রবিবার, মে ২৬

জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ : শেষ পর্ব

0

০৫.
বাড়ির মাইনষে কোমরে শিকল-দিয়া আমারে বাইন্ধা থোয়! দিন রাইত ঘরের ঘুঁটির লগে বান্ধা অবস্থাতেই থাকি আমি। খুঁটির লগে হেলান দিয়া ঘরের মেঝতে লেট দিয়া বইয়া থাকি তামানটা দিন। বসতে বসতে খাবাজাবা লাগলে মাটিতে কাঁইত হইয়া শুইয়াও পড়ি সময় সময়! কোনো গ্যাঞ্জাম হয় না! শিকলটা বহুত বহুত লাম্বা! সহজেই শোওয়া যায়! সহজেই খাড়াও হওয়া যায়! কোনো অসুবিধা হয় না! যেমনে— ইচ্ছা তেমনে লড়াচড়া করোনে—কোনো গ্যাঞ্জাম অয় না আমার!

কিন্তু অই খাড়া হওয়াই সার। এক কদমের বেশি আর আগানো যায় না! শিকলে টান পড়ে! তবে আমি শিকল বান্ধা থাকলে সমস্যা কী! আমার তো বাইরে কোনো কাজ নাই! থাকলাম নাইলে ঘরের ভিতরেই এমুন হইয়া?

Ad Strip_Akimun Rahman_e Software_EP 3তবে তাও কিন্তু একটু অসুবিধা হইয়াই যায়! পেশাব-পায়খানা ফিরতে যাওয়ার ব্যাপার তো আছে দুনিয়ায়, নাকি? সেই যে ভোর ভোর কইরা, মায়ে আমারে পায়খানায় পাঠায়—তখন কিন্তু আম্মায় অন্য আরেকটা শিকল আমার কোমরে বাইন্ধা দেয়। সেইটা আরো অনেক চিকন-সরু; আরো অনেক অনেক লাম্বা সেইটা! সেই শিকলটার একমাথা আমার কোমরে বাঁধা থাকে, আরেকটা মাথারে আম্মায় করে কী—পায়খানার পাশের পাতল-পোতলা কড়ুই গাছটার ডালে বাইন্ধা থোয় তখন।

সেই বান্ধা দিয়া হয়তো এট্টু দূরে সইরা যায় মায়ে, নাইলে সেয় কী করে কী জানি! আমি তা দেখতে পাই না! পায়খানার যে দরোজা, সেইখানে একটা লম্বা ছালা বান্ধা আছে! আমি ঢোকার পরে আম্মা সেই ছালাটারে দরোজা বরাবর নামায়ে দিয়া, ছুৎ কইরা সইরা যায়!

কিন্তু দূরের তেনে আমি তার হাঁকানি শুনতে পাইতে থাকি, ‘খালি পেশাব ফিরলেই হইবো না কইতাছি! পায়খানাও ফিরবি! নাইলে তরে বারেবারে কে খেদমত দিতে যাইবো! হুনলি, পিছামারা দুশমন? একলগে হাগা-মুতা-সব ফিরা খালাস হবি কইতাছি!’

কোনো কোনোদিন আমি কতো চেষ্টা-তোয়াজ করি পেটেরে! ‘ভাই ভাই! বাইর কইরা দে পায়খানারে! দে দে রে! বাইর কইরা দে!’

তহন কিনা পেটটায় তবদা দিয়া পইড়া থাকে। খালি পেশাবরে বাইর কইরা দেয়। খনে খনে খালি এট্টু ছুত ছুত কইরা— পেশাবেরেই বাইর করতে থাকে! পায়খানারে বাইর করোনের কথা—পেটে কানেই নেয় না! বাইর করেই না! এমুনটাই করতে থাকে পেটে, কোনো কোনোদিন। আর কিচ্ছু করে না!

কিন্তু কিয়ের কী! তহন কিনা পেটটায় তবদা দিয়া পইড়া থাকে। খালি পেশাবরে বাইর কইরা দেয়। খনে খনে খালি এট্টু ছুত ছুত কইরা— পেশাবেরেই বাইর করতে থাকে! পায়খানারে বাইর করোনের কথা—পেটে কানেই নেয় না! বাইর করেই না! এমুনটাই করতে থাকে পেটে, কোনো কোনোদিন। আর কিচ্ছু করে না!

অইদিকে যতো দেরি হইতে থাকে, মায়ের চিৎকার ততো উঁচা হইতে থাকে! উঁচার উপরে উঁচা হইতেই থাকে!

ইস! মায়েরে আর কতো যাতনা দেওয়া যায়? এই যে ভোর সকালটা কইরা রোজ রোজ—আমার জন্যই এমুন খাড়া হইয়া থাকতে হয় তারে! এইটা কতো কষ্টের না?

সেই কথা মনে কইরা, আমি সেইসব দিনে মায়েরে বলি কী, ‘হইছে তো! হাগা মুতা-সব হইছে!’

বলি, আর বদনার পানি ফেলতে থাকি—ছড়র ছড়র! আর কী সোন্দর! মায়ে আমার সেই ট্যাটনামী একটুও ধরতে পারে না! আমার কথা পুরা বিশ্বাস কইরা নেয় সেয়।

তারপর পুষ্কুনির ঘাটলায় নিয়া আমার পাও-হাত ধোওয়ায়। আমার হাতে ছাই দেয়! দাঁতে ঘসার লেইগা দেয় সেই ছাই! এই ছাইটুক দেখলেই আমার মন কেমুন যে বেজার হইয়া যায়! লগে লগে মাথাটার ভিতরেও কেমুন জানি— গো গো আওয়াজ করতে থাকে!

আমার মুখ দিয়া চিক্কুর বাইর হইতে থাকে! রোজ ভোরসকালে এমুন চিক্কুর বাইর হয়ই হয় আমার! চিক্কুর বাইর হইয়া যায়ই! আমি এট্টুও সেইটা আটকানি দিতে পারি না!

