রবিবার, জুন ২৩

টোকন ঠাকুরের ধারাবাহিক : জার্নি অব কাঁটা : পর্ব ১৫

0

ঢাকা শহরে এভাবে কখনো আবাসিক থাকিনি আমি, যেভাবে নারিন্দায় থেকেছি। নারিন্দা কাঁটা ছবির প্রধান লোকেশন, নারিন্দা শহীদুল জহিরের জন্মভূমি। নারিন্দায় অবস্থিত ভূতের গলি, যেখানে কাঁটার প্রধানতম চরিত্র নিঃসঙ্গ আবদুল আজিজ ব্যাপারীর পৈতৃক বাড়ি। এই বাড়িকে ঘিরেই গল্পটা যেমন আবর্তিত, এই বাড়িতেই থাকলাম আমরা। সত্যিই, সে এক অদ্ভুত সময়ের ইশারা নেমেছিল ভূতের গলিতে, যেখানে কাঁটা ছবির টিম মেম্বরদের নিয়ে আমি ভোর, সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, রাত-মধ্যরাত পার করেছি। নয় মাস সময় ছিলাম আমরা নারিন্দায়। ভূতের গলির বাইরে আমার তখন কোনো দুনিয়া নেই, নারিন্দার বাইরে আর কোনো বিশ্ব নেই। কাঁটা টিমেরও দুনিয়া তখন নারিন্দা থেকে দয়াগঞ্জ, ঢালকান নগর, ধুপখোলা মাঠ, কাগজীটোলা, সূত্রাপুর, ফরাসগঞ্জ, শ্যামবাজার, মিলব্যারাক, বুড়িগঙ্গা, গেণ্ডারিয়া, চৌধুরী আলম নগর, মামুর মাজারের মোড়, ফরিদাবাদ, সাধনা ঔষাধলয়ের গলি ও নানান উপগলি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের দুনিয়া তখন দক্ষিণ মৈশুন্ডি, কলতাবাজার, শিংটোলা, লক্ষ্মীবাজার, র‍্যাংকিন স্ট্রিট, পদ্মনিধি লেন এবং ঘুরে ফিরে চৌরাস্তার মোড়ের ‘ইয়োর চয়েস সেলুন’, গলির চিপায় চা-পুরির ছোট্ট হোটেল অথবা ভূতের গলির আবদুল আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির বাইরে নয়। ওরকম জীবন আমার ঢাকায় আগে কখনো কাটেনি, এরপরেও আর কাটবে না, জানি। শুধু আমার কেন? কাঁটা টিমের সবার জন্যই কথাটা সত্য। সবার সঙ্গেই আমার এ ব্যাপারে কথা বলা আছে, সবাইই স্বীকার করেছে।


ppp 15. 2

ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির কাঠামো পুনর্নির্মাণ করছে কাঁটা টিম


কিছু অভিজ্ঞতা থাকে মানুষের, মানুষ নিজেই বুঝতে পারে, ইচ্ছে করলেও আর দ্বিতীয়বার ওরকম হবে না, ওরকম করা যাবে না। ও একবারই হয়। দাশ বাবু বলছিলেন যে, ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর—।’ নারিন্দার নয় মাস কাঁটা টিমের সবার জীবনে সেরকম কিছু স্মৃতি-অভিজ্ঞান সঞ্চয় হয়ে আছে। আজ নারিন্দা থেকে অনেক দূরে বসে এইটুকু মনে করতে পারি। অতবড়ো বাড়িতে একটি টিম নিয়ে যে আমি ছিলাম, ছিলাম এক স্বপ্নের ঘোরে, ঘোরের নাম সিনেমা, সিনেমার নাম কাঁটা। মনোজগতের কাঁটা। এই কাঁটা দর্শকের মাথায় ঢোকানো হবে শিগগিরই, এ বছরেই। বছরের নাম দুহাজার তেইশ। এ বছর সিনেমা ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা হচ্ছে, কাঁটাকে দর্শকের চোখাচোখি করে দেওয়া, কানাকানি করে দেওয়া। কাঁটা টিম প্রধান হিসেবে আমার পার্সেপশন, কাঁটা আমাদের জীবনের এমন কিছু উপাদানে সমৃদ্ধ, যা এ দেশের ছবি বা ফিকশনের ইতিহাসে খুব সচরাচর নয়—এই দাবি মিলিয়ে দেখার দায়িত্ব দর্শকের। মিললে বলবেন, মিলেছে। না মিললে বলবেন, মেলেনি। গালি মেনে নেব, অপমান মেনে নেব। সমস্ত সীমাবদ্ধতার পরেও আমার বা কাঁটা টিমের না-পারা ও পারাকে বাজিয়ে দেখতে চাই। লেইট ফিফটিজে নির্মিত ‘মুখ ও মুখোশ’ পাকিস্তানের প্রথম বাংলা ছবি, সেই ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আমি সম্যক জ্ঞাত।

কাঁটা আমাদের জীবনের এমন কিছু উপাদানে সমৃদ্ধ, যা এ দেশের ছবি বা ফিকশনের ইতিহাসে খুব সচরাচর নয়—এই দাবি মিলিয়ে দেখার দায়িত্ব দর্শকের। মিললে বলবেন, মিলেছে। না মিললে বলবেন, মেলেনি। গালি মেনে নেব, অপমান মেনে নেব।

অন্য ভাষার সিনেমার দর্শক হয়েছি বা নিয়ত হচ্ছি যেমন আমি, হচ্ছে কাঁটা টিম, হচ্ছেন আপনিও— ফলত, মিলিয়ে দেখার দারুণ অবকাশ আছে। শহীদুল জহির তো গদ্যে নিজেই এক জনরা, কাঁটা গল্পটি সেই জনরার অন্যতম ফসল। আর আমরা চেষ্টা করলাম সেই জনরা মাথায় রেখে কোথাও পৌঁছাতে, জার্নিটা ছবিতে দেখা যাবে। প্রায় পাঁচশো পাত্রপাত্রী, ষাট-সত্তুরটা পুরান ঢাকার পুরোনো সব বাড়ি, ইতিহাসের তিনটি আলাদা আলাদা সময় চিত্রিত আছে কাঁটাতে। গল্পটা শুরু হবে ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি, যেদিন রেডিও থেকে খবর ভেসে আসছে যে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা তার ছবির নায়িকাসহ নগরবাড়ি ফেরিঘাটের নদীতে ডুবে মারা গেছেন। আর গল্পটা শেষ হবে পরের বছর ৩০ অক্টোবর, ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায়, ঘটনাটি ঘটবে পুরান ঢাকার ভূতের গলিতে। অবশ্য ৮৯-৯০ সালের এই ফিকশনে দুটি ফ্ল্যাশব্যাকও আছে। এক ফ্ল্যাশব্যাকে যাব আমরা ১৯৭১ সালে, আরেক ফ্ল্যাশব্যাকে যাব আমরা ১৯৬৪ সালে। এটুকুই বলা যায় গল্প সম্পর্কে। কাঁটা চিত্রনাট্যে যা লেখা ছিল, তাই শুট করার প্রস্তুতি তখন কাঁটা টিমের। টিম কোথায় তখন? ওই যে বললাম, ভূতের গলিতে। ভূতের গলি কোথায় পৃথিবীতে? একবার চোখ বন্ধ করেন, পাঁচ সেকেন্ড চোখ বন্ধই রাখেন, এবার খোলেন, দ্যাখেন আপনার চোখের সামনেই ভূতের গলি, গলির ৩৬ নম্বর বাড়ি, আবদুল আজিজ ব্যাপারীর বাড়ি; অর্থাৎ আপনার মুখোমুখি কাঁটা। অসহায়ত্ব, আত্মগ্লানি ও বিভ্রান্তির চক্র কাঁটা। কাঁটা আপনার মুখোমুখি হবেই অথবা আপনি নিজেই কাঁটার মুখোমুখি বসবেন—আমি এরকম ভাবনা করি। আপনি তো দিন শেষে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার নিজের ভাবনার মুখোমুখি হন বা হবেন, সে কারণেই কাঁটা আর আপনি মুখোমুখি বোঝাপড়া করবেন একদিন, এ আমি অনুভব করি।


ppp 15. 3

দ্যাছ ছাধিন হইছে, মহল্লায় ট্যাপের পানি আiইছে মাগার ব্যাপারীর বাড়ির উঠানের পাতকুয়াটা অহনো রয়া গেল…


