদিন সকালে সকালে, আলো।
সকালটা তখন কচি না। আবার ডগর-ডাঙর হয়ে ওঠাও না। যেন সে সকাল তখন অনেকখানি মাথায় বেড়ে ওঠা, কিন্তু অনেকখানিই না-বুঝ এক মনুষ্যকন্যার মতো; সেইদিন।
সেদিনই কেন জানি আকাশে কেমন আলো! কেমন কেমন আলো।
কামরাঙার ডালে ডালে, পাতার নিরলে নিরলে, বাত্তি হয়ে উঠতে থাকা কামরাঙা ফলের হলদে-সবুজ শরীরের মতো; অনেক আলো। সবজে-হলদা সে আলো। আসমানে আসমানে, আর আমাদের গাছগুলোর মাথায় মাথায়। সেই রোদ তখনও উঠানে নেমে আসে নাই সেদিন।
আব্বা কোন ওই ভোর ভোর, অফিসের জন্য বের হয়ে গেছেন। যেতে তাঁকে হয় যেন সত্য সত্যই সাত সমুদ্র অথবা তেরো নদীর ওই পাড়ে। আমাদের এই দেওভোগের বাড়ির পরে, কতো রকমের কতো কতো নাকি পন্থ পাড়ি দেওয়ার থাকে। সেসব পেরুতে হয় আব্বাকে, প্রায় প্রতিদিনই। রোজ ফিরতে ফিরতে এশার ওয়াক্ত হয়ই হয় আব্বার।
উঠানে আর গাছদের গোড়ায় গোড়ায় তখন সাদাটে আলসেমি আর নৈঃশব্দ্য। আর তখন, আমাদের নতুন ওই বাড়ি ভরাও ছিলো থইহীন নিঃঝুমতা। আব্বা কোন ওই ভোর ভোর, অফিসের জন্য বের হয়ে গেছেন। যেতে তাঁকে হয় যেন সত্য সত্যই সাত সমুদ্র অথবা তেরো নদীর ওই পাড়ে। আমাদের এই দেওভোগের বাড়ির পরে, কতো রকমের কতো কতো নাকি পন্থ পাড়ি দেওয়ার থাকে। সেসব পেরুতে হয় আব্বাকে, প্রায় প্রতিদিনই। রোজ ফিরতে ফিরতে এশার ওয়াক্ত হয়ই হয় আব্বার।
তারপর জিরিয়ে-মিরিয়ে, ওই অতো অতো অমন পথ-পেরুনোর কিচ্ছা-কাব্য শোনান আব্বা। আম্মাকে শোনান। সবকথা আম্মাকে শোনাতে ভালোবাসেন আব্বা। আমরা পোলাপানসকল, অমন রাত-ঘন হতে থাকার-কালে, পড়ার টেবিলে বসে বসে পড়া মুখস্থের মকশো করতে করতে, সেইসব কথা-পরস্তাবের দিকে কানকে পাঠায়ে দিতে থাকি। খুব খুব দিতে থাকি। তখন কেমনে কখন যে আমাদের গলার আওয়াজ থেমে-থুমে ঝুম হয়ে গেছে, ঝুম হয়ে যায়, আমরা ভাই-বোনেরা কোনোজনেই সেটা খেয়াল করে উঠতে পারি না।
ঢাকা কী কাছে-কিনারের! এই ১৯৭৩ সালেও নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা যেতে হলে, আছে কেবল বিআরটিসি বাস। নয়তো কদাচিৎ পাওয়া যায়, ভোমা গোবলা শরীরের ভোপ ভোপ হর্ন দিতে থাকা, ভুটকি-গুলটি জাতের বাসগুলার কোনো কোনোটাকে। নাইলে থাকে ট্রেন। সেটা যদি টাইম মিলায়ে-টিলায়ে ইস্টিশানে পৌঁছানো যায়, তো তখন সেটাতে চড়া যায়। তাই রোজ আব্বার ভোর ভোর অমন ছুট। রোজ রোজ রাত এশার ওয়াক্ত করে করে, এইভাবে ফিরে আসা।
ঢাকার কোনোদিকে কি বাসা নেওয়া যায় না?
