শনিবার, জানুয়ারি ২২

হামিরউদ্দিন মিদ্যার রবিবারের ধারাবাহিক : ধুলোমাটির ভুবন | পর্ব-০৬ | আমন ধানের মরশুম

0

আমন ধানের মরশুম


আশ্বিন মাস পড়লেই মনের ভেতর একটা আনন্দের চোরা স্রোত বইতে শুরু করত। আমাদের গ্রামের পাশ থেকেই শুরু হয়েছে বিশাল মাঠ।

মানুষমারী, করচবনি, পলশোড়া, আমসোল, গোলতোড় যেদিকেই তাকানো হোক শুধু সারি সারি সবুজ ধানখেত চোখে পড়বে। ধানগাছের পেট থেকে আশ্বিনে বেরিয়ে আসে ‘থোড়’। থোড় হলো শিষের গর্ভাবস্থা। থোড়ের ভেতরেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে সরু লিকলিকে কচি শিষ। ছোটোবেলায় পাড়ার ছেলেপুলেদের সঙ্গে দল বেঁধে মাঠে যেতাম থোড় খেতে। থোড় খেতে গেলে অবশ্য চাষির চোখকে ফাঁকি দিয়েই মাঠে যেতে হতো। আলপথে চুপটি করে বসে লোকের খেত থেকে টেনে বের করতাম থোড়, তারপর নখ দিয়ে চিরলেই বেরিয়ে আসত সাদা রঙের কচি শিষ। সুতোর গোছার মতো সেই কচি শিষগুলি খেতে কী স্বাদই না লাগত!

অপরিস্ফুট ধানের শিষগুলি ছেলেপুলেরা নষ্ট করলে কোন চাষির মেজাজ ঠিক থাকে! চোখে পড়লেই সর্বনাশ! তাড়িয়ে পগার পার করত আমাদের। কখনও ধপাস করে পড়েছি জলা জমিতে। কাদা গায়ে ঘর ফিরেছি। বাপ-মায়ের বকুনি খেয়েছি। কখনও চাষি নালিশ করে গেছে বাড়ি বয়ে এসে। নালিশ শুনে পিঠটা পাঁজিয়ে দিত আব্বা। তবুও মন মানত না। লুকিয়ে ছুপিয়ে চলে যেতাম মাঠে।

একদিন ঘটে গেল একটা অঘটন। দিলবাহার চাচার ধানখেত থেকে থোড় খেয়ে আমাদের পাড়ার সফিকুল বাড়ি ফিরেই ছটফট করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সদর হাসপাতালে। খেতটাই সকালেই কীটনাশক দিয়ে স্প্রে করেছিল চাচা, সফিকুল তা বুঝতে পারেনি। না বুঝেই অনেকগুলো থোড় খেয়ে ফেলেছিল।

একদিন ঘটে গেল একটা অঘটন। দিলবাহার চাচার ধানখেত থেকে থোড় খেয়ে আমাদের পাড়ার সফিকুল বাড়ি ফিরেই ছটফট করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সদর হাসপাতালে। খেতটাই সকালেই কীটনাশক দিয়ে স্প্রে করেছিল চাচা, সফিকুল তা বুঝতে পারেনি। না বুঝেই অনেকগুলো থোড় খেয়ে ফেলেছিল। ওয়াস করার পর সে যাত্রায় জানে বেঁচে গিয়েছিল সে। তবে আমাদের মনের ভেতর সেই যে ভীতি ঢুকে গেল, আর থোড় খেতে কক্ষনো যাইনি। তবে এখন মাঠঘাট গেলে, ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়লে দু-একটা কচি থোড় টেনে চেখে দেখি বইকি!