বাড়ি সংস্কার করা হচ্ছে। সংস্কার বলতে কিছু জায়গায় পুনর্নির্মাণ করতে হচ্ছে। বাড়িটা আমরা এমন ভাবে দেখাব, স্বয়ং বাড়ির মালিক জনাব প্রয়াত নাসিরুদ্দিন বা তারও আগে যিনি বাড়িটি তৈরি করেছিলেন সেই পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া লোকটি—তাঁরা দেখলে যেন বলতে পারেন, ‘আরে, বাড়ির পেছনের দিকটাকেই তোমার সামনের দিক করে দিলে? উল্টাই দিলে? পশ্চাৎ সম্মুখ, সম্মুখ পশ্চাৎ। কিয়া বাত কিয়া বাত।’

দিলাম, কাঁটার জন্য দিলাম। একটি নির্মিতব্য ছবির জন্য যেন-বা একটি লড়াই আমার, আমাদের। তাই বাড়ির এখন যিনি মালিক, নাসিরুদ্দিন ও পরবর্তী নূরজাহান বেগম হয়ে আরও পরের এক তরুণী, তিনি কী ভাববেন তখন আমার তা মাথায় নেই। কারণ, কাঁটার চরিত্র স্বপ্নারানী দাসের ঘরের মধ্যে পুজো করার জন্য যে জায়গাটা, ধ্রুব এষ বললেন, ‘এই শেলফটা তো স্থায়ী?’

‘হুম। বাড়ির দেওয়ালের ভেতরটা থেকেই বানানো। কেন?’

‘শেলফের নিচের দিকটা কাটা যায় না?’

ধ্রুব’দাকে বললাম, ‘যাবে না কেন? কাঠমিস্ত্রি গফফার দাঁড়ানো পাশেই। শেলফের কাঠের কিছু অংশ কেটে ফেলা হলো মুহূর্তেই। দরকার, তাই করা হলো। কাঁটার জন্য দরকার কোনো কিছু অ্যারেঞ্জ করতে আমি এককাট্টা আছি, টিমকেও সেই অনুযায়ী অনুশীলন করিয়ে আসছি সেই মগবাজার ক্যাম্প থেকেই। বাড়ির বয়স প্রায় শতবর্ষ পার হওয়া। সেই বাড়ির দেওয়ালে থাকা স্থায়ী কাঠের শেলফের কিছু অংশ কেটে ফেলতে আমার একটুও বাঁধেনি, কারণ, কাঁটায় ওরকম লাগবে। ব্যাস। বাড়িওয়ালার সঙ্গে এ নিয়ে পরবর্তীতে এক প্রস্থ ঝগড়া যে পেন্ডিং থাকছে, তা তখন মাথায় রাখিনি। মাথায় আরও অনেক কিছু রাখিনি, যা রাখলে কাঁটা করা যেত না।

আজিজ ব্যাপারীর বাড়িটি পরিত্যক্ত ছিল, আমরা ওঠার পরে আস্তে আস্তে সেই ত্যক্ত ভাব দূর হতে লাগল। মনে আছে, প্রচুর মশা ছিল। তাই সিটি কর্পোরেশনের একজন লোক ঠিক করা হলো, যে কিনা প্রতিদিন ফগার মেশিন নিয়ে আসত কাঁটা লোকেশনে। সারা বাড়ি শব্দ করে মশার ওষুধ ছিটাত, ধোয়ায় কিছুক্ষণ শাদা হয়ে যেত চারপাশ। পরে ওই ফগার মেশিন চালানো সিটি কর্পোরেশনের চাকরি করা ছেলেটি একজন পুলিশের চরিত্র করেছে কাঁটাতে। বাড়ির উঠোনের মাটির অংশে তখন আমরা একটি বাগান বানাচ্ছি। পাতাবাহার গাছ লাগানো হচ্ছে, ঘাস লাগানো হচ্ছে। আর্ট ডিপার্টমেন্টের তখন রাতদিন ব্যস্ততা। ব্যস্ততা সব বিভাগেই। কাঁটা প্রপস, কস্টিউম, চরিত্রদের রিহার্সেল, সংলাপ থ্রোয়িং, নানারকম ব্লকিং, অভিব্যক্তিসমূহ, কো-আর্টিস্টদের সঙ্গে নিরন্তর বোঝাপড়া, আমার মুড তাদের মধ্যে চারিয়ে দেওয়া, স্ক্রিপ্টে কিছু না কিছু সংযোজন হতেই থাকা, পুনরুদ্ধার করা গলি ও নির্মিত পাঁচিলের সামনের রাস্তায় কৃতি রঞ্জনের দুড়মুস কাহিনি চলতে থাকে। তখনো আমি মগবাজার বাসা থেকে নারিন্দা ক্যাম্পে উঠে পড়িনি। কিন্তু সারা দিন নারিন্দায় থাকি। অনেক রাতে ফিরে যাই মগবাজারের বাসায়। অবশ্য কাঁটা টিমের একাংশ তো উঠেই পড়েছে। একদিন নারিন্দা ক্যাম্পে, হয়তো বিকালের দিকে, টিম মিটিং করছিলাম। প্রচুর গ্যাস হচ্ছিল আমার। পানিও খাচ্ছিলাম বেশি। ঢেঁকুর উঠছিল। আধাঘণ্টায় প্রস্রাব করতে হলো বেশ কয়েকবার। শুভ ওর বন্ধু তরুণ ডাক্তার মামুনকে নিয়ে এলো। মামুন আমাকে দেখল। বলল, ‘আপনাকে এখনই মিডফোর্ডে যেতে হবে।’


 

ppp 15. 5

কাঁটা শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা, আড্ডায় অনিমেষ আইচ, তৌফিক ইমন ও শিবু কুমার শীল


‘মামুন, কী বলতেছ তুমি? সেট নির্মাণ পুরোপুরি হয়নি এখনো, টিমের সবাইরে এইখানে রেখে আমি হাসপাতালে যাব?’

‘হুম, আপনাকে যেতেই হবে। ‘

টিম থাকল নারিন্দায়। ওদের বললাম, ‘আচ্ছা, আমি মিডফোর্ড থেকে ঘুরে আসি, তোমরা থাকো।’

মিডফোর্ডে যাওয়ার পর আমার কিছু শারীরিক পরীক্ষা করা হলো। ভাবলাম, এখন কিছু ওষুধ-টোষুধ দেবে, সে গুলো নিয়ে ফিরে যাব নারিন্দায়, যেখানে কাঁটার পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড টিম আমার অপেক্ষায় আছে। আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির অবকাঠামোতে কিছু সংযোজনা হচ্ছে। টিমের থাকা-খাওয়া, কাজকর্মের বাজেট সবই তো আমার উপরে নির্ভর করছে। আমি কাঁটার নির্মাতা যেমন, প্রোডিউসারও বটে। কিছু টেস্টের বিষয়আশয় দেখে মিডফোর্ডের ডাক্তার জানালেন, ‘আপনার ৮ নাম্বার বেড।’

‘মানে কী? আমার কী হইছে যে ভর্তির কোনো অনুরোধ ছাড়াই মিডফোর্ড হাসপাতাল ভর্তি করে নিল আমাকে? তাছাড়া আমি হাসপাতালে থাকলে নারিন্দায় যে লোকজন আছে, তাদের কী হবে?’ আমার নাকি মৃদু অ্যাটাক হয়ে গেছে হার্টে। তাই হাসপাতাল আমাকে ছাড়বে না। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, আমার হার্ট আছে, তাই অ্যাটাকের শিকার হচ্ছে। সাউন্ড গুড।