যায় তো বটেই। অফিসের বরাদ্দের বাসা তো মতিঝিল এজিবি কলোনিতেই মেলে। বরাদ্দ আছেও তো।
কিন্তু নিজেদের এই যে নতুন বাড়ি, এই যে এমন উঠানে উঠানে কামরাঙা গাছ; টিয়া-সবুজ পাতাঅলা চার চারটা জাম গাছ ও অগুনতি আমের চারা; আর এই যে নিমের ডালে ডালে অই যে অমন শান্তির দুপুর; সেইগুলার মায়া কেমনে কাটানো যাবে! নিজেদের প্রথম বাড়ি না! পুবের পুষ্কুনীর পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে কেমন পোক্তরকমে মাচাখানা বান্ধানো হইছে! একজন জোগালীরে পুরাদিনের মজুরি দিয়ে, তবেই অতি সুন্দর মতন বান্ধা হইছে, অই মাচা। তাতে এখন পুঁই আর ধুন্দুল আর করল্লা আর মিঠা কুমড়ার লতাডগা ঢলকায়ে ঢলকায়ে জোয়ান হয়ে উঠছে। সেইসব লতাডগায় ফুলরে ফুল, ডগার এই মুড়া সেই মুড়ায় পুখরি, কচি নব শাখার অল্প-মল্প আভাস, ওই দেখো! কেমুন বাহারের!
এদের সকলেরে একদম একা ফেলে, অন্য কোনোদিকে চলে যাওয়া যায় নাকি! ওই যে নতুন কাটা পুষ্কুনী! সেইটাতে দেখো, কেমন না কুচকুইচ্চা কালা পানি জাগনা দিছে, কেমন না শীতল পানি!
এদের রেখে কলোনির কিটকি-মিটকি ফ্ল্যাটে, বসত করতে মন যায়? যায় না। মফস্বলে মফস্বলে তো একটা আস্ত বাড়ি বরাদ্দ ছিলো! চৌদিকে দেয়াল-ঘেরা একতলা সব। সেইখানে বসতের কালে যেই শান্তি মিলছিলো, সেইটা কি ওই ফ্ল্যাটবাড়িরা দিতে পারবে?
পারবে না। আব্বারও সেইটা মনে হয়। আম্মারও হয়। তাইলে আর কী! তাইলে এখন আসা-যাওয়ার ভোগান্তী-পেরেশানী বরদাস্ত করো। ‘এক সুখ পাইতে হইলে আরেক বে-সুখরে সইজ্জ করোন লাগেই। খনার মায়ে এমুনই কইয়া গেছে!’ আমাদের শহরবানু খালাম্মা, পাটার ওপর শুকনা মরিচ রাখতে রাখতে এই সত্যকথাখানা জগতেরে নিত্য স্মরণ করায়ে দিতে থাকেন।
সেই মরিচদের, রোজ, কোনো-না-কোনো বিহানের টাইমে গামলার পানিতে চুবায়ে রাখা হয়। বেলা দশটা করে মরিচেরা নিজেদের ভেতরে, পানি টেনে নিয়ে-টিয়ে, একেবারে ভোমা-ভোমলা হয়ে থাকে। তাদের তখন পাটা পুতা-পেষা করতে বহুত আরাম। দুই-চারটা বাটা দিবা কী দিবা না, অমনেই লোকে পেয়ে যাবে মিহি-মিশকানো মরিচ বাটা। নিত্যির রান্নার জন্য অমনেই মশলা বাটে শহরবানু খালাম্মা।
তো, সেইদিনের সেই সকালে, পাটা-পুতায় মরিচ বাটাবাটির ঘস্টর-পস্টর আওয়াজ তখনও ওঠে নাই। আদতে তখন আব্বা বেরিয়ে যাওয়ার পরে, আম্মা, একটুখানি কাত হওয়ার অবস্থায়। আমাদের গুঁড়াগাঁড়ারাও ঘুমকে ঘুম। খুব আল্টা-মাল্টা জোরসে ঘুম।
বাড়িতে তখন কে জাগে?
