শুক্রবার, জুন ১৯

আমার বিশ্বকাপ, আমার আর্জেন্টিনা

0

দু-গলি পরেই চাচার বাড়ি—সেখানে বিশ্বকাপ উৎসব। মহল্লা ভেঙে পড়ে খেলা দেখায়। হুল্লোড় একশ। আমি তাদের মধ্যে সবচে জুনিয়র। নিজের বাড়ির সাদাকালো ন্যাশনাল ছেড়ে, ফিলিপস কালারে। ২০ ইঞ্চি টিভি। তাতেই ছুটছে ম্যারাডোনা।

সালটা ১৯৯০। গ্যান্দা বলতে যা বোঝায়, আমি সম্ভবত তা-ই। সবার হুল্লোড়ে গলা মেলাই, বড়ো ভাইবোনদের সাথে থাকতে পারি, এই আমার আনন্দ। না, আরেকটা আনন্দ আছে—ম্যারাডোনাকে দেখার আনন্দ।

’৮৬-তে ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ জিতেছে। তার উত্তাল অবস্থা ’৯০-এর পাড়ায় পাড়ায়। দেয়ালে লেখা মারাদোনা। দেয়ালে আঁকা ফুটবল। এমন দেয়ালে আঁকা বলেই নাকি প্র‍্যাকটিস করত ম্যারাডোনা। তার শৈশবের গল্প রূপকথার মতো ছোটে। আমার ছোট্ট বুকে ছোট্ট ছোট্ট শ্বাস, আর বিরাট এক স্বপ্ন—এবারও বিশ্বকাপ জিতবে ম্যারাডোনা।


Maradona 86

৮৬-র বিশ্বকাপ জেতার পরে কাপ হাতে ম্যারাডোনা


ঘটনা তা ঘটে না অবশ্য। যে পশ্চিম জার্মানিকে ’৮৬-তে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা, তার কাছেই পরাজিত হয়ে ঘরে ফেরা। রঙিন টিভিতে ম্যারাডোনার ব্যর্থ মুখ মনে লেগে আছে আঁঠার মতো। দুই পকেট ভর্তি কাচের মার্বেল হারিয়েও এত মন খারাপ হয়নি আমার। প্রিয় লাল পেন্সিলটা যেদিন ভেঙে গিয়েছিল সেদিনও কি এতটা বুক ভেঙেছিল? ভাঙেনি।

সেই শুরু। পরাজয়ের গল্পের শুরু। ’৯৪-এ তো প্রিয় ম্যারাডোনার কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়া। শুনলাম, ড্রাগ নিয়েছে। ড্রাগ কি তখনও তো বুঝি না৷ ভাবলাম, ম্যারাডোনা যদি নিয়েই থাকে কিছু, তাতেই বা কি? এমন কি আরও বড়ো হয়েও হিসেব মেলাতে পারিনি; ম্যারাডোনা নিজেই যখন ড্রাগ, তখন তার আলাদা করে ড্রাগ নেয়ার কী প্রয়োজন?

এ সময়েই আমাদের জীবনে আসতে শুরু করে ক্রিকেট। ফুটবলের চেয়ে অধিক আগ্রহে তা আঁকড়ে ধরি। নিজে খেলি, পাগলের মতো খেলাও দেখি। অন্য টিমের জয়-পরাজয়, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। আমাদের কেউ ফিফটি মারলে খুশিতে টিন পেটাই। ক্লাব ফুটবলের ঢেউ তখনও আশপাশে আছড়ে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু আমি নেই সে-সবে। আমার কাছে ফুটবল মানে বিশ্বকাপই শুধু, আর বিশ্বকাপ মানে আর্জেন্টিনা।

ফুটবল ততদিনে নতুন মোড়কে হাজির হচ্ছে। আরও আগ্রাসী যেন, আরও হিসেব-নিকেষের খেলা। কে কোন ছকে খেলছে তা নিয়ে শীতের ঘাটে রোদ পোহানো। আমি এত কিছুতে নেই। আমার কাছে ক্যানিজিয়া মানে ম্যারাডোনার সাথে খেলা প্লেয়ার। বাতিস্তুতা মানে ম্যারাডোনার দলকে বিশ্বকাপ জেতানোর তুরুপ।

কিন্তু হায়! ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা।

যে বন্ধুরা এতকাল ছিল আর্জেন্টিনার সমর্থক, তাদেরও কেউ কেউ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে অন্য দলে। আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করলে এখন একটা বি দলও লাগে৷ নাহলে বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ রাখা যায় না৷ ব্যাজিওর গুণে সেই দল আমার ইতালি৷ কিন্তু কতদিন আর ধৈর্য রাখা যায়? বড়ো এলোমেলো খেলে বিশ্বকাপ থেকে বারবার ছিটকে পড়া, এ সহ্য করাও তো কঠিন! আর ওদিকে ব্রাজিল যেন এক অদ্ভুত ছন্দের জাদুকর হয়ে ওঠা দল। মাঠের মতো এক গতিতে ছোটে, ওড়ে, ধ্বংস করে দেয় প্রতিপক্ষকে; অথচ সকল সৌন্দর্যকে ধারণ করেই। হায়, লাতিন শুধুই ব্রাজিলের পায়ে!