তো এলিফ্যান্ট রোডে থাকাকালীন একরাতে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো। আমি ভাবলাম, অ্যাসিড বেড়েছে। ট্যাবলেট ছিল, খেলাম। ব্যথা কমল না। ব্যথা আরও বাড়ল। রাতে আর ঘুমাতেই পারলাম না। সকাল নয়টার দিকে ফোন করলাম হারিস ভাইকে। হৃদরোগের ডাক্তার এবং কবি। পশ্চিমবাংলায় ভূমেন্দ্র গুহ, বাংলাদেশে হারিসুল হক।

মনে পড়ল, এটি আমার জন্য পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ আগেও একবার এই ঘটনা ঘটছিল আমার, যখন আমি থাকতাম নিউ এলিফ্যান্ট রোডে। সিঙ্গেল লাইফ আমার। বাইরে বাইরে খাওয়া দাওয়া করেছি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। তাই অ্যাসিড থেকে নিজেকে বা নিজের পেটকে রক্ষা করতে পারিনি। সেই কলেজ লাইফ থেকেই আমি বাড়ির বাইরে থাকছি, খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি। তাই অনিয়ম নিয়ম হয়ে সংবিধান হয়ে গেছে আমার জীবনে। প্রচুর অ্যাসিডিটির ট্যাবলেট আমি খেয়েছি। এখনো খেতে হয়। তো এলিফ্যান্ট রোডে থাকাকালীন একরাতে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো। আমি ভাবলাম, অ্যাসিড বেড়েছে। ট্যাবলেট ছিল, খেলাম। ব্যথা কমল না। ব্যথা আরও বাড়ল। রাতে আর ঘুমাতেই পারলাম না। সকাল নয়টার দিকে ফোন করলাম হারিস ভাইকে। হৃদরোগের ডাক্তার এবং কবি। পশ্চিমবাংলায় ভূমেন্দ্র গুহ, বাংলাদেশে হারিসুল হক। পিজিতে আছেন। সজ্জন মানুষ। অন্য যেকোনো রোগের ডাক্তার কাকে দেখাব, আমার বা আমার বাপ-মা-বোন-ভাগ্নিদের—এ ব্যাপারে অনেকবছর ধরে হারিস ভাইয়ের পরামর্শ নিয়ে থাকি আমি। হারিস ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম, ‘পেটে ব্যথা। ব্যথা বুক পর্যন্ত আগাচ্ছে।’ হারিস ভাই বললেন, ‘পিজিতে আসতে পারবা?’


ppp 15. 6

আগারগাঁও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালকের দফতরে প্রপসের সন্ধানে কাঁটা টিম, ২০১৮


‘পারব’— বললেও এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাঁটাবন মোড় পার হলাম। আমার তখন হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। তাছাড়া আমার ভাবনায় আছে যে, অ্যাসিড। পেটে কিছু তেল জমেছে, গ্যাসও জমেছে। আমেরিকা খোঁজ পেলে তেল কোম্পানির নল ঢুকিয়ে দেবে পাছা দিয়ে, গ্যাস নিতেও তারা ছাড়বে না। তেল-গ্যাসের বাজার আন্তর্জাতিক—যা আমার পেটেই আছে। কাঁটাবন মোড় পার হয়ে আজিজ মার্কেট পর্যন্ত কষ্ট করে হাঁটলাম খুবই ধীর গতিতে। আজিজে ঢুকেই বসে পড়লাম ফ্লোরে। মনে হচ্ছিল, পিজির কার্ডিয়াক ব্লক পর্যন্ত পৌঁছুতে পারব না। শুভ, শাশ্বত আর সাকিল—সহকারীরা এসে গেল দ্রুতই। হারিস ভাই কিছু টেস্ট করাতে দিলেন আমাকে এবং বললেন, ‘ওই যে বেড, তুমি ওই বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ো।’

‘মানে কী? আমার কী হইছে?’

‘মাইল্ড অ্যাটাক।’

আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি মোটেও সিরিয়াস ছিলাম না। বললাম, ‘হারিস ভাই, আজকে কিছু হালকাপাতলা ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দেন, ট্যাবলেট খেতে থাকি, আরেক দিন আসবনে। সেইদিন ভর্তি হয়ে থাকব না হয়।’ হারিস ভাই আমার কথা আমলেই নিলেন না, তার সঙ্গে যুক্ত হলেন ডাক্তার দীপক কুমার অধিকারী; তাঁরা কার্ডিয়াক বিভাগের স্টাফদের নির্দেশ দিলেন হাসতে হাসতে, ‘এই অবস্থায় ওকে ছাড়া যাবে না। ছাড়লে বাইরে গিয়ে যদি মরে যায়, কাল ওর লাশ নিয়ে শাহবাগ-শহীদ মিনারে মিছিল-মানববন্ধন হবে, ডাক্তারদের গোষ্ঠী উদ্ধার হবে।’ পরিস্থিতি আমার পক্ষে এলো না, হারিস ভাইয়ের সোৎসাহেই আমাকে ভর্তি হতে হলো পিজির কার্ডিয়াক বিভাগে। দশ দিন টানা ছিলাম। আমার নাভির চারপাশ দিয়ে ১৪টা ইনজেকশন দেওয়া হলো। বুকের লোম সব চেঁছে ফেলা হলো। পিজি হাসপাতালের কার্ডিয়াক ব্লকে অনেক প্রিয়জন আমাকে দেখতে আসতে শুরু করল সেই কদিন। খুব মজা হচ্ছিল। সম্ভবত চতুর্থ দিন দুপুরের পর হাসপাতালের চার তলা থেকে চুপি চুপি নেমে যাই আমি। পিজি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকি চারুকলার দিকে। চারুকলার সামনে গিয়ে ঢুকে পড়ি উদ্যানে। এই চারুকলা, এই উদ্যানে হাঁটতে হাঁটতে, ঘুরতে ঘুরতে, উড়তে উড়তে, পুড়তে পুড়তে আমি বড়ো হয়েছি। পাতলা গোঁফ নিয়ে বাড়ি থেকে এসে আমার গোঁফ পেকে গেছে শাহবাগ প্রান্তরেই। ঘণ্টাখানেক উদ্যানে থেকে বিড়ি-বুড়ি তো না-খাওয়া ছিলাম চার দিন, পুষিয়ে নিলাম। তারপর হাতে বানানো একটা শলাকা নিয়ে ফের হাঁটতে হাঁটতে শাহবাগ, পিজিতে, চুপি চুপি কার্ডিয়াক ব্লকে নিজের বেডে ফিরে আসি। সেই হাতে বানানো শলাকা রাতে অর্ধেক টেনে বাকি অর্ধেক রেখে এলাম বাথরুমের ভেন্টিলেটরের কাচের উপর, পরে মাঝরাতে খাব আর কি!। পরে নার্স ধরে ফেলেছেন ব্যাপারটা। হারিস ভাইয়ের কাছে নালিশ গেছে এবং হারিস ভাই তার চেম্বার রুমে যেতে বললেন, গেলাম। বললেন, ‘নার্স তো ধরে ফেলেছে।’

