শুক্রবার, জুন ১৯

বল চিনলে খেলা বদলায়

0

আমার প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের স্মৃতি কোনো গোলের নয়। জয়ের নয়। পতাকারও নয়। আমার প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতি এক ঘুমের। ২০০৬ সাল। পৃথিবীর কোথাও জার্মানির স্টেডিয়ামগুলো আলোয় ভেসে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্যালারিতে বসে ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছে। অথচ সেই সময় আমাদের গ্রাম ছিল অন্য এক পৃথিবী। সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। রাত নামলে অন্ধকার সত্যিই অন্ধকার হতো। পাশের বাড়ির আলোও চোখে পড়ত না। কেবল জোনাকি, কুপি কিংবা হারিকেনের আলো মানুষের অস্তিত্বের খবর দিত।

আমাদের বাড়িতে একটি সাদাকালো টেলিভিশন ছিল। সে টেলিভিশন ছিল বাড়ির এক বিশেষ সদস্যের মতো। কিন্তু তাকে সচল রাখার জন্য দরকার হতো ব্যাটারি। দূরের বাজারে ব্যাটারি নিয়ে যাওয়া হতো, চার্জ দিয়ে আবার ফিরিয়ে আনা হতো। বিনোদন মোটেই সহজলভ্য ছিল না। একটি ম্যাচ দেখার জন্য প্রস্তুতি ছিল, আয়োজন ছিল, প্রতীক্ষা ছিল। আজকের দিনে হয়তো রূপকথা মনে হবে, সে সময় মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে এন্টেনা ঘুরাত। আরেকজন ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার করে বলত, ‘এইবার ঠিক আছে!’ একটু পর আবার ছবি ঝিরঝির করে উঠলে নতুন করে এন্টেনা ঘোরানো হতো। পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের সংযোগ তখন এতটাই ভঙ্গুর ছিল।

আমি বাবার সঙ্গে রওনা দিলাম। তখন রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখি ছোটোখাটো এক জনসমুদ্র। কেউ মাদুর পেতেছে, কেউ টুল, চেয়ার এনেছে, কেউ বা দাঁড়িয়ে গল্প করছে। খেলা শুরু হতে তখনও অনেক দেরি। কিন্তু অপেক্ষারও তো নিজস্ব আনন্দ আছে। মাঠে তখনও খেলোয়াড় নামেনি, অথচ গ্রামের মানুষজনের ভেতর খেলা শুরু হয়ে গেছে।

বিশ্বকাপ এলে সেই ভঙ্গুর সংযোগেরও আলাদা মর্যাদা তৈরি হতো। সেই রাতে আমাদের ব্যাটারিতে চার্জ ছিল না। বাবা বললেন, কয়েক বাড়ি পরেই এক চাচার বাড়িতে খেলা দেখা যাবে। আমি বাবার সঙ্গে রওনা দিলাম। তখন রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখি ছোটোখাটো এক জনসমুদ্র। কেউ মাদুর পেতেছে, কেউ টুল, চেয়ার এনেছে, কেউ বা দাঁড়িয়ে গল্প করছে। খেলা শুরু হতে তখনও অনেক দেরি। কিন্তু অপেক্ষারও তো নিজস্ব আনন্দ আছে। মাঠে তখনও খেলোয়াড় নামেনি, অথচ গ্রামের মানুষজনের ভেতর খেলা শুরু হয়ে গেছে। কে জিতবে, কে হারবে, কারা সেরা—এসব নিয়ে তর্ক চলছে। টেলিভিশনটি এনে রাখা হয়েছে খোলা উঠানে। মাথার ওপর তারাভরা আকাশ। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। গ্রীষ্মের রাতের গায়ে হালকা উষ্ণতা। আমি বাবার পাশে বসেছিলাম। তারপর? তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।