‘ক্যান? আমারে তুমি দাঁত মোড়াইতে ছাই দেও ক্যান আম্মা? ঘরে না সগলতে পেস্ট দিয়া দাঁত মাজো? মাজো না? নাইলে টুথ পাউডারও তো আছে তোমাগো! আমারে হেটি দেও না ক্যান? দেও না ক্যান? আমার লগে তোমরা এক চক্ষে নুন এক চক্ষে তেল-করো ক্যান? এমুন দুই চউক্ষাপনা ক্যান করো তুমি?’

এতো সব কথা আমার মুখ দিয়ে হড়গড় হড়গড় করে একসাথে বের হতে থাকে বলে, কোনো একটা কথার অর্থও মায়ে ধরতে পারে না! সেয় নাকি খালি গোঙানি শুনতে পাইতে থাকে! অনেক গনগনা রকমের গোঙানি শুনতে পাইতে থাকে শুধু! আর কিচ্ছু না!

দুঃখে-চেতে আমি তখন করি কী—ঘাটলা তেনে ফাল দিয়া পানিতে পইড়া যাই! যা! আমার আর ঘরে গিয়া কাজ নাই! আমি পুষ্কুনিতেই থাকমু! চিরদিন পুষ্কুনিতেই থাকমু আমি! যাহ!

আমি যে অমন ঝুপ্পুত কইরা—আতকার উপরে—পানিতে ঝাঁপায়ে পড়ি, তাতে মায়ের কী কম কষ্ট হয়! আমার লগে লগে শিকলটাও তো জোরেই হড়হড় কইরা নাইম্মা আসতে থাকে!

সেই শিকলের জোর টানে, মায়ের হাত একেক দিন থেঁতাভোতা নীলা নীলা হইয়া যায়! আহারে! তার হাতটাতে তখন কতো টাটানি হইতে থাকে! কতো জ্বালাপোড়া হইতে থাকে! ইইস!

সেই শিকলের জোর টানে, মায়ের হাত একেক দিন থেঁতাভোতা নীলা নীলা হইয়া যায়! আহারে! তার হাতটাতে তখন কতো টাটানি হইতে থাকে! কতো জ্বালাপোড়া হইতে থাকে! ইইস!

আবার অই যে ঝুপ্পুত কইরা পানিতে পইড়া যাই আমি, তখন পানি জোরে ছিটকায়ে গিয়া মায়েরে ভিজায়া দেয় না? দেয় তো! তারপর তো সেই ভিজা কাপড়েই তারে ঘরের কাজকর্ম কইরা চলতে হয়! সেই ভিজা কাপড় নিজের শরীরেই শুকাইয়া নেয় আম্মায়। কিছুতেই বদলায় না সেয়। না না!

ক্যান এমুন জিদ তার! এমুন জিদ ক্যান করে আম্মায়?

জিদ হইবো না? হারামজাদা নসীবে যদি তারেই এমুন দাগা দিতে পারে, তাইলে সেয় এইটুক জিদ করতে পারবো না? দুনিয়ার আর কাউরে তো এমন পোড়া কপাইল্লা করে নাই খোদায়! তারে ক্যান করলো! কোন পাপে! তারেই ক্যান এমুন পাগল-ছাগল টানোনের কিসমত পাইতে হইলো! আর তো কেউইর এমুন ছাড়-কপাল না! তার কপালটাই ক্যান খালি এমুন?
তাইলে সেই পাপের সাজা সেয় নিজেও যতোভাবে পারবো, নিজেরে দিতে কসুর করবো না! তার তাইলে আর ভিজা কাপড় কী, বা শুকনা কাপড়ই কী!

তো, রোজ সকালে অইভাবে আমারে ধোয়া-পাখলা কইরা, তারপর ঘরের ভিতরে নিয়া আসে আম্মায়।

ঘরের ভিতরে আমারে বাইন্ধা রাখার যেই শিকলটা আছে, সেইটা সব সময় ঘরের খুঁটির সাথে বান্ধাই থাকে! সেইটার অন্য মাথাটা খালি আমার কোমরে দরকার মতো বান্ধতে হয়! তাইলেই ব্যাস! আর ঝামেলা থাকে না!

রোজ সকালে যখন আম্মায় আমারে সেই শিকল দিয়া মোড়ানী দিতে থাকে, আমার তখন আম্মারে জাবড়ে ধইরা থাকার কতো না ইচ্ছা হয়! তখন আমার বলতে ইচ্ছা করতে থাকে, ‘আম্মা আম্মা! আমি আর বান্দরামি করমু না! একদম ভালা হইয়া থাকমু! একদম লক্ষ্মী হইয়া চলমু! আম্মা! আমারে বাইন্ধেন না আম্মা!’

কোনো কোনোদিন আমি কিন্তু সত্য সত্য আম্মারে সেইসব কথা বলতে থাকি! অনেক অনেক বলতে থাকি! কিন্তু সেই কথাগুলা ক্যান জানি আম্মা একদমই শুনতে পায় না!

এই সময় তো আমি আস্তে-সুস্তেই কথা কয়টা বলি! তাই না? তাও আম্মা শোনে না! উল্টা তখন আমারে চাপা গলায় বলতে থাকে কী, ‘এই! এই শুয়োরের ছাও! গোঙাইস না কইলাম! গোঙাইস না! থাম থাম! তর আব্বার ঘুম ছুইট্টা যাইবো কইলাম! সকাইল্লা টাইমের কাঁচা ঘুমটা কইলাম!’

কিন্তু আম্মা তার গলা চিপা করলে কী, আব্বার কাঁচা ঘুম কেমনে জানি ঠিকই ছুইট্টা যায়! তখন আব্বা ক্রোধে কী করবে না করবে—তার কোনো দিশা পায় না! তারবাদে আঁতকা করে কী-একটা ছুট দিয়া আইসা—আমারে কঠিন একটা থাপ্পড় মারে!