একলা এক ভোম্বল কন্যা জাগে।
সেই সেইই তখন কেবল জাগনা।
সে আর নিদালু থাকে, তার তখন সেই সাধ্য নাই। রাতের কালে যে তার দুই চক্ষে নিদ আসছিলো, সেইটা ঘুমের দোষ। পারলে, সে কিছুতেই ঘুমাতো না। কিন্তু কেমনে যে ঘুম আসেই আসে! সে বোঝে নাই।
নাইলে তখন, ওই রাতের বেলা তো সে ভেতরে-অন্তরে ছটফট ছটফট, ছটফট ছটফট। সদ্য জালে আটকানী পাওয়া পুঁটিমাছদের মতন ছটর-পটর, ছটর ছট কম্প পেতে থাকা তখন, তার পরানের সবটা। প্রতি বছর বৈশাখ মাসে নানাবাড়ির পুষ্কুনীতে জাল ফেলা হয়। সমস্তটা পুকুরে ঘের-দেওয়া জাল। সে জাল তুলে আনার পরে, কতো মাছ। কতো জাতের কতো মাছ। সকলেই থির গম্ভীর, কিন্তু পুঁটি মাছেরা শুধু রাগে অশান্তিতে ছুট্টুর মুট্টুর, চিট্টুস চুট্টুস। ছড়ফড়ানি ছটফটানি।
সেই মেয়েটার অন্তরে, ওই রাতের কালে, তেমন তেমন ছড়ফড়-ছটফট। হবে না কেন! সে না সেদিনের বিকালের টাইমে, খুব আশ্চর্যের একটা জিনিস পেয়ে গেছে! এমন কিছু যে সে এমন হঠাৎ করে, এমন সত্যি সত্যিই, পেয়ে যেতে পারে; সে জানতো নাকি কোনোদিন! কোনোদিন অমন কিছু পেয়ে যাওয়ার আশা সে, করতে জানতো নাকি! কিন্তু কী তাজ্জবের বিষয়, আল্লা! সে পেয়েছে! পেয়েছে।
আব্বা রোজই তো রাতের এশার টাইমে ফেরেন। কিন্তু সেই বিকালে, আচমকাই আব্বা বিকালেই ফিরে আসেন। দিনের বেলা, অমন বিকালের বেলায়, ছুটির দিন ছাড়া অন্য আরেকটা দিনে আব্বা-পেয়ে ওঠা! অনেক আহ্লাদের। বাড়িভরা তাই অনেক হল্লা তখন।
আব্বার হাতে একটা একটা নতুন পেপার। ওটা নাকি অনেকই তুক্ষার একটা পেপার। এটাও পড়া দরকার, আব্বার। আবার আম্মারও। আর, মাথা-জাগনা দিয়ে উঠতে থাকা জ্যেষ্ঠাজন, সে পড়ে তো পড়লো! দেশদুনিয়া আর দিনকালের খোঁজটা রাখতে শিখুক না মেয়ে, বেড়ে উঠতে উঠতে! এখন তো সে কেবলই ক্লাশ নাইনে। এইটা পড়ে-পড়ে যেট্টুক বুঝতে পারবে, বুঝবে।
এদিকে, আব্বার হাতে একটা একটা নতুন পেপার। ওটা নাকি অনেকই তুক্ষার একটা পেপার। এটাও পড়া দরকার, আব্বার। আবার আম্মারও। আর, মাথা-জাগনা দিয়ে উঠতে থাকা জ্যেষ্ঠাজন, সে পড়ে তো পড়লো! দেশদুনিয়া আর দিনকালের খোঁজটা রাখতে শিখুক না মেয়ে, বেড়ে উঠতে উঠতে! এখন তো সে কেবলই ক্লাশ নাইনে। এইটা পড়ে-পড়ে যেট্টুক বুঝতে পারবে, বুঝবে।
তাদের তল্লাটের আশপাশের কোনোদিকেই এই মেয়ের কোনো বান্ধবী নাই। এমন ভেতরের দিকে, না-গ্রাম না-পাকা সড়কঅলা কোনোরকম একটু পাড়া, এই দেওভোগ অঞ্চলটুক। এই অঞ্চলে স্কুলে যাওয়ার জন বলতে এই এক কন্যা মাত্র। সে একা একলা স্কুলে যায়, একা একলা কেবল বই পড়ে, আর আব্বার ট্রান্সফার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। কবে আব্বার আবার ইচ্ছা হবে! ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা? আব্বা না বলছিলো, এইবার রাজশাহী মাস্ট? কবে তবে!
২.
