শনিবার, জানুয়ারি ২২

হামিরউদ্দিন মিদ্যার রবিবারের ধারাবাহিক : ধুলোমাটির ভুবন | পর্ব-০৩ | পৌষসংক্রান্তির মেলা

0

পৌষসংক্রান্তির মেলা


মকর পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইছে
আরে টুসুমনি ধামসার তালে কেমন দেখো নাচিছে
মকর পরবে…

মাঠের লক্ষীকে ঘরে তোলা হয়েছে। ঝাড়াই-মাড়াই করে মরাই বাঁধার কাজও শেষ। নতুন চালের ভাত খাচ্ছে গাঁ-গ্রামের মানুষ। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে কুটে রেখেছে ‘আলোচাল’। মানে আ-সেদ্ধ আতপচাল। সেই চালের গুড়ি দিয়ে পিঠেপুলি হবে। সামনে পৌষসংক্রান্তি না! নতুন খেঁজুর গুড়, নারকেলের পুর দেওয়া পিঠেপুলি, দেশি মুরগির ঝোল। রাঢ়ের গ্রামবাংলায় একটা উৎসব উৎসব ব্যাপার। মানুষজনের হাতে টাকাকড়ি জমেছে। খরচ করার জন্যে হাত নিসপিস করছে। পৌষসংক্রান্তিতে মেলা বসবে। দেউলির মেলা, বেলামা, রাঙামাটি, পীরপুকুর। হিন্দু-মুসলমানের মিলনক্ষেত্র।

অঘ্রাণ শেষ হতেই ফেরিওয়ালাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে হাঁক পাড়ে—আলতা, চুড়ি, কানের দুল—নিয়ে যাও গো মা বুনেরা। ঘরের আইবুড়ো বিটিছেলে, বউ-ঝিরা সব ‘মকরচান’ করে মেলা দেখতে যাবে কি ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে! তারা সাজুগুজু করবে। লালফিতের বেনি, পায়ে আলতা, ঠোঁটে লিপস্টিক। হাতের চুড়ির ঠুন ঠুন। রাঙা পেড়ে শাড়ি। বলি ও মরদ তুমি অমন আড়চোখে তাকাও না। মন যে বড়ো হু হু করে গো! এখনও তো কোকিল ডাকে নাই। পলাশফুল ফুটে নাই। শিমুলফুল ফুটে নাই।

ছোটোবেলায় পৌষসংক্রান্তির দু’দিন আগেই আব্বা সাইকেলে করে মাকে আর আমাকে নানির বাড়িতে দিয়ে আসত। ওখানের পীর পুকুরের মেলা বিশাল নামকরা! কত মানুষ মোরগ, ছাগল মানত করে রাখে! মেলায় গিয়ে মানত শোধে। খিচুড়ি মাংস রান্না করে দরগাতলায় দিয়ে এলেই, কমিটির ছেলেরা ডেকে হেঁকে দর্শানার্থীদের খাইয়ে দেয়।

ছোটোবেলায় পৌষসংক্রান্তির দু’দিন আগেই আব্বা সাইকেলে করে মাকে আর আমাকে নানির বাড়িতে দিয়ে আসত। ওখানের পীর পুকুরের মেলা বিশাল নামকরা! কত মানুষ মোরগ, ছাগল মানত করে রাখে! মেলায় গিয়ে মানত শোধে। খিচুড়ি মাংস রান্না করে দরগাতলায় দিয়ে এলেই, কমিটির ছেলেরা ডেকে হেঁকে দর্শানার্থীদের খাইয়ে দেয়। অনেকেই পীরের পুকুরে ঠান্ডা কালহা জলে ডুব দিয়ে সব পাপ ধুয়ে ফেলে। বুড়ো পীর জলের তলায় ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে। মানুষের পাপগুলো চেটে চেটে খায়। তার দেহ বাড়ে, গতর বাড়ে। পুকুরের জল তাই কমে না।