প্রায় প্রায়ই এমন করে সেয়! সেই থাপ্পড় এমন থাপ্পড় যে, আমি হুড়ুম কইরা মাটিতে বইসা পড়ি! একটুও খাড়া থাকতে পারি না আর! তখন আম্মার চোখে ক্যান জানি পানি আইয়া পড়ে।

আমি তো মাটির উপরে কাঁৎ হয়ে পড়া তখন! একপাশের গাল তখন পুরা তবদা! কানের ভিতরে ঝিনঝিন ঝিনঝিন আওয়াজ খালি তখন! আমি সেই সময় আর আম্মার দিকে তাকামু কেমনে! চোখ তো নিজে নিজেই বন্ধ হইয়া থাকে তখন, আমার!

সেই সময়, সেই চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায়ই, আমি পরিষ্কার দেখতে পাই, আম্মা কান্দতাছে! আমারে থাপ্পড় মারতে দেইক্ষা-কান্দতাছে আম্মায়! কান্দতাছে কষ্টে, জোর কষ্টে! কিন্তু মুখে বলতাছে কী? বলতাছে— ‘মর মর তুই! আল্লায় নেউক আলা তরে! আলা তুই রেহাই পা! মর!’

আইচ্ছা, সেইসব কথা থাউক।

তাইলে অই কথাটা বলি! অই যে—যেইদিন কিনা আমি—পায়খানা করা নিয়া ছলচাতুরি করি—সেই কথাখান বলি! সেই যে, না-হওয়া হাগারে—হইছে বুঝানের লেইগা তো আমি বদনির পানি ঢাইল্লা দেই ঠিকই; কিন্তু সেইটা যেইদিন করি, সেইদিন আমার বড়ো মুসিবত হয়!

রোজ ভোরে আমারে সাফ-সুতরা করা তো হয়! তারপর করে কী, আম্মায় আমারে আইন্না ঘরের ভিতরের খুঁটির লগে বান্ধে! সেই যে আমারে বাইন্ধা থুইলো, তারবাদে সেই বাঁধন সারা দিন আর সারা রাইতের মধ্যে আর দুই কী একবার মাত্র খোলা হয়।

তাও যদি কারো খেয়ালে আসে যে, আমারে তো পেশাব করানো দরকার, তাইলেই শিকলটা আবার খোলা হয়! নাইলে না! আমি বান্ধা থাকি যে থাকিই!

তখন কী হইবো? আমার পেশাব লাগলে তখন আমি কী করমু?

আমি আর তহন কী করি! সেই বান্ধা-থাকার জায়গাতেই আমি খাড়া হইয়া যাই! আর হড়মড় পেশাব করা ধরি! কইরা, খালাস হই।

তারবাদে সেই পেশাবে-ভিজা জায়গাখানেই আমি লেট দিয়া বইসা পড়ি। বইয়া থাকি থাকি থাকি! ইচ্ছা হইলে সেইনেই কাঁৎইত হই। চক্ষে ঘুম আহে! আমি ঘুমও যাই সেইনেই!

এমন করতে থাকলে জামা কাপড়ে পেশাবমাখা মাটি না লেপটায়ে গিয়া পারে? লেপ্টে লেপ্টে যায় তো। সেইটা দেইক্ষা আম্মার অতো চেত হয় ক্যান— কে জানে!

যেইদিন সকালে পায়খানার ভিতরে বসার পরে হাগা আসে না, সেইদিন বড়ো ভেজাল হয়! সেই হাগা কোন সময় যে আসবো-আমি সেইটা কেমনে জানমু? সেইটায় করে কী—বিড়িম-ধিড়িম কইরা কইরা, হঠাৎই, আইসা পড়ে সেইদিন!

যেইদিন সকালে পায়খানার ভিতরে বসার পরে হাগা আসে না, সেইদিন বড়ো ভেজাল হয়! সেই হাগা কোন সময় যে আসবো-আমি সেইটা কেমনে জানমু? সেইটায় করে কী—বিড়িম-ধিড়িম কইরা কইরা, হঠাৎই, আইসা পড়ে সেইদিন!

এই যে এমনে যখন ঘরের ভিতরে হাগা হইয়া যায় আমার, তখন কিন্তু আমি আম্মারে অনেক ডাক পাড়তে থাকি! আমি আম্মাকে ডাকতে থাকি—আম্মা আম্মা আম্মা!

কিন্তু সেই ডাকেরে নাকি অন্যরা ডাক শোনে না! তারা বোলে শোনে যে, আমি নাকি কিমুন আচুইক্কা আওয়াজ দিতাছি! ঘ্যাগ ঘো ঘ্যাগ ঘো গোঙ গোঙ আওয়াজ! কেমুন শয়তান অরা!

আমারে নিয়া হাসাহাসি তো করতে থাকেই, আবার কতো রকমের কুকথা যে বলাবলি করতে থাকে! বলে কী; ‘আরে! দেখ দেখ! উয়ে অখন কেমুন নয়া গোঙানী দিতাছে! মাথা-খরাপীটা বাইড়া গেছে গা আউজকা, এইটার!’

ওদিকে, এই যে আমার পাও ময়লায় ছিন্দাবিন্দা হইয়া গেছে, গন্ধে আমার শরীর উগলাইতাছে—এইগুলি নিয়া আমি কতখোন থাকমু! ইস! আমি তো ভালার জন্যই সেই গু-মুতেরে দুই হাতে সরাইতে থাকি! আমার ভালার লেইগাই তো সেই গুয়েরে-আমার কাছ তেনে-দূরে সরায়ে দিতে থাকি, তাই না? সেইটা কেউ বোঝে না!

