শনিবার, অক্টোবর ৮

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৬

0

Shakoor Majid_Pro Picক্যাতাভিৎসের এক সকাল
শাকুর মজিদ


এমন নীরব নিথর রেল স্টেশন আমার দেখা হয়নি কোথাও।

না দেশে, না বিদেশে।

রাত সোয়া চারটায় চেক রাজধানী প্রাগ থেকে ওয়ারশোগামী যে ট্রেনটি এই ক্যাটউইস রেল স্টেশনে দু’মিনিটের জন্য থামবে, সেখানে আমাদেরও খুব তড়িঘড়ি করে নেমে যাবার কথা। নামতে খুব সমস্যা হবার কথাও নয়, কারণ ৩ দিন আগে ওয়ারশো থেকে ওমর ভাইয়ের গাড়িটি আমাদের বড়ো সুটকেসগুলো নিয়ে এসেছে তার শহরে। তিন রাতের জন্য যে বিরতিটুকু আমরা নিয়েছিলাম, তার দু’রাত কাটবে রেলে, এক রাত প্রাগের হোটেলে। দু’দিনের প্রাগ দেখা শেষ করে আমরা আবার ফেরত এসেছি পোলান্ডে। এবং নামতে হচ্ছে ছোট্ট এই মফস্বল শহরতলি KATOWICE-এ (পোলিশ উচ্চারণে এ শহরের নাম ক্যাতাভিৎসে)।

তিন রাতের জন্য যে বিরতিটুকু আমরা নিয়েছিলাম, তার দু’রাত কাটবে রেলে, এক রাত প্রাগের হোটেলে। দু’দিনের প্রাগ দেখা শেষ করে আমরা আবার ফেরত এসেছি পোলান্ডে। এবং নামতে হচ্ছে ছোট্ট এই মফস্বল শহরতলি KATOWICE-এ (পোলিশ উচ্চারণে এ শহরের নাম ক্যাতাভিৎসে)।

ক্যাটাউইচের এই ছোট্ট রেল স্টেশনে যখন শেষ রাতের দিকে এ ট্রেনটি এসে থামল, তখন তাকে স্বাগত জানানোর জন্য সবুজ পতাকা হাতের রেলকর্মী ছাড়া কিছুই দেখা গেল না। এ স্টেশনে আর কোনো যাত্রীর ওঠা-নামা নাই।

ট্রেনটি থামতেই ধীরে ধীরে একটি কালো ছায়ামূর্তিকে আমাদের দিকে হেঁটে আসতে দেখা যায়। শেষরাতের দিকে তাপমাত্রা ২/৩ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। এমনিতে আমরা গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষ। সামান্য শীতে হাঁড় কাঁপা শুরু হয়ে যায়। আমরা ২/৩ স্তরের গরম কাপড়ে পুরো শরীর আটকে রেখে কাঁপতে কাঁপতে যখন প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ালাম সেই ছায়ামূর্তিটি আমাদের কাছে মূর্ত হয়ে যায়। পকেটে হাত দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসেন ওমর ভাই। এই শীতের কুয়াশাভরা নির্জন রেল স্টেশনটিতে ভোর রাতে তাকে দেখে মায়া লেগে যায়। কিন্তু তার মুখে ভয়ানক ফুর্তি। তড়িঘড়ি করে আমাদের হাতব্যাগগুলো নিয়ে তার একটা বড়োসড় গাড়িতে ছয়জনই উঠে পড়ি। গাড়ির হিটার জ্বলে, ক্যাসেট প্লেয়ার অন হয়। গান বাজে— ‘রা, রা রাসপুতিন….’। বনিএম এর সেই স্মৃতি জাগানিয়া গান।

হঠাৎ করে তার গাড়িতে এই গানটি কেন বাজে? তবে কি হিসেব করেই ওমর ভাই এ গানটি রেখেছেন আমাদের জন্য? এটা তো ৮০’র দশকের গান। কলেজে (ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজ) আমরা যখন এইট-নাইন, ওমর ভাইয়েরা টেন-ইলেভেন, তখন এই গান শোনা হতো। ক্লাস টুয়েলভের ভাইয়েরা কলেজ ছেড়ে যাওয়ার আগে আগে কেউ কেউ ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে আসতেন। রেস্ট টাইমে তাদের এই সব ক্যাসেট প্লেয়ারে জোর ভলিউমে গান বাজতো। যারা খুব স্মার্ট ছিল, তারা এই সব গানের সাথে নাচতোও একা একা, আমরা দেখতাম। ‘বনিএম’, ‘এবা’- এসবের গানের কদর ছিল বেশি। ওমর ভাইদের ব্যাচ এই গানগুলোই তখন বেশি শুনত।

ওমর ভাই দেশ ছেড়েছেন কলেজ থেকে বেরিয়েই। দেশে তার স্থায়ীভাবে ফেরা হয়ে ওঠেনি আর। ভবিষ্যতে আর কখনো হবে বলেও মনে হয় না। তবে কি আমাদেরকে পেয়ে তার পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল? বাঙালিদের কাছে পেয়ে তার তো বাংলা গান শোনানোর কথা! তিনি কেন ‘বনি এম’ এ গেলেন?