আশ্বিন মাসের শেষে ডাক সংক্রান্তি। সূর্য ডোবার আগে পর্যন্ত মাঠে মাঠে শুনতে পাওয়া যায়, ধান ফুল…ফুল…ধান ফুল…ফুল…

চাষিরা স্নান করে পরিশুদ্ধ পোশাকে নলডাকতে যায় মাঠে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধানগাছের সাধ দেওয়া হয়। সন্তান সম্ভবা মেয়েকে যেমন সাধ দেওয়া হয়, এও ঠিক তেমনি। একটি কলার পেটোতে নয় রকম সামগ্রী, যেমন– খুরি ভাঙা, নারকেল নাড়ু, কলা, আদা, কল আঁটি, কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা হলুদ, মানকচু, আরও অন্যান্য ফল দেওয়া হয়। একটি নতুন বাঁশের কঞ্চিতে কার্পাস তুলো জড়িয়ে দেওয়া হয়। এখানে খুরি ভাঙা হলো নতুন বাসনের প্রতীক এবং কার্পাস তুলো হলো নতুন বস্ত্রের প্রতীক। কঞ্চির বদলে কেউ কেউ পাটকাঠি, বা সরকাঠিও ব্যবহার করে। বিকালে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে জমির আলপথ ধরে ঘুরে ঘুরে চাষি ছড়া কাটে,

সবার জমি আলফাল, আমার জমিই ফলুক চাল—
ধান ফুল…ফুল
ধান ফুল…ফুল…

চারধারের আল ঘোরা হলেই ওই সরকাঠি বা পাটকাঠির গোছাটা জমির ঈশান কোনে পুঁতে দেওয়া হয়। চাষির বিশ্বাস মা লক্ষ্মী এতে সন্তুষ্ট হয়ে খেত ভরা ফসল দেবে।

আমাদের মুসলমান পাড়ার চাষিরা পুজো-আচ্চা করত না, তবে ছোটোবেলায় দেখেছি, ডাক সংক্রান্তিতে অনেকেই পাটকাঠি পুঁতে দিয়ে আসত জমিতে। আর ছড়া কাটত, ধান ফুল…ফুল…

আমার দাদোর সঙ্গে অনেকবার নলডাকতে গেছি। মসজিদের ইমামসাহেব এই ব্যপারগুলোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। মিলাদ-মাহফিল হলেই এই প্রসঙ্গগুলো টেনে হাজির করে ‘সেরেকি গোনাহ্’র ফতোয়া দিতেন। অনেকে না মানলেও কিছু কিছু চাষি লুকিয়ে চলে যেত মাঠে। নল না ডাকলে যদি ফলন কম হয়! মা লক্ষী অসন্তুষ্ট হয়!

কার্তিক পড়তেই ধানের শিষে দুধ জমে। গাছ ফলবতী হয়। এই সময় উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করে। সারারাত ধরে পিট পিট করে শিশির পড়ে। ধানের শিষ তাতে পুষ্ট হয়। চাষির তখন চোখে ঘুম থাকে না। শুধু ঘর আর বাহির করে। কবে মাঠের ধান খামারে উঠবে, সেই চিন্তায় দিন গুনে চাষি। বার বার মাঠে গিয়ে দেখে আসে ফলন কেমন হয়েছে। গাছে শিষ দেখেই স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করে দেয়। নতুন ধানের ভাত খাওয়ার আশায় দিন গুনে চাষিবউ, আর রোজ ওপরওয়ালার কাছে মনে মনে প্রার্থনা জানায়, যেন ভালোয় ভালোয় মাঠের ধান তুলতে পারে। মাঠে ধান পেকে গেলেই তো সব নয়। হঠাৎ করে নেমে আসতে পারে বজ্র-বিদ্যুৎ সহ তুমুল ঝড়ঝাপটা। তুষারপাত। তখন এতদিনের তিল তিল করে গড়া স্বপ্ন, নিমেষেই ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে।

প্রতিদিন শিষ কুড়িয়ে কুড়িয়ে বস্তায় ভরে রাখতাম। সামনে পৌষসংক্রান্তি। গ্রামের শেষে পীর পুকুরের পাড়ে মেলা বসবে। তার জন্য টাকা জমাতে হবে না! ধান তোলার মরশুমে শিষ কুড়িয়ে কুড়িয়ে, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ঝুরো ধান বের করে, এক বস্তা, দেড় বস্তা ধান আমরা জোগাড় করে ফেলতাম। সেই ধান মাড়া হলে মল্লিক পাড়ার আবুল কাকার দোকানে চালান যেত।