অরা যেই টের পায় যে, আমি ঘরের ভিতরে হাগা কইরা দিছি, অমনেই করে কী-আমারে অরা মারা শুরু করে! তালের পাঙ্খার ডাটি দিয়া পিটাইতে আরাম্ভ করে অরা আমারে! নাইলে গিয়া শলার ঝাড়-টারে আইন্না—আমারে বাড়ি দেওয়া ধরে! যার ইচ্ছা হয়—সেই আমারে মারতে থাকে।

অইদিগে দেখো গা-চিকন একটা কঞ্চি—আম্মায় কেমনে জোগাড় করছে—কে জানে! সেইটা দিয়া আম্মায়ও মারা ধরে আমারে। আম্মায় আমারে মারতে মারতে আবার পুষ্কুনিতে নিয়ে যায়! তারপর থু থু করতে থাকে, আর আমারে সাফ দিতে থাকে!

এমুন ঘিন্না করতে হয়? আমারে এমুন ঘিন্না করতে হয় তোমাগো? আমি কি কইছি যে, আমারে বাইন্ধা থোও? সেইটা কই নাই তো! আমারে খোলা রাখো না ক্যান তোমরা? আমারে খোলা রাখলেই তো আমি ইচ্ছামতন যখন দরকার তখন, পায়খানায় যাইতে পারি!

পারি না? পারি!

কিন্তু সেইটা তো তোমরা আমারে করতে দেও না!

খালি কও, আমি নাকি কই গিয়া কোন সর্বনাশের তলে পড়মু! সেই সর্বনাশের বোলে কোনো ঠিকঠিকন্তি নাই! মাইয়া বাচ্চা! আবার কিনা মাথায় দোষ-অলা মাইয়া! আবার কিনা বোবা! হায় সর্বনাশরে!

তবে আমি কিন্তু একদম সঠিক কইরা জানি, আমার এইসব কিচ্ছু হইবো না! কিচ্ছু হওনের কোনো রাস্তা নাই!

আমি কি একলা নাকি? আমি তো একলা না! আমার তো সই-দোস্তরা আছে। আমি তাগো আর এখন দেখতে পাই না ঠিক, কিন্তু ক্যান জানি আমার মনে হয়; তারা দিনরাইত আমারে ঘেরাও দিয়াই থাকে। য্যান তারা রোজ রাইতে আমার পাশে শুইয়াই ঘুমায়! অনেক ঘুমায়! তাগো আমি দেখতে পাই না, কিন্তু তারা আছে! তাগো যখন মন চায়, আসে হেরা আমার পাশে! অদৃশ্য হইয়াই আসে! আবার তাগো যখন মন চায়, যায় গা! আমারে আর দেখা দেয় না! তাতে কী!

আমার ষোলো বচ্ছর বয়সের সময়, একদিন ধুপ কইরা নানী মইরা গেল!

না না! ধুপ কইরা না! মরোনের আগে বহুতদিন বিছনায় পইড়া পইড়া ছটফটাইছে সেয়! বেশিরভাগ সময়ে বেহুঁশের মতোন পইড়া থাকছে। যখন হুঁশটুক আসছে, তখনই আমারে বসাইছে তার কাছে!

তার কাছে বসাইয়া বসাইয়া সেয় খালি আল্লারে ডাকোনের কথা কইছে আমারে। আরো কইছে যে, আমি য্যান আল্লা-পাকের কাছে আমার মউত চাইতে আইলসামি না করি! বারেবারে কইছে!

এমন কইরা আমারে বুঝ দিতে দিতেই—একদিন নানি—কেমনে জানি চোখ বন্ধ কইরা ফালাইছে! আর খোলে নাই!
তখন অই বাড়িতে আমি কার কাছে থাকমু? কেউ তো নাই!

আব্বায় তখন কয়দিন অনেক লৌড়ালৌড়ি করলো! আমারে এতিমখানায় দিয়া দেওনের লেইগা খুব চেষ্টা করলো! কিন্তু কিছু করতে পারলো না!

কোনো এতিমখানাই এমুন টুন্ডা-লুলা-বোবারে নিতে রাজিই হইলো না! সাফ কইয়া দিলো, তাগো অন্য এতিমেরা নাকি আমারে দেইক্ষা ডরাইবো!

আবার নানির বাড়িতেই অন্য কারো লগে আমারে রাখোনের চেষ্টাও দিলো আব্বায়! কিন্তু সেইটারও কোনো রাস্তাই পাওয়া গেল না। তখন কী করা! একদম কিচ্ছু ব্যবস্থা করতে না পাইরাই আমারে আনতে হইলো—এই বাড়িতে। আমারে আনতেই হইলো! অন্য ভাই-বইনেগো লগে থাকানের লেইগা আমারে আনতে হইলোই!

অন্য ভাই-বইনটি যেমুন-তেমুন, বড়ো ভাইয়েসুদ্ধা প্রথমে আমারে দেইক্ষা কী ভেংচাভেংচি! য্যান আমি অগো কিছু লাগি না! আমারে কতো মন্দছন্দ কওয়া-কওয়ি! কতো হাসির উপরে হাসি, টিটকারির উপরে টিটকারি দেওয়া-দেওয়ি! আমি অগো কিছু লাগি না? লাগি না? আপনা বইনের লগে মাইনষে এমুন করে? নানির কাছে আছিলাম যহন, তহন আমার লগে তো কেউ কোনোদিন এমুন করে নাই! নানির লগে থাকোনের সোমে তো, কোনো পাড়া-পড়শী মাইনষেও তো আমারে দেইক্ষা—এমুন টিটকারি গায় নাই!

তাইলে আপনা মানুষ অইয়া—মায়ের পেটের ভাই-বইনটি এমুন করে ক্যান! বিষয়খান খেয়াল কইরা—আমার—তহন খালি চেত উঠতে থাকে। অনেক অনেক চেত!

এগো লগে আমি থাকমু কেমনে? এমুন জায়গায় আমি কেমনে থাকমু! আমি এইনে থাকমু না! আমি যামু গা নানির কাছে! নানির নিরালা বাড়িতে যামু গা আমি! আমি এইনে থাকমু না!