আমি বুঝতে পারি না। শেষ রাতে ঘুমের ঘোর যাতে কাউকে না তাড়ায়, তার জন্যই হয়তো এমন হাই ভোল্টেজ গান নির্বাচন তার পছন্দ হয়েছে। ইংরেজি গানের কথা আমি বুঝতে পারি না। আমার ছেলেরা বোঝে। হাইবিটের সাথে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করার বিদ্যাও আমার কখনো শেখা হয়নি। আমি ঝিম মেরে বসে থাকি গাড়ির পেছনের সীটে। নতুন শহরে, এমন নির্জলা ভোর রাতে, সুবহে সাদেকের প্রায় আগের মুহূর্তে, কুয়াশা ভরা রাজপথ মাড়াতে মাড়াতে আর হৈ হুল্লোড় করতে করতে আমরা ৮তলা একটা দালানের নিচে এসে নামি।

দালানের কোণায়, ছোট্ট একটা সাইনবোর্ড। পোলিশ ভাষায় লেখা UL. Jesionowa 22। এর মানে কী হতে পারে বুঝি না। হয়তো কোনো একটা সড়কের ২২ নম্বর বাড়ি এটি। কিন্তু জানি যে আমাদের জন্য তার একটা এপার্টমেন্ট সার্ভিসড এপার্টমেন্টেটিতেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।

দালানের নিচ তলায় এক বুড়ো একটা ডেস্কে বসে বসে ঝিমুচ্ছেন। তার সামনে একটা কম্পিউটার স্ক্রীনে কতগুলো ছোটো ছোটো উইনডো খোলা। সিসিটিভির কাজ কারবার দেখছেন তিনি। সারা রাত জেগে থাকতে থাকতে শেষ রাতের দিকে তার ঝিমুনি এসেছে। মহা বিরক্ত তিনি।

দালানের নিচ তলায় এক বুড়ো একটা ডেস্কে বসে বসে ঝিমুচ্ছেন। তার সামনে একটা কম্পিউটার স্ক্রীনে কতগুলো ছোটো ছোটো উইনডো খোলা। সিসিটিভির কাজ কারবার দেখছেন তিনি। সারা রাত জেগে থাকতে থাকতে শেষ রাতের দিকে তার ঝিমুনি এসেছে। মহা বিরক্ত তিনি। এর মধ্যেই তিনি আটতলা ও নয় তলার দুটো কামরার মোট ৫টি চাবি আমাদের হাতে দিলেন। কপাল ভালো, ওমর ভাই সাথে আছেন। এই বুড়ো একবর্ণ ইংরেজি জানেন না। থ্যাংক্যু শব্দটাও সম্ভবত তিনি কখনো শোনেনি।

ঘরের ভেতর ঢুকে দেখি এলাহি কাণ্ড। দু’টো এপার্টমেন্ট ভাড়া করা হয়েছে। একটি তিন কামরার, অপরটি দুই কামরার। যে তিন কামরার এপার্টমেন্টে আমার রুম পড়েছে, সেই রুমে ঢুকে দেখি ওয়ারশো থেকে রেখে দেওয়া সুটকেসটি পরম যত্নের সাথে আমার ঘরে নিয়ে রাখা। এমনিতে আমাদের পঞ্চপর্যটক বাহিনী, যখন দেখি হোটেলে কামরা নেই, বাধ্য হয়ে ৫ জনের জন্য আমাদের দুই কামরা ভাড়া করতে হয়। এক কামরায় আলাদা একটা বিছানাও দিয়ে দেয় হোটেল ওয়ালারা। সারাদিন এবং প্রায় সারারাত আমরা যেকোনো একটি কামরায়ই থাকি। এমনও হয়েছে এক কামরায় গাদগাদি করে ৫ জনই ঘুমিয়ে গেছি। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে দুই জন হয়তো তাদের রুমে গেল। নেহায়েত নিজের টুথব্রাশটা ব্যবহার করার জন্য নিজের রুমে যাওয়া।