নার্স তো ধরবেই। আমার একটি কবিতার বই আছে, ‘নার্স, আমি ঘুমোইনি’—এতে তো পরিষ্কার যে, কোনো এক রোগী হয়তো জেগে আছে। রাত দুইটা। রাত সোয়া দুইটা। সব রোগীই কি নিদ্রামগ্ন, মিড নাইটে? রাত আড়াইটা। তিনটা বাজল। নার্স একা, একজন রোগী নিদ্রাহীন, পুরো ওয়ার্ড শুনশান। কী হতে পারে? কী হতে পারে না? সেই সিচুয়েশন ডিল করার ভাবনা ছিল হয়তো সেই কবিতায়, ‘নার্স, আমি ঘুমোইনি’তে। হারিস ভাইয়ের চেম্বার রুমে কিছু হার্টের ছবি বাঁধাই করে ঝোলানো আছে। আর দেওয়ালে ঝুলছিল কবি শামসুর রাহমান ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যারের ছবি। হারিস ভাইয়ের কাছ থেকে তার ব্র্যান্ডের একটা শলাকা টেনে আমি চলে আসি আমার কার্ডিয়াক ওয়ার্ডের বেডে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সবাই খুব সাবধান বাণী দিচ্ছিল, ‘এইবার ধূমপান বাদ দ্যাও। রেস্টে থাকো।’ এক ধরনের প্লাস্টিকের তামাকবিহীন ডিজিটাল ধূমপানের ব্যবস্থা হলো আমার। ঢাকা সেনানিবাস স্টেডিয়ামে সে সময় চলছিল বেঙ্গল ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক উৎসব। চার রাত সারা রাত। সবাই গেছে। আমি তো হার্টের রোগী, সদ্য হাসপাতাল ফেরত, তাই আমার তো তখন বেশি বের হওয়া নিষেধ। বাসায় শুয়ে থাকা, খাওয়া দাওয়া, ট্যাবলেট সেবন চলছে। ফোনে বা ফেসবুকে মনে নেই, নবনীতা নক করলেন। যেতে বললেন মিউজিক শুনতে। বললাম, ‘কী করে যাব? হার্টের ব্যামো।’

‘হার্টের কি বেশি ব্যবহার করে ফেললেন নাকি প্রয়োজনীয় ব্যবহার না করার ফলে হার্টে জং ধরে গেছে?’ এই প্রশ্ন কণ্ঠশিল্পী নবনীতা চৌধুরীর। আমি এর উত্তর জানি না। আমার শুধু মনে পড়ে, পিজির কার্ডিয়াক ব্লকে ডাক্তার হারিসুল হকের রুমের দেওয়ালে হার্টের নানারকম ছবি ঝুলছে। আমি তখন রেস্টে আছি। নবনীতা বললেন, ‘ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকই তো হার্টের বড়ো চিকিৎসা, জানেন না?’

চার রাত পর পর জেগে জেগে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভালে কাটানোর পর মনে হয় ভালো হয়ে গেলাম। ভালোই ছিলাম। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের সঙ্গে মাঝরাতে দেখা হলো মিউজিক ফেস্টে। মোরশেদ ভাই তখন বিদেশ থেকে বাইপাস করিয়ে সদ্য ঢাকায় ফিরেছেন। মাঝরাতের পর, মোরশেদ ভাই বললেন, ‘তোমার নাকি হার্টের সমস্যা হইছে?’ বললাম, ‘জি মোরশেদ ভাই।’

‘সিগারেট টানতে পারতেছ?’

আমি ডিজিটাল শলাকা দেখালাম, বললাম, ‘এই।’


ppp 15. 8

কাঁটা ক্যাম্পে চলচ্চিত্র গবেষক ও লেখক অনুপম হায়াৎ। কাঁটা ছবির জন্যে তাঁর কাছে নানানভাবে আমার ঋণ রয়ে গেছে


মোরশেদ ভাই একটা ইশারা দিলেন। সেই ইশারা ফলো করলাম আমি। আর্মি স্টেডিয়ামের এক কোণে গিয়ে মোরশেদ ভাই সিগারেট বের করলেন নিজের জন্য, আমাকেও দিতে দিতে বললেন, ‘চলো, চুপচাপ মেরে দি।’

আমিও নিলাম শলাকা। ফাইনালি আমরা ধরা খেলাম। কার কাছে? ওখানে কীভাবে যেন এসে পৌঁছুলেন মুনিরা মোরশেদ মুন্নী। এই দুজনে বেঁচে গেছেন সেই দিন, ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি, যেদিন নগরবাড়ি ফেরিঘাটে ট্রাকের ধাক্কায় গাড়ি পড়ে যায় নদীতে। মারা যান আলমগীর কবির ও টিনা খান, বেঁচে যান মুনিরা মোরশেদ মুন্নী ও সেদিনের তরুণ নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। যে প্রসঙ্গটা দিয়ে কাঁটা গল্পের সূচনা, ইয়োর চয়েস সেলুনে। জার্নি অব কাঁটা কি এখন আর্মি স্টেডিয়ামে? না, তাহলে কোথায়? ভূতের গলি, নারিন্দায়।

নারিন্দা পর্যন্ত ভালোই ছিলাম তবে সেদিন সন্ধ্যায় আকস্মিক কিছু লক্ষণ দেখা গেল। তরুণ ডাক্তার মামুন কাঁটা সেটে সন্ধ্যার পর আসত প্রায়ই, শুভর সঙ্গে আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির তিন তলায় বসে কিছু একটা খাওয়া দাওয়া করত বলেই মনে হতো। তারপর মিডফোর্ডে আসতে হলো, এখন এখানকার কার্ডিয়াক ব্লকের ৮ নম্বর বেডের পেশেন্ট আমি। আবারো সেই হার্ট অ্যাটাকের শিকার। কী, বেশি ব্যবহারের ফলে নাকি কোনোরকম ব্যবহার না করার দরুন জং ধরে গেছে? আমার হার্টে কি মরচে পড়ে গেছে? আমার হার্টে কি শ্যাওলা জমে গেছে? নাকি ঝাঁজরা হয়ে গেছে? পুড়ে ভস্মও হয়ে থাকতে পারে। টেস্ট চলছে। আমাকে শুইয়ে দেওয়া হলো বেডে। আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছি কখন নারিন্দায় ফিরে যাব? এখানে পড়ে থাকলে ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়ে যাবে, বুঝতে পারছিলাম। হয়তো ঘুমের ডোজ বেশি দেওয়া ছিল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, কখন? তা মনে নেই। ঘুমের আগমুহূর্তটা পরে কি খুব ক্লিয়ার মনে পড়ে মানুষের?

নগরীর কোলাহল মিশে থাকা এক হাসপাতালের কার্ডিয়াক পেশেন্ট আমি, আমার মাথার কাছে কি বসে আছে কোনো রাইকিশোরী, আমার শিয়রে সারা রাত জেগে আছে কোনো মৃগয়া! কিন্তু চোখ খুলতেই দেখি, সে নেই। আমি কি বিভ্রমের শিকার? হার্ট অ্যাটাকের শিকার, এই জন্য ডাক্তার আছেন, নার্স আছেন, ওষুধ আছে, হাসপাতাল আছে; কিন্তু বিভ্রমের শিকার হলে কোথায় যাব?