এইনে আমারে আনার প্রথম দিগে কিন্তু আমি ছাড়াই থাকতাম। কোনো শিকল-মিকল দিয়া আমারে বান্ধোনের কোনো বুদ্ধি তখন, কারো হয়ই নাই। এই বুদ্ধি তারা পরে পাইছে! পরে।

সেই সময়, আমারে বাড়িতে আনোনের অল্প কয়দিন পরেই দেখা যায়, আম্মার ধুমধুমাইয়া জ্বর আসছে।

জ্বর আর যায় না, যায় না। তখন ডাক্তরের কাছে একদিন নেওয়া হয়— আম্মারে! ডাক্তরে কয়, ‘এই জ্বর কোনো ছোটোমোটো জিনিস না! এইটা অনেক কঠিন জ্বর! টাইফট জ্বর।’

আব্বায় আম্মার জ্বর নিয়া চিন্তা করতে করতে—খালি রাগই হইতে থাকে। আবার নিজের কপালে বাড়িও মারতে থাকে। আবার কইতেও থাকে, ‘এমুন অইবো না ক্যান? ঘাড়ের উপরে শনি আইয়া উঠছে না? অহন এমুন গরদিশই চলতে থাকবো এই সংসারে!’

তার কথা শুইন্না আমার আবার চেত হইতে থাকে! ‘আমি কি কইছিলাম নি আমারে এই বাড়িতে আনতে? কইছিলাম?’ প্যাঁচায়ে প্যাঁচায়ে আমি এই কথা আব্বারে বলতে থাকি। আব্বায় কিন্তুক সেইকথা বোঝে বইল্লা মনে হয় না!

তাও কি না সেয় কুইদ্দা আইসসা, আমারে কইস্সা একটা চটকানা দেয়! সেই চটকানার চোটে আমি একদম খাড়ার তেনে-হুড়ুত কইরা—মেঝেতে পইড়া যাই! পইড়া আমার আর ওঠোনের বাসনা হয় না! আমি কান্দতে থাকি, নানি নানি নানি! নানি গো!

তেমন সময়ে আমি শুনি কী, বাইরের তেনে কে জানি আমারে কইতাছে, ‘আরে, তুই এইনে পইড়া রইছস ক্যান? বাইর অ জলদি! জলদি আয়!’

‘কই যামু? কে ডাক পাড়ে?’ আমি ধুছমুছ করে উইঠ্ঠা বসি! তারপর চোখ মুছতে মুছতে বাইর হইয়া যাই। অন্য ভাই-বইনটি আমার যাওয়ারে চাইয়াও দেহে না! আর, আম্মায় তো বিছনায় পড়াই!

রাস্তায় আইসা দেহি, কোনোদিগে কাউরে দেখা যায় না! খালি ডাক শোনা যায়, ‘আয় গো দিলি! দিলরুবা! আয় আয়!’

ডাক শুইন্না আমি আগাইতে থাকি! আগাইতে থাকি। কিন্তু কাউরে দেখতে পাই না! তারবাদে যাইতে যাইতে যাইতে কতো পোথ যে পার হই, তার শুমার নাই। কতো মানুষগো বাড়ি যে ছাড়াইয়া যাই, তারও কোনো হিসাব পাই না। তাও ডাক থামে না!

ডাক শুইন্না আমি আগাইতে থাকি! আগাইতে থাকি। কিন্তু কাউরে দেখতে পাই না! তারবাদে যাইতে যাইতে যাইতে কতো পোথ যে পার হই, তার শুমার নাই। কতো মানুষগো বাড়ি যে ছাড়াইয়া যাই, তারও কোনো হিসাব পাই না। তাও ডাক থামে না! খালি কইতে থাকে, ‘আয় গো বইন দিলরুবা! আয়রে আয়! আয়!’

অই ডাক শুইন্না আমি কি না যতো আগাইতে থাকি, ততো পুরানো নানা কথা আমার মনে আসতে থাকে! ক্রমে কি না আমার পুরানকালের সই-দোস্তগো লেইগা পরানটা উথলাইতে থাকে! কই যে গেল গা তারা! আর দেখলাম না! এই ডাক কি অরা দিতাছে নি?

মনের ভিতরে এমন নানান কথা নিয়া আগাইতে আগাইতেই কি না শেষকালে দেখতে পাই, ডাকটা আসতাছে খু খু খা খা একখান মাঠের ভিতর তেনে।

অই যে মাঠের মাঝ বরাবর জায়গাটা! সেইনেই তো আছে গোরস্থানটা! অই গোরস্থানেই না নানিরে মাটি-মঞ্জিল দেওয়া হইছে? অই গোরস্থান তেনেই তো দেহি ডাকটা আসতাছে! অই যে পরিষ্কার শোনা যায় ডাক, ‘আয় গো দিলি! দিলরুবা! আয় রে আয়!’

ক্যান ক্যান ক্যান ডাকো তুমি, গোরস্থান?

গোরস্থানে কোনো জব দেয় না!

জব না দিলে না দিবো! আমার ভিতরে যাওয়া আটকাইবো কেটায়? আমি এমনে-সেমনে কদমে কদমে আগায়া—গোরস্থানের ভিতরে ঢুইক্কা যাই!

ভিতরে ঢুইক্কা দেখি, অনেক শান্তি লাগতাছে তো!

গোরস্থানটা ভাঙাভোঙা! খাঁ খাঁ পাতরের মধ্যে হা হা পইড়া রইছে—এই গোরস্থানে। হের কোনো বেড়া নাই কোনো সীমানা নাই! খালি আউলা-ঝাউলা কয়টা কব্বর!

তাও কেমুন আচানক বিষয়! গোরস্থানটার কব্বরগুলার কিনারে-মিনারে কতো যে নিমগাছ জন্মাইয়া রইছে! য্যান শতে শতে নিমগাছ!