আমার নানির বাড়ি পশ্চিম নন্দরামপুর। ডাঙা জমিনের দেশ। পাতালের জল তুলে নানারকম মরশুমি ফসলের আবাদ করে চাষিরা। শীতকালে পেঁয়াজ, সরষে, ধনেপাতা, বাঁধাকপি, পালং, ফুলকপি অঢেল ফলে। পেঁয়াজ বাড়ির ধারে ধারে কুসুম বীজ ছড়িয়ে দেয় নানা। কুসুম বীজ দিয়ে হলুদ মুড়ি ভেঁজে রাখত নানি। পৌষ পরব বলে কথা। নানারকম কলাই, সাদা কুসুম বীজ, হলুদ মাখানো চাল নুনিয়ে ভাজা হয় মুড়ি। মাদার গাছের তলায় মেচেতে বসে বাটিতে হলুদ মুড়ি নিয়ে ছোটো ছোটো দাঁতে কুটুর মুটুর করে খেতাম। মেলার আগের রাতে সারারাত চোখে ঘুম আসত না। কখন সকাল হবে! ভোরের মোরগ ডাকল কি! মোরগ কোথায় আর ডাকবে! রায়পাড়া থেকে মাইকে গান ভেসে আসছে। মেয়েরা সারারাত জাগরণ করে টুসু গান গাইছে—আমার টুসু মুড়ি ভাসে চুড়ি ঠনঠন করে গো! …

সকাল হলো তো টাকা বিলানো আরম্ভ হলো। আত্মীয় স্বজন, পাড়াপড়শিরা একে অপরের ঘরের বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মেলা দেখতে বিশ-পঞ্চাশ টাকা দেয়। আর মামাবাড়ির কদর তো আলাদা! মামা, মামি, খালারা যা দিত, তাতে আমার মেলা দেখেও বেড়ে যেত।

নানি ভোর ভোর উঠে উনুন ধরিয়ে পিঠে করছে। আমার আর তর সইছে না। ও নানি, মেলা দেখতে যাবে নাই? গাড়ি কখন ছাড়া হবে গো?

যাব রে ভাই যাব। এত খিদিবিদি কীসের! এই তো সবে সকাল হলো। বাঁশতলায় যা, তুর মামা কী করছে দেখগা।

ছুটে গিয়ে দেখি বাঁশতলায় আনারুল মামা গরুর গাড়িতে ছাউনি লাগাচ্ছে। নৌকার ছই-এর মতো। কাঁচা বাঁশ ফেঁড়ে বাতা বাঁকিয়ে গাড়ির ঠেকনার এমাথা ওমাথা জুড়ে দিয়েছে। ওপরে তেরপল ঢাকা দিলে, কিংবা খড় চাপিয়ে দিলেই ছাউনি। এই ছাউনি দেওয়া গাড়িকে ‘ছপ্পর গাড়ি’ বলে। তখনকার দিনে ছপ্পর লাগানো গাড়িতে বিয়েবাড়ির বরযাত্রী, দোলার বিবি যেত।

মামি, খালা, নানি সবাই পীর পুকুরের মেলা দেখতে যাবে। নানি মোরগ মানত করেছিল। পীর পুকুরে গোসল করে মোরগ খিচুড়ি রেঁধে সিন্নি দেবে পীরের দরগায়। তারপর মেলায় প্রবেশ। সারাবছর ধরে কতকিছু মনে মনে ফর্দ করে রেখেছে বাড়ির মেয়েরা। সেই সব জিনিস কেনাকাটা করার আছে। মাটির হাঁড়ি, পিঠে করার পিড়ে-বেলনা, ঝাঁঝড়ি, খুন্তি আরও কত কী!

ও আনা মামা, টপ টপ করো গো! কখন যাবে? মেলা শেষ হয়ে গেলে?

এই তো হয়েই এলো ভাগনে। রোদ একটু চড়ুক। ঠান্ডায় গিয়ে পীর পুকুরে ডুব দিতে পারবি তো?

