রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭

আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ৫ম পর্ব

0

‘কোন সে পন্থ গেছে পোস্ট অফিসের দিকে!’

 

আমাদের যে পাড়া, তার নাম দেওভোগ। রাস্তা-মোস্তা বিহীন একখান, কোনোরকম গ্রাম মতো বসতিস্থল শুধু সেটা। আমার যে হাইস্কুল, সেটা হলো একবারে টাউনের কাছাকাছি জায়গায়, ডিআইটি ১নম্বর মার্কেটের কাছে। সেইখানেই টাউনের নতুন ও অন্য কয়টার চেয়ে সুন্দর দেখতে সিনেমা হলটা। গুলশান সিনেমা হল। স্কুলঘেঁষেই ছোটোঠান্ডা পৌর পাঠাগারখানা। সেইটাতে তখনকার দিনে, ওই ১৯৭৩ সালে, একটা কোনো মেয়েও পা দিতে যায় না। শরমের ব্যাপার না? ওইখানে যায় কেবল ব্যাটামানুষেরা। ওইখানে দিন ভর খালি ব্যাটা-পোলাপাইনেই আনাযানা চালায়, কেউ কেউ বসে বসে পড়ে। পেপারটা পড়ে, নাইলে পড়ে কোনো-বা চিকন-চাকন বই। তবে বেশিরভাগ জনই গালগপ্প করে। সবই কেবল ব্যাটামানুষ। একটা কোনো মেয়ে-মহিলারে ওইটার ভিতরে তখন একটা বারের জন্যও ঢুকতে দেখে নাই কেউ। তবে তাদের বই লাগলে, সেটা তারা ঠিকই পায়। সেইসব বই নিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাটামানুষও কি সকলের বাড়িতে বাড়িতেই নাই? আছে। সেই ব্যাটামানুষেরা এই পৌর পাঠাগারে গিয়ে ঝট্টত-মট্টত করে মেম্বার হয়ে যায়। তারবাদে দরকার মতো আউট বই নিজেদের ঘরের বইন বা ভাগ্নি বা ভাউজের জন্য ধার নেয়। আবার পড়া শেষে ফিরত দিয়ে যায়। কিন্তু মেয়েরা অইখানে জীবনেও যায় না। যায়ই না।

আর ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেটটাতে আছে কেবল দোকান। স্টেশনারির দোকান, ফটো তোলার স্টুডিও, জুতার দোকান, ওষুধের ফর্মেসি। স্কুল ছুটির পরে মর্গ্যান স্কুলের তাবৎ মেয়ে এই মার্কেটের এই মাথা সেই মাথার কোনো দোকানেই ঢুঁ দিতে বাকি রাখে না। তখন পুরাটা ডিআইটি মার্কেটে খালি মর্গ্যান স্কুলের বটল গ্রিন জামা আর সাদা ওড়না-পায়জামার লড়ালড়ি দেখা যায়। কিছু কিনুক বা না-কিনুক, দোকানে ঢোকা তাদের চাইই।

এই যে স্কুলের কাছে-কিনারে এতো কিছু আছে, কিন্তু কোনোদিকে একটা কোনো পোস্ট অফিস নাই। ওদিকে দেখো গা, তাজ্জবের ব্যাপার! পোস্ট অফিস এইখানের কোনো মুড়ায়ই নাই সত্য, কিন্তু কিনা ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেটের ফটো স্টুডিওর সামনের জায়গাতেই, একখানা লাল ডাক বাক্স খাড়া করা আছে। চিঠির ইনভেলাপ ফেলানের টিনের বাক্স। এইখানে কে আসবে চিঠি ফালাইতে? এইটাতে চিঠি ফালাইলে, সেই চিঠি কি সঠিক জায়গায় যাওয়ার কিসমত পায়? কই, কোনোদিন তো এই বাক্স কোনো পিয়নেরে আইসা খুলেতে দেখলো না বকুলে। আঁখিরও তো নজরে আসে নাই সেইটা কোনোকালেই। এইটাতে চিঠি ফালায় নাকি লোকে! সেই জিজ্ঞাসার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।

