শুক্রবার, অক্টোবর ২২

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০২

4

Shakoor Majid 3লেস ওয়ালেসার সাথে এক ঘন্টা
শাকুর মজিদ


সকাল ১০টা বাজতে তখনো ২-৩ মিনিট বাকি। আমরা লিফটের কাছে এসে ছয়জন একত্র হবার জন্য কিছু সময় নিচ্ছি, এমন সময়, আটষট্টি বছর বয়সের এক যুবক, তাঁর দু’পাশে দুই তরুণ নিয়ে হুড়মুড় করে লিফটে উঠে গেলেন। লিফটটি তাঁর জন্য দাঁড় করিয়েই রাখা ছিল। লোকজনের ত্বরিত ব্যস্ততা দেখে বুঝে ওঠার বাকি থাকল না যে পোল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী নেতা লেস ওয়ালেসাই এইমাত্র আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেলেন।

আমরা পরের লিফটে তেতলায় উঠে যাই। এই একঘন্টা সময় আমাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া বলেই অফিসের ৩/৪জন কর্মকর্তা ব্যস্ত হয়ে গেলেন আমাদের নিয়ে।

ওয়ালেসা সাহেব সবে এসেছেন তাঁর অফিসে, সেক্রেটারির রুমেই দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমাদের নিয়ে এক সাথেই ঢুকলেন তাঁর কামরায়।

খুব সাধারণ মানের একটা কাঠের টেবিল, চেয়ারের একপাশে ফুলদানিতে তাজা ফুল, আর দূরের দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর একটা ছবি। এই হলো প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের বর্তমান অফিস।

ওয়ালেসা দ্রুত টেবিল গোছান। টেবিলের ওপর নতুন-আসা কয়েকটা চিঠির খাম ছিঁড়ে ফেলেন। দ্রুত দেখে সবগুলো রাখেন একপাশে, কম্পিউটার অন করেন, লগইন করেন তাঁর ইমেইল একাউন্টে। আমাদের পঞ্চপর্যটকের দুই ভিডিও আর পাঁচ স্টিল ক্যামেরা বন্দি করতে থাকে তাঁর এই আয়োজন। শুরু হয়ে যায় আমাদের আলাপচারিতা।

লেস ওয়ালেসা--শ্রী

লেস ওয়ালেসার সাথে পঞ্চপর্যটক ও ওমর ফারুক

লেস ওয়ালেসার কাছে কী জানতে চাইব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। এই লোকটাকে নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজ উইকসহ নামি-দামি পত্রিকাগুলো একাধিকবার কভার স্টোরি করেছে, পুরো বিশ্বের মধ্যে বছরের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে, নোবেল পুরস্কারসহ শতাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার যাঁর ঝুলিতে, হাইস্কুলের গণ্ডি না পেরিয়েও ৩০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় যাকে অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে, তাঁর সাথে আসলে কোন বিষয় নিয়ে কথা বলা শুরু হবে, এটা নিয়ে মুশকিলে পড়ে যাই।

একটু ধরিয়ে দিতেই নিজে থেকে বলে উঠলেন ওয়ালেসা— ‘আমরা গরিব ঘরের সন্তান। আমার বাবা ছিলেন কাঠ-মিস্ত্রী। ৬ ভাই ১ বোন রেখে তিনি যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র ২ বছর। বাবা মারা যাবার সময় আমার চাচাকে বলে গিয়েছিলেন আমাদের দেখে রাখার জন্য। চাচা দেখে রেখেছেন। আমাদের মাকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু তারপরও স্বচ্ছলতা ছিল না আমাদের সংসারে। রুজি করার দরকার ছিল, আমাকে পাঠানো হলো ইলেক্ট্রিক মেকানিকের কাজ শিখতে। শিখেও ছিলাম। কিন্তু এই গিদাইনস্ক শিপইয়ার্ডে এসেই আমার জীবনটা কেমন যেন পাল্টে গেল।’