ঠিক এ রকম জায়গায় অনেক নীল বছরে বছরে হলুদ হয়ে গেল। অনেক নতুন হলো ব্রাজিলের সমর্থক। সেটিই ছিল স্বাভাবিক। মানুষ বিজয়ীর সাথে থাকতে চায়, থাকতে চায় সৌন্দর্যের সাথে।

কিন্তু আমি, আমার মতো আরও কয়েক জন, আমরা থেকে গেলাম হারুপার্টি হয়ে আর্জেন্টিনার সাথে। দলবদল হলো না। মনের আশাও ফুরাল না। একদিন হবে, একদিন নিশ্চয় হবে! প্রত্যেক বিশ্বকাপেই শুনি, আর্জেন্টিনার অমুক প্লেয়ার ঠিক আরেকটা ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনা জুনিয়র। আমরা এক বুক আশা নিয়ে খেলা দেখতে বসি। কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে জুনিয়র ম্যারাডোনা গড়াগড়ি খায় মাঠে, জয় আসে না। আমাদের এক-একটা বিশ্বকাপ আসে লজ্জা হয়ে। আমরা জোর গলায় ফুটবল শব্দটাও আর উচ্চারণ করতে পারি না।


Mesi 2

আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি (বাঁয়ে) এবং জার্মানির ম্যাটস হুমেলস ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচে বলের পেছনে দৌঁড়াচ্ছেন


এরপরই একটা ব্যাপার ঘটল। আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড়ের নাম শুনতে পেলাম। অনেক অনেক দিন পর আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড়ের নাম শুনলাম, যার সাথে ম্যারাডোনার তুলনা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে সে নিজেই নিজের মতো করে অতুলনীয়। তার নাম মেসি। সে নাকি বিস্ময় বালক৷ ক্লাবে সে আগুনের কবিতা লিখছে।

হবে হয়তো। আমি অত গা করি না। অনেক দেখেছি এসব। শেষ পর্যন্ত সবাই ম্যারাডোনার সাথে এক জায়গাতেই মিল রাখে—কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ে। ব্যস, এতটুকুই!

কিন্তু মেসিকে নিয়ে দেখি মিথের মতো গল্প হতে থাকে টংয়ে, রাস্তায়, রিকশায়, অফিসে। বার্সেলোনায় কীভাবে কত বয়সে জয়েন করেছে, কেমন খেলে সে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যেহেতু ঘর পোড়া গরু, কারো ওপরেই আর আস্থা রাখি না। মনে মনে ভাবি, দেখব ওই বিশ্বকাপেই!

তা দেখলাম তাকে বিশ্বকাপে। ২০০৪ সালেই তো, নাকি? বদলি হিসেবে নেমেছিল। একটা গোলও করল। কিন্তু বড়াই করে যে যার-তার কাছে তার নাম বলব, তেমন কিছু মনে হলো না একদমই।

এরপর বিশ্বকাপ আসতে থাকে আর মেসির পারদ দুনিয়াজুড়ে বাড়তে থাকে। ক্লাবে সে এই জিতছে সেই জিতছে। কিন্তু আমার তাতে কী? আমার তো ক্লাব নেই। আমার কাছে ফুটবল মানে বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপ মানে ওই আর্জেন্টিনা।

২০১০ সালে ঘটল এক মহাবিস্ফোরণ। ম্যারাডোনা ফিরে এলো আমাদের জীবনে। কোচ হয়ে। ঠিক যেন এক শ্বেতভল্লুক। খেপাটে প্রবাদ পুরুষ। তার অস্ত্র মেসি। ইয়েস, আমাদের অস্ত্রও এবার মেসি। কিন্তু তার কাঁধে দেখি ভালোবাসা রাখা যায়, চাইলে বন্দুকও রাখা সম্ভব, কিন্তু পুরো দল রাখার মতো প্রশস্ত না ওই কাঁধ। মেসি যেন এই আর্জেন্টিনার না, আর্জেন্টিনাও যেন মেসির না। ম্যারাডোনা মেসি মিলে যে ম্যাজিক হবে ভেবেছিলাম, তা হলো না। মেসিকে আমার আপাদমস্তক মনে হলো, পাড়ার ভদ্র ছোটোভাই, যে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে, কিন্তু আমাদের ডোবাপানায় ওই রেজাল্টের বিন্দু পরিমাণ দাম নেই।

