রবিবার, জুন ২৩

লিওনার্দো নরম্যান কোহেনের দীর্ঘ কবিতা ‘সহস্র চুম্বনকাল’ ।। ভাবান্তর : খন্দকার ওমর আনোয়ার

0
লিওনার্দো কোহেন

লিওনার্দো কোহেন


লিওনার্দো নরম্যান কোহেন ১৯৩৪ সালে কানাডাতে জন্ম গ্রহণ করেন। ৮২ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। কোহেন ছিলেন কালোত্তীর্ণ একজন অসাধারণ কন্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, কবি এবং একজন ঔপন্যাসিক। কোহেনের সংগীতের মূল উপজীব্য বিষয় হচ্ছে ব্যক্তির ধর্ম ও রাজনৈতিক বিশ্বাস, একাকীত্ব, বিষাদময়তা, যৌনতার ভিন্নতা, মৃত্যু ও অন্তর্ধানের বেদনা, প্রেম-বিরহ-রোমান্স ইত্যাদি। ২০১১ সালে কোহেন সাহিত্যে তাঁর মৌলিক অবদানের জন্য ‘প্রিন্স অব এস্টুরিয়া’ এবং নবম ‘গ্লেন গাউড’ পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ‘কানাডিয়ান মিউজিক হল অব ফেম’, ‘কানাডিয়ান সং রাইটারস হল অব ফেম’ এবং ‘রক এন্ড রোল হল অব ফেম’ এ জায়গা করে নিয়েছেন। এছাড়াও কানাডা সরকার কর্তৃক তাদের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা পদক ‘অর্ডার অব কানাডা’তেও ভূষিত হন।


সহস্র চুম্বনকাল


বেণীদোলানো মাতাল-বিভুল-মত্ত কিশোরী
তার বেতাল ‘ঘুংগুর রহিবে লাল পায়’!
তার বিজয়ের মোহন বাঁশি আর জাগরণী গান
থেমে যাবে সহসাই!

অবশেষে সমন জারি হলো–
অপরাজেয় শক্তিমত্তার খোলসে
পৌনঃপুনিক জয়ের নেশায় বিভোর সে
কী করে বেঁচে থাকে উৎকল্পনায়?
এক পরাবাস্তব জীবনকে সাথী করে!
সহস্র চুম্বনকালের গভীরে।

শতরাঞ্জ ঘুরে যায়,
আত্মঘাতী ঘুঁটির চালে রাণীমাতা মাৎ হন,
আর আমি ফিরি উদ্বেগহীন
আমার চিরায়ত পান্থপথে!
তার কোমল কচি হাতের আঙুল ফস্কে হারানো অতীত
মোনালিসার বদলী ফ্রেমে বাঁধা পড়ে হয়ে ওঠে অবিনশ্বর!

আমি দিকবিদিক ক্লান্তিহীন ছুটে চলি,
চুম্বনসিক্ত শত সহস্র শপথকে সাথে নিয়ে,
আমার সমস্ত স্পর্শকে নিংড়ে ফেলে
জীবন্মৃত বেঁচে থাকে সে
সহস্র চুম্বনের ঘূর্ণিপাঁকে পড়ে!

যখন
‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে’,
হতাশায় বিহ্বল সে ভেঙেচূড়ে চূরমার—
হৃদয়ের শার্ষিতে জমাটবাঁধা অবিমিশ্র মায়ার কুলুপ আঁটা
সহসাই খুলে পড়ে সহস্র চুম্বনে,
সিঞ্চনে সিঞ্চনে সিক্ত হয় তপ্ত হৃদয়খানি।

শুধু শরীরে নিমগ্ন হয়ে সমুদ্রের অতলদেশ পারি দিয়েও
চোখ মেলে দেখি, মহাসাগর গেছে শুকিয়ে
বুভুক্ষু-পিয়াসী হৃদয়টাকে সাথে নিয়ে আমি
অবশেষে ‘মগ্নচৈতণ্যের শিষ’ হয়ে বাঁচি!

ডুবন্ত জীবনতরীর কিয়দংশ মাড়িয়ে
আমি সবেগে ধাবিত হই সমুখ পাটাতন পানে—
অভিসম্পাতের আশীর্বাদে নিষিক্ত—
ধ্বংসের অনুমোদনে নিমজ্জিত হয় সেই তরী
সহস্র চুম্বনের জলে।

শতরাঞ্জ আবারো যায় ঘুরে,
আত্মঘাতী ঘুঁটির চালে রাণীমাতা আবারো মাৎ হন,
আমি ফিরি ফের উদ্বেগহীন
আমার চিরায়ত গন্তব্যের পথে!

আমি নিশ্চিত জানি,
ফিরে সে তো আসবে না আর
শত শতদল সাথে শপথের ভূলুণ্ঠিত মালা নিয়ে
নির্বাক-নিথর হবে তার ভাবনার ডালা,
আমার নির্বাসিত দুয়ারে ঝুলবে মরণতালা!

সহস্র চুম্বনকাল শুধু প্রেত হয়ে জাগে,
অবিস্মৃতি নোঙর ফেলে
অবমুক্ত হৃদয়ের গোপণ এক কোণে।

যখন
‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে’,
হতাশায় বিহ্বল সে ভেঙেচূড়ে আবারো চূরমার—
হৃদয়ের শার্ষিতে জমাটবাঁধা অবিমিশ্র মায়ার কুলুপ আঁটা
সহসাই খুলে পড়ে সহস্র চুম্বনে,
সিঞ্চনে সিঞ্চনে সিক্ত হয় তপ্ত হৃদয়খানি।

বেণীদোলানো মাতাল-বিভুল-মত্ত কিশোরী
তার বেতাল ‘ঘুংগুর রহিবে লাল পায়’!
তার বিজয়ের মোহন বাঁশি আর জাগরণী গান
থেমে যাবে সহসাই!

অবশেষে সমন জারি হলো।
অপরাজেয় শক্তিমত্তার খোলসে
পৌনঃপুনিক জয়ের নেশায় বিভোর সে
কী করে বেঁচে থাকে উৎকল্পনায়,
এক পরাবাস্তব জীবনকে সাথী করে!
সহস্র চুম্বনকালের গভীরে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৬৯ এ উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধায়। রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক শেষে ১৯৮৯ সালে ‘ভারতীয় সাংষ্কৃতিক বিনিময়-বৃত্তি’ নিয়ে আই আই টি মাদ্রাজে এরোস্পেস এঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন করেন। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০০ সালে ‘অস্ট্রেলিয়ান আন্তর্জাতিক স্নাতকোত্তর গবেষণা বৃত্তি’র অধীনে আর এম আই টি ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন শেষে ব্রিসবেনের অদূরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। জাপানে ‘পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলোশিপ’ শেষে দীর্ঘ ১৪ বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে শিক্ষকতা এবং ‘আন্ডারওয়াটার মেরিন ট্যাক্টিক্যাল ভেহিকেলস এন্ড কম্পোজিট কন্সট্রাকশন মেটিরিয়েলস’ নিয়ে কর্মরত ছিলেন। বিগত প্রায় দেড়বছর ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এভিয়েশান এন্ড এরোস্পেস ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন। দুটি প্রবন্ধ সংকলন, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং জয়ন্ত চ্যাটার্জীর কন্ঠে তার ১২টি কবিতার ১টি অডিও সিডি প্রকাশিত হয়েছে একুশে বইমেলায়।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।