কথায় পেয়ে যায় ওয়ালেসাকে। আমরা সামান্য সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার পরপর নিজেই অনর্গল কথা বলেন। এই কথার রেশটুকু ধরতে আমাদের সময় লাগে। পোলিশ থেকে বাংলা হয়ে আসা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়।

ওয়ালেসা বলেন, ‘খুব ছোটোবেলা থেকেই আমি খ্যাপা টাইপের ছিলাম। আমার কিছু পছন্দ না হলে, কোনো কিছু অযৌক্তিক মনে হলে আমি প্রতিবাদ করতাম। আমি গোঁড়া ক্যাথলিক, কিন্তু দশ বছর বয়সে আমাদের পাড়ার গির্জার বিশপের সাথে আমার লেগে যায়। আমার মনে হয়েছিল, ধর্মের একটা বিষয় তিনি ঠিকমতো উপস্থাপন করছেন না। এক মাস আমাদের মধ্যে এ নিয়ে বচসা চলে। পরে বিশপ আমার কাছে এসে তাঁর নিজের ভুল স্বীকার করেন। আমাকে বলেন, জীবনে তুই অনেক বড়ো হবি, না হলে জেল খাটবি। এই বিশপের দুটো কথাই ফলেছিল। জেল খেটেছি কয়েকবার, বড়ো তো হয়েওছি!’

লেস ওয়ালেসা তাঁর সলিডারিটি দলটি নিয়ে প্রথম যে কাজ করেছিলেন, তা ছিল সে সময়কার কম্যুনিজমের বিরুদ্ধচারিতা। কেন তবে এই লোকটি সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল?

পোলিশরা সবসময় স্বাধীন জাতি। যেখানে দুইজন পোলিশ থাকবে সেখানে তিনটি রাজনৈতিক দল থাকবে। আর আমাদের দিয়েছে একটা মাত্র দল। অন্য কথা বলার কোনো স্বাধীনতা নাই। সে জন্যই আমরা এই সিস্টেমটাকে মানতে পারি না। এখনও পর্যন্ত আমি এ ব্যবস্থাটাকে সহ্য করতে পারি না।

কমিউনিজমের কথা আসতেই ওয়ালেসা বলেন ‘আমি আসলে জন্ম থেকেই এই সব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলাম। পোলিশরা কখনই এই ব্যবস্থা পছন্দ করেনি। তাদের ওপরে এই ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পোলিশরা সবসময় স্বাধীন জাতি। যেখানে দুইজন পোলিশ থাকবে সেখানে তিনটি রাজনৈতিক দল থাকবে। আর আমাদের দিয়েছে একটা মাত্র দল। অন্য কথা বলার কোনো স্বাধীনতা নাই। সে জন্যই আমরা এই সিস্টেমটাকে মানতে পারি না। এখনও পর্যন্ত আমি এ ব্যবস্থাটাকে সহ্য করতে পারি না। কিন্তু আমার কাজ এবং আমার চরিত্র লোকজন পছন্দ করেছে এবং আমার চিন্তা চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে জনগণ। ৬০-৭০ সালের দিকে সবাই আমাকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে যেহেতু আমি সাহসী ছিলাম। যতবারই আমরা ডাইরেক্টরের রুমে যেতাম কোনো দাবি-দাওয়া নিয়ে, ততবারই সবাই আমাকে সামনে ঠেলে দিত। কিন্তু যখনই ডাইরেক্টরের রুমে ঢুকে পেছনে থাকাতাম, তখন দেখতাম আমার পেছনে কেউ আর নেই। সুতরাং নেতা আমাকে হতেই হয়েছিল।

লেস ওয়ালেসাকে নেতা হওয়ার জন্য বেশি কিছু করতে হয়নি। তাঁর প্রতিবাদী চেতনাই তাঁকে ওখানে নিয়ে গিয়েছে। ডক-শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মনে করেছেন যে, সমাজতন্ত্র আসলে কোনো বাস্তবিক সমাধান নয়। যে কতগুলো কারণে একসময় সমাজতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, সেটা আর এখন নেই।