বনের গভীরে দুপুর, ঝিমপাড়া দুপুর। নির্জন কোনো দুপুরে কেন আমি একলা জঙ্গলে ঢুকে পড়ি? তবে কি কোনো মৃগয়ার চকিত চাহনি দেখেছি? মৃগয়া কোন দিকে ছুটে গেছে? জংলাপাতার ঝোপ নড়ে যেই দিকে, ওইদিকে? আমিও ছুটতে থাকি মৃগয়াকে লক্ষ করে, আমিও বুঝতে পারি, এ জীবন ভালোবাসার শুধু, আর কিছুর নয়, আর কিছুরই নয়। সহায়-সম্পদ-স্বার্থ জমাতে জমাতে ভালোবাসা থেকে দূরে ছিটকে যায় মানুষ, ভালোবাসার অনুভূতি থেকে হারিয়ে যায়। আর আমি ভালোবাসার মধ্যে ডুবে মরতে চেয়েছি। আজকেও তাই চেয়ে বসে আছি এমন এক নদীকূলে, ওপারে তুমি, এপারে আমি, সাঁকো নেই, নৌকা নেই, আমি শুধু ওপারে তাকিয়ে থাকার দিন পার করি। চরাচর জুড়ে বেহিসেবি জোসনার আলো ডাক দেয়। ডাকে নেশা, ডাকে জুয়া, জুয়াড়ির পূর্বপুরুষ ছিল জোসনাখোর। তাই মাতাল হবার অধিকার শুধু তারই, যার জিন থেকে হ্রেষা ভেসে আসে, পাহাড়ি ঘোড়ার। আরে, ঘোড়া কোথায়, পাহাড় কোথায়? এ যে সমতল। নগরীর কোলাহল মিশে থাকা এক হাসপাতালের কার্ডিয়াক পেশেন্ট আমি, আমার মাথার কাছে কি বসে আছে কোনো রাইকিশোরী, আমার শিয়রে সারা রাত জেগে আছে কোনো মৃগয়া! কিন্তু চোখ খুলতেই দেখি, সে নেই। আমি কি বিভ্রমের শিকার? হার্ট অ্যাটাকের শিকার, এই জন্য ডাক্তার আছেন, নার্স আছেন, ওষুধ আছে, হাসপাতাল আছে; কিন্তু বিভ্রমের শিকার হলে কোথায় যাব? আমার মনে হয়, আমি শুয়ে আছি নির্ভানা লেকের পাড়ে, রাইকিশোরী আর আমিই শুধু আছি। এ একদম স্বার্থপরতা, না? অবশ্য ভালোবাসার দুনিয়ায় এরকমই হয়। আমি রাইকিশোরীর দিকে তাকালাম। বুঝলাম, ও ঘুমায়নি। আমি বলেছিলাম, নার্স, আমি ঘুমোইনি। রাইকিশোরী বলতে পারে, ‘হৃদয়ের রোগী, আমিও ঘুমাইনি।’ কিন্তু সে কিছু বলল না। সে আমার দিকে একবার তাকাল। আমি তার দিকে তাকিয়ে তার একটি হাত ধরলাম। আমি তার হাত ধরতেই চেয়েছি। আঁকড়ে ধরতেই চেয়েছি। তক্ষুনি আমার পুরোপুরি ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি, অপসৃয়মান সিনারিওতে লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার মরীচিকাময় ধুধু মরুভূমি। কেউ নেই। কিছু নেই। কিচ্ছুটি নেই। নিজের মস্তিষ্কে সৃজিত স্বপ্নঘোরে কী না কী ভাবি আমি! কয়েক দিন আমার গেল মিডফোর্ডে। কিন্তু নারিন্দায় টিম পড়ে আছে দিকনির্দেশনাহীন, এ আমাকে প্রেশার দিচ্ছিল। তাই, ফোন করলাম পিজিতে, হারিস ভাইকে। বললাম, ‘মাইল্ড অ্যাটাকে আমি যদি এ অবস্থায় মিডফোর্ডে পড়ে থাকি, এবার আমার ম্যাসিভ অ্যাটাক হতে বাধ্য। মিডফোর্ড তো আমারে ছাড়তেছে না।’

হারিস ভাই বললেন, ‘ছাড়বে কেন? তোমাকে ওখানে আরও যদ্দিন দরকার, থাকতে হবে।’


ppp 15. hok

একদা সিনেমার সঙ্গে জড়িয়েছিলেন কবি-কথাসাহিত্যিক-নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক, আমিও জড়িয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে


‘তাইলে নারিন্দার কী হবে? দরকার হলে আপনি আমাকে মিডফোর্ড থেকে পিজিতে ট্রান্সফার করে নেন। পিজির কার্ডিয়াকেও একদিন না হয় থাকলাম। তারপর পিজি থেকে ডিসচার্জ করে দেবেন আমাকে। আমি নারিন্দায় চলে যাব। কাঁটার কাজ শেষ হোক, তখন আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত টেস্ট করাব। চিকিৎসা তখন দেখা যাবে। এখন পরিস্থিতি একটু বোঝেন।’

সেভাবে হয়নি। তবে আমার চাপাচাপিতে মিডফোর্ডও আমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। অনেক দিন বাদে আমি মিডফোর্ড থেকে মগবাজার বাসায় ফিরলাম। গাড়িতে মনে হলো সেই রাইকিশোরী প্রাণেশ্বরী পাশেই বসে আছে। না, এও এক বিভ্রম। বিভ্রম আমার পিছু ছাড়ছে না। বিভ্রম আমাকে একদিন বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এসেছিল। আকাশে হিঙুল রঙের মেঘ যেভাবে ডাকে, বিভ্রমও আমাকে ডাকে। পরদিনই নারিন্দায় উপস্থিত আমি, সঙ্গে এক প্যাকেট হৃদয়-রোগের ওষুধ। সকাল বিকাল রাত— ১২টা ট্যাবলেট প্রতিদিন। প্রায় বছরখানেক তা কন্টিনিউ হলো।

নারিন্দায় সেটের কাজ আবার শুরু হলো। সব কিছু থমকে ছিল, আমি আবার তাতে তুমুল গতি ঢেলে দিলাম। কাঁটার ব্যাকগ্রাউন্ড টিমের সবাই নতুন, তারা যা কিছু করছিল, তাদের অভিজ্ঞতায় সে সব প্রথম। কী সেটের কাজ, কী প্রপস, কস্টিউম বা যাই হোক। এমন কি কাঁটা শুটিং দেখার মাধ্যমেই তাদের কাজে জড়িত থেকে শুটিং দেখার অভিজ্ঞতা প্রথম। আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির সামনে, পাচিলের পাশে কিছু নতুন ইটের দেওয়াল চোখে পড়ল। সেই নতুন ইট ঢাকতে হবে। আর ইটের দেওয়ালের উপরের অংশে কাঁটার তিন সময়ের তিনটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক শ্লোগান লেখা থাকবে। কিন্তু নিচের দিকের নতুন ইট ঢাকব কী করে? একটা ভক্সওয়াগন গাড়ির খোঁজ পাওয়া গেল কিন্তু সেটা আনা গেল না। কিন্তু আমার দরকার ১৯৬৪ সালের আগের যে কোনো মডেলের একটা গাড়ি, যেটা নষ্ট হয়ে পড়ে থাকবে বাড়ির সামনেই। লতাপাতা গজিয়ে যাবে বহুদিন পড়ে থাকা গাড়ির ভেতরে। দেওয়ালের নতুন ইটও ঢাকা পড়বে। কী করা যায়? গাড়ি কোথায় পাওয়া যায়?


ppp 15. 10

পিরিওডিক্যাল ছবি কাঁটার নারিন্দা ক্যাম্পের প্রপস রুমের একটুখানি চেহারা


সহকারীদের কেউ একজন বলল, মেসবাউর রহমানের সুমনের তত্ত্বাবধানে এরকম একটা গাড়ি আছে, ১৯৬১ মডেলের। অর্থাৎ কাঁটাতে সেটি ব্যবহার করা যেতে পারে। সুমনের সঙ্গে ফোনে কথা হয় আমার। আমাদের দুজন সহকারী চলে যায় নিকেতনে, সুমনের অফিস থেকে সেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে চলে আসে নারিন্দায় আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির সামনে। জায়গা মতো রাখা হয় গাড়িটি। হ্যাঁ, এ গাড়ি অনেক আগের, ১৯৬১ মডেল। পাকিস্তান আমলের জিনিস। সুমনের অফিস থেকে যারা এসেছিল গাড়ির সঙ্গে, তারা চলে গেল। কিন্তু পরদিন, পরদিন আমি কাঁটার আর্ট ডিরেক্টর শিল্পী মাহমুদুর রহমান দীপনকে বললাম, ‘গাড়ির মডেল তো চিত্রনাট্যের সঙ্গে যায় আর কি! দীপন’দা, গাড়িটা অনেক বছর ধরে পরিত্যাক্ত থাকবে বাড়ির সামনে, এখন সেই ব্যবস্থা করেন। গাড়ির ভেতরে লতাপাতাঘাস-কচু গাছ উঠে যাবে।’

