১২ ভোল্টের ব্যাটারি
সে সময় ফুটবল বলতে ‘খুব মজার আর এক্সাইটিং একটা কিছু’ ছাড়া আর কিছু না বুঝলেও নানার দেখাদেখি আমিও ছিলাম ব্রাজিল। আমার নানা ছিলেন এক সময়ের জাঁদরেল হেডমাস্টার। তিনি বাদে ঘরের বাকি সবাই আর্জেন্টিনা। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে বেশি উচ্ছ্বাস দেখানোর সুযোগ নেই, তার সাথে ব্রাজিলকে নিয়েও কোনো বিরূপ কথা বলার উপায় নেই। আমাদের ছিল একটা লাল রঙের নিপ্পন সাদাকালো টিভি। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না বলে ১২ ভোল্টের লুকাস ব্যাটারিই ছিল ভরসা। সে ব্যাটারিও আনতে হতো ভাড়ায়। খেলা হতো গভীর রাতে নয়তো একেবারে ভোরের দিকে। আমি এত ছোটো ছিলাম যে খেলা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে উঠে শুধু শুনতাম অমুক জিতেছে, তমুক হেরেছে। একদিন শুনি যে ম্যারাডোনা আর খেলতে পারবে না। সবার কী যে মন খারাপ! কেউ আবার শুরু করেছে কান্নাকাটি যার ভেতরে আবার আমার বোনেরা, কাজিনেরা সবাই আছে। আমি শুধু ভাবছিলাম এই ম্যারাডোনা আবার কে, যার জন্য এত এত মন খারাপ, এত এত কান্নাকাটি আর এত এত চোখের জল! স্কুলের বন্ধু রাশেদকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ম্যারাডোনা কাফের, মদ খাইছে, মদ খেয়ে শক্তি বাড়াই গোল দিছে। ওই দিকে আর্জেন্টিনার ভক্তদের মুখে শুধু কন্সপিরেসি থিওরি। কেউ বলছে এটা ব্রাজিলের ষড়যন্ত্র, ঘুষ দিয়ে এ কাজ করিয়েছে। কেউ আবার বলছে ম্যারাডোনার উপর বদ জ্বিনের আছর পড়ছে। কেউবা বলছে এটা ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ, কোন বিশ্বকাপে জানি হাত দিয়ে গোল দিয়েছে এজন্য।
স্কুলের বন্ধু রাশেদকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ম্যারাডোনা কাফের, মদ খাইছে, মদ খেয়ে শক্তি বাড়াই গোল দিছে। ওই দিকে আর্জেন্টিনার ভক্তদের মুখে শুধু কন্সপিরেসি থিওরি। কেউ বলছে এটা ব্রাজিলের ষড়যন্ত্র, ঘুষ দিয়ে এ কাজ করিয়েছে। কেউ আবার বলছে ম্যারাডোনার উপর বদ জ্বিনের আছর পড়ছে। কেউবা বলছে এটা ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ, কোন বিশ্বকাপে জানি হাত দিয়ে গোল দিয়েছে এজন্য।
এদিকে আমার নানা খুশি, তার সাথে আমিও খুশি। আমরা খুশি খুশি হয়ে বিটিভির খবর দেখছি। খবরের শেষে ম্যারাডোনার আগের কিছু পারফরম্যান্স দেখাল। আমি তো দেখে অবাক। বাহ! এ জন্যই ম্যারাডোনা, এ জন্যই সবাই কাঁদছে! ফাইনালের দিন ঘটে গেল অঘটন। ব্যাটারির চার্জ শেষ। কেউ এই চার্জহীন ব্যাটারি চেঞ্জ করে আনার নেই। বড়ো মামার সাথে কিসের জন্য নানার কথা বন্ধ। আমি গুটিগুটি পায়ে বড়ো মামাকে গিয়ে বললাম ব্যাটারি এনে দিতে। এত বিশাল এক ধমক দিলো মনে হলো যেন বজ্রপাত হয়েছে। এক দৌড় দিলাম। সারাদিন কিছু খেলাম না। রাতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেলাম। কে একজন এসে ডেকে তুলতে এলো, বলল, এই, মামা ব্যাটারি এনেছে, খেলা দেখবি না? আমার মনে রাজ্যের অভিমান। পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে উঠে দেখি আমার বোন, কাজিন সবার মন খারাপ। ইতালি হেরে গেছে। ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমার যতটা খুশি হওয়ার কথা ঠিক ততটাই খুশি হলাম। কিন্তু এত খুশির ভেতরেও লক্ষ করলাম কোথায়, কিসের জন্য জানি আমার মন খারাপ। পরে বুঝলাম, আমার মন খারাপ আসলে ম্যারাডোনার জন্য।