যখন কম্যুনিজম শুরু হয় তখন তাঁর একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছিল। সে সময় কমিউনিজমের দরকার ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের আগে কমিউনিস্টরা বলেছিল, সব সুষ্ঠুভাবে করবে, ন্যায্য ভাবে করবে। মানুষ অকপটেই তাদের গ্রহণ করেছে। যখন কমিউনিস্টদের হাতে ক্ষমতা চলে এলো তখন তাঁরা তাদের কথা রাখেনি। খারাপভাবে দেশ পরিচালনা করেছে। আমি সামাজতন্ত্রের বিপক্ষে নই, মনে রাখতে হবে আমি সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে।কমিউনিস্টদের নীতিটা খারাপ ছিল না। খারাপ ছিল তারা, যাদের হাতে ক্ষমতাটা গিয়েছিল।

ওয়ালেসা বলেন, যখন কম্যুনিজম শুরু হয় তখন তাঁর একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছিল। সে সময় কমিউনিজমের দরকার ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের আগে কমিউনিস্টরা বলেছিল, সব সুষ্ঠুভাবে করবে, ন্যায্য ভাবে করবে। মানুষ অকপটেই তাদের গ্রহণ করেছে। যখন কমিউনিস্টদের হাতে ক্ষমতা চলে এলো তখন তাঁরা তাদের কথা রাখেনি। খারাপভাবে দেশ পরিচালনা করেছে। আমি সামাজতন্ত্রের বিপক্ষে নই, মনে রাখতে হবে আমি সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে। কমিউনিস্টদের নীতিটা খারাপ ছিল না। খারাপ ছিল তারা, যাদের হাতে ক্ষমতাটা গিয়েছিল। সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব না। কিন্তু এই ব্যবস্থাটা কোনো দেশেই পুরোপুরি পরীক্ষা দিতে পারেনি। আমাকে একটা দেশ দেখাও যেখানে এটি উত্তীর্ণ। ক্যাপিটালিজমও ভালো না, কিন্তু কিছু কিছু দেশে ভালো রেজাল্ট দিতে পেরেছে। এদিক দিয়ে ক্যাপিটালিজম এগিয়ে আছে।

লেস ওয়ালেসাকে বলি— চীন তো সমাজতান্ত্রিক দেশ। এটা তো বেশ ভালো চলছে।

ওয়ালেসা বলেন, আমাদের সমাজতন্ত্রটা দুইটা ভাগে বিভক্ত ছিল। পার্টি পরিচালনা করার মনোপলি এবং কমন ইকোনোমি। চায়নাতে ইকোনোমিটা ছড়িয়ে দিচ্ছে— কিছু সরকারি খাতে, কিছু বেসরকারিখাতে। কিন্তু মনোপলিটা রাখছে। চীনের সমাজতন্ত্র আসলে পাঁচ নাম্বার কমিউনিজম। এটা পুরোপুরি আলাদা।

ওয়ালেসা বলেন, সময়ের সাথে সাথে বদল হয় পরিপ্রেক্ষিতও। এর সাথে সব জাতিকেই পা মেলাতে হবে। যদি তাঁরা আপডেটেড না থাকে, তাহলে বিপর্যয় অনিবার্য। শুধু তাই নয় আধুনিক কারিগরি প্রযুক্তির সাথেও আমাদের একাত্ম হতে হবে।

পৃথিবীতে এখনো প্রধান দুটো দল। একদল ভুখা, যারা খেতে পায় না। আরেক দলের অফুরন্ত সম্পদ, কিন্তু সেটা তাঁরা ভুখাদের খেতে দেবে না। ভুখারা এক সময় বলবে, যদি না খেয়েই আমাদের মরতে হয়, তাহলে যুদ্ধ করেই না হয় মরি, তাতে জিতে গেলে অনেক কিছু বদলানো সম্ভব। ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে সংঘাত। এজন্য দরকার এই দুই পক্ষের এক সাথে বসা।