আব্বা যেই পেপারটা আনেন, তার নাম সাপ্তাহিক দেশবাংলা।
ইত্তেফাকের মতো অনেক লম্বা-উঁচা না এই পেপারটা। ইত্তেফাকের লেখাগুলার মতন অমন কালচে গুঁড়িগুঁড়ি অক্ষরঅলাও না এটা। এইটা দেখতে ছোটোমোটো। পাতাগুলাও যেন অনেকটাই মোটামতো। এই পেপারের ভিতর থেকে ইত্তেফাকের মতন গন্ধ তো উঠছে না। ইত্তেফাকের ভেতর থেকে রোজার দিনের বুট-মুড়ি-পেয়াজুর গরমাগরম দোপেঁয়াজা দোপেঁয়াজা গন্ধ ওঠে। অনেক ভালো লাগে সেই গন্ধ।
কিন্তু এই পেপারটা থেকে আসতাছে অন্যরকম গন্ধ! বইয়ের পাতার ভেতরে গুঁজে-রাখা শুকনো শিউলি ফুলের ফুরফুরা ফুরফুরা গন্ধ-মতোন যেন, এই পেপারের গন্ধটা।
এইটার পাতা সাদা সাদা। তাতে কালো কালো অক্ষর। সেই অক্ষর দিয়ে দিয়ে, অনেক কঠিন কঠিন রাগের কথা লেখা আছে, সেই কাগজে। আব্বার নাকি ওটা পড়তে অনেক ভালো লেগেছে। আম্মার একটু ভালো লাগে না এইটারে পড়তে।
‘কতো কইতাছি, বেগম লইতে। তুমি দেহি গ্রাহ্যই করতাছো না রহমান সাব! গ্রাহ্য তো করতাছোই না। উল্টা নিকি কী একটা আজাইরা বকাবাদ্যিঅলা পেপার আনোনের বাহানা ধরছো! এমুন কইলজা-ছেঁদা করা কথা পড়োন লাগবো নিহি, টেকা দিয়া পেপার কিন্না? বেগম দিতে কও না ক্যান?’
‘বেগম দিতে যে কমু আমি ছেড়াটারে, আমি কি দোপোরের টাইমে ঘরে থাকি? থাকো তো তুমি। তুমি ফায়সালাটা সারো না ক্যান? আমারে এইটুক আসান দিতে তোমার মনে চায় না?’
‘হ, হ! আমি তো বাইত খালি আজাইরা বইয়া থাকি। আমারে তো চুলা গুঁতানো লাগে না। আমারে তো পোলাপাইনের গুষ্টিরে লেপা-পোছা লাগে না। খালি আমি নাকি অফিসে বইয়া থাকি।’
এমন বিবাদে আব্বা-আম্মা থাকা মানে, একটু পরেই আমাদের জন্য কোনো-না-কোনো ভালো খানাখাদ্য রান্না হওয়াই হওয়া। আব্বা ও আম্মার ওই বিবাদের আগুন্তি-পাছুন্তির মধ্যেই মেয়েটা, নতুন পেপারটাকে হাতে নিয়ে নেয়। পড়তে যে সে কী ভালোবাসে! কী ভালোই না বাসে সে পড়তে!
বাড়িতে ইত্তেফাক রাখা হয়। আমাদের বাড়িটা নারায়ণগঞ্জ টাউন থেকে কতো যে দূরে। কোন যে ভেতরের ভেতরে। আবার, আমাদের আশপাশের কোনো বাড়ির কেউ পেপার নেয় না। পড়তেই যে জানে না আমার পড়শি-অড়শি মামা-খালুরা। তারা পেপার নিয়া কী করবো!