সকালে ঘুম ভাঙার পর শুনলাম এক আশ্চর্য গল্প। জিদান নাকি একজনকে মাথা দিয়ে আঘাত করেছে। কথাটা শুনে আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। তিনি এমন কাজ করবেন কেন? কিন্তু গ্রামের মানুষজনের মুখে মুখে সেই ঘটনা ঘুরছে। কেউ বলছে রাগের মাথায় করেছে। কেউ বলছে অপমান সহ্য করতে পারেনি। আমি ঘটনাটি দেখিনি। অথচ আমার স্মৃতিতে সেই ঘটনাটিই সবচেয়ে স্পষ্ট। তারপর বহুদিন ধরে জিদানের সেই হেড আমাদের গ্রামে লোককথার মতো বেঁচে ছিল। চায়ের দোকানে, বাজারে, ধানের মাড়াইয়ের ফাঁকে, সন্ধ্যার আড্ডায়—সর্বত্র।

কেউ রাগ দেখাতে গিয়ে মজা করে বলত, ‘দেখিস, জিদানের মতো হেড মেরে দেবো!’

একটি বিশ্বকাপের ফাইনালের ঘটনা কীভাবে হাজার মাইল দূরের একটি গ্রামের কথাবার্তার অংশ হয়ে উঠেছিল, এখন ভাবলে বিস্ময় জাগে। আমার প্রথম বিশ্বকাপ হলো একটি অন্ধকার গ্রামের উঠান। একটি সাদাকালো টেলিভিশন। কিছু মানুষের সম্মিলিত অপেক্ষা। আর এমন একটি ঘটনার স্মৃতি, যা আমি নিজের চোখে দেখিনি, তবু আজও স্পষ্ট দেখতে পাই। সম্ভবত স্মৃতি এমনই।

২০০৬ সালের সেই ঘুমের পর আমি আর আগের মানুষটি থাকলাম না। বয়স বাড়ল কিছুটা। পৃথিবীও যেন একটু কাছে এলো। কিন্তু আমাদের গ্রাম তখনও বিদ্যুতের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারেনি। সন্ধ্যা নামলে অন্ধকার নেমে আসত ধীরে ধীরে। গাছের ডাল বেয়ে, বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে, পুকুরের কালো জলে ভেসে ভেসে। তবু অন্ধকার সম্পূর্ণ ছিল না। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির টিনের চালের ওপর তখন ছোটো ছোটো সোলার প্যানেল বসেছে। সারাদিন তারা সূর্যের আলো জমিয়ে রাখত। সন্ধ্যা হলে সেই জমে থাকা আলো ক্ষীণ সাদা হয়ে মানুষের ঘরে নেমে আসত। ভাবতে ভালো লাগে—দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেডিয়ামে তখন হাজার হাজার বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে, আর আমাদের গ্রামে সূর্যের সঞ্চিত আলোয় মানুষ বিশ্বকাপ দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ফুটবল উৎসব আর আমাদের ছোট্ট গ্রামের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সূর্য।

বিশ্বকাপ আসে। যেভাবে বর্ষা আসে। যেভাবে কাশফুল আসে। যেভাবে হঠাৎ একদিন মাঠের ঘাসের রঙ বদলে যায়। বিশ্বকাপও সেভাবেই এসে গ্রামের বাতাস বদলে দিলো। কোথাও বাঁশ কাটা হচ্ছে। কোথাও রঙিন কাপড় মাপা হচ্ছে। কোথাও সুঁই-সুতোর ভেতর দিয়ে জন্ম নিচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি। দূর থেকে তাকালে মনে হতো গ্রামটি যেন বাংলাদেশে নেই। যেন পৃথিবীর নানা দেশের পতাকা এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের বাড়িতেও পতাকা উঠল। আর্জেন্টিনার। আমার বড়ো ভাই আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিল। আমি ব্রাজিল। একই উঠানের মধ্যে তখন দুই দেশের বাস। বিকেলের মাঠও বদলে গেল। যে মাঠে আমরা একসঙ্গে খেলতাম, সেখানে অদৃশ্য রেখা টেনে দেওয়া হলো। আমরা কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা।