কে দিবো জবাব? বকুলে এইখানে চিঠি ছাড়ে নাই কোনোসোমে। সেয় তার চিঠি তার আপনা তাহেরা খালাম্মারে দিয়া দেয়। খালাম্মাই টাইমমতো চিঠি পোস্ট করে দেয়।

আর, এই বক্সে চিঠি ফালানোর কথাই বা এখুনি ওঠে ক্যামনে। আগে তো আমারে ইনভেলাপ পাইতে হইবো, তাই না? ইনভেলাপ না কিনলে, চিঠি পাঠামু কেমনে। দেখো, কেমুনটা লাগে! পোস্ট অফিসের চিহ্ন-মিহ্নসুদ্ধা নাই কোনোদিকে, ওদিকে কিনা চিঠি ফালানোর বাক্স খাড়া করে রাখছে লোকেরা!

সাপ্তাহিক দেশবাংলা-য় ওই ‘পত্রমিতা চাই’ ডাকটা শুনতে না পেলে, আমার তো পোস্ট অফিসের খোঁজখবর নেওয়ার কোনো ঠেকা পড়তো না। পোস্ট অফিস দিয়া আমার কোন দরকার! কিন্তু এখন সেটা জানতে পারাটা আমার বড্ডই দরকার। নাইলে আমি ইনভেলাপ কিনমু কেমনে। আমারে কী পত্রমিতালী করা লাগবে না?

পোস্ট অফিসের তল্লাস পাওয়াটাও যে দুনিয়ায় এমন একটা অতি ঠেকার ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে, সেইটা কে জানতো! সাপ্তাহিক দেশবাংলা-য় ওই ‘পত্রমিতা চাই’ ডাকটা শুনতে না পেলে, আমার তো পোস্ট অফিসের খোঁজখবর নেওয়ার কোনো ঠেকা পড়তো না। পোস্ট অফিস দিয়া আমার কোন দরকার! কিন্তু এখন সেটা জানতে পারাটা আমার বড্ডই দরকার। নাইলে আমি ইনভেলাপ কিনমু কেমনে। আমারে কী পত্রমিতালী করা লাগবে না?

আমাগো এইনের পোস্ট অফিস কই আছে? স্কুলের কাছে কোনো একটা থাকলো না কেন! নাইলে আরেকটু দূরের, চেম্বার রোডেও যদি একটা কোনো পোস্ট অফিস থাকতো! তাইলেও আমি ছুট দিয়া কিন্না আনতে পারতামই। ডর লাগতো অনেক, অইনে একলা যাইতে ডর সত্যই লাগতো, কিন্তু আমি যাইতামই যাইতাম। কিন্তু পোস্ট অফিস কোনখানে? নারায়ণগঞ্জে কি কোনো পোস্টঅফিসই তাইলে নাই?

শোন-শোনা-শোন জানা গেল, এই টাউনে পোস্ট অফিস অবশ্যই আছে। তবে সেইটা আছে টাউনের অনেক ভেতরের এলাকায়। সেই জায়গার নাম কালির বাজার। সেইখানেই না ডিসি অফিস? সেই অফিসের কিনারেই আছে পোস্ট অফিসের হইলদা বিল্ডিং।

অতো দূরের কালির বাজারে, স্কুলের অনেক মেয়েই থাকে। ক্লাশ নাইনের সেকশন ‘এ’-রই তো কতোজনে থাকে। কিন্তু থাকলে কী! তাদের শুধু কিনা আমি মুখ চিনি। কোনোজনের সাথেই আমার কোনো কথা বলাবলির জানাশোনাটা নাই। আর, স্কুলের ছুটির পরে ওইখানে কেমনে যাবো? অতো দূরের দূর জায়গায়! যাওয়ার কোনো অবস্থা আছে? একদম নাই। যাবো কোন প্রকারে? একে তো অতো দূর, হেঁটে যেতে যেতে লেগে যাবে দুনিয়ার টাইম। তখন বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে না? কেন এমন দেরি হলো, সেইটার কী উত্তর দেওয়া যাবে তখন!