বড়োদের কথা বাদ দিলাম, আমাদের ছেলেপুলেদের কিন্তু ধান পাকার সময় হলে খুশির সীমা থাকত না। কেন না ধান কাটা হলেই মাঠে মাঠে ঝরে পড়া টুং শিষ কুড়তে যেতাম আমরা। প্রতিদিন শিষ কুড়িয়ে কুড়িয়ে বস্তায় ভরে রাখতাম। সামনে পৌষসংক্রান্তি। গ্রামের শেষে পীর পুকুরের পাড়ে মেলা বসবে। তার জন্য টাকা জমাতে হবে না! ধান তোলার মরশুমে শিষ কুড়িয়ে কুড়িয়ে, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ঝুরো ধান বের করে, এক বস্তা, দেড় বস্তা ধান আমরা জোগাড় করে ফেলতাম। সেই ধান মাড়া হলে মল্লিক পাড়ার আবুল কাকার দোকানে চালান যেত। পুরো টাকাটাই কি আর হাতে পেতাম আমরা? মেলা দেখার জন্য একশো দেড়শো টাকা হাতে পেতাম। তাতেই আমাদের আর কে পায়! খেলনাপাতি কিনে, বিভিন্ন খাবারদাবার খেয়ে এক গা ধুলো মেখে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম। মায়ের জন্য আনতাম, জিলিপি, খাঁজা। বাড়ির প্রয়োজনীয় মাটির হাঁড়িকুঁড়ি, বেতের কুলো, ঝুড়ি, হাত-পাখা সস্তায় পেয়ে গেলে হাত ছাড়া করতাম না। তারপর তো আরও মেলা বসে। সেই চৈত্র মাসের গাজন পর্যন্ত।

কার্তিক শেষে ধানগাছ হলুদ হয়ে আসতেই দাদো চলে যেত বন ধারে। আমাদের এখানে মুনিষ পাওয়া যায় না বেশি। বন ধারের গ্রামগুলো থেকে পরিবার সহ হাঁড়িকুঁড়ি তল্পিতল্পা নিয়ে খাটতে চলে আসে আমাদের এদিকের গ্রামগুলোতে। ওদের ওধারে জমি কম। জলের অভাবে চাষবাস তেমন হয় না। কেউ কেউ কমসম চাষ করলেও, ধান কেটে ঘরে তুলে নেয় আমাদের মাঠের ধান পাকার আগেই। যাতে পুবে খাটতে পারে। ওদের ‘জেঠো’ করে চাষ। মানে অনেক আগেই ধান রোয়ানো হয়ে যায়। পাকেও ‘নামী’ করে। মানে তাড়াতাড়ি।

সেবার এলো শুশুনিয়ার কোলের কোনো এক গ্রাম থেকে একটি সাঁওতাল পরিবার। বুড়োবুড়ি, তাদের দুই ছেলে, ছেলের বউ, আর নাতিপুতি। তখন আমি খুবই ছোটো। আবছা স্মৃতি মনে পড়ে।

বাইরে থেকে খাটতে আসা জন-মুনিষদের গ্রামের মানুষ ‘মাঝি’ বলত। ধান কাটা আর ধান রোয়া এই দুই সিজনেই বড়ো চাষিরা মাঝি এনে রাখত। থাকার জন্য একটা পরিত্যক্ত বাড়ি, কিংবা গোয়ালঘর ছেড়ে দিতে হতো। আর খাওয়ার জন্য চাষিকেই বহন করতে হতো চাল ডাল আলু তেল। মাঠের কাজ শেষ করে, হিসেব করে বেতন গুনে নিয়ে আবার সব তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যেত।

আমার বাবা তখন সদ্য সংসার থেকে পৃথক হয়েছে। একটা টালির ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়ি, উপরে নিচে দুই কুঠুরি। নিচের রুমটা আমাদের ছেড়ে দিয়েছিল দাদো। আর উপরে থাকত ছোটো কাকা।

আমাদের ঘরের পাশেই দাদোদের গোয়ালঘর। গরু-মোষ খুব বেশি ছিল না। এক সময় দাদো গরু ব্যাবসা করত। তখন গোয়ালঘরটা বানানো হয়েছিল। সেই ঘরেরই একটা অংশে গরুগুলোকে পার করে, এক ধারটা ছেড়ে দেওয়া হলো পরিবারটিকে। তাতেই তো সবার হয় না। খামারে তেরপল, খড় দিয়ে তাঁবুর মতো একটা থাকার জায়গা ওরা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছিল।