কৈশোর বয়সে মানুষ পতাকা খুব সহজে ভালোবাসে। আর খুব সহজেই ভুলে যায় যে পতাকার ওপাশেও বন্ধু আছে। সেই সময় তর্ক করতে আমার খুব ভালো লাগত। ব্রাজিলের পক্ষে এমন সব যুক্তি দাঁড় করাতাম, যার চেয়ে আবেগ ছিল বেশি, সত্য ছিল কম। প্রতিপক্ষকে হারাতে চাইতাম। তার কথা বুঝতে নয়, তাকে চুপ করিয়ে দিতে চাইতাম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রতিটি তর্কের পর আমার ভেতরে একটা শূন্যতা জন্ম নিত। মনে হতো, আমি কি সত্যিই ফুটবল নিয়ে কথা বলছি? নাকি শুধু নিজের পক্ষকে বড়ো প্রমাণ করার জন্য শব্দ ছুড়ে দিচ্ছি? তর্কে জিতেও কেন যেন হেরে যেতাম। এদিকে পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার শব্দ এসে পৌঁছাচ্ছে আমাদের গ্রামে। ভুভুজেলার অবিরাম গুঞ্জন। মনে হতো যেন অজস্র মৌমাছি একসঙ্গে উড়ছে।

নিজের দলের আনন্দের চেয়ে অন্যের দুঃখ দেখার আকাঙ্ক্ষা কেন এত প্রবল হয়ে উঠেছিল? আর্জেন্টিনা হারল। সেদিন রাতে আমি আর আমার সমবয়সী এক চাচা গিয়ে আমারই ফুফাতো ভাইয়ের বাড়ি থেকে আর্জেন্টিনার পতাকা নামিয়ে আনলাম। উল্লাসে। হৈচৈয়ে। অকারণ বিজয়ের অনুভূতিতে। তাড়াহুড়োর মধ্যে পতাকাটি ছিঁড়েও গেল খানিকটা।

আর বাতাসে ভেসে বেড়াত একটি গান—সামিনা মিনা এ এ…ওয়াকা ওয়াকা এ এ… আমরা ভাষা বুঝতাম না। তবু গানটি বুঝতাম। যেভাবে শিশুরা বৃষ্টির ভাষা বোঝে। চায়ের দোকানে, মাঠে, স্কুলফেরত পথে, হাটের ভিড়ে—গানটি মানুষের মুখে মুখে ঘুরত। আর ছিল অক্টোপাস পল। সমুদ্রের গভীরতার এক প্রাণী কীভাবে আমাদের গ্রামের আড্ডার বিষয় হয়ে উঠেছিল, আজও ভাবলে অবাক লাগে। বিশ্বকাপ আসলে শুধু ফুটবল নয়। এটি পৃথিবীর গল্পগুলোকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ারও এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। তারপর এলো বিদায়ের দিন। ব্রাজিল হারল। মনে আছে, বুকের ভেতর কেমন হাহাকার জমেছিল। কিন্তু তার থেকেও অদ্ভুত ছিল অন্য একটি অনুভূতি। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম আর্জেন্টিনা কবে হারবে। আজ ভাবলে এই জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করে। নিজের দলের আনন্দের চেয়ে অন্যের দুঃখ দেখার আকাঙ্ক্ষা কেন এত প্রবল হয়ে উঠেছিল? আর্জেন্টিনা হারল। সেদিন রাতে আমি আর আমার সমবয়সী এক চাচা গিয়ে আমারই ফুফাতো ভাইয়ের বাড়ি থেকে আর্জেন্টিনার পতাকা নামিয়ে আনলাম। উল্লাসে। হৈচৈয়ে। অকারণ বিজয়ের অনুভূতিতে। তাড়াহুড়োর মধ্যে পতাকাটি ছিঁড়েও গেল খানিকটা। সেদিন বিষয়টি খুব বড়ো কিছু মনে হয়নি।

কিন্তু রাতের নীরবতায় কোথাও যেন একটি প্রশ্ন জেগে রইল।

আমরা কী করছি?

