প্রিয় রোসিও
আপাতত গুছিয়ে নিচ্ছি সব। তথাপি তোমার জন্য কিছু মায়া রয়ে গেল প্রিয় রোসিও।
রাত তিনটায় অনতিদূর উঁচু টিলায় নিভু নিভু বাতিগুলো কিছু বলতে চেয়েছিল
শোনা হয়নি; কেবল দেখেছি সাঁই করে উড়ে যাওয়া পাখির মর্মাহত বেদনার পাখা
কীভাবে ছড়িযে পড়ছিল নিঃসঙ্গ রাত জুড়ে, টেবিলে, চেয়ারে, তোমার মুখাবয়বে।
কেনসের তীর ঘেঁষে যেসব ছবি এঁকেছিলেন পিকাসো তাদের প্রতিও রয়ে গেল অসামান্য মায়া
মেরিনাকেও দিয়েছি খানিক, উষ্ণতা ফিরে না এলে সেসব কেবলি ঘুমঘোর স্বপ্নের মতো
ক্ষণস্থায়ী। তথাপি রং ও রেখার অবিমিশ্র সংঘাতে চিত্রগুলো অতিদীর্ঘ বেদনায় হাসে
বিমূর্ত কলায়, কিছুমাত্র ম্লান হয়নি আঙুলের গান, চিরসুন্দরতা, নিশ্চয়ই জানো মিরেইয়া।
অনুকূল আবহাওয়া ছিল না বলে দেখা হয় নাই তোমাকে, প্রিয় গ্রানাদা—
আন্দালুসিয়ার পথে পথে, শীতে ও রোদ্দুরে উদাসীন পিয়ানোর সুর বাজে গার্সিয়া
কর্দোবার সহস্র সময়, প্রিয় মদ ও স্বতস্ফূর্ত পঙ্ক্তিগুলি ছড়িয়ে আছে মরমে
ধুলায়, রেখায়— ফোয়ারায় বসে আজো তারা গল্প করে, ঔদাস্যে চেয়ে থাকে।
শোন বলি, আপাতত রেখে যাচ্ছি কিছু গোপন প্রবণতা
বিস্তীর্ণ রেখা ও রঙের উত্তাপে সেসব হারাবে না কিছুমাত্র জেনো।
নিঃস্বতা
সর্বস্ব খুইয়েছে যার
তাঁকে নিঃস্বতার কথা
বলা অযথা।
যথাতথা মিটে গেছে
লেনদেন
আনাগোনা
যত ছিল
অন্তরের ভাব
ও তৃষা—
বিবমিষা, বিবমিষা—
আপন স্বভাবে তাঁকে
দিয়েছে জলাঞ্জলি
সকলি ভুল যার
তার কাছে এসব মামুলি—
মামুলি ঘটনায় ফেঁসে গেছে
কত না কন্যা ও মাসি
যত না মূল্যবান তার চেয়ে
এ জগতে দাম কার বেশি!—
সোনা না তামা—
তামামা তামামা—
হাসি হাসি মুখ নিয়েও পালালো যারা
তারা আর ফিরবে না কোনোকাল
যতই ক্ষরণ হউক যত অকারণ
ঘরে ফিরবে না তারা আমরণ।—
জেনে গেছে ভাব
অন্তরের আপন স্বভাব
এঁকে তুলি দিয়ে কতবার—
শতবার
অঞ্জলি নাও
আর জিগাও অন্তরের ভাবে সবই
আছে কিনা ভালো—
এতসব জমকালো অসাধারণ ভিড়ে—
আপনায়— কোন নদী থিতু হয় গঞ্জনায়
অ-প্রবহমান, পরাধীনতায়!
কে কার স্বভাবে ধায়
নদী না সমুদ্র—কে কাঁপে জোয়ার-ভাটায়!
আপন স্বভাবে স্থিত হয় সব
একদিন, ঝড়ের পরের রাতে
স্বাধীনতায়!
অদ্ভুত
চোখের জল বেয়ে নামতে নামতে
মেয়েটি অন্ধ হয়ে গেল।
জলের সম্পর্কও অন্ধ হয়।
ঘোলা জলে নেমেও
রঙ বদলাতে হয়, অদ্ভুত!