সকাল বেলা রান্না করে খেয়েদেয়ে সব মাঠে যেত ধান কাটতে। ফিরত বেলা দুটো আড়াইটার সময়। ফেরার পথে নিয়ে আসত খালে-ডোবায় হাতড়ে গেঁড়িগুগলি, চ্যাং-ল্যাটা মাছ, জাড় ব্যাঙ। আলের মাথায় গজানো দু-চারটি কুলেখাড়া, শুশনি শাক, পুকুরপাড় থেকে কচুর গেড়ো, কলমি শাক, কাচা ডুমুর। তরি-তরকারির চিন্তা ওদের করতে হতো না। প্রকৃতি থেকেই সব সংগ্রহ করে নিত। শ্যামলা রঙা ছোটো বউটির একটি খুকি ছিল। ওর নাম আলতারানী। যতদিন আমাদের এখানে ছিল, ওই আলতারানী ছিল আমার খেলার সঙ্গী।

ওর বাপ-মা, দাদু-ঠাকুমা সবাই কাজে যেত মাঠে, এক-দুইদিন আলতারানীও যেত সঙ্গে। আলের মাথায় চুপটি করে বসে থাকত। আমার সঙ্গে যখন ভাব হয়ে গেল, তখন ওদের সঙ্গে যাবার জন্য খুব কান্নাকাটি করতাম।

ওর বাপ-মা, দাদু-ঠাকুমা সবাই কাজে যেত মাঠে, এক-দুইদিন আলতারানীও যেত সঙ্গে। আলের মাথায় চুপটি করে বসে থাকত। আমার সঙ্গে যখন ভাব হয়ে গেল, তখন ওদের সঙ্গে যাবার জন্য খুব কান্নাকাটি করতাম। বাধ্য হয়ে নিয়ে যেত আমাকে। কোনোদিন আলতারানী মাঠে না গিয়ে আমার সঙ্গেই খেলত।

আলতারানীকে সঙ্গে নিয়ে ঝোপেঝাড়ে, বনে-বাদাড়ে, ক্যানেলে, পুকুরপাড়ে কত যে ঘুরেছি! আলতারানীর একটা কথা আজও মনে পড়ে। ক্যানেলের ধারে জলা জায়গায় কতগুলো কচুর গাছ দেখে আফশোস করে বলেছিল, তুদের ই গাঁ-টোতে কত খাবার রে! কুনু অভাব নাই। আমাদের উখানে ইমন কচুগাছ থাকলে পতিদিন চড়চড়ি রাঁধতাম।

আলতারানীর মুখে আমাদের গ্রামের প্রশংসা শুনে বুকটা বেলুনের মতো ফুলে গেছিল। বলেছিলাম, আমাদের এখানে এই কচুগুলো কেউ তো খায় না। এগুলো বদ কচু। আপনা আপনি হয়।

মুখটা ভ্যাংচে আলতারানী বলল, হঅঃ, বদ কচু! আমড়ার টক দিলে সব জব্দ!

তারপর প্রতিবছর ধান রোয়ানো আর কাটার সময় হলেই ওই সাঁওতাল পরিবারটিকে দাদো আগে থেকেই বলে দিয়ে আসত। ওরা সপরিবারে এসে চাষবাসের কাজ উদ্ধার করে দিয়ে যেত। একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল ওদের সঙ্গে। আমিও দিন গুনতাম কবে আলতারানীরা আসবে।

মাঠে ধান কাটা শেষ হলেই গরুর গাড়ির চাকায় পোড়া মবিল ঢালা হয়। আমার শুকুর কাকা খুব ভালো গাড়োয়ান। মাঠে গোবর সার বইতে বলো, ধান বইতে বলো, কাকার মতো মানুষের জুড়ি মেলা ভার।

খামারটা গোবর দিয়ে লেপে পুছে রাখত মা কাকীরা। তারপর গাড়ি গাড়ি ধান উঠত। সেই ধান কখনও টাটকা ঝেড়ে মরাই বেঁধে রাখত। মেঘের অবস্থা খারাপ বুঝলে পালুই দিয়ে রেখে দিত, ঝাড়া হতো পৌষ পরবের আগে।