মোটামুটি গাড়ি কিছুটা ভাঙা হলো। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো ভূতের গলি কাঁপিয়ে, হয়তো গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বা কিছু বিকট শব্দ করে ফেটে যায় কাজটি করার সময়। বাড়ির সামনে গাড়ি যেমন থাকবে ভেবেছি, পরবর্তী ৩-৪ দিনে তা করা ফেলা হলো। এভাবেই সাত মাস গাড়িটা পড়ে থাকা অবস্থায় ব্যবহৃত হয়েছে কাঁটা সেটের প্রপস হিসেবে, ব্যাপারীর বাড়ির সামনে। তখন এরকম মনে হওয়ার সুযোগ নেই যে, ইঞ্জিন স্টার্ট করে চালিয়ে আনা গাড়ি ভেঙে সেটের প্রপস হিসেবে ব্যবহার করার সাতমাস পর যখন ফেরত দেওয়া হবে, তখন কী পরিস্থিতি হবে? আমি সুমনের কাছে কী বলব? তখন শুধু মনে হওয়া, যেভাবে ভাবছি, সেভাবে দরকার। তাতে যা হবার হবে, সেটা পরে দেখা যাবে। তাছাড়া সুমনের গাড়ি তো!

‘আমাকে চিনতে চাচ্চিস? ওকে। চেনাবনে। আগে ওদের শুটিংটা শেষ হোক।’ আমি হাঁটা শুরু করলাম, অমনি একজন সিকিউরিটি আমার সামনে এসে কাচুমাচু করে বলল, ‘স্যার, চিনতে পারিনি। মাফ করে দেন স্যার।’

বেশ আগে একবার এক টেলিভিশন ফিকশনে একটা ক্যারেক্টার করার জন্য আমাকে ফোন করেছিল সুমন। কিন্তু অভিনয়ে আমি একেবারে সাইনেসে আক্রান্ত হয়ে পড়ি, সে কথা বলেছি সুমনকে। ডিরেক্টর অ্যাকশান বলার পরে নির্ধারিত সংলাপ ও অভিব্যক্তিসহ কো-আর্টিস্টের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার বদলে আমার কেবলই মনে হতে থাকে, আমার হচ্ছে না। হচ্ছে না হচ্ছে না ভাবটা মনে এসে দানা বাঁধে মুহূর্তেই। তখন সেই নির্ধারিত কন্ডিশনে থাকা তো আমার সম্ভব হয় না, যা ডিরেক্টর চেয়েছিলেন। এর একটাই প্রমাণ আছে, সেটা জনাব মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে ঘটেছিল কক্সবাজার হোটেল সি-গালের নিজস্ব বিচে, যেখানে আমার কো-আর্টিস্ট ছিলেন জনাব হুমায়ুন ফরীদি। আর সরয়ার ছিল ডিরেক্টর। সেই থেকে হাতেনাতে প্রমাণিত, আমার দ্বারা অভিনয় করা সম্ভব নয়। অভিনয়ে আমার কখনো তেমন আগ্রহও আসেনি। কিন্তু ছবি নির্মাণে গেলে অভিনয় করিয়ে নিতে হয়ে, সে আমি পারি, সেই পারাতে আমার ভাল্লাগে। তাই সুমনকে কোনোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ব্যাপারটা আমি পারিই না। জানি না, সুমন আমার অবস্থা কতদূর অনুধাবন করতে পেরেছে! নিশ্চয়ই পেরেছে। সুমন তো চারুকলার ছাত্র, একদিন পত্রিকায় প্রকাশিত আমার একটি কবিতা নিয়ে কথা বলছিল। রঙমিস্ত্রী ফিল্ম ফেস্টিভাল করেছি আমরা চারুকলায়, তখন কিছু কথা হয়েছে। আরেকটা মজার ঘটনা মনে এলো। একদিন, অনেক আগের একদিন, আমি উদ্যানে বসে আড্ডা দিচ্ছি। দেখলাম, একটু দূরেই এক শুটিং ইউনিট দাঁড়ানো। আর পার্কের ইউনিফর্মড কয়েকজন সিকিউরিটির লোক দাঁড়ানো শুটিং ইউনিটের লোকেরদের মধ্যে। একটা হিচিং হচ্ছে, বুঝতে পারলাম। শুটিং চলাকালীন ডিরেক্টর একধরনের ক্ষমতাবান কিন্তু বিবাহের আসরের মেয়ের বাপের দশায় পড়ে। অর্থাৎ তার অনেক ক্ষমতা কিন্তু সবাই সহযোগিতা করলেই সে ক্ষমতাবান। দেখলাম, হিল্লোল, নওশীনসহ সুমন সিকিউরিটির লোকেদের কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে। জানি তো, সিকিউরিটির লোকেরা বলবে, ‘অনুমতি ছাড়া শুটিং করা যাইব না।’ কিন্তু পূর্ত মন্ত্রণালয়ে সেই একটা দৃশ্য শুট করতে অনুমতি আনতে যাওয়া বা পাওয়া সেও এক মহাফ্যাকড়া। আমি আড্ডা থেকে উঠলাম। শুটিং ইউনিট বা হিচিং পয়েন্টে পৌঁছালাম। কোনো রকম অবকাশ না দিয়ে সিকিউরিটির লোকেদের উপর আক্রমণাত্মক ভাষা ও গালিগালাজ শুরু করলাম—’এই, তোমাদের কার কবে চাকরি হইছে? পার্মানেন্ট হইছে? হ্যাঁ? এদের কাজে ডিস্টার্ব করতেছ? তোমাদের সাহস তো বেড়ে গেছে। দাঁড়াও, দশ মিনিটের মধ্যে সাহস ভেঙে দিচ্ছি।’ পুরো মাস্তানি করলাম। সিকিউরিটির লোকেরা একদমই ভড়কে গেছে। বুঝতে চেষ্টা করছে, আমি কে? সেটা দেখে আমার বচন-আক্রমণের ডেনসিটি বাড়ায়ে দিলাম। কাজ হলো। সিকিউরিটির লোকেরা একটু থমকে গেল, থথমত খেয়ে গেল। বুঝতে চেষ্টা করছিল, আমি পূর্ত মন্ত্রণালয়েরই কেউ কি না! নাকি কড়া সাংবাদিক? আর আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম। বললাম, ‘পার্কে ডিউটি করবা ভালো করে। সব কিছু দেখে রাখবা। একটু দূরে দাঁড়ায়ে খেয়াল রাখবা, এদের শুটিংয়ে কেউ যাতে ডিস্টার্ব না করতে পারে। ঠিক আছে?’


ppp 15 narkel kora swpna

স্বপ্নারানী দাস তার স্বামী সুবোধচন্দ্র দাসকে বলল, ‘নাড়ুর বৈয়ম খালি…


মাস্তানি প্রচণ্ড কাজে লাগল। শাহবাগ-চারুকলা-টিএসসি বা উদ্যান অঞ্চলে আছি যত বছর, তত বছর তো আমি আমার বাড়িতেও থাকিনি। তাই মাস্তানি নয়, এটা নেটিভিটির এখতিয়ার। তাছাড়া সিকিউরিটির লোকেরা কিছু টাকা নেবে বলেই তো ওই অনুমতিপত্র চাওয়া, তা তো জানি। তাই মাস্তানি করলাম। সিকিউরিটির লোকেরা সরে গেল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাতে লাগল, আমার ক্ষমতার উৎস-ভাবনা তখন ওদের মাথায়। আর আমি সুমনদেরকে চেনা না-চেনার ভাব করে বললাম, ‘এই, তোমরা নির্বিঘ্নে শুটিং চালায়ে যাও। আমি ওই পাতা-পোড়ানো ইউনিটে আছি গাছতলায়।’ বলেই, সেই স্পট থেকে সরে যাওয়া সিকিউরিটির লোকেদের একদম কাছে চলে গেলাম, বললাম, ‘আমাকে চিনতে চাচ্চিস? ওকে। চেনাবনে। আগে ওদের শুটিংটা শেষ হোক।’ আমি হাঁটা শুরু করলাম, অমনি একজন সিকিউরিটি আমার সামনে এসে কাচুমাচু করে বলল, ‘স্যার, চিনতে পারিনি। মাফ করে দেন স্যার।’ তুইমুই বলার একটা নগদ রেজাল্ট পেলাম।

বললাম, ‘এই আমি স্যার না ষাঁড় এটা তোকে বলল কে? আমি তোর ভাই। তুইও আমার ভাই। ওই যে শুটিং করতে আসছে, ওরাও তোর ভাই। বুঝলি?