ইইপ বাবা! এত জাড়ে আমি গা ধুবো নাই। মামিকে গরম পানি করতে বলছি। গা ধুয়েই যাব।

বাঁশতলার পাশে নানার জ্ঞাতিভাই রইসন নানার গোয়াল। গোয়ালের সামনে টাকলু মাথায় গামছার পাগড়ি জড়িয়ে বুড়ো বটি দিয়ে ছানি কাটে, থুড়ি খড় কাটে। গরম পানিতে আমার স্নান করার কথা শুনে ঠেস মেরে বলল, রূপপালের মরদগুলো বুঝি জাড় ব্যাঙের গোস খায়? গরম পানি দিয়ে কী গা ধুবি বে ছোকরা!

ব্যাঙের মাংস খেলে নাকি বেশি শীতকাতুরে হয় মানুষ। আমিও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়ি না, তা তুমরা কি খেঁক শিয়ালের গোস খাও? এত চর্বি কেনে!

বেলা ন-টা দশটা নাগাদ এগনেতে তালাই বিছিয়ে আলতো রোদে বসে আমরা খেতে বসি। দুধ, খেঁজুর গুড় দিয়ে পিঠেপুলি, মুরগির ঝোল দিয়ে চালগুড়ির রুটি। খাওয়ার পর্ব চুকলেই গামছা ভিজিয়ে আমার হাত-পা মুছে জামা-প্যান্ট পরিয়ে দিত ছোটো খালা।

বেলা ন-টা দশটা নাগাদ এগনেতে তালাই বিছিয়ে আলতো রোদে বসে আমরা খেতে বসি। দুধ, খেঁজুর গুড় দিয়ে পিঠেপুলি, মুরগির ঝোল দিয়ে চালগুড়ির রুটি। খাওয়ার পর্ব চুকলেই গামছা ভিজিয়ে আমার হাত-পা মুছে জামা-প্যান্ট পরিয়ে দিত ছোটো খালা। তারপর নিজে সাজতে বসত। আনারুল মামা গাড়ির জোয়ালে গরু জুড়ে চালকের আসনে, মানে ‘মহড়ায়’ বসে তাগাদা দিত—কইরে ভাগনে, সবাইকে ডেকে আন।

সবাই হাজির হলেও ছোটো মামি আর ইসমতারা খালার সাজা শেষ হয় না। এক সময় নানি তিতিবিরক্ত হয়ে ধমক দিয়ে ডেকে নিয়ে আসত।

মাঠের ধান বওয়ানোর পরেই গরুর পায়ের খুর, শিঙ সব চেঁছে পরিস্কার করে তেল মাখিয়ে চকচকে করে রেখেছে। ছপ্পরগাড়ির ভেতরে মেয়েরা উঠে বসে। আমি পেছনে মায়ের কাছে।

নানাকে দেখলাম একটা কাঠের বোঝা নিয়ে হন্তদন্ত এগিয়ে আসছে। বুড়ো মেলায় যাবে না, ঘর আগলাবে। সবাই চলে গেলে গরু-ছাগলগুলো না খেয়ে টাঙা থাকবে। কাঠের বোঝাটা এনে নানা বলল, একটু সরে বস সবাই। বোঝাটা তুলে নে। ওখানে গিয়ে জ্বালন কুথায় পাবি!

চাল, তেল, নুন, পেঁয়াজ সিন্নি চরানোর সব সরঞ্জাম নেওয়া হয়েছে। বস্তায় হাড়ি, কড়াই, বটি। মামাকে নির্দেশ দিল নানা, মাঠের গোলে গোলে গাড়ি নিয়ে যেতে। রাস্তায় আজ প্রচণ্ড ভিড় হবে। পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

ধান তোলার সময় জমির আল কেটে কেটে মাঠে গরুর গাড়ি চলার সরু রাস্তা তৈরি হয়ে গেছে। সেই সরু মেঠো রাস্তায় ‘গোল’। গোল ধরে ধরে গাড়ি মাঝিরডাঙা, সাবগ্রামের পাশ হয়ে জগন্নাথপুরের রাস্তায় উঠবে। চাকায় ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে এগোচ্ছে গাড়ি। হুট হাট হুড়-র-র-র…