পুরা দেওভোগে, শুধু ওই এক ঘর লোক, যাদের পেপার নেওয়া লাগে। এই আমাদের বাড়ি। এই একটা বাড়িতে পেপার দিতে আসতে তো কম দূর হাঁটা লাগে না। আমাদের দেওভোগ তখন এমনই এক চিলতে এট্টুখানি এক পাড়া, চলাচলতির জন্য সেখানে তখন একটা মাটির রাস্তাসুদ্ধ নাই।
ওই ফাঁকা টানা জায়গাটা বছরের শুকনার দিনে; থাকছে শেয়ালকাঁটা, হাতিশূড়, দণ্ডকলস আর নাটাকাঁটার ঝাড়ে-ঝোপে থলথলানো। কোনো কোনো দিকে মাথা-উঁচিয়ে আছে অনেক অনেক চোরকাঁটার ঝাড়। শুকনার দিনে ফাঁকা-লম্বা ওই জায়গাটা অমনই থাকে। আর থাকে ধুলা-ধুলধুলা।
পাড়াটার মাঝখান দিয়ে একটা ফাঁকামতো টানা জায়গা ফেলে রাখা আছে, মিউনিসিপ্যালিটি বলে গেছে একদিন এখান দিয়ে একটা সড়ক যাবে। আগে হবে মাটির রাস্তা, পরে কোনোদিন ইট-বাঁধাই সুড়কি-ঢালাই রাস্তা হবে এইটাই।
ওই ফাঁকা টানা জায়গাটা বছরের শুকনার দিনে; থাকছে শেয়ালকাঁটা, হাতিশূড়, দণ্ডকলস আর নাটাকাঁটার ঝাড়ে-ঝোপে থলথলানো। কোনো কোনো দিকে মাথা-উঁচিয়ে আছে অনেক অনেক চোরকাঁটার ঝাড়। শুকনার দিনে ফাঁকা-লম্বা ওই জায়গাটা অমনই থাকে। আর থাকে ধুলা-ধুলধুলা। তখন ঝোঁপঝাড়ের কিনার-কাছার দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসা-যাওয়া করা যায়।
কিন্তু বর্ষার কালে? তখন বাইরা মাইস্যা পানির তলে চৌদিক। কোষা নাওই ভরসা তখন।
সেই পাড়াখানে পেপার দিতে আসা কি কম মেহন্নতের কাম! পেপারঅলা মিয়ায় রোজ রোজই পেপার দিতে এসে এইমতে গজর-মজর করে।
কই হইলো গিয়া ডায়মন্ড সিনেমা হল, সেইখানে পেপারের স্ট্যান্ড। ঢাকা থেকে সেইখানে পেপার আসতে আসতেই না বেইল এগারোটা সাড়ে এগারোটা হইয়া যায়। পেপার আসে, একেকজনে একেক গাট্টি পেপার বুঝবাঝ করে, তারবাদে-সেনা বাড়ি বাড়ি পেপার দেওন। এই যে পেপারঅলা, সে পইল্লা-পরথমে টাউনের উকিলপাড়া, চেম্বার রোড, তামুকপট্টির বাড়িগিলিতে পেপার দেয়। তারবাদে আখড়া, জল্লার পাড় দিয়া পেপার দিয়া-থুইয়া, তবেই সে আসে এই দেওভোগে। আসে সর্বশেষ এই বাড়িতে পেপার দিতে। এইটাই শেষ খেপ তার। এইনে সে পেপারখান দেয় কী দেয় না, অমনেই যাওয়া ধরে নিজ বাড়ির দিকে। তার বাড়ি হইলো ভোলাইল। দেওভোগ ছাড়াইয়া আরও এট্টু পচ্চিমে।
নিজেগো ভোলাইলের রাস্তা বরাবর পড়ে কিনা এই গাহেকের বাড়ি, সেই কারণে সে পেপার দেওনের কামটা নিছে। সর্ব কর্ম সারতে সারতে একেকদিন সে এইখানে পেপার দিতে আসে আসর পার হয় হয় টাইমে। আম্মা তখন ঘুমে, পোলাপাইনেরা সকলেই নিজের নিজের স্কুলে। তখন এই মিয়ায় পেপার কার হাতে দেয়? সে পেপারখানা গেটের ফাঁক দিয়া উঠানের মাটিতে ফিক্কা থুইয়া যায়। ঘরের কেউই তো তারে সামনাসামনি পায় না মোটের উপরে। তাইলে কে তারে বলবে, রেগুলার কইরা বেগম পেপারটা দিতে!
বললে, আম্মা বলতে পারে। কিন্তু ঘুমের আলস্যি আম্মাকে এমন আটকে রাখে! চোখ নাকি খুলতেই পারে না আম্মা। আব্বার সাথে এই সব কথার প্যাঁচ-ঘোচ চালাতে চালাতে আম্মা কখন যে গিয়ে চুলার পাশে বসেন! উঠানের নিমগাছের নিচে আব্বার জন্য জলচৌকি পাতা হয়। সেটার পাশে ছোটোমোটো শীতলপাটিখানাও বিছানো হয়ে যায়।
তার ওপরে নকশি দস্তরখানাটা পেতে দিতে থাকে শহরবানু খালাম্মা। পাটির বাইরে, উঠানে কাঁসার চিলমচিটাও কোন সময় জানি রাখা হয়ে গেছে। বিকালের নাস্তা তাইলে আম্মা ওইখানে খেতে দেবেন!