এখানে, এই তিন কামরার এপার্টমেন্ট দেখেই আমরা পুলকিত। এদের দুটো রুম মাস্টার বেডরুমের মতো। বড়ো বড়ো বিছানা। যেকোনো বিছানায় আমরা যেকোনো দুই বন্ধু ঘুমাতে পারি। আমদের প্রাইভেসির কোনো সমস্যা কারো কাছে নাই। সবাই প্রকাশিত।

এ রকম ৩টা রুম ছাড়াও আছে বড়ো একটা ড্রয়িং রুম। ডাবল সোফাসেট, রান্নাঘর, খাবার ঘর, কাপড় ধোয়া বা শুকানো বা ইস্ত্রি করার আরেকটা ঘর।

আমি টিমের জুনিয়ার মোস্ট। সবচেয়ে ছোটো ঘরটা আমি বেছে নিলাম। আমার কামরায় ঢুকে হঠাৎ করে জানালার দিকে আমার চোখ যায়। ভোরের সূর্য এই মাত্র উঁকি দিয়েছে। ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে জেগে উঠছে ক্যাতাভিৎসের নাগরিক স্থাপনা। আয়তক্ষেত্রাকার এই জানালার ফ্রেমটাকে হঠাৎ করে মনে হলো যেন একটা নিখুত হাঁতে আকা প্রকৃতির দৃশ্য।

Shakoor Majid_EP_6_P_1

গেস্ট হাউজের জানালা দিয়ে দেখা প্রথম ভোরের ক্যাতাভিৎসে

এমন চমৎকার একটা দৃশ্যকে চোখের সামনে রেখে আমার চোখ বন্ধ করতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আমাদের এখন করতে হবে। সারারাত না ঘুমানোর ক্লান্তি দূর করতে হলে এখন একটু ঘুমানো দরকার।

 

সসনোভিৎসে-ক্যাতাভিৎসে
কথা ছিল, বেলা একটা পর্যন্ত আমরা সবাই ঘুমাব; কিন্তু সাড়ে এগারোটার দিকে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার সহপর্যটকেরা প্রায় সবাই ব্রেকফাস্টের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত, আরিফ ভাই রান্নাঘরে। টোস্টারে ব্রেড চাপানো হয়েছে, ওয়েলডান ডিম তৈরি হয়েছে। ডাইনিং টেবিলে জ্যাম-জেলি-বাটার-মধু অফুরন্ত।

কফি চড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছেন লাভলু ভাই। সাঈদ ভাই গোছগাছে সময় দিচ্ছেন। এ কাজটি তিনি খুব ভালো পারেন। আমি দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। আমার জন্য বাড়তি আদর সবার। তেমন কিছুই আমার করতে হয় না নাস্তা খাওয়া পর্যন্ত। নাস্তা শেষে সবচেয়ে জটিল কাজটি আমার ওপর বর্তাল। যেহেতু আগের কোনো কাজেই আমার অংশগ্রহণ ছিল না, তাই পরের এই অংশে আমাকে প্রয়োজন। সবগুলো প্লেট ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ট্রেতে রাখার মতো যে কাজটি বাকি সেটা করার জন্য আমি ছাড়া আর কেউ তখনো অবশিষ্ট নেই।

বিদেশ বিভুঁই এসে এতোদিন হোটেলের খাওয়া খেয়েছি। আজ থেকে আগামী ৫ দিন আমাদের এই রুটিন চলবে। চিন্তায় পড়ে যাই। এ কয়দিনে দেশি খাবারের জন্য আমাদের প্রাণগুলো প্রায় যায় যায়। মোটাচালের ভাতের সাথে আলু দিয়ে গরুর গোস্ত আর পাতলা ডাল খাওয়া হয় না বলে ওমর ভাইয়ের কাছে খেদ করা হয়েছিল কয়েকঘন্টা আগে।

বিদেশ বিভুঁই এসে এতোদিন হোটেলের খাওয়া খেয়েছি। আজ থেকে আগামী ৫ দিন আমাদের এই রুটিন চলবে। চিন্তায় পড়ে যাই। এ কয়দিনে দেশি খাবারের জন্য আমাদের প্রাণগুলো প্রায় যায় যায়। মোটাচালের ভাতের সাথে আলু দিয়ে গরুর গোস্ত আর পাতলা ডাল খাওয়া হয় না বলে ওমর ভাইয়ের কাছে খেদ করা হয়েছিল কয়েকঘন্টা আগে। এই সাধ পূরণের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ৮ ঘন্টারও কম সময়। বেলা দেড়টায়, কলিং বেলের শব্দ। ওমর ভাই এসেছেন। তার হাতে দুইটা ডেকচি, সঙ্গে তাঁর পোলিশ ড্রাইভার। তার হাতে আরও দুটো।