সেই সগল নিমগাছের পাতলা পাতলা চিরল পাতার—ছায়াও আছে তবে! সেই ছেমারা সগল কব্বরের উপরে—কী সোন্দর বিছাইয়া বিছাইয়া রইছে! বাতাসে গাছের পাতাগিলি এট্টু এট্টু কাঁপে! আর তহন কব্বরের উপরের ছায়াগিলিও এট্টু এট্টু কাঁপতে থাকে!

আরে বাপ্পুস রে! নিমগাছের ডালে ডালে কতো ফল যে ফইল্লা রইছে গো নানি! দেখতেন যুদি! পাকনা পাকনা ফল!

সেই পাকনা নিমফলের কতাগিলি দেহেন গো নানি, গোরস্থানের মাটিতে মাটিতেও পইড়া রইছে! আবার দেহেন—সেই ফলেরা পুটপাট কইরা কেমুন ঝরতাছে! ঝরতাছেই খালি!

ওহহো রে! কেমুন যে ডগডসা দেখতে নিমফলটি!

আম্মার লেইগা কালকা যে ছেফফল আনছে আব্বায়, সেইগিলির মতোন দেখতে এরা!

আমি একটা ছেফ ফল খাইতে চাইছিলাম না? চাইছিলাম। খাওনের লেইগা অনেক ঘ্যানঘ্যান করতাছিলাম আমি! দিতো যুদি একটা!

ছেফফল খাইতে চাইছিলাম দেইক্ষা—জেঠি আমারে চুলে ধইরা লাবাজাবা টান দিছে। অনেকবার টান দিছে! জোরে জোরে টান! আমার মাথা তহন একদম বেঁকা হইয়া গেছিলো!

আবার আমারে অমনে মারতে মারতে জেঠি কইছে, ‘এমুন না বোলে পাগল? তাইলে মজা খাওনের কথা বোজো কেমনে? সিয়ান পাগল! রুগীর জিনিস খাইয়া ফালাইতে চায়! কী জিব্লার জিব্লা!’

আব্বার সামনেই সেয় আমারে এমুন করছে! কিন্তুক আব্বায় জেঠিরে কিচ্ছু কয় নাই!

আইচ্ছা! আমি অহন নিমফল খামু! এই নিমগোটাটি দেখতে ছেফ ফলের মতোন তো! খালি এট্টু ছোটো দেখতে! তাতে কী! এইগিলিও খাইতেও অই একই সোয়াদের হইবো! আমার ঠিক মনে হইতাছে—নিমগোটা আর ছেফ ফলের সোয়াদ—একদম এক হইবোই হইবো!

আইচ্ছা তবে! খাই আমি তাইলে নিমগোটা! পেট ভইরা খাই!

আমি তখন নানীর কব্বরটার কিনারের মাটিতে লেট দিয়া বইসা যাই! তারবাদে নিমগোটা খাওয়া ধরি!

ওহ ওহ! কেমুন সরস! তয়, কেমুন জানি তিতা তিতা—এই নিমগোটারা! ছেফ ফলও খাইতে এমুন? আইচ্ছা! এট্টু তিতা আছে—থাকুক না? আমার তো খাইতে সোয়াদ লাগতাছে!

‘এটি খায় না! আহারে এটি খায় না!’ হুড়ুম-ছুরুম কইরা নিমগোটা চাবাইতে চাবাইতে আমি শুনি—কে জানি আমারে অটি খাইতে নিষেধ দিতাছে!

কেটায় নিষেধ দেয়! বাতাসে নি? নাকি সই-দোস্তরা আসছে দেখা দিতে? এই নিরালা গোরস্থানে—আসছে নি তারা?

না! কোনোদিগে সই—দোস্তেগো চিহ্নটাও নাই।

কিন্তু কথাটা তাইলে কে কইলো? বাতাসে? বাতাসের নি আমার লগে কথা কইতে ইচ্ছা করতাছে?

আমি তখন গোরস্থানের এইদিগ ওইদিগে তাকানি দেই! কে কথা কয় রে? কেটায়?

অম্মা! ভালা কইরা চাইয়া দেখি, ও রে! বাতাস না তো! গোরস্থানে তো খালি আমি একলাই নাই! আরো একজন মনিষ্যিয়েও তো এইনে বসা আছে!

গোরস্থানের অই যে কিনারটা দেখা যায়—সেইখানে কেমুন একটা অচিন গাছ খাড়া হইয়া রইছে! কী জানি কোন গাছ সেইটা! ওইটার তলেই কি না বসা আছে একজনে! একটা বেটা। বেটাটার মাথাভরা জট! আর চোখগিলি কেমুন লাল টকটক্কা!

আল্লা! এই দূরের তেনেও সেই লালেরে পরিষ্কার বোঝা যাইতাছে! বোঝাই যাইতাছে-বেটাটায় একটা পাগল বেটা! সেয়ই দেখো আমারে নিমফল খাইতে নিষেধ দিতাছে!

ইস! এই মিয়ায় কইলেই হইলো আর কী! ক্যান আমি খাওয়া বন্ধ করমু?

‘যাও মিয়া! আমার মজা লাগতাছে—আমি খাইতাছি! তুমি না-করোনের কে?’ আমি চোখমুখ পাকায়ে তারে হুঁশিয়ারি দেই! সেই মিয়াটায় আমার চোখ-রাঙানি দেইক্ষা অল্পমল্প হাসে।

ওই মা! বেটাটায় হাসে ক্যান! যা পাগল! দূরে যা!

অইটা পাগল না?

পাগল না হইলে কেউ ছালা পিন্ধা থাকে? এই বেটায় একটা কালাকুষ্টি, পুরানের পুরান ছালা পিন্ধা আছে। পাগল কোনখানের! যা যা পাগল!

আমার কথা শুইন্না—সেই পাগলে য্যান ডরাইয়া যায়! সে করে কী-আস্তে কইরা উইট্টা খাড়ায়।

যাউক গা এইটায়—অই পাগলটায়—যাক গা এইখান তেনে! যা যা! তাইলে আমি শান্তিতে এইনে বইয়া থাকতে পারি।

আম্মার অসুখের গন্ধঅলা বাড়িতে যাওনের কোনো ইচ্ছা নাই আর আমার! যামু না আর আমি সেইনে!

