শুক্রবার, জুলাই ৩১

ত্রিকালদর্শী, হে পঙ্খিনি

0

১.
এই যে প্রাচীন গাছ; তাতে স্মৃতিপুঞ্জ, ধ্বংসস্তূপ
মানুষ পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘপথ, অগ্নিদগ্ধ নদী
সময় এক বহুরূপী মহাভাঁড়; দেখিয়েছে জাদু
মহিষের শিং দিয়ে বানানো কাঁকই তার সাক্ষী

তুমি জানো কাটামুণ্ডের ইতিহাস, ভাইয়ের পিঠে
বোনের মৃতদেহ, ওংকার; বাঘছালের নিচে
লীলাময় করুণ কঙ্কাল, আর যত বেদে নারী
ঋতুর গন্ধমেখে উজান থেকে উজানে ছুটে-চলা

আস্তাবলে মরখুটে ঘোড়ার বিলাপ শুনতে পাও?
ধ্বস্ত লিঙ্গ, আর চোখের কোটরে তাদের অন্ধকার
জমা হয়ে আছে, কখনোসখনো নিজেদের রক্তের
ভিতরকার আফিমের গন্ধ শ্বাস রোধ করে দেয়

একটা আঁকাবাঁকা পৃথিবী তো পার হওয়া গেল
মুণ্ডানারীর সঙ্গমতৃষ্ণায় পুড়ে গেছে কত ফসল
তুমি জানো, তাদের অলক্ত পায়ে গাঢ় চুম্বন
এঁকে কমন্ডলু জলে কত স্নানও করে নিয়েছি।

 

২.
মাটি ছেনেভেঙে যারা গড়েছে নিজের প্রতিমা
তারা কৃষিমগ্ন ভাইবোন, মাতাপিতা, স্বামী আর স্ত্রী
তন্ত্র মন্ত্র সাধন দিয়ে গড়েছে চিত্ররূপ চিত্তরূপ
সপ্তডিঙা ঠেলে এখানে তাদের ঠাঁই হাড় সন্ন্যাসসহ

লাঙলের পালটে মিশে গেছে কত রক্তমাখা চাঁদ
পঙ্খিমাতা ডানা ঝাপটেছে, ভেঙে গেছে নীড় ও ডিম
আমপাতার ছাইয়ে ঢেকে গেছে দূর্বা ও বিন্নাদলের
হাহাকার, নদীতীরে একই শব্দহীন ধ্বনি বীজখেতের

অন্ধকারের নাভিদেশে আজ কারা পিতামহের করোটি
খুঁজে বেড়ায়? মুঠোভরতি কঙ্কাল নিয়ে ভূমির রন্ধ্রে
গেঁথে রাখে মৃতের অবশিষ্ট স্মৃতিচিহ্ন, অযৌন ক্ষুধা?
ব্যর্থসব ভ্রুণের ক্রন্দনের পাশে তুমিও স্তব্ধ একাকী

আমি সারাটা রাত বাথানে শুধু গোবাদির কান্না শুনি
কুপিহীন কুটিরে নারী ও পুরুষের ঐশী আর্তনাদ
তোমার দেহের গাঢ় গন্ধ নাকে ভেসে আসে বাতাসে
সকল অতীন্দ্রিয়ের শোভা আমি চেয়ে চেয়ে দেখি।

 

৩.
প্রত্ন নারীর দীর্ঘ কঙ্কাল দেখে ভেবেছি এ গঙ্গামূর্তি
হয়তো খোঁপায় জড়ানো ছিল সাপের হাড়ের মালা
পুকুর খুঁড়ে খুঁড়ে ঈশানকোণে পেয়ে গেছি কাল
চোখের কোটরে খুঁজেছি রক্তমণির কম্পমান রেখা

কিন্তু নাভিমণ্ডল দেখে মনে হয় মেহগনি কাঠের স্তূপ
যদিও দেহের নিচে ক্ষরিত তামসতা, বর্ম ও কৃষিশোভা
নৃমুণ্ডশিকারীদের দলে একদা আমিও ছিলাম, এই নারী
দ্বাদশ যোগিনী; হাড়ের চিহ্ন পথে পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে

এই যে কঙ্কাল, সেও সাক্ষী আমাকে পুড়ানো হয়েছে
অরিন জংলায়, আশ্চর্য অন্ধকারে সুপ্ত সুষুম্না পুড়ে ছাই
যদিও ইড়া ও পিঙলা আমাকে নিয়ে চলে উলটো রথে
অতিঘোর রাতে আমার অস্থিতে জ্বলে হৃদিস্থ মধ্যমা