অন্ধচোখের কোনো রঙ নেই।
সে, না হলুদ কালো বা বাদামি
কিছুই দেখে না।
কেবল ভাষা আছে অন্ধ চোখের
নির্বাক, যদিও সে অবদমনের ভাষা।
ভাষা হারিয়ে গেলে
মেয়েটির চোখে জল নেই।
নির্বাপিত জল মিশে গেল
জলীয়বাষ্প হয়ে মেঘেদের সাথে।—
অজানায়।
জপ
আমিও মন্ত্র জানি ফের তোমাকে জীবিত করার। ঘোরলাগা যে জীবনে চলে গিয়ে কেবল বিমূর্ত হীরার পালকের কথা মনে পড়ে, তুমিও জানো আমি সেই পালকের সহোদরা, হৃদয়ে পাঁজরে লিখে নাম কালে কালে ডানায় ভর করে এসেছি ফিরে অস্থির জনপদে। তোমাদের কাছে যতটুকু খনি ও খনিজ আছে তার দিকে মুখ ফিরায়ে তোমরাও একদিন যেতে পারো ভূমধ্যসাগর পার হয়ে পরিস্থান। আমি সেখানেই থাকি, তোমাদের কল্পনা বড়ো হলে দেখো আমাকে সেদিন তোমদের নিদ্রায় ও ঘোরে, অনিদ্রায়, অবদমনে আমি কী রূপ তোমাদের থেকে আলাদা হয়ে, তোমাদের ভালোবেসে অতীন্দ্রিয়ের মরণে নেমেছি, অনুরণন শেষে। আমি যে মন্ত্র জানি তারও ভাগ কিছু তোমাদের বিলিয়ে দিয়েছি, অসম্ভব ডানার ভার নিয়ে তোমরাও একদিন চলে এসো মন্ত্র ও জাদুর গহীনে। ভালোবাসা মন্ত্ররূপ হলে অনেক জীবন পার হয়ে মানুষের মন বারবার বেঁচে ওঠে। আর আমি তোমাকেই মন্ত্র বলে জপ করি।
আইসোলেশন
একা থাকি।
একা খাই।
একা ঘুমাই।
একা ঘরে
অগোচরে
একা মরে যাই।
তোমাদেরও নিশ্চিত মৃত্যু আছে জেনেও
আমার মৃতদেহ সৎকারে
তোমাদের মন ও পা আড়ষ্ট হয়ে থাকে!
মৃত্যুর চেয়ে অধিক বিষণ্ন একাকীত্ব নাই!

জন্ম ১৩৭২ বঙ্গাব্দের ২১ মাঘ, তথা ১৯৬৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, নেত্রকোণা জেলায়। পড়াশুনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, (১৯৮৫-৮৯ সেশন )। সাংবাদিকতা ও অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে ভয়েস নামে বেসরকারি একটি গবেষণা সংস্থার প্রধান নির্বাহী। ঢাকায় বসবাস করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : কবিতা : অতিক্রমণের রেখা, ২০০০; সকল বিকেল আমাদের অধিকারে আছে, ২০০৪; অবিচল ডানার উত্থান, ২০০৬; আদিপৃথিবীর গান, ২০০৭; আগুন ও সমুদ্রের দিকে, ২০০৯; আনন্দবাড়ি অথবা রাতের কঙ্কাল, ২০১০; প্রেম, মৃত্যু ও সর্বনাম, ২০১৪; অতিক্রমণের রেখা : নির্বাচিত কবিতা, ২০১১; ভূখণ্ডে কেঁপে ওঠে মৃত ঘোড়ার কেশর, ২০১৩; রাজার পোশাক, ২০১৪; অনেক উঁচুতে পানশালা, ২০১৪; দাহকাব্য, ২০১৫; শ্রীমতি প্রজাপতি রায়, ২০১৭; এখান থেকে আকাশ দেখা যায়, ২০১৮। গদ্যগ্রন্থ : সমূহ সংকেতের ভাষা, ২০০১; কলমতালাশ : কবিতার ভাব ও বৈভব, ২০১৪; কবিতার নতুন জগৎ, ২০১৭। পুরস্কার : বইপত্র সম্মাননা, কলকাতা, ২০০০; বগুড়া লেখক চক্র, ২০১৫; শব্দগুচ্ছ, ঢাকা-নিউইয়র্ক, ২০১৫; লোক, ২০১৬।