মোরগটা কাল দরমায় ঢুকেনি। বাঁশতলায় ঘাপটি মেরে বসে ছিল। পশুপাখিরা অনেক আগে থেকেই বুঝি টের পেয়ে যায়? অনেক ঝাপটাঝাপটির পর বহু কসরতে ধরা হয়েছিল। ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে রেখে দিয়েছিল নানি। মাথায় ফুলের মতো ঝুঁটি। আগুনরঙা পালকে কালো রঙের ছিঁটা। গাড়ি যত দুলে, মোরগ তত কঁককঁক করে। বাছার রেহাই নাই।

ধানকাটা মাঠগুলো বুকে লাড়া নিয়ে পড়ে আছে। জলের অভাব। কেউ কেউ শ্যালো সাবমার্সিবেলের ভরসায় সরষে লাগিয়েছে। দিকে দিকে সরষে খেতে হলুদ ফুল ফুটেছে। চারিদিকে ছবির মতো সব গ্রাম। গ্রামের মাথায় তালগাছ, খেঁজুরগাছ, কোথাও পুকুর। পুকুরে মকরচান করে আগুন পোহাচ্ছে ছেলেপুলের দল। আল ধরেও হেঁটে হেঁটে কত মানুষের যাতায়াত। কোনও বাপ ছোটো ছেলে-মেয়ের হাত ধরে মেলা দেখতে যাচ্ছে। মা-টা হাঁটতে হাঁটতে পিছিয়ে যাচ্ছে। বাপ তখন পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে ডাকে, কই গো! টপটপ পা চালাও।

গাড়ি যখন মাঠ ছাড়িয়ে মোড়াম রাস্তায় উঠল, তখন রোদের তেজ অনেকটাই বেড়ে গেছে। আমাদের গাড়ির পেছনেও দু’দুটো ছপ্পর লাগানো গাড়ি। একটা মোষের, আর একটা গরুর। গাড়িগুলো প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম থেকেই আসছে। বাড়ির মেয়ে-বউরা রাস্তার মানুষদেরকে মুখ দেখাবে না। ছাউনি হলো পর্দা। আবার রোদ-বৃষ্টির হাত থেকেও রক্ষা করে।

পীর পুকুরের রাস্তায় গাড়ি উঠতেই, আমার বুকের ভেতর কেমন যেন বাজনা বাজত। ওই তো মেলার দোকানদানি দেখা যাচ্ছে। নাগরদোলা ঘুরছে। মাইক বাজছে। মেলা! মেলা! সারাবছর তো এই দিনটির প্রতিক্ষাতেই বসে থাকি। এরপর আরও অনেক জায়গায় মেলা বসবে। সেই চৈত্রমাসের গাজন পর্যন্ত চলতেই থাকবে একের পর এক। তবে এইভাবে একসাথে মেলা দেখতে যাওয়া আর হয় না। দু-এক জায়গায় আব্বা সাইকেলে চাপিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসত। জিলিপি খাওয়াত। তবে যত কেনাকাটা করতাম সব পৌষসংক্রান্তির মেলাতেই। খেলনার বন্দুক, জে.সি.পি গাড়ি, বাঁশি, ডুগডুগি। মাছখেকো ভূত, ঠাকুমার ঝুলি, হাসির রাজা গোপালভাড় তেরপলে পাতা বিভিন্ন স্বল্প মূল্যের চটি গল্পের বই।

পীরপুকুরের পাশের ধানকাটা লাড়াবাড়িতে মেলা বসে। পুকুরের ধারে ধারে সারি সারি গরুর গাড়ি, মোষের গাড়ি দাঁড় করানো। সব এসেছে চাঁদাই, মানগাঁ, মাদারবনি, পিয়েরবেড়া, গুরুলবাদ, কাটাবাঁদ, আশুড়িয়া… দূর-দূরান্ত থেকে। পুকুরের জলে অনেকেই কুবকাব ডুব দিয়ে উঠে আসছে ‘জাড়ে কাঁটা’ হয়ে। মানে ঠান্ডায় গায়ের লোম সজারুর কাঁটার মতো খাঁড়া করে। উঠেই গা-হাত মুছে নতুন জামা-কাপড় পরে মেলায় ঢুকছে।