আরো তো যন্ত্রণা আছে।

স্কুলড্রেস পরে ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেটের সামনে অল্পস্বল্প ঘোরো তুমি, সেটা ঠিক আছে। টাউনের কোনো লোকই তাতে কিছুই মনে করবে না। কোনোদিনই কিছুই মনে করে না। কিন্তু অমন অতো দূরের কালির বাজারের রাস্তায় তুমি হয়তো খালি গিয়েও সারো নাই, দেখবা ময় মুরব্বিদের কেউ-না-কেউ ঠিকই দেখে ফেলবে তোমাকে। এত্তোটুক এই টাউন। সবখানেই সকলের ময়মুরুব্বি লোকেরা আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেই।

অমন সন্ধ্যাসন্ধি টাইমে তুমি কোর্ট-কাচারির রাস্তায় চলাচলতি করতে গেছো কেন? এইসব তো ভালো কথা না। তোমার সেই বেলাইনে চলার খবর, তোমার বাড়ি ফেরার আগেই দেখো গা, তোমার বাপ-মায়ের সামনে হাজির হয়ে গেছে। তারা তো তখন কোনো জয়-জিজ্ঞাসার ধারও ধারতে যাবে না। সিধা না তখন বাড়ি থেকে বের হওয়াই নিষেধ করে দেবে। পড়া-মোড়াসুদ্ধা বন্ধ। আর, অতো বিকালের টাইমে নি পোস্ট অফিস খোলা থাকবে! তাগোও ছুট্টি হইয়া যায় না নাকি তখন?

তাইলে আমি এখন ইনভেলাপ কেমনে পামু? কই পামু? কেমনে তবে আমি আল রাজী মেডিক্যাল হোস্টেলে চিঠি পাঠামু! বকুলি কেমনে তাইলে ইনভেলাপ পায়? অর মিয়াভাইয়ে কিন্না আইন্না দেয়?

‘ইছ, তোবা!’ বকুলি নিজের জিভে মস্ত কামড় দেয়; ‘কস কী তুই! আমি কোনো পোলারে চিঠি লেখি, সেইটা মিয়াভাইয়ে জানলে নি আমারে আস্তা রাখবো! বাইত তেনে না বাইর কইরা দিবো!’

তাইলে?

‘আরে ছেড়ি, তাইলে আবার কী! আছে, আমার বেবস্থা করা আছে।’

‘বকুলের মায়ের আপনা জেঠাতো বইন হইতাছে তাহেরা খালাম্মায়। জেঠাতো বইন, তবে তার বয়স এট্টুও বেশি না। সেয় তার বাপমায়ের কোল-ঝাড়া ছাও। সেই তাহেরা খালাম্মায় মহিলা কলেজে পড়ে। ফার্স্ট ডিভিশন পাইছে হেয় মাট্টিকে। মাতা তার অনেক ভালা। হের লেইগাই তাগো ঘরের হগলতে তারে অনেক মান্যি করে। হের মায়ে মান্যি করে, ভাইয়েরা করে, ভাই-বৌয়েরা করে। হেগো গুষ্টিত নি এমুন মাতা-বালা কোনোজন আছিলো কোনোদিন! ওই তাহেরা খালাম্মায়ই কলেজ তেনে আওনের সোমে, রিস্কা ঘুরাইয়া পোস্টাফিসে যায়। আর একলগে দুনিয়ার ইনভেলাপ কিন্না আনে। বকুলির লেইগাও আনে এক থোকে অনেকটি। আনবো না ক্যান? খালাম্মাই তো পেন ফ্রেন করোনের বুদ্ধি দেছে বকুলিরে। নাইলে বকুলির এতো সাহোস অইতো নিকি! তাহেরা খালাম্মার ফেরেনে হইলো গিয়া বাকুতে থাকে। হেই যে রাশিয়ার বাকু, সেই দেশে। সেয় সেই দেশে পড়তে গেছে। সেইনে চিঠি পাঠান্তি তো যাহা-মাহা কতা না। এয়ার মেইলে দেওন লাগে। খালাম্মায় তাইলে পোস্টাফিসে না গিয়া করবো কী!’