ওয়ালেসা বলেন, পৃথিবীতে এখনো প্রধান দুটো দল। একদল ভুখা, যারা খেতে পায় না। আরেক দলের অফুরন্ত সম্পদ, কিন্তু সেটা তাঁরা ভুখাদের খেতে দেবে না। ভুখারা এক সময় বলবে, যদি না খেয়েই আমাদের মরতে হয়, তাহলে যুদ্ধ করেই না হয় মরি, তাতে জিতে গেলে অনেক কিছু বদলানো সম্ভব। ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে সংঘাত। এজন্য দরকার এই দুই পক্ষের এক সাথে বসা। আর সিস্টেমটাকে না পাল্টে ৫ বছর পরপর দল পাল্টালাম দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, এটা কোনো সমাধানই নয়।

—মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
—আজকে যেটা লিবিয়াতে বা অন্যান্য আরব দেশগুলোতে হচ্ছে, সেটা আমি আরও বিশ বছর আগেই বলেছিলাম। শাসকদের বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, না হলে সংগ্রাম হবে। আর মডার্ন টেকনোলজি সাহায্য করবে লোকজনকে সংগ্রামে একত্র করতে। অনেক বেশি রক্ত ঝরতে পারে কিন্তু এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। এই পরিবর্তনটা আমরা কী শান্তিপূর্ণভাবে করব নাকি রক্ত ঝরিয়ে করব? পৃথিবীটা বদলাতে হবে, পৃথিবী এখন ভালো নেই। এরকম ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ ‘ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড’ থাকা উচিৎ না। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সবাইকে পাশাপাশি থাকতে হবে। বর্তমানে আমরা বহুধাবিভক্ত। আমাদের এখন একটা সরলরেখায় আসতে হবে। নতুন টেকনোলজি আমাদের বাধ্য করবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে।

—ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে আর পড়েননি কেন?
—কারণ আমাদের পরিবারে অভাব ছিল, আমাকে কাজ করতে হতো। আমার সামর্থ ছিল না। কিন্তু আমি যদি পড়াশোনা করতাম তাহলে হয়তো আমি ডকইয়ার্ডের ডাইরেক্টরই হতাম এবং আমি নিজেই আমার প্রতিপক্ষ হয়ে যেতাম। (এ কথা বলেই হেসে ওঠেন ওয়ালেসা)।
—শেষ কবে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেছেন?
—গতকালও আমি আমার বৌ’র ইলেকট্রিকের কাজ করে দিয়েছি। তবে চাকরি হিসেবে ১৯৯৮-এ আমি শেষ ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেছি। প্রেসিডেন্সি শেষ হওয়ার পরে আমি ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমাকে নেয়নি। পরে আমাকে ডাইরেক্টর হিসেবে নিতে চেয়েছে। আমার ওয়ার্কাররা রাজি হয়নি। তারপরে আমাকে রিটায়ারমেন্টে দিয়েছে। খুব শখ ছিল শ্রমিক হিসেবে আবারও কাজ করার, করতে পারিনি। সারাক্ষণ শুধু জার্নালিস্ট, ফট্রোগ্রাফাররা আসত। তাঁরা আমাদের কাজের ডিস্টার্ব করত। আমরা কাজ করতে পারতাম না। জার্নালিস্টদের যখন ঢুকতে দিত না তখন মারামারি হতো। যখন ঢুকতে দিত তখন কাজ হতো না। পরে দেশের আইন অনুযায়ী আমার এখানে যে স্ট্যাটাস পাওনা তাই দেওয়া হয়েছে। এখন একজন সংসদ সদস্য যে সুযোগ সুবিধা পায়, আমিও সেই একই সুবিধা উপভোগ করি। আমার অনেক বন্ধু আছে, কিন্তু অনেক শত্রুও আছে। পৃথিবীতে এটাই নিয়ম।