পীরপুকুরের পাশের ধানকাটা লাড়াবাড়িতে মেলা বসে। পুকুরের ধারে ধারে সারি সারি গরুর গাড়ি, মোষের গাড়ি দাঁড় করানো। সব এসেছে চাঁদাই, মানগাঁ, মাদারবনি, পিয়েরবেড়া, গুরুলবাদ, কাটাবাঁদ, আশুড়িয়া… দূর-দূরান্ত থেকে। পুকুরের জলে অনেকেই কুবকাব ডুব দিয়ে উঠে আসছে ‘জাড়ে কাঁটা’ হয়ে। মানে ঠান্ডায় গায়ের লোম সজারুর কাঁটার মতো খাঁড়া করে। উঠেই গা-হাত মুছে নতুন জামা-কাপড় পরে মেলায় ঢুকছে। যারা মানত করেছিল, তারা সব মাটি খুঁড়ে উনুন বানিয়ে সিন্নি চড়িয়েছে।

গাড়িতে আগেই তিনটে ইঁট তুলে রেখেছিল মামা। সেই ইঁট দিয়ে তে-কোনা চুলো বানিয়ে কাঠের গনগনে আঁচে হাঁড়ি চড়াল নানি। মামি, খালা, মা সবাই হাতাহাতি লেগে পেঁয়াজ, রসুনের খোসা ছাড়িয়ে দেয়। তারপর মানত করা মোরগের মাংস আর খিচুড়ি রান্না হলে পীরের দরগায় নামিয়ে দিয়ে আসে। দরগাতলায় লাইন দিয়ে বসে শালপাতায় চলছে খাওয়াদাওয়া। মেলার দিন কম মানত থাকে! সন্ধে পর্যন্ত চলে খাওয়াদাওয়ার পর্ব। মানুষ মনে মনে যা মানত করে রাখে, সেই আশা পুরণ হলে তবেই সিন্নি চড়ায়। নানিকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম—আচ্ছা, নানি তুমি যে প্রতিবছর সিন্নি চড়াও, কীসের এত মানত করো বলো তো!

নানি হেসে বলেছিল, মানতের কথা কী প্রকাশ করতে আছে রে নাতি! হাঁড়ের গাঁথুনি আর চামের ছাউনি দেওয়া মানুষের শরীর, কতরকম খায়েশ থাকে, স্বপন থাকে। ধরে লে, খেতে ভালো ফসল হয়েছে তাই মানত শোধ করছি, কিংবা ইচ্ছে ছিল মতির যেন দুটো ছা’ হয়। সেই ছাগলের দুটো ছানাই হয়েছে।

আমি ছিলাম ছোটো থেকেই রোগধরা। রোগজ্বালা লেগেই থাকত। নানির বিশ্বাস পীর পুকুরে ডুব দিলে আমার সব বালা মসিবত ঠিক হয়ে যাবে। তাই যতই পানি ঠান্ডা হোক, আমাকে প্রতিবছর ডুব দিতে হতো।

সিন্নি চড়ানো হলে ভিজে জামা-কাপড় গরুর গাড়ির ওপরে মেলে দিয়ে নতুন জামা কাপড় পরে মেলায় ঢুকতাম। মামা সবাইকে সাবধান করে দিত, হাত ধরে ধরে ঘুরবি, আর কেউ যদি হাতছাড়া হয়ে যাস তাহলে এই গাড়ির কাছে এসে বসবি।

মেলায় তো কেউ না কেউ হাতছাড়া হবেই। এত বড়ো মেলা! কত মানুষের ভিড়! হাত ধরে ধরে ঘোরা যায়!