কী আর দেবে? সেই সেই ওভালটিন আর টোস্ট বিস্কুট। নাইলে আব্বার জন্য ঝালমুড়ি আর আমাদেরও ঝালমুড়ি আর ওভালটিন। সেইসব কে খায়! বহুত খাইছি আমরা। খালি ওভালটিন, খালি ওইই।
পাতা ওল্টাতে থাকি আমি। উঠানে উঠানে অনেক কেমন একটা গন্ধ যেন উড়ছে! পরান উতলা করে দেওয়া গন্ধ! ফেটানো চিনি আর ডিম জাবড়ানো পাউরুটি ভাজার গন্ধ যেন আসে। অনেক সরেস আর তপ্ত তপ্ত গন্ধ! আম্মা বুঝি সেই খাবারটা করছে! ওহ! আব্বার অতি প্রিয় প্রিয় অনেক প্রিয় সেই খাবারটা! আব্বা যে কেন রোজ রোজ বিকালে বিকালে বাইত আইতে পারে না! ইশ!
আব্বার আনা নয়া ওই পেপারটা খুলতে খুলতে আমার বিষম চেত আসতে থাকে। আধা ঠান্ডা ওভালটিনেরে স্মরণে আসতেই চেত হতে থাকে। ক্যান! চা বানাইলে কিসের দোষ? আউজকা আমি কিছুতেই যুদি ওভালটিন মোখে দেই!
পেপারের পাতায় পাতায় কতো না লেখা! বড়ো বড়ো সব লেখা। আগুন আগুন লেখা। অইগুলা তো আমি পড়মুই। স্কুলের পড়াটা শেষ কইরা, তবে পড়মু। রাইত বেশি হইলে তবেই আমি সেই টাইমটা পামু। অখন তো আগে আলগোচ্ছে এট্টু, পুরাটা পেপাররে দেইক্ষা লই!
পাতা ওল্টাতে থাকি আমি। উঠানে উঠানে অনেক কেমন একটা গন্ধ যেন উড়ছে! পরান উতলা করে দেওয়া গন্ধ! ফেটানো চিনি আর ডিম জাবড়ানো পাউরুটি ভাজার গন্ধ যেন আসে। অনেক সরেস আর তপ্ত তপ্ত গন্ধ! আম্মা বুঝি সেই খাবারটা করছে! ওহ! আব্বার অতি প্রিয় প্রিয় অনেক প্রিয় সেই খাবারটা! আব্বা যে কেন রোজ রোজ বিকালে বিকালে বাইত আইতে পারে না! ইশ!
ওই যে উঠানে ওই যে দস্তরখানার ওপরে কাঁসার থালাখানা, ওই দেখা যায়! থালা উপচানো ওই যে ভাজা পাউরুটিরা!
‘বড়ো, আয়!’ আম্মা ডাক দেয়।
‘কই রে মাইয়া! ঠান্ডা হইয়া যাইতাছে। আয়!’ আব্বা ডেকে চলেন।
‘উইয়ে নি আইবো অখন।’ শহরবানু খালাম্মা সকলেরে জানান্তি দিতে থাকেন, ‘উয়ে পাইছে নয়া আরেকখান বই। হেইটা থুইয়া উয়ে উটবো নিকি!’
পেপারটার শেষপাতাটা না দেখে যাই কেমনে! খাক না সব্বাই। আমি একটু পরেই যাই না? শেষ পাতাটা অল্প একটু দেখেই ছুট লাগাবো, এমনই ভাবছিলাম আমি প্রথমে। কিন্তু কী যে হয়! কী যে হয়! শেষের পাতার এক কিনারে একটা ছোটোমতো লেখা, এই যে ছাপা হয়েছে। লেখা? না, লেখা না। কি তবে? কী জানি!
ওইখানে লেখা আছে:
পত্রমিতা চাই
রাজিকুল আহসান /এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষ/আল রাজি মেডিক্যাল হোস্টেল/রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ/রাজশাহী
যা দেখছি, আমি কি সত্য সত্যই তা দেখছি? এটা কি সত্য?
নাকি ফেটানো ডিমের মায়ায় জাপটানো পাউরুটির গন্ধরা আমারে এইভাবে ভুল দেখাচ্ছে? ভুল দেখছি নাকি!
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ১ম পর্ব
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ২য় পর্ব
[বি. দ্র. লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।]

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।
আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধূলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!