সিঙ্গেল সোফা
১৯৯৮-এর বিশ্বকাপ আসতে আসতে আমি ফুটবল বুঝে গেছি। লেফট ব্যাক, রাইট ব্যাক আর সেন্টার ব্যাকের পার্থক্য বুঝি। ফরমেশন বুঝি। ভলি, ড্রিবলিং এসবও বুঝি। শুধু বুঝি না কোন দল সাপোর্ট করা উচিত। ড্রয়িং রুমে দুইটা সিঙ্গেল সোফার একটাতে আমার পুরো শরীর এঁটে যেত। আমি এক হাতার উপর মাথা আরেক হাতায় পা দিয়ে বাঁকা হয়ে শুয়ে শুয়ে খেলা দেখতাম। ততদিনে ১২ ভোল্টের ব্যাটারির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। গ্রামে ইলেকট্রিসিটির লাইন এসেছে। তবুও একটা ব্যাটারি রাখা। যদি ইলেকট্রিসিটি চলে যায় তখন ব্যাটারি দিয়ে টিভি চালানো হবে। আমার খেলা দেখার সাথী ছোটো মামা। একদিন জাপান আর আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে বসলাম। ছোটো মামা জাপানের সাপোর্টার, কারণ জাপান আমাদের এশিয়া মহাদেশের দেশ। আমি কোন দল সাপোর্ট করব বুঝতে পারছি না। খেলা দেখতে বসে বাতিস্তুতা, ওর্তেগা, ভেরন, লোপেজ এদের খেলা দেখে আমি অবাক। এর মধ্যে বাতিস্তুতা গোল দিয়ে বসল। আমি অজান্তেই চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলাম। প্রায় সাথে সাথে ছোটো মামা ক্ষোভে ফেটে ধমক দেয়া শুরু করলেন। বললেন আমি যেন দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে চলে যাই, এই সেই। আমি আস্তে করে সেখান থেকে চলে গেলাম। সেদিন বাতিস্তুতা, ওর্তেগা, ভেরনদের মনকাড়া খেলা আর ছোটো মামার ধমক আমাকে বাকি জীবনের জন্য আর্জেন্টিনার সাপোর্টার বানিয়ে দিলো। মনে আছে প্রায় সবগুলো ম্যাচই সেই সিঙ্গেল সোফায় বসে উপভোগ করেছিলাম সেইবার। আমার এই উপভোগের পাতে ছাই দিয়ে দিলো নেদারল্যান্ডস। তখন অবশ্য হল্যান্ড নামে চিনতাম। দুর্দান্ত টিম ছিল হল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচে একেবারে শেষ মিনিটে বুকে ছুরি বসিয়ে দিলো ডেনিস বার্গক্যাম্প। এখনও যেন এই নাম লিখতে গিয়ে মুখের ভেতর তিতা হয়ে আসছে।

গোল করার পর লিওনেল মেসি
এক টাকার বাজি
সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার টিম ছিল সর্বকালের সেরা টিম আর আমি ছিলাম আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা সাপোর্টার। ২০০২ এর কথা। আমি তখন চট্টগ্রামে ছোটো ফুফুর বাসায়। সেখানে সবাই ব্রাজিল, এমনকি সেই বাসার ফার্নিচারগুলোও। আমাদের সাথে খেলা দেখত শাহালম ভাই নামে একজন। ব্রাজিলের ডাইহার্ড ফ্যান। ইংল্যান্ডের সাথে সেকেন্ড ম্যাচ হারার পরপরই ঘোষণা দিলেন যে আর্জেন্টিনা প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যাবে। আমি বললাম না। তিনি বললেন হ্যাঁ। আমি বললাম বাজি, তারপর তিনিও বললেন বাজি। জিজ্ঞেস করলেন, আমার কাছে ওই মুহূর্তে কত