‘জি স্যার।’

‘আবার ষাঁড়? বল, ভাই।’

সিকিউরিটির লোকটি দ্রুত ভাই বলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করল। সেই ব্যাপারটি আমার মনে পড়ে গেল নারিন্দায় সুমনের গাড়িটি আনার পর। দীপন’দা বললেন, ‘দ্যাখো তো, গাড়িটা ঠিকঠাক নষ্ট হইছে কি না তুমি যেরকম চাচ্ছিলে!’

‘হুম, হয়েছে।’

সুমন-শিবু-শোয়েব-সৌরভদের গানের দল মেঘদল। সুমনের ছবি ‘হাওয়া’ কাঁপিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক বাংলা ছবির ব্যবসায়িক রেকর্ড। কাঁটাতে বড়ো চরিত্র করেছে অনিমেষ। সম্ভবত অনিমেষকে নিয়ে টেলিভিশন ফিকশনে বড়ো দুইটা চরিত্র অনেক আগেই করেছে সুমন। আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ সুমনের কাছে। অন্য কেউ হলে সেই ভাঙা গাড়িটি ফেরত দেওয়ার সময় সম্পর্কের অবনতি হতোই। সুমনের সঙ্গে এ নিয়ে আমার একটি কথাও হয়নি। আমি জানতাম, কথা হবে না। এমন নয় যে, সুমনের সঙ্গে আমার খুব বেশি কোনো আড্ডাও হয়েছে। তবু একটা ব্যাপার থাকে না, যে, এটা আমি করতে পারি বা এটা আমি করতে পারি না। সুমনের একটা গাড়ি এনে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটা ভেঙে ফেলতে পারি? স্বাভাবিক ভাবে পারি না। কিন্তু যখন ছবি বানাচ্ছি, তখন কি আমি স্বাভাবিক? পোয়াতি নারীর ইচ্ছা যদি হয় গাড়ি ভাঙার, আগত নতুন বাচ্চার কথা ভেবে সেই ইচ্ছা পূরণ করা যায়। পূরণ করা উচিত। কাঁটার সেটে ওরকম গাড়ি পড়ে থাকা দরকার ছিল আজিজ ব্যাপ্যারীর চরিত্রের জায়গা থেকেও, তাই গাড়ি এনে ভাঙা হয়েছে। ভেঙেছে কাঁটার আর্ট ডিরেক্টর দীপন’দার নেতৃত্বে কয়েকজন। এমন না যে, ওই গাড়িটা এনে তারপর ভেঙে ফেলে আমি পার্সোনালি লাভবান হয়েছি! যা করা হয়েছে, কাঁটা ছবির জন্য করা হয়ছে—এটা বুঝবার মতো অভিজ্ঞান সুমনের আছে। এ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে হবে কি হবে না, সেই প্রজ্ঞা সুমনের আছে। তাই গাড়ি ভাঙা নিয়ে একটি বাক্যও খরচ হয়নি আমাদের। তাছাড়া কাঁটাকে ছবি হয়ে উঠতে সুমনেরও তো একটা কন্ট্রিবিউশন লাগবে, লাগবে না? ওরা বিজ্ঞাপন বানায়, টাকা কামাই করে। আমি তো তা করি না। আমি কবিতা লিখি। কবিতা পড়ে কেউ টাকা দেয়? একজন কাউকে এই সমাজ কবিতা লিখতে অনুমোদন করা মানেই তো তারা কবিতা পড়বে কিন্তু কবিকে কোনো টাকা পয়সা দেবে না, সেটা নির্ধারণ করে ফেলল। এরকমই তো, নাকি? সুমন-শিবু-সৌরভ-শোয়েব বা মেঘদল-এর জন্য আমার অন্তরে যে ভালোবাসা আছে, শেয়ারবাজারে সেই ভালোবাসা বিক্রি করতে পারব কোনো দিন? পারলে কত ডলার পাব? আমার নিজেরই তো কাজের জন্য সার্বক্ষণিক একটা গাড়ি দরকার। উবার-পাঠাও সবসময় মেলে না। আমার লেখা পাঁচশ কবিতা যদি আমি বিক্রি করে দিই, ক্রেতা পাব? কিন্তু দরকার। বাণিজ্যমেলায় এত কিছু বিক্রি হয়, কবিতা বিক্রি হয় না। মানে কী? কবিতা বিক্রির জিনিস নয়! যা বিক্রির নয়, তাই করেই একটা জীবন পাড়ি দিয়ে ফেললাম মুক্তবাজার অর্থনীতির পাদদেশে বসে! অপচয় নয় জীবনের? না। অর্থচিন্তা মাথায় নিয়ে কবিতার দিকে হাঁটতে হাঁটতে কোথাও যাওয়া যায় না। একটা শব্দ বা বাক্যের সন্ধানে কেউ হাঁটে না, হাঁটতে পারে না। এভাবে তো কবিতাই আসবে না। কবিতা নিজে না এলে কে তারে আনে, কে আনতে পারে? সম্রাজ্ঞী না? কবি কি সম্রাজ্ঞীর হিডেন লাভার?


ppp 15. 11

আয়েশা ও ঝিনুক, কাঁটার কস্টিউম বিভাগের দুই সহকারী


আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির উঠোনের পাতকুয়ায়াটা ঠিকঠাক করা হলো। বাড়ির সমান বয়সী শতবর্ষী সেই কুয়া। কুয়াটাই কাঁটার অন্যতম প্রধান একটি ক্যারেক্টার হয়তো। কাজেই কুয়ার দিকে দর্শক সতর্ক দৃষ্টি রাখবে, আমরাও কাঁটা নির্মাণপর্বে সেটা মাথায় রেখেছি। কুয়া একটি ম্যাজিক, কাঁটায়। ঘুঘু ও ময়না এনেছে তাইজুল ইসলাম রোমান, কাঁটার সিনেমাটোগ্রাফার। টিয়া রাস্তা থেকে কিনে এনেছে শুভ। বেশ কয়েকটা একই রকম তুলসীগাছ এনেছে রোমান। তুলসীগাছও কাঁটার আরেকটি ক্যারেক্টার।