ফলে, অ্যালেন স্বপনের মতো হতাশ! বারবার হতাশ! বিপক্ষ বন্ধুদের গঞ্জনা শুনতে শুনতে কান পচে গিয়েছিল এতদিন। এখন ফেসবুক চলে আসায় ‘হাহা’র উৎপাতও নিত্য।

কিন্তু এর মধ্যেই মেসি বদলাতে শুরু করল। খোদ আর্জেন্টিনাতেই তাকে নিয়ে কম দুয়ো দেয়া হয়নি। এসব শুনেই হয়তো ফুটবল ছাড়তে চাইল বেচারা। আমরাও ভাবলাম, হবে না আর। ২০১৪ এর বিশ্বকাপে ফাইনালে গিয়েও ফিরে যাওয়া, ’১৮-র বিদায়, সবই বলছিল, হবে না মেসি, আর না!


messi-maradona

২০১০ সালের বিশ্বকাপে মেসি ও ম্যারাডোনা


আমি ধরেই নিয়েছিলাম মেসিকে আর দেখব না। কিন্তু মেসির ভেতর কিছু একটা হয়েছিল তো নিশ্চয়ই। মেসির যা কিছু অর্জন করা সম্ভব ফুটবলে, তার সবই ছিনিয়ে নিয়েছে। শুধু একটা বিশ্বকাপ নেই তার কাছে। ২০১৮ তে মাঠে মেসি বড়োভাই হয়ে উঠছিল, কিন্তু মনে হয়েছিল দলটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। ’২২-এ এসে সেই অপবাদ ঘুঁচল। দেখলাম, মেসিকে ঘিরে যারা মাঠে ঘুরছে, গোলপোস্টে দাঁড়াচ্ছে তারা সবাই মেসির ভক্ত। মেসির জন্য তারা জীবনও দিতে প্রস্তুত।

আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতল। মেসিরা মাঠে দাঁড়িয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছে, বিশ্বকাপ তুলে নিচ্ছে বুকের কাছে, চুমু দিচ্ছে, এমন দৃশ্য কখনও দেখব, ভাবিনি।


Mesi 1

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পরে ট্রফি হাতে লিওনেল মেসি ও সতীর্থরা


১৯৯০ থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখি আমি বলা যায়, তখন থেকে, জানতামই না জিতলে কেমন লাগে। ২০২২-এ তাই ফাইনালের পর অনেক দিন ঘোর কাটেনি আমার। পুরোনো ফাইনাল এরপর কতদিন যে দেখেছি বলতে পারি না। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতি যে মোহ ম্যারাডোনা আমার ভেতর বুনে দিয়েছিল, মেসি তার বৃত্ত পূরণ করে দিয়েছে। বিজয়ী হওয়ার গৌরব, শত লাঞ্ছনার নীরব প্রতিবাদের ভাষা হয়ে এসেছে। এত আনন্দ, এত উল্লাস যে আমার ভেতরেও বারুদের মতো ঠাসা ছিল, আমি জানতাম না। একদিন মেসির যে কাঁধটা খুব অপ্রসস্ত আর অপ্রস্তুত লেগেছিল, দেখলাম সেই কাঁধটাই পৃথিবীর ভার উঠিয়ে নিয়েছে।

আফসোস শুধু একটাই বিশ্বকাপের এই বিজয়, প্রিয় শ্বেতভল্লুকটা দেখে যেতে পারেনি। কাপটা আরেকবার তার হাতে কেমন লাগে, আমার ধারণা, মেসিরও সাধ ছিল তা দেখার।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮১। দশ বছরের লেখালেখির জীবনে লিখছেন মূলত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বর্তমানে কর্মরত একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘আত্মহননের পূর্বপাঠ’ (২০১০, কবিতা), ‘যে কারণে আমি সাকিব আল হাসান হতে পারি নি’ (২০১৭, রম্য সংকলন), ‘য পলায়তি স জীবতি’ (২০২০, গল্প সংকলন), ‘সিলগালা মহল্লার ব্যালকনিরা’ (২০২১, গল্প সংকলন)। কী একটা অবস্থা (২০২২, রম্য সংকলন), একটা রোদের গল্প (২০২৩, গল্প সংকলন), জাফির অ্যাডভেঞ্চার (২০২৩, কিশোর উপন্যাস), তাশা (২০২৪, বিজ্ঞান কল্পগল্প), গন্ধম (২০২৫, গল্প সংকলন)

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।