একটি খেলার জন্য আমরা কেন পরস্পরকে ছোটো করছি? কেন বন্ধুদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলছি? কেন আনন্দকে সংঘাতে পরিণত করছি? পরদিন আমি ভুল স্বীকার করেছিলাম। কিন্তু তারও আগে আমার ভেতরে একটি উপলব্ধির জন্ম হয়েছিল।

পতাকাটি ছিঁড়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে ছিঁড়ে গিয়েছিল কৈশোরের এক ধরনের সরল উন্মাদনাও। সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, খেলা মানুষকে একত্র করে, বিচ্ছিন্নও করে।

ফুটবল মাঠে বাইশজন মানুষ দৌড়ায়, অথচ তার ঢেউ পৌঁছে যায় মানুষের ভেতরের অদৃশ্য ভূখণ্ডে। আজ এত বছর পরও যখন কোথাও ‘ওয়াকা ওয়াকা’ শুনি, কিংবা কোনো বাড়ির ছাদে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা উড়তে দেখি, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে আমাদের গ্রামের কথা।

সোলার প্যানেলের নিচে জমে থাকা আলো। বিকেলের মাঠ। তর্কে বিভক্ত বন্ধুদের। ছিঁড়ে যাওয়া একটি পতাকা। আর কৈশোরের সেই মুহূর্তটি, যখন প্রথমবার বুঝতে শিখেছিলাম—ফুটবল শুধু মাঠে খেলা হয় না, মানুষের মনেও খেলা হয়।

এরপরের বিশ্বকাপগুলোও এসেছে। পতাকা উড়েছে। রাত জেগেছে মানুষ। নতুন নায়ক জন্ম নিয়েছে, পুরোনো নায়ক বিদায় নিয়েছে। মেসির চোখে আমি অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া দেখেছি। নেইমারের চোখে দেখেছি ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের ব্যথা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, সেই সময় থেকেই আমি বিশ্বকাপের ভিড় থেকে একটু একটু করে সরে আসতে শুরু করি। এমন নয় যে ফুটবলকে ঘৃণা করতে শিখেছিলাম। বরং আমি প্রশ্ন করতে শিখেছিলাম।

একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, খেলার চেয়ে খেলা-ঘিরে মানুষের আচরণ আমাকে বেশি ভাবায়। বিনোদন কোথায় যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হার মেনে বসেছে। মানুষ নিজের দলের জয়ে আনন্দিত হওয়ার চেয়ে প্রতিপক্ষের পরাজয়ে বেশি উল্লসিত। একটি খেলা, যা আনন্দের জন্য জন্মেছিল, তা অনেক সময় অহংকার, বিদ্বেষ কিংবা কৃত্রিম বিভাজনের বাহন হয়ে উঠছে।

কৈশোরের সেই পতাকা-ছেঁড়ার ঘটনার পর থেকে এই প্রশ্ন আমাকে ছাড়েনি। আমি ভাবতে শুরু করলাম—আমরা আসলে কী উদযাপন করি? খেলাকে, নাকি পরাজিত কাউকে?

আমার শৈশবের মাঠে গোল্লাছুট ছিল। বৌচি ছিল। কানামাছি ছিল। লুকোচুরি ছিল। ছিল আরও কত নাম-না-জানা দেশজ খেলা। সন্ধ্যার আগে মাঠ ভরে উঠত শিশুদের কোলাহলে। আজ সেইসব মাঠের অনেকগুলোই নীরব। কিছু মাঠ হারিয়ে গেছে। কিছু খেলা হারিয়ে গেছে। কিছু শব্দ অভিধান থেকে নয়, জীবন থেকেই মুছে যাচ্ছে।

তারও পরে আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবিয়েছে। বিশ্বকাপ এলে আমাদের গ্রাম, আমাদের শহর, আমাদের উঠান—সবকিছু যেন অন্য দেশের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা স্পেনের পতাকা উড়তে থাকে আকাশে। এতে আনন্দ আছে, উৎসব আছে, সন্দেহ নেই। তবু কোথাও কোথাও আমার মনে হয়েছে, আমরা কি ধীরে ধীরে নিজেদের সাংস্কৃতিক ভূগোল থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না? আমার শৈশবের মাঠে গোল্লাছুট ছিল। বৌচি ছিল। কানামাছি ছিল। লুকোচুরি ছিল। ছিল আরও কত নাম-না-জানা দেশজ খেলা। সন্ধ্যার আগে মাঠ ভরে উঠত শিশুদের কোলাহলে। আজ সেইসব মাঠের অনেকগুলোই নীরব। কিছু মাঠ হারিয়ে গেছে। কিছু খেলা হারিয়ে গেছে। কিছু শব্দ অভিধান থেকে নয়, জীবন থেকেই মুছে যাচ্ছে। আমি জানি, সময় বদলায়। মানুষের বিনোদনও বদলায়। তবু হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর জন্য মন খারাপ হয়।