টাকা আছে। আমি পকেট হাতড়ে দেখলাম এক টাকার একটা পিতলের কয়েন আছে। সেই এক টাকারই বাজি ধরা হলো। সুইডেনের সাথে খেলা। আমি নিশ্চিত আর্জেন্টিনা জিতবে। কিন্তু জেতা আর হলো না, হলো ড্র। আর্জেন্টিনা বাদ। থমথমে মুখ করে এক টাকার সেই মহামূল্যবান কয়েন দিয়ে দিলাম। রাতে দেখা গেল কিছুতেই আমি খাচ্ছি না, আর ছোটো ফুফু আমার হাত ধরে টানছেন খেতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু একচুলও নাড়াতে পারছেন না। আমি যেন মরে শক্ত হয়ে গেছি।
হাওলাতের টিভি
২০০৬-এর বিশ্বকাপ। ইউনিভার্সিটিতে ওঠার পর প্রথম বিশ্বকাপ। সে এক টানটান উত্তেজনা। কিন্তু খেলা কোথায় দেখব তার কোনো ঠিক নেই। শুরু করলাম টিভি খোঁজা। একটা সেকেন্ডহ্যান্ড টিভি দেখলাম, মাত্র ২৪০০ টাকা। তখন এই টাকা আমাদের কাছে অনেক। আমার কলেজ থেকে স্কলারশিপের মতো পাওয়া কিছু টাকা হাতে ছিল। সাহস করে সেই টাকা নিয়েই চলে গেলাম টিভি কিনতে। কিন্তু খুব দেরি হয়ে গেছে। দোকানদার সকালেই বিক্রি করে দিয়েছেন। মন খারাপ করে গেলাম আমার এক ধনী বোনের বাসায়, তার বাসায় অনেকগুলো টিভি। গিয়ে বললাম, আপু ভিক্ষা দেন একটা টিভি, নয়তো হাওলাত দেন। হাওলাত দিলেন। সেই টিভিতে দেখলাম এই বিশ্বকাপ। কিন্তু সেই একই কপাল। এবারও আর্জেন্টিনা বাদ দ্বিতীয় রাউন্ডে। আমি আর বন্ধু মেহেদী মন-টন খারাপ করে আধা কেজি মিষ্টি খেলাম। অবশ্য এর পরেও সেই বিশ্বকাপ অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখেছিলাম। ফাইনালে জিদানের সেই ঢুঁস আজও মনে আছে, জিদানকেও মনে আছে। মনে আছে, আমার এক টিউশনের ছাত্রের ভাগ্নের নাম রেখেছিলাম আমি, জিদান।
যেদিনই আর্জেন্টিনার ম্যাচ সেদিন চলে যাই মেহেদীর বাসায়। দুই বন্ধু মিলে আর্জেন্টিনার একের পর এক জয় দেখি। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি দেই। বিজয়ের এই হাসি বেশিদিন থাকে না। মনে আছে জার্মানির কাছে সেই হারের পর দুজনেই মিইয়ে গেলাম।
আবার ম্যারাডোনা
ম্যারাডোনাকে মাঠে দেখার সুযোগ আবার হলো ২০১০-এ। এবার তো আমি আর আমার বন্ধু মেহেদী সিওর যে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন। ম্যারাডোনা যেখানে কোচ সেখানে তো অন্য কেউ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রশ্নই আসে না। জীবনে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখব, সে কী থ্রিল আমাদের মধ্যে! যেদিনই আর্জেন্টিনার ম্যাচ সেদিন চলে যাই মেহেদীর বাসায়। দুই বন্ধু মিলে আর্জেন্টিনার একের পর এক জয় দেখি। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি দেই। বিজয়ের এই হাসি বেশিদিন থাকে না। মনে আছে জার্মানির কাছে সেই হারের পর দুজনেই মিইয়ে গেলাম। মিইয়ে গেলেও সবগুলো ম্যাচই দেখেছিলাম। আমাদের দুজনেরই মন কেড়ে নিয়েছিল দিয়েগো ফোরলান। আমরা তার নাম দিয়েছিলাম রাজকুমার। কারণ তাকে মাঠে এখলেই মনে হতো কোনো এক রাজা বুঝি খেলতে নেমেছে। শুনেছি ফোরলান এখন টেনিস খেলে। আমার আরেক প্রাণের খেলা। ATP র্যাংকিংয়েও নাম এসেছে। আসলেই রাজকুমার!