Shakoor Majid_EP_6_P_2

৩টি পাখির ডানা দিয়ে তৈরি সেলসিয়ানের তিনটি পুণর্জাগরনের স্মারক হিসাবে আছে পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো এই স্মৃতিসৌধ

আবার ডাইনিং টেবিলে বসা। এবার অন্য জিনিস। ভাত-মাংস-ডালের সাথে একেবারে খাস বাংলাদেশি পাবদা মাছ। একি! পোলান্ডের এই ছোট্ট শহরে বাংলাদেশি পাবদা এলো কোথা থেকে? ওমর ভাই বলেন, তার যে রেস্টুরেন্টটি আছে এই শহরে, এর জন্য বাংলাদেশি (ভারতীয় নামধারী) তরিতরকারি এবং মাছ কিনতে হয় ভিয়েনা থেকে। মাসে দুইবার এই বাজার করার জন্য তিনি বা তার লোক ভিয়েনা যান। ভিয়েনাতে এই তরিতরকারি আসে ফ্রান্স থেকে। ফ্রান্সে আসে লন্ডন থেকে। লন্ডনের মতো বাংলাদেশি খাবারের এতো বড়ো বাজার ইউরোপীয় কোনো শহরে নাই। তাই কখনোবা লন্ডন থেকে কখনোবা ফ্রান্স বা ইউরোপীয় বাঙালি অধ্যুষিত শহর যেমন, রোম, ফাংকফুর্ট বা বার্লিন থেকে এসবের আমদানি হয়, অপেক্ষাকৃত কম বাঙালি বসতির এই সব শহরে।

পুরো পোল্যান্ডে বাংলাদেশির সংখ্যা শ’পাঁচেকের বেশি নয়। আর এই ক্যাতাভিৎসে শহরে বাঙলি পরিবার একটিই মাত্র। ওমর ভাইয়ের। এককভাবে যে ৪-৫ জন বাংলাদেশি এই শহরে থাকেন তারা সবাই তাঁর রেস্টুরেন্টের কর্মী।

একবার ভরপেটের নাস্তা খাওয়ার ঘন্টা দেড়েকের মাথায় আবার ভরপেটে খেতে যাওয়া কিঞ্চিত কষ্টেরও কাজ। কিন্তু খাটি দেশি রেসিপির এই খাবারের গন্ধ যখন নাকে এসে লাগে, তখন জোর করে ক্ষুধা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না আমাদের হাতে।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা প্রথম যে সিদ্ধান্ত নেই, তা হলো দুই বেড রুমের অপর এপার্টমেন্টেটি আমরা ছেড়ে দিতে চাই। তাতে যদি পুরো ৫ দিনের ভাড়া দিতেও হয়, তাতে আপত্তি নাই। এ রকম তিন বেডের ফ্লাট আমাদের ৫ বন্ধুর জন্য যথেষ্ট বড়ো। ৫ কামরায় ৫ জন আলাদা হয়ে থাকব, এই যদি হয় বাইরে এসে আমাদের থাকা, তবে আর একসাথে বিদেশে আসা কেন? ঢাকায় আমরা যে যার মতো যার যার ঘরেই তো থাকতে পারি!

সিদ্ধান্ত গৃহিত হলো। ২ বেডরুমের কামরা থেকে ব্যাগ বোচকা টেনে এনে বোঝাই করা হলো এই এপার্টমেন্টে। এবার কাপড়চোপড় পরে বেরিয়ে পড়ার পালা। এর আগে গিদাইনস্ক-তরুণ বা ওয়ারশোতে আমাদের নিয়ে বয়ে বেড়ানো ভাড়া করা ভ্যানটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার বিনিময়ে পোলান্ডের অনারারি কনসাল জেনারেলের ব্যক্তিগত দুটো গাড়ি আমরা ব্যবহারের জন্য পেয়েছি। একটির চালক স্বয়ং অনারারি কনসাল জেনারেল, অপরটি তার পোলিশ শোফার লুকাস।

লুকাস ২৩-২৪ বছরের সুদর্শন তরুণ। সাংঘাতিক ফ্যাশনেবল তার চলাফেরা, পোশাক আশাক। অত্যন্ত ভদ্র এবং অমায়িক তার আচরণ, কিন্তু আমাদের জন্য সে বড়োই অসুবিধার। ইয়েস, ছাড়া সে ইংরেজি আর কোনো শব্দ জানে না, বোঝেও না। যে কোনো প্রশ্ন করলে সে মাথা নাড়ে এবং বলে ‘ইয়েস’।