ধূসর কঙ্কাল এই কালচক্রযান ভেসে আসে গর্ভগৃহে
অর্ধস্ফুট অমাবশ্যায়; পুরুষ ও প্রকৃতির মৈথুন শেষে
পৌরাণিক রাতে, পিঁপড়ের সারির মতো মধুচক্র ভেঙে
তুমিও নিষাদের চোখ এড়িয়ে ষড়চক্রে সাক্ষী হয়ে আছ।

 

৪.
বানের সময় যেভাবে ভেলার পেছন পেছন
ভেসে আসে আহত জলঢোঁড়া, আমিও এমনি
কালস্রোতের প্রবল টানে এখানে এসেছি, নিরীহ
নরোম পলিতে দেখো পড়ে আছে দেহের চিহ্ন

চারদিকে যুদ্ধের ডামাঢোল গায়ে তাই জবার রং
ছড়ানো কবন্ধের পাশে দিনেরাতে সমান কাতর
কুঠার মাত্র অস্ত্র তাও কারা কেড়ে নিয়ে গেছে
এখন তসবির দানার মতো মৃত্যুর প্রহর গুনি

মানুষকে হত্যা করে মানুষ কতটা জয় পেল?
অথবা চতুর সেজে কী লাভ হলো মানুষের?
—এই প্রশ্নে অন্ধকারে চোখ মেলে তাকালে
দৃষ্টির মশাল দেখে ক্ষতময় করোটির পাহাড়

তুমিও জানো মানুষ নিজেকে হত্যা করেছে
বহু আগে, এখন সে আপন শব বহন করছে
মহা ধুমধামে; ধর্ম, জ্ঞান, মহত্ত্ব সবই তার একেকটি
মুখোশ মনে হয়—আরশিতে নিজের কাছেও অচেনা।

 

৫.
লোকে ভাবে কতকিছু; কখনো লক্ষ্মী, কখনো অপয়া
শুভ-অশুভের বার্তা নিয়ে ঘরের ছাদে, দক্ষিণে ও উত্তরে
যখন পানখ সাপের ডিমের মতো ঘোলাটে রাত আসে
চরাচরে, তুমি হয়তো কেঁদে উঠলে কবরস্থানের গাছে

মানুষের মাংস দগ্ধ করে খাচ্ছে মানুষ পরম তৃপ্তিতে
ভেবেছ নূতন কিছু নয়, এটাও মানুষের ধর্ম; যেহেতু
গুহার কন্দর থেকে গাছের শাখার থেকে জমিনে এসেছে
তাইবলে তমিস্রা ডেকে আনবে মোহরের প্রলোভনে?

নেশাতুর মহাকাল নিজেই কালকেউটে; পেঁচিয়ে ধরেছে
মানুষের গলা, অথচ মানুষ ভেবেছিল এ তারই টোটেম
গাছেরাও বিষণ্ন আজ কেননা বাতাসে রক্তের ফেনা ভাসে
এমন ওঝাও নেই হৃদয়ের হিংসার বিষ ঝেড়ে নামাতে পারে

তবু কেন তোমাকে চিনি না? হাওড় থেকে আসা কচ্ছপের
পিঠে একমাত্র সওয়ার আমি বোরোখেতের আলে দেখি নাই
তোমারে? যখন ইহুদি ও তার দোসররা কাটামুণ্ড হাতে
ডলারের নিলাম হাঁকে তখনও বার্তা দিয়ে যাও, কল্যাণী!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি, আখ্যান-লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। জন্ম ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশের ওপরে। উল্লেখযোগ্য কবিতার বই ‘সিন্ধুদ্রাবিড়ের ঘোটকী’, ‘এখন মৃগয়া’, ‘আমি করচগাছ’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রভৃতি; আখ্যান ‘একটা জাদুর হাড়’, ভ্রমণ-আখ্যান ‘না চেরি না চন্দ্রমল্লিকা’, প্রবন্ধ ‘কবিতার ইন্দ্রজাল’, ‘রাষ্ট্র দুর্বৃত্তায়ন ও ন্যায্যতার লড়াই’ এবং গবেষণা ‘সিলভিয়া প্লাথ: সৃষ্টি ও স্বীকারোক্তি’, ‘সিলেটের তাম্রশাসন: ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি’। পেশাগত জীবনে প্রথম দিকে সিভিল সার্ভিস, পরে শিক্ষকতা। কর্মক্ষেত্র শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সম্পাদনা করেন ছোটোকাগজ ‘সুরমস’ ও গোষ্ঠীপত্রিকা ‘কথাপরম্পরা’। শখ ভ্রমণ। ভ্রমণ করেছেন নেপাল, ভারত, জাপান, চীন, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ। স্ত্রী সাহেদা শিমুলকে নিয়ে বসবাস করেন সিলেটে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।