মেসি! মেসি!
তখন আমার মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। পড়াশোনা শেষ কিন্তু চাকরি-বাকরি কিছুই পাচ্ছি না। সমানে ভাইভা দিয়ে যাচ্ছি। বেশ ভালো ভাইভা দিলেও চাকরি আর হয় না। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেল ২০১৪ বিশ্বকাপ। ততদিনে এইসব বিশ্বকাপ-টাপ নিয়ে আমার সব ধরনের মোহ শেষ। জ্ঞান এত পরিমাণ বেড়েছে যে বুঝে গিয়েছি এইগুলা সব পুঁজিবাদীদের ধান্ধাবাজি। আমাদের মতো গরিব, ছোটোলোকেদের ভুলিয়ে রাখার জন্য এক ধরনের ড্রাগ। সব মূর্খ মানুষজনের আগ্রহ, উচ্ছ্বাস দেখে মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি দেই। অবশ্য এর সবই উবে গেল আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন। একটা চা দোকানে বসে পুরো ম্যাচ দেখলাম। চা খেলাম মিনিমাম দশ কাপ। আর্জেন্টিনা জিতল। আহা! কী যে এক শান্তি! আমি মুহূর্তেই সব ভুলে গেলাম। আমার মনেই থাকল না যে আমার বন্ধুদের সবার চাকরি হয়ে গেছে একমাত্র আমি ছাড়া। আমার এটাও মনে থাকল না যে এসব খেলা, উন্মাদনা সবই আসলে ক্যাপিটালিস্টদের ভাওতাবাজি। মেসি আর আর্জেন্টিনা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকলাম টানা এক মাস। বন্ধুরা কেউ পাশে নেই। অবশ্য তাতে কোনো সমস্যা হলো না। বেশ কিছু জুনিয়র আর্জেন্টিনা ফ্যান জুটিয়ে নিলাম। সারা দিন খালি মেসি মেসি করি। মেসির যা কিছু সব নিয়েই গল্প করি। গল্প করতে করতে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসি যে মেসিই আসলে সর্বকালের সেরা, শুধু একটা বিশ্বকাপ হাতে তোলা বাকি। কে একজন একবার মেসিকে মাছি বলার ঘটনা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াল। ফাইনালের দিন সে কী উত্তেজনা! গলা সমান এড্রেনালিন রাশ! কিন্তু শেষমেশ আর হলো না। ম্যাচ শেষে আর এক সেকেন্ডের জন্যও বসলাম না। মেসির হতাশ চেহারা দেখতে ইচ্ছে করছিল না। সোজা গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কীভাবে কী হলো জানি না হঠাৎ আবিষ্কার করলাম চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ছে। আবার সেই ছোটোবেলায় ফিরে গেলাম। এক পাশ থেকে আরেক পাশে ফিরব সেই শক্তিটুকুও নেই, যেন আমি মরে শক্ত হয়ে গেছি।
হায়! এমবাপ্পে!