ধান ঝাড়া হয়ে গেলে গ্রাম থেকে দলে দলে ফিরে যেত জন-মুনিষের দল। আর মা কাকীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত, ভাত মুড়ির চালের জন্য ধান সেদ্ধ করতে। পিঠে খাওয়ার জন্য আলোচাল কুটতে। আলোচাল হলো আসেদ্ধ করা ধান থেকে সরাসরি চাল। এতই সাদা, রোদে মেলে রাখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। অন্ধকার ঘরে রাখলে মনে হবে হাজার আলোর রোশনাই।

ধান ঝাড়া হয়ে গেলে গ্রাম থেকে দলে দলে ফিরে যেত জন-মুনিষের দল। আর মা কাকীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত, ভাত মুড়ির চালের জন্য ধান সেদ্ধ করতে। পিঠে খাওয়ার জন্য আলোচাল কুটতে। আলোচাল হলো আসেদ্ধ করা ধান থেকে সরাসরি চাল। এতই সাদা, রোদে মেলে রাখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। অন্ধকার ঘরে রাখলে মনে হবে হাজার আলোর রোশনাই। তাই বোধহয় নাম আলোচাল। আলোধান কুটা হতো ঢেঁকি দিয়ে। পৌষ পরবের আগে সারা গ্রাম জুড়ে শুধু ঢেঁকির পাড় দেওয়ার শব্দ ভাসত বাতাসে।

আলোচালের গুড়ি থেকে পৌষ-সংক্রান্তীতে বানানো হয় পিঠে পুলি, রুটি পিঠে, আসকি পিঠে, কলের যাতা। নতুন খেজুর গুড় তখন উঠে যায়। গ্রামের মহুলেরা মহলো ছেড়ে পরবে বাড়ি ফিরে। সাথে নিয়ে আসে টিন টিন খেজুর গুড়। সেই টাটকা গুড় কেনার জন্য মহুলেদের বাড়িতে লম্বা লাইন পড়ে যেত।

এখন দিনকাল বদলে গেছে। উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চাষবাসের কাজ সম্পন্ন হয়। আমনধানের মরশুমের সেই আনন্দও হারিয়ে গেছে গাঁ-গ্রাম থেকে। আধুনিক যন্ত্রপাতি কাজ কেড়ে নিয়েছে আলতারানীদের। চাষিদের সঙ্গে জন-মুনিষদের যে মধুর সম্পর্ক ছিল, তাতেও অনেকটা ফাটল ধরেছে। এখন ধানকাটার সময় মাঠে গেলে মানুষজনের হৈচৈ, আনন্দ মশকরা কানে আসে না। শুনতে পাওয়া যায়, ধানকাটা মেশিনের ঘড় ঘড় শব্দ। কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যন্ত্রদানবটা সারা মাঠটাকে কখন যে দখল করে নিয়েছে, আমরা টেরই পাইনি।


‘ধুলোমাটির ভুবন’ ধারাবাহিকের অন্যন্য পর্ব
প্রথম পর্ব : ঘরামী চালের ভাত
দ্বিতীয় পর্ব : দু’চাকার বাহন
তৃতীয় পর্ব : পৌষসংক্রান্তির মেলা
চতুর্থ পর্ব : মোরা এক সুরে গান গাই
পঞ্চম পর্ব : মাছের সেকাল, মাছের একাল

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

হামিরউদ্দিন মিদ্যার জন্ম ১৪ই জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। মূলত গল্পকার। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। বর্তমান, এই সময়, সাপ্তাহিক বর্তমান, আজকাল, প্রতিদিন, অনুষ্টুপ, পরিচয় প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় গল্প লিখেছেন। বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালেও লিখে থাকেন। ২০১৯ সালে কলকাতা বইমেলায় 'সৃষ্টিসুখ' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে গল্পগ্রন্থ 'আজরাইলের ডাক'। লেখালেখির জন্য ২০১৮ সালে পেয়েছেন 'প্রতিশ্রুতিমান গল্পকার সম্মান'। ২০২১ সালে 'আজরাইলের ডাক' গল্পগ্রন্থটির জন্য পেয়েছেন 'দৃষ্টি সাহিত্য সম্মান'। তাঁর গল্প ইংরেজি ও হিন্দিতেও অনুবাদ হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।