নারিন্দার ভূতের গলির আজিজ ব্যাপারীর বাড়িতে একদিন এলেন আবদুল আজিজ। তিনি জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের চলিচ্চিত্রের এক অন্যতম প্রযোজনা হাউস জাজ। ছবি প্রযোজনা করে জাজ মিডিয়া, জাজ বাংলাদেশের বড়ো পরিবেশকও বটে। আজিজ ভাই কাঁটার খোঁজখবর নিলেন, দুপুরে কাঁটা টিমের সঙ্গে খেলেন। একটা সুন্দর সময় কাটল আমাদের। পিরিওডিক্যাল ছবি কাঁটার অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে তিনি বিস্মিত হলেন, বললেন, ‘এত কিছু! শেষ করেন, তারপর কথা হবে।’ একদিন কাঁটা ক্যাম্পে এলো মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। নির্মাতা, গায়ক, আর্টিস্ট। উজ্জ্বলের সঙ্গে আমার এমনিতেই একটা বোঝাপড়া আছে। উজ্জ্বল কবিতা লেখে, উপন্যাস লেখে। ওর একটা বইয়ের প্রচ্ছদের নামলিপিতে আমার হাতের লেখা গেছে। সুন্দর কয়েকটি টেলিভিশন ফিকশন বানিয়েছে উজ্জ্বল। একদিন ক্যাম্পে এলেন অনুপম হায়াৎ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট খুঁটিনাটি অনুপম ভাইয়ের চেয়ে ভালো আর কারো জানা আছে বলে আমি জানি না। এমন ভালো মানুষ খুব সহজে দেখা যায় না। কাঁটাতে যে ব্যবহার করা হয়েছে অনেক সিনেমার পোস্টার, সে সব বিষয়ে অনুপম ভাইয়ের সাজেশন আমাদের কাজে লেগেছে।


ppp 15. 7

ভালো গাড়িটা ভেঙে নষ্ট করা হলো কাঁটার প্রয়োজনে, গাড়ির মালিক মেসবাউর রহমান সুমন


কাঁটা ক্যাম্পে আমার মা-বাবাও ঝিনেদা থেকে এসে ঘুরে গেছে। দুই বোন এসেছে। দুই ভাগনি সেটেই তো ছিল কিছু দিন। এক রাতে এলো শিল্পী শাওন আকন্দ। একরাতে এলো কণ্ঠশিল্পী লিমন। গান শোনাল বেশ কয়েকটা। লিমনের কণ্ঠ-গায়নভঙ্গি আমার পছন্দের, অনেক দিনই। এক দিন এলো বন্ধু, কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান। একদিন এলেন কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, কবি তারিক সুজাত ও কবি পিয়াস মজিদ। আমি জানি, সৈয়দ হক জীবিত থাকলে কাঁটায় অভিনয় করাতাম। কথাও হইছিল। হক ভাই বলছিলেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ করব। বেশি বড়ো ক্যারেক্টার দিও না, ধকল তো!’ সত্যি, সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন এমন একজন, যার সঙ্গে আমার কথা হতো কবিতা নিয়ে, কথাসাহিত্য নিয়ে, চিত্রকলা, বাংলা গান, সিনেমা, ভাস্কর্য—টোটাল আর্ট নিয়েই। খুব মিস করি হক ভাইকে। হক ভাইয়ের একটি বিখ্যাত উপন্যাস নিয়ে আমার সিনেমা বানানোর কথা আছে, এ নিয়ে কত যে কথা হয়েছে আমাদের, ভাবি আনোয়ারা সৈয়দ হকও জানেন। তাঁদের গুলাশানের বাসায় বসে আড্ডা হতো আমার, প্রায়ই হতো। হক ভাই বললেন, কাঁটার গল্পটা কী, শোনাও তো!’

সৈয়দ হক ছবি বানিয়েছেন সিক্সটিজে, উর্দু ভাষায়। বাংলা ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন অসংখ্য, ছবির জন্য গান লিখেছেন অগণন। জহির রায়হান ও আলমগীর কবির তাঁর বন্ধু ছিলেন। একদিন কাঁটার গল্পটি শুনতে শুনতে অনুধাবন করার পর চোখ চকচক করে উঠল হক ভাইয়ের। বললেন, ‘খুব ভালো গল্প তো! শোনো, সেই পঞ্চান্ন সালেই কিন্তু আমি “রক্তগোলাপ” লিখেছি। গল্পে ম্যাজিক দিয়েছি।’ তাঁর একটি গল্পের কথা মুখে শোনালেন তখন হক, বললেন, ‘একবার পোড়ো তো! কাটা কাটা শটে ধরা যায় কি না!’

হক সাহেবের মৃত্যু আমাকে ব্যথিত করেছে ভীষণ। আমি সর্বদাই তাঁর শূন্যতা অনুভব করি। যদিও কবিতা পুরোপুরি ছেড়ে যাইনি, তবু আমার সিনেমা করতে যাওয়া নিয়ে অনেকেই বলেন, ‘কবিতা ছেড়ে সিনেমা কেন…’ সৈয়দ শামসুল হক শুধু বলতেন, ‘মাধ্যমটা তো আমার অজানা নয়। করো। তোমার হাতে ছবি ভালো হবে।’

আমি আমার অনেক প্রিয়জন সৈয়দ শামসুল হককে আজীবন উপলব্ধি করতে পারব, সেই সম্পর্ক তাঁর সঙ্গে আমার ছিল। সেই শক্তি তো তাঁর লেখাতেও আছে। কাঁটা নির্মাণপর্বে তাই সৈয়দ হককে আমার মনে পড়েছে, মনে পড়ে। কথায় কথায় হক একদিন বললেন, ‘শহীদ ওর “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা” আমাকে দিয়েছিল পড়তে। ওর মতো গদ্যের হাত বাংলা ভাষায় দেখি না কাউকে।’

‘একদম, আমি সেভাবেই তাঁকে পাই’—বলার পর সৈয়দ হক বললেন, ‘আমাকে পাও কিছু?’

‘পাই। অনেক কিছুতেই পাই। ভুরি ভুরি পাই।’

মৃত্যুর পর সৈয়দ হক কুড়িগ্রামে ফিরে গেছেন। আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে কুড়িগ্রামে যাব যাব করতে করতেই দেশে করোনা এসে গেল, তাই যাওয়া আটকে গেল। হক-পুত্র দ্বিতীয় হকের সঙ্গে আমার কুড়িগ্রাম যাওয়ার পরিকল্পনাও হয়ে আছে। কাঁটা দেখানো হবে কুড়িগ্রামে, তখন কি সৈয়দ হক ছবিটা দেখতে পাবেন? অবশ্য কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারির সন্তান সোহেল তৌফিক কাঁটার একটি বড়ো চরিত্র করেছে। হক ভাই, কুড়িগ্রামকে এড়িয়ে যাইনি কিন্তু আমি। আমার সেই সাধ্য কোনো দিন হবে না—আপনাকে এড়িয়ে যাওয়ার। তবে আপনাকে সামনাসামনি আর না পাওয়ার একটা আফসোস আমার হতেই থাকে, হতেই থাকবে। তখন তাকাব আমি নীলক্ষা আকাশ নীলে, তখন ভাসব আমি ডানামেলা গাঙচিলে। আর এখন, কাঁটা গড়ে তুলছি তিলে তিলে!

যদি তুমি এই ধারাবাহিক ‘জার্নি অব কাঁটা’ পড়তে থাকো, জানবে, তুমিও আমাদের সঙ্গে আছো, পরবর্তী অধ্যায়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সত্য যে, তুমিও কাঁটার সঙ্গেই ছিলে…


আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ১ম পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ২য় পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৩য় পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৪র্থ পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৫ম পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৬ষ্ঠ পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৭ম পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৮ম পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ৯ম পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা ১০ম পর্ব
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা পর্ব ১১
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা পর্ব ১২
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা পর্ব ১৩
আরও পড়ুন : জার্নি অব কাঁটা পর্ব ১৪


কাঁটা প্রোডাকশন ফটোগ্রাফি : হোসেইন আতাহার

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১ ডিসেম্বর, ১৯৭২, ঝিনাইদহ। বেড়ে ওঠা, বসবাস:  ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, খুলনা ও ঢাকা। একাডেমিক (সর্বশেষ) পড়ালেখা: চারুকলা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রন্থ প্রকাশনা: কবিতার বই কয়েকটি, গদ্যের বই কয়েকটি। সম্পাদিত গ্রন্থ: ২টি। ছবি নির্মাণ: ‘ব্ল্যাকআউট’ (২০০৬) আনরিলিজড। ‘রাজপুত্তুর’ (২০১৪), ‘কাঁটা’ (২০২৩) । পেশা: আর্ট-কালচার চষে বেড়ানো।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।