কিন্তু সেই খালাম্মারে তো আর আঁখির জন্য ইনভেলাপ আনতে বলতে পারে না আঁখিয়ে। না সে কোনোদিন তারে দেখছে, না সে নিজের পত্রমিতালী করতে চাওয়ার ইচ্ছাখানা খালাম্মারে বলতে পারবে। অনেক শরম লাগবে তার। বকুলিরেও বলতে পারবে না। নিজের চিঠি নি অপরেরে দেখানো যায়! যাহ!

বাপরে বাপ! কোন দূরে না জানি ওই বাকু! সেইখানে একজনে পড়তে গেছে! আর সেই অতো দূরে পত্র পাঠায় খালাম্মায়! কথাটা চিন্তা করতে গিয়াই তো আঁখির মাথা তালাগাড়া দেওয়া শুরু করছে। কিন্তু সেই খালাম্মারে তো আর আঁখির জন্য ইনভেলাপ আনতে বলতে পারে না আঁখিয়ে। না সে কোনোদিন তারে দেখছে, না সে নিজের পত্রমিতালী করতে চাওয়ার ইচ্ছাখানা খালাম্মারে বলতে পারবে। অনেক শরম লাগবে তার। বকুলিরেও বলতে পারবে না। নিজের চিঠি নি অপরেরে দেখানো যায়! যাহ!

এই সবটা বিষয়ই আঁখি নিজের মধ্যে নিজে লুকায়ে রাখবে। আর, হয়তো চিঠি সে পাঠালো ঠিকই, কিন্তু সেই চিঠির উত্তর যদি না আসে। তখন বকুলি টিটকারি দিবে না? শরম না তখন? কিন্তু সে ইনভেলাপ পায় কই তাইলে! এই যে আট দিন নয় দিন পার হইয়া গেল গা, এর মধ্যে সেই ছেলে না জানি কতো কতোজনের কতো কতো চিঠি পেয়ে গেছে। এখন আর হয়তো আঁখির চিঠিরে নেওয়ার দরকারই তার নাই! এমন হইতে কি পারে না? পারে পারে। আঁখি কেমনে ইনভেলাপ তবে পায়!

চিন্তায় কিটকি-নিটকি করতে থাকে তার অন্তর। উপায় নাই রে কোনো। এট্টুও উপায় নাই। তারপর দেখো, অমন নাই নাই করতে করতেই, আচমকাই তার স্মরণে আসে যে, তার না একটা মামা আছে! একমাত্র একটা মামা!

মামার অফিস কই? সেই যে এসডিও অফিসের কাছে! দেখছো দেখছো! আঁখি কেমুন একটা ভুলুন্তি বিবি হইয়া গেছে! মামায় না আছে! তার না নিজের পরানের মামাটা।

মামা সেদিন আমার জন্য চার চারটা ইনভেলাপ আনে। হালকা ঘিয়া-হলুদ ইনভেলাপ, তার এককোনায় লাল রঙে লেখা বাংলাদেশ। ইংলিশেও লেখা। বাংলায়ও। সেই লালের মধ্যে একখানা ছোট্ট শাপলা ফুলেরও ছাপ্পা দেওয়া আছে।


আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ১ম পর্ব
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ২য় পর্ব
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ৩য় পর্ব
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ৪র্থ পর্ব


[বি. দ্র. লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।]

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।

আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধূলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।