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০২ ।। শ্রী

আড্ডা চলছে লেস অয়ালেসার সাথে, দোভাষির ভূমিকায় ওমর ফারুক

শান্তির জন্য ওয়ালেসা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে। কিন্তু এ পুরস্কারটি গ্রহণের জন্য তিনি নরওয়ে যাননি। পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। জিজ্ঞেস করি, কেন? ওয়ালেসা বলেন, আমার ভয় ছিল, আমি একবার দেশ ছাড়া হলে কম্যুনিস্ট সরকার আমাকে আবার দেশে ফিরতে দেবে না। এ কারণে বুদ্ধি করে স্ত্রীকে পাঠিয়েছিলাম।
—পোল্যান্ড এখন যেভাবে চলছে আপনার স্বপ্ন কি তাই ছিল?
—এটা কেউ যদি আগে আমাকে বলত পোল্যান্ড একদিন এইরকম অবস্থায় আসবে আমিই বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু বর্তমানে আমি সবচেয়ে সুখী মানুষ। যখন দেখি আরও ভালো কিছু করার দরকার ছিল তখন আমি শান্তি পাই না। এখন আমি দেখি আরও অনেককিছু বাকি আছে।
—আপনার আত্মবিশ্বাসের প্রধান শক্তিটা কী?
—আমি জন্মের পর থেকেই বিদ্রোহী। আমার জীবনে আমি অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছি। আমর সব চিন্তা-চেতনা কাজ করা শুরু করেছে। কারণ আমার মাথার কম্পিউটার কাজ করে। আমাকে কেউ কিছু দেয়নি আমি নিজেই সব অর্জন করেছি।
—বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে?
—তোমাদের দেশের সমস্যাও আমি অল্পকিছু জানি। অন্যান্য দেশের সমস্যাও আমি কিছু জানি। আমি ওইসব লোকদের চিনি, যাদের অনেক আছে। কিন্তু তাঁরা এটা অন্যদের ভাগ দিতে চায় না। আমি নিজেও গরিব পরিবারের, সে কারণে আমি গরিবদের সমস্যাটা ভালো বুঝি। গরিবদের কাছে কোনো কথা নিয়ে গেলে ওরা আমার কথা শোনে এবং বোঝে। মানুষের চরিত্র বিচিত্র। আজ একজনকে নির্বাচিত করছে তো কাল আরেকজনকে। মানুষকে যদি একটা আঙুল দেন তাহলে সে পুরো হাত নিয়ে নিতে চাইবে। মানুষ এমনই। আমি চাচ্ছি কিছু করতে এবং আমি অপেক্ষা করছি কবে এটা করতে পারব। আমি প্রথমে মিশরের লোকদের বলেছিলাম তাদের কী করতে হবে। কিন্তু দ্বিতীয়বার তাঁরা আমার কাছে আর আসেনি। মিশরে বিপ্লব হবে। আপাতত স্বল্প সময়ের জন্য শান্ত আছে, কিন্তু বিপ্লব হবেই। মোবারককে (হোসনি  মোবারক) সরিয়ে দিয়েছে কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। এটা সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এমন কোনো নেতা নেই যে বলবে আর সবাই তাঁর কথা শুনবে। এজন্য আমি বলব, জনগণের সাথে মিথ্যা বলা যাবে না। আমি তোমাদের দেশ-সহ সব দেশে যেতে পারি কিন্তু সাথে সাথে কিছু হবে না।

—বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রনায়কের সাথে আপনার কখনও দেখা হয়েছে ?
—এখনও হয়নি, তবে আশা করছি আমি আমন্ত্রিত হবো এবং তোমাদের ওখানে যাব। আমি মনে করি, তোমাদের ওখানেও কিছু কাজ করার দরকার, যাতে কোনো রকম ক্ষতি না-করে পরিবর্তন করা যায়। যত আগে এবং বুদ্ধি রেখে করা যাবে ততই ভালো।

—বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রনায়কের সাথে আপনার কখনও দেখা হয়েছে ?
—এখনও হয়নি, তবে আশা করছি আমি আমন্ত্রিত হবো এবং তোমাদের ওখানে যাব। আমি মনে করি, তোমাদের ওখানেও কিছু কাজ করার দরকার, যাতে কোনো রকম ক্ষতি না-করে পরিবর্তন করা যায়। যত আগে এবং বুদ্ধি রেখে করা যাবে ততই ভালো।
—রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কোনো আমন্ত্রণ পেলে আপনি বাংলাদেশে যাবেন ?
—অবশ্যই যাব। কিন্তু আমন্ত্রণটা হতে হবে রাষ্ট্রপ্রধানের মাধ্যমে। আমি ওদেরকে বলবো না যে সংগ্রাম করো না, কিন্তু বলব, কীভাবে কাজটা করতে হবে। আমরা সব সময় ট্রেড ইউনিয়নকে বলি যে, সবচেয়ে বেশি নেওয়ার চেষ্টা করো কিন্তু আচরণ করো ব্যাকটেরিয়ার মতো।