পুরা দিন এই গোরস্থানে বইয়া থাকমু! রোজ রোজ বইসা থাকমু! তারবাদে রাইত হইবো যহন, তহন আমি আমার আপনা বাইত গিয়া শুইয়া থাকমু!

আপনা বাড়ি কোনটা?

আরে! আমারে লইয়া নানীয়ে যেই বাড়িতে থাকতো, সেইটা আমার আসল বাড়ি! আমি জানি না নাকি?

রাইত হইলে করমু কী, এইখান তেনে গিয়া নানির রান্ধনঘরের চালার নিচে শুইয়া থাকমু! কোনো জ্বালা নাই! নানির লগে লগে থাকলে আর জ্বালা কীয়ের?

এইটুক কথা আমি কেবল চিন্তা করছি কী করি নাই—তার মিদে দেহি, পাগলটায় আইসা আমার সামনে হাজির! এতো দূর তেনে—এমুন ছুতফুত কইরা— কেমনে আইসা পড়লো পাগলাটায়?

এইটুক কথা আমি কেবল চিন্তা করছি কী করি নাই—তার মিদে দেহি, পাগলটায় আইসা আমার সামনে হাজির! এতো দূর তেনে—এমুন ছুতফুত কইরা— কেমনে আইসা পড়লো পাগলাটায়?

আসছে তো আসছেই, আবার কি না সেয় তার হাতটাও বাড়াইয়া দিছে আমার দিগে। হাত বাড়াইছে ক্যান? হাতে কী!

তার হাতে দুই দুইটা ছেফ ফল!

আয় হায় গো! দুইটা ছেফফল! পাকনা লেম্বুর মতোন হইলদা-সবুজ দেখতে! ডাসডাসা তাজাতোজা দুইটা ছেফ ফল!

আমি সেইটা না নিয়া পারি? কও, পারি?

আমার হাতে ছেফ ফল দুইটা ধরাইয়া দিয়া, সেই মিয়ায় সিধা হাইট্টা যাইতে থাকে! আমার চক্ষের সামনে দিয়া হাইট্টা যাইতে থাকে।

আর আমি কিনা আমার চক্ষের সামনে—একটা তাজ্জবের ঘটনা ঘটতে দেখতে থাকি! আমি পষ্ট দেখতে পাইতে থাকি, তার শইল্লে কোনো ছালা নাই!

এই না দেখলাম, তার শইল্লে ছালাখান ঝুলতাছে? তাইলে পলকে সেইটা কই গেল? এই যে আমার চোখ দেখতাছে—অন্য জিনিস! দেখতাছে যে, সেয় পিন্ধা আছে সাদা রঙের একটা পিরান!

না না পাঞ্জাবি না! আমি পাঞ্জাবি চিনি! তার পরনে আছে সাদা পিরান! এমুন পিরান আমি কবিরাজ নানারে পিন্ধতে দেখছি!

সে আগায়ে যাইতাছে, আর একটু একটু কইরা তার মাথার জটগুলা হইয়া উঠতাছে ছলছলা চুল! তার মাথাভর্তি চুল! য্যান তারা বৈশাখ মাইস্যা কালা মেঘ!

আরো কী আচানকের বিষয়! অই তো সেয় হাঁটতাছে! হাঁটতাছে তো! কিন্তু যেই সেয় মাটিতে পাও ফেলতাছে, অমনেই গোরস্থানের মাটি আর খরখরা, মরা মাটি থাকতাছে না! তার পায়ের তলের মাটিতে গজাইয়া উঠতাছে ডুগডুইজ্ঞা সবুজ মিঠা-কুমড়ার লতা!

সেই লতায় লতায় ফুইট্টা আছে বগবগা হইলদা হইলদা রঙঅলা ফুল! হাজারে হাজারে ফুল! মিষ্টি-কুমড়ার টগটকা-হলুদ ফুল! আল্লা গো! আমি কী দেখতাছি!

‘অই মানুষ! খাড়াও! খাড়াও! খাড়াও গো!’ আমি ছেফ ফল খাইতে খাইতে, তারে কতো না ডাক পাড়লাম! সেয় শোনলোই না! একবার পিছনটা ফিরা চাইলো না পর্যন্ত! কেমনে এমুন কাঠুইরা-পরানের হয় মাইনষে!

তারপর কী ঘটে? ঘটে এক ছ্যারাভ্যারা ঘটনা!

কবিরাজ নানায় পতিত মাঠে কবিরাজী গাছ খোঁজতে খোঁজতে কী মনে কইরা গোরস্থানের দিকে আসে! আইসা দেখে, বিরাট একখান ভয়ের ব্যাপার ঘইট্টা রইছে!

সেই ছমছমা, নিরালা গোরস্থানে কিনা বেবুঝ দিলরুবায় শুইয়া অঘোরে ঘুমাইতাছে! সেয় খালি সেইনে শুইয়াই নাই, সেয় করছে কী নিজের নানীর কব্বরটারে জাবড়ানী দিয়া ধইরাও আছে!

হায় হায় হায়! বেবুঝ দিলরুবায় এইনে কেমনে আইলো?

এইটা তো ভালা কথা না! বান-বাতাসের বিপদ আসুক কী না-আসুক, অন্য দিক দিয়া বিপদ আসতে পারে না নাকি? জগতে বদমাইশের কোনো কমতি আছে? কোন বিপদে কে ফালাইবো-কে বলতে পারে?

দেখতে বাঁকাচুরা যেমনই হউক, মাইয়ায় যে সিয়ানা হইছে—সেই কথা তো উড়াইয়া দেওন যাইবো না! এমনে চললে, সর্বনাশ হইতে কতখোন?

কবিরাজ নানার সেই কঠিন হায় হায় শুইন্নাই না শেষে—আমার কোমরে—এই শিকল বান্ধনি শুরু করছে আব্বা-আম্মায়? করছে তো!