প্যাঁ—পুঁ-উ-উ— করে বাঁশি বাজাচ্ছে ছেলেরা, কেউ খেলনার ডুগডুগি। মানুষজনের কথাবার্তায় গমগম করছে সারা চত্ত্বর। মাইকে বাজছে রমরমা নাগপুরি—আরে চল গৌরি, লে যাব্ব তোকে মোর গাঁও….। মাঝে মাঝে মাইকে প্রচার অমুক গ্রামের তমুক হারিয়ে গেছে। পরিবারের লোকের কাছে অনুরোধ তারা যেন কমিটির কাছে গিয়ে নিয়ে আসে।

জিলিপি, খাজা, গজা নানারকম মিষ্টির দোকান, খেলনা মনোহারি, আসবাবপত্রের দোকান। ঝান্ডি, ফিরফিরির জুয়াখেলা তো আছেই। নতুন জামাই শালিকে নিয়ে গেছে মেলা দেখাতে। শালির নজর শো কেসের দামি সিতাহারটার দিকে। কী আর করবে বেচারি জামাই! কথায় বলে না, সাথে শালি তো পকেট খালি। জামাইও কম নয়, শালিকে পছন্দের জিনিস কিনে দিয়ে বলল—চলো শালি চলো, নাগরদোলায় চড়ব। এই মাটির পৃথিবীতে বড়োই ধুলো গো! একটু আকাশে উড়ি চলো। ওই তো নাগরদোলা ঘুরছে বনবন বনবন। জামাইবাবুর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে শালি।
কাদের বাড়ির খোকা একটি খেলনা জাহাজ কিনেছে। কী বিশাল জাহাজ! তা দেখে আর একটি ছেলে কেঁদে উঠল। বায়না ধরল বাপের কাছে, বাবা ওই জাহাজ আমার চাই চাই চাই। তুমি কিনে দিবে কিনা বলো।

বাপ বলল, ওরে পাগল অত টাকা আমি কোথায় পাব! তুই তো আগে বলতে পারতিস, গাড়ি কিনলি, বাঁশি কিনলি এবার চল…কিছু খাওয়া-দাওয়া করি। মেলা এলি, জিলিপি খাবি না?

ছেলে নাছোড়বান্দা। বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। কান্নাকাটি করে, আমার চাই চাই চাই। বাবা বলে, নাই নাই নাই…শেষমেষ ছেলে ভুলল। বাবা বলল, ওই নকল জাহাজ নিয়ে কি করবি রে! বাড়ি ফিরে একটা লম্বা বাঁশ কাটব। যখন আকাশে জাহাজ উড়বে, তখন শুধু আমাকে একবার ডেকে দিবি। বাঁশের খোঁচায় তুকে আসল জাহাজ পেড়ে দিব। কত চালাবি, চালা কেনে! নিমেষেই হিল্লি দিল্লি চলে যাবি।

মাটির হাঁড়ি কলশি, বেতের বোনা কুলো, পেছে, চালুনির পসরা নিয়ে এসেছে পালপাড়া, ডোমপাড়ার বউ-ঝিরা। পৌষসংক্রান্তির মেলায় কী নেই! বিভিন্ন সেলের দোকান, পাপড়ি চাট, এগরোল, মোগলাই, চাউমিন..দশটাকায় দাদা পাবে না গাড়ি, হবে না বাড়ি, মিলবে না বউয়ের লাল টুকটুকে শাড়ি, নিয়ে যান যান… হরেকমাল দশটাকা।

বলি ও বৌদি, দাদাকে নিয়ে মেলায় এসেছেন, আর পাপড়ি চাট না খেয়েই চলে যাবেন? আসুন আসুন…কমল সাহার পাপড়িচাট না খেলে, আপনার জীবন বৃথা।

সূর্যের তেজ কমে এসেছে। কমলা থেকে ধীরে ধীরে লাল রং ধারণ করছে। যত সন্ধে ঘনিয়ে আসবে, মেলার ভিড় তত কমতে থাকবে। দিনের মেলা, সন্ধে হলেই শেষ। ভাঙা মেলায় জিনিসপত্রের দাম অনেক কম থাকে। দোকানদাররা খালি করে দিতে চায়। পীর পুকুরের আশেপাশের মানুষজন ভাঙা মেলাতেই কেনাকাটা করে। দূর-দূরান্ত থেকে যারা আসে, তাদের তো আগেই বেরিয়ে পড়তে হয়।

ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে, পা-গুলো ধরে গেলে একসময় টলতে টলতে গাড়ির কাছে হাজির হই। ও বাবা, গাড়িতে তখন নানি, মামি কেনাকাটা করে বসে আছে। গাড়ি যদি জিনিসপত্রেই বোঝাই হয়ে যায়, তাহলে মানুষগুলো চাপবে কোথায় গো! যাবার কালে বাড়ির জন্য গরম জিলিপি কেনা হয়। এরপর ফেরার পালা। সূর্যের তেজ কমে এসেছে। কমলা থেকে ধীরে ধীরে লাল রং ধারণ করছে। যত সন্ধে ঘনিয়ে আসবে, মেলার ভিড় তত কমতে থাকবে। দিনের মেলা, সন্ধে হলেই শেষ। ভাঙা মেলায় জিনিসপত্রের দাম অনেক কম থাকে। দোকানদাররা খালি করে দিতে চায়। পীর পুকুরের আশেপাশের মানুষজন ভাঙা মেলাতেই কেনাকাটা করে। দূর-দূরান্ত থেকে যারা আসে, তাদের তো আগেই বেরিয়ে পড়তে হয়।

ফেরার পথে গরুগুলো কেমন ঝিমিয়ে যায়। সারাদিন গাড়ির চাকার সঙ্গে বাঁধা ছিল। খেয়েছে শুধু ছাউনি থেকে পাড়া দু-আঁটি খড়। শুধু গরুগুলো কেন, মানুষগুলোও ‘আলামারা’ হয়ে গেছে। ওই তো গাড়িতে বসে নানি, মামি, খালা, মা কেমন ঢুলছে। ইটিসিটি কিনে খেলেও, বাঙালির ভাত ছাড়া কি চলে? সেই সকালে পিঠে খেয়ে বেরিয়েছে সবাই। তারপর জিলিপি, পাপড়, তেলেভাজা মুখ চলেছে তো চলেছেই। আনারুল মামা জোয়ান মানুষ। তার ওসবে পোষায় না। দরগাতলায় গিয়ে সিন্নি খেয়ে এসেছে।

রাস্তায় ফিরতি মানুষজনের ভিড়। গরুগুলো নিজের মতো চলতে থাকে। চাকায় বিদায় বেলার করুণ সুর। আসছে বছর আবার হবে। এক বিশাল জনসমুদ্রকে পেছনে ফেলে, সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে কখন যেন মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়তাম। দূর থেকে তখন হয়তো আবছা ভেসে আসত—

খাইরুন লো.. তোর লম্বা মাথার কেশ
চিড়ল দাঁতে হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ
খাইরুন লো…


‘ধুলোমাটির ভুবন’ ধারাবাহিকের অন্যন্য পর্ব
প্রথম পর্ব : ঘরামী চালের ভাত
দ্বিতীয় পর্ব : দু’চাকার বাহন

 

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

হামিরউদ্দিন মিদ্যার জন্ম ১৪ই জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। মূলত গল্পকার। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। বর্তমান, এই সময়, সাপ্তাহিক বর্তমান, আজকাল, প্রতিদিন, অনুষ্টুপ, পরিচয় প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় গল্প লিখেছেন। বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালেও লিখে থাকেন। ২০১৯ সালে কলকাতা বইমেলায় 'সৃষ্টিসুখ' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে গল্পগ্রন্থ 'আজরাইলের ডাক'। লেখালেখির জন্য ২০১৮ সালে পেয়েছেন 'প্রতিশ্রুতিমান গল্পকার সম্মান'। ২০২১ সালে 'আজরাইলের ডাক' গল্পগ্রন্থটির জন্য পেয়েছেন 'দৃষ্টি সাহিত্য সম্মান'। তাঁর গল্প ইংরেজি ও হিন্দিতেও অনুবাদ হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।