আরও বড়ো হয়ে বুঝেছি, বিশ্বকাপ আজ শুধু খেলা নয়, এটি একটি বিশাল বৈশ্বিক বাজার। সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং কর্পোরেট শক্তি মানুষের আবেগকে পণ্যে রূপান্তরিত করে। তারা জানে, মানুষ যত বেশি আবেগপ্রবণ হবে, বাজার তত বেশি প্রসারিত হবে। ফলে খেলা ধীরে ধীরে বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে ভোক্তা সংস্কৃতির এক বৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়। কখনও কখনও রাজনৈতিক শক্তিরও প্রদর্শন। কোটি কোটি মানুষের আবেগ সেখানে পণ্য হয়ে ওঠে। আনন্দও বাজারের অংশ হয়ে যায়।

এসব ভেবেই ধীরে ধীরে আমি অন্য পথে হাঁটতে শুরু করেছি।

আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, বিশ্বকাপের রাতে আমি কী করি, আমি বলব—আমি হয়তো একটি বই পড়ি। কোনো ভালো চলচ্চিত্র দেখি। কোনো গান শুনি।

বিকেলে কোনো নদীর ধারে হাঁটি। কোনো গাছের ছায়ায় বসে থাকি। কিংবা কোনো কবিতার একটি লাইন নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ভাবি।
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জীবনকে প্রসারিত করে এমন অনেক আনন্দ আছে। সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, ভ্রমণ, প্রকৃতি, জ্ঞানচর্চা—এসব আমাদের ভেতরের পৃথিবীকে বড়ো করে। আমাদের কল্পনাশক্তিকে উর্বর করে। আমাদের আরও মানবিক করে তোলে। খেলারও সৌন্দর্য আছে, আমি তা অস্বীকার করি না। কিন্তু আমার কাছে খেলা খেলা হিসেবেই সুন্দর। তাকে জীবন-মরণের প্রশ্নে পরিণত করার মধ্যে আমি আর কোনো অর্থ খুঁজে পাই না। আজ যখন বিশ্বকাপের মৌসুম আসে, আমি সেই সাদাকালো টেলিভিশনের উঠানটিকে মনে করি, সোলার প্যানেলের আলোর নিচে বসে থাকা মানুষদের মনে করি, পতাকা নিয়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া কিশোরদের মনে করি। তারপর মনে হয়—আমরা সবাই আসলে আনন্দ খুঁজছিলাম। শুধু কখনও কখনও আনন্দের পথ ভুল করে ফেলেছিলাম।

তাই এখন আমার উন্মাদনা অন্যত্র। একটি ভালো বইয়ের জন্য।

একটি সত্য উচ্চারণকারী কবিতার জন্য। একটি মননশীল চলচ্চিত্রের জন্য। একটি নতুন পথের জন্য। একটি গাছের জন্য। একটি নদীর জন্য।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২৯শে বৈশাখ ১৪০৪, ১২ই মে ১৯৯৭, বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার শ্যামগাঁতী গ্রামে। ঢাকা কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কবিতা ও গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বই : ‘যামিনী ও মরমী ধনুক’ (কবিতা, ২০২১), ‘বই জলের স্বরাজ’ (কবিতা, ২০২৫ 'বাংলা একাডেমি লেখক কর্মশালা ও পুস্তক প্রকাশনা উৎস ২০২৫')। সম্মাননা: স্পর্ধিত তারুণ্য সাহিত্য সম্মাননা ২০২৬ (বগুড়া লেখক চক্র)

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।