তেমনেই তো যাইতাছিলো হাজারে-বিজারে দিন! শিকলে বান্ধা থাইক্কাই তো যাইতাছিলো আমার দিন-রাইত? সেই আমার লেইগা আজকা দেখো কেমুন একটা বিষয় ঘইট্টা যায়! আজকা দেখো—কিছুর মধ্যে কিছু না, আপনা থেকেই একটা ঘটনা ঘইট্টা গেছে! বিশ্বাস করা যায় না—এমুন এক ঘটনা!

আজকা সন্ধ্যার মুখে আমি দেখি কী—আমার শিকলের যেই মাথাটা ঘরের খুঁটির লগে বান্ধা, সেইটা কি না আপনা তেনেই খুইল্লা গেছে! খুইল্লা কি না—সেই শিকলে আবার হুড়ঝুম কইরা মাটিতে পইড়া—হুড়মুড় আওয়াজ তোলে নাই!

সেই শিকলে পড়ছে তো পড়ছে—অতি আলগোচ্ছে পড়ছে গিয়া আমারই কোলে! সেই কারণে শিকল পড়ার কোনো আওয়াজ—বাড়ির কোনোজনেই শোনতে পায় নাই! কেউ জানেই নাই কিচ্ছু!

শিকলখান আমার কোলের উপরে পইড়া সারে না; আমি শুনি যে, কে জানি আমারে ডাক পাড়া শুরু করছে! খুব ডাকতাছে দিলরুবারে! বারেবার বারেবারে ডাকতাছে!

সেই ডাক শুইন্না, একবার মনে হইতাছিলো মাটিতে দুই পাও বিছাইয়া কান্দি! জনমকার কান্দন কাইন্দা লই! আরেকবার মনে হইতাছিলো, উড়াল দেই! উড়াল দিয়া যাই গা সেই দেশে! যেই দেশে বাতাসে, হিজল ফুলেরা ওড়াউড়ি করে! দিনরাইত ওড়াউড়ি করে!

তাইলে দিলরুবায় কেমনে আর ঘরে থাকে? এমুন কইরা ডাক দিলে, ঘরে থাকার কোনো উপায় আছে?

নাই নাই নাই রে!

সেই কারণেই তো—এই যে শিকলের গাট্টি হাতে নিয়া—দিলরুবায় আইসা দাঁড়াইছে, চৌরাস্তার কিনারে! সেই ডাকের মায়াই তো আমারে নিয়া আসছে এইনে—এই যে এই কালা রাইতের ছেমার ভিতরে! আমি আইসা খাড়াইয়া রইছি, এই যে!

০৬.
নিজেকে এই পরস্তাবকথা শোনোনো—তার শেষও হয় না, অমনি দিলরুবা দেখে— ওই যে আসছে তার বাস! অই যে বাসটা মোড় ঘুরছে!

সেটা দেখে, ছল্লাত ছল্লাত করে উঠতে থাকে তার অন্তরের ভেতরটা!

করবে না?

সে তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, এই বাস তাকে কোনখানে নিয়ে যাবে!

এই বাস তাকে নিয়ে যাবে এক নদীর কাছে। বাস থেকে নামলেই, নদীর গন্ধভরা বাতাসের সাথে দেখা হবে তার। সেই বাতাস তারপর ওকে নিয়ে যাবে আরেকটু দূরে। বাতাসের পাশে পাশে—একটুখানি পথ-হাঁটতে হবে তাকে! যেতে হবে একটু দূরে!

সেই দূরে আছে—এক পতিত ভিটা! সেইখানে মস্ত একটা হিজলবাগিচা আছে! হিজলের বাগিচায় ফুল আছে! সেই ফুল যতো ফোটে, ততো ঝরে ঝরে পড়ে!

তারা শুধু ঝরে ঝরে ঝরে! ঝরে ঝরে যায় তারা—দিনরাত ভরে!

সে ঝরার শেষ নেই কোনো!

হিজলবাগিচার সীমানা যেখানে শেষ হবে, সেইখানে অন্য একটা দেশ আছে! একদম চুপ নিঝুম দেশ! সেই দেশ নিমগাছের ছায়ায় ছায়ায় ঢাকা! ওই ছায়ার নিচে তারা দাঁড়িয়ে আছে! সেই যে দিলরুবার সই—দোস্তরা!

অনেক অনেকদিন ধরে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে তারা!

আরো একজনও অপেক্ষা করে আছে, দিলরুবার জন্য! সেইকথা দিলরুবা জানে! অপেক্ষা করে আছে—সেই জন! সেই যে সে! রুখো মাটির ওপর দিয়ে যে হেঁটে যায় বলে, সেই মাটি সবুজে সরস হয়ে যায়! সে যেইখানে পা রাখে, সেইখানে মিঠা কুমড়ার লতা জন্ম নেয়। লতায় লতায় থাকে খালি হলুদ ফুল!

আরো একজনও অপেক্ষা করে আছে, দিলরুবার জন্য! সেইকথা দিলরুবা জানে! অপেক্ষা করে আছে—সেই জন! সেই যে সে! রুখো মাটির ওপর দিয়ে যে হেঁটে যায় বলে, সেই মাটি সবুজে সরস হয়ে যায়! সে যেইখানে পা রাখে, সেইখানে মিঠা কুমড়ার লতা জন্ম নেয়। লতায় লতায় থাকে খালি হলুদ ফুল!

যেতে যেতে দিলরুবা যদি ছায়াভর্তি একটা পুকুরের সন্ধান পায়, তবে তাকে সে তার কোমরে জড়ানো শেকলখানা দিয়ে দেবে! কে না জানে, সকল শেকলই জলের কাছে গিয়ে হেলেঞ্চার লতা হয়ে যায়!


Motifআরো পড়ুন

জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ : ১ম পর্ব
জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ : ২য় পর্ব

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।

আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধূলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।