লুকাস ২৩-২৪ বছরের সুদর্শন তরুণ। সাংঘাতিক ফ্যাশনেবল তার চলাফেরা, পোশাক আশাক। অত্যন্ত ভদ্র এবং অমায়িক তার আচরণ, কিন্তু আমাদের জন্য সে বড়োই অসুবিধার। ইয়েস, ছাড়া সে ইংরেজি আর কোনো শব্দ জানে না, বোঝেও না। যে কোনো প্রশ্ন করলে সে মাথা নাড়ে এবং বলে ‘ইয়েস’। তাকে ‘থ্যাংক ইউ’ বললেও সে হাঁসতে হাঁসতে মাথা নাড়ে আর বলে, ইয়েস, ইয়েস।

আমার কপাল আরো বেশি খারাপ। ওমর ভাই তার সতীর্থ বন্ধুদের নিয়ে তার গাড়িতে উঠে পড়েন। আমার আর সাঈদ ভাইয়ের ভাগ্যে জোটে লুকাসকে। লুকাস ইংরেজি জানে না। সে কারণে আমাদের কোনো কথাই তাকে বুঝাতে পারি না। তার দায়িত্ব সামনের গাড়িকে ফলো করা। আমরা সসনোভিস্ (Sosnowiec) আর ক্যাতাভিৎসে (Katowice) নামক দু’টো জমজ শহর এপার ওপার করি। একটা শহর থেকে দশ মিনিটের মধ্যে আরেকটা শহরে যাই। উত্তরা থেকে টংগীর মতো যাওয়া আসা।

ভিন্ন রকমের নিরিবিলি পরিবেশের এই ছোট্ট শহর দুটোও আমাদের ভালো লেগে যায়।

Shakoor Majid_EP_6_P_3

রাতের ক্যাতাভিৎসে

দক্ষিণ পোল্যান্ডের এই ক্যাতাভিৎসে শহরে সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখের মতো মানুষের বাস। এটি মূলত শিল্প এলাকা। কয়লা খনির জন্য এক সময় এই এলাকাটির খুব নামডাক ছিল। এখনো আছে। খনি থেকে কয়লা উঠানোর অনেক নতুন কারিগরি বিষয় আবিষ্কৃত হবার কারণে আদিম পন্থার কয়লা উদগীরণের কাজে শ্রমিকদের প্রয়োজন এখন অনেক কমে এসেছে। তথাপিও এই অঞ্চলের স্থানীয় ধনী শ্রেণির মানুষেরা মূলত কয়লা খনির শ্রমিকই। কারণ, এই পেশায় অনেক বেশি উপার্জনের সুযোগ ছিল এক সময়। এই ক্যাতাভিৎসে শহরটিও গড়ে উঠে মূলত কয়লা খনিকে উপলক্ষ্য করে। এই শহরের বয়স প্রায় ৭শ’ বছর। প্রায় ৩শ’ বছর ধরে এটা পুরোপুরি শহরের মর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠছে। প্রতিবেশী দেশ জার্মানী থেকে কয়েকজন বণিক এসে এখানে শিল্পকারখানা গড়ে তুললে এখানকার নাগরিক পরিবেশে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আসতে থাকে। ১৮৮৫ সালে এটি শিল্প শহরের মর্যাদা পায়।

ক্যাতাভিৎসে শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাছে আমাদের গাড়ি এসে থেমে যায়। আমরা একটা বিশাল আকারের মনুমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াই। ওমর ভাই বলেন— এটা হচ্ছে সমস্ত পোল্যান্ডের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো স্মৃতিসৌধ। ভূমি থেকে খানিক উঁচু একটা বেদির ওপর দাঁড়ানো এই সৌধটি ৩টি পাখির ডানা নিয়ে তৈরি। তিনটি পাখা সেলসিয়ানের তিনটি পুনর্জাগরণকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। পাখা তিনটির পালকগুলোর ওপর পোলিশ হরফে কতগুলো নাম লেখা। যে অঞ্চলগুলোতে এই জাগরণের যুদ্ধগুলো ঘটেছিল মূলত সেই অঞ্চলেরই নাম এখানে লেখা।


ধারাবাহিকটির অন্য পর্বগুলো পড়ুন :

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০১
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০২
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৩
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৪
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৫

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২২ নভেম্বর, ১৯৬৫। তিনি একজন বাংলাদেশি স্থপতি, নাট্যকার, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক। ভ্রমণকাহিনি ও জীবনী সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।