এক সময় ওয়ালেসা ঘড়ির তিকে তাকালেন। আমরা বুঝে নিলাম, আলাপ করার জন্য এক ঘন্টা সময় পার হয়ে গেছে। এবার আমাদের উঠে পড়ার পালা। ওয়ালেসার একজন সহকারী আমাদের কাছে ৬টা বই নিয়ে এসেছেন। পোল্যান্ডের পতাকার মতো রক্তিম লাল মলাটের ওপর লেখা ‘GDANSK, According to Lech Walesa.’

ওয়ালেসাকে নিয়েও শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে কম কাজ হয়নি। Voker schiondorf তাঁর জীবন নিয়ে সিনেমা বানিয়েছিলেন Strike. ‘Man of Iron’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র বানানো হয়েছিল। ১৮৮১ সালে এ ছবিটি ‘গোল্ডেন পাম’ পুরস্কার জেতে। মজার কথা, এ ছবিতে তাঁর নিজের ভূমিকায় লেস ওয়ালেসা অভিনয়ও করেছিলেন। অভিনেতা ওয়ালেসা এটা ছাড়াও প্রায় ২০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাকে নিয়ে অসংখ্য গান, কবিতা লেখা হয়েছে বিশ্বময়। ১২টি বই আছে তাঁর জীবনকর্ম নিয়ে। এই GDNSK, According to Lech Walesa ছাড়াও তিনিটি বই লিখেছেন তিনি। বইগুলো হলো The road of hope (1987), The road to freedom(1991) এবং All that I do, I do for Poland (1995). এ বইগুলো সবই পোলিশ ভাষায়, ইংরেজিতে অনুবাদ করা।

পোল্যান্ডের সলিডারিটি ট্রেড ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান পোলিশদেরকে একটি নতুন সরকার কাঠামো উপহার দিয়েছেন। নিজে সম্মান আর স্বীকৃতি ছাড়া বৈষয়িক কিছুই পাননি। এখনকার তাঁর সমস্ত চিন্তা চেতনা তাঁর নামে তৈরি হওয়া একটা ফাউন্ডেশনকে নিয়ে। তিনি মনে করেন, এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই তাঁর অসমাপ্ত সকল কাজ তাঁর অনুসারী পরবর্তী প্রজন্ম চালিয়ে যাবে। দ্বিতীয়বার তিনি নির্বাচিত হতে পারেননি, তাতে কোনো খেদ নই, যিনি হয়েছেন তিনিও তাঁর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সুতরাং কোনো অভিযোগ নেই তাঁর।

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০২ ।। শ্রী

গিদাইন্সকের প্রাচীন শহরতলি

এবার সত্যি সত্যিই উঠে যাবার পালা। রাজকীয় এই ভবনটির তেতলার সিঁড়ি মাড়িয়ে আমরা ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামি। গিদাইনস্ক শহরকে বিদায় জানাতে হাতে আছে দু’ঘন্টা সময়। এর মধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হবে নতুন শহরের দিকে। পোল্যান্ড সফরের সবচেয়ে বড়ো অধ্যায়টা আমাদের প্রথম দিনেই পাঠ হয়ে গেল। এখন আছে ইতিহাস খোঁজার পালা। বিকেলেই আমরা এই শহর ছাড়ব।


ধারাবাহিকটির অন্যান্য পর্ব পড়ুন :

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০১

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২২ নভেম্বর, ১৯৬৫। তিনি একজন বাংলাদেশি স্থপতি, নাট্যকার, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক। ভ্রমণকাহিনি ও জীবনী সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।