২০১৮-তে আমার অবস্থা আর আগের মতো নেই। চাকরি বাকরি হয়ে গেছে। দেশের বাইরেও অনেক দিন থেকে এসেছি। জীবন অনেক শান্ত আর স্থির। তাই সেই বিশ্বকাপটা হওয়া উচিত ছিল শান্ত আর স্থির। কিন্তু বিশ্বকাপ কী কখনও স্থির হয়! কখনও যা করি না, তার সবই করলাম। আর্জেন্টিনার জার্সি কেনা, ছাদে বিশাল পতাকা টানানো, রাস্তাঘাটে ব্রাজিলকে পচানো, হেন কোনো কর্ম বাদ নেই। মাঠে মেসি আর এখানে আমি, দুজনই অপেক্ষায় স্বপ্নের সেই কাপ আমাদের হবে। কিন্তু এবারও হলো না। আইসল্যান্ডের সাথে প্রথম ম্যাচ, ড্র। তখনও মাথা ঠান্ডা, তখনও বুকের ভেতর সেই পুরোনো আশার প্রদীপ নিভু নিভু করে জ্বলছে। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া ঝড়ের মতো এক করুণ ভবিতব্য লিখে দিতে এলো। আর্জেন্টিনা, মেসি আর আমি, আমাদের সবাইকে বিধ্বস্ত করে দিলো। কোনোরকমে নক আউট পর্বে গেলেও সেই পর্যন্ত গিয়েই থামতে হলো। কী এক অসাধারণ খেলা খেলেও তার কাছে হারতে হলো। মেসি মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ল আর আমি মাথা নিচু করে বসে থাকলাম সোফায়। বাতাসে এত এত অক্সিজেন থাকা সত্ত্বেও আমি হাঁসফাঁস করতে লাগলাম। এক কিশোর সারা জীবনের জন্য আমার অন্তরে দাগ ফেলে দিলো। হায়! এমবাপ্পে!
দ্য ডে অর দ্য নাইট
সেইবার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম যে আর কোনো আশা করব না, হতাশও হবো না। এভরিথিং উইল রিমেইন কুল অ্যান্ড কাম। তার ধারাবাহিকতায় আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ না দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিকে আর্জেন্টিনা আর সৌদি আরবের খেলা চলছে আর অন্য দিকে আমি কিশোরগঞ্জ ক্লাবে টেনিস খেলছি। কিন্তু, কীসের টেনিস খেলা, মন পড়ে আছে কাতারে! বল মারি একদিকে যায় আরেকদিকে। শেষে যখন শুনলাম সৌদি আরব জিতেই গিয়েছে, খেলা বাদ দিয়ে চলে এলাম। এবার আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম, খেলা তো আর দেখবই না, আর্জেন্টিনার নামও মুখে নেব না। এর মধ্যে আবার হয়ে গেলাম ট্রান্সফার। নতুন জায়গায় গিয়েও সিদ্ধান্তে অনড় থাকলাম। আগের মতো জার্সি নেই, আগের মতো পতাকা নেই, আগের মতো কিছুই নেই। কিন্তু কিছু না থেকেও কী যেন একটা রয়ে গেছে! আর্জেন্টিনা একের পর এক ম্যাচ জেতে আমার ভেতরটা খুশিতে পূর্ণ হয়ে যায়। প্রতি ম্যাচ শেষে মানুষজনের হই-হুল্লোড়, নাচানাচি টের পাই, কিন্তু নিজে কিছুই করি না। মনে হয় আমি একটু উচ্ছ্বাস দেখালেই আর্জেন্টিনা হেরে যাবে। আমার এই ম্রিয়মাণ অবস্থা ভাই বন্ধু কেউ যেন বিশ্বাস করে না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমি আরও যেন চুপ হয়ে যাই। মাঝেমধ্যে টেনে টেনে বলি, আরে না, এরা আর কাপ পাবে না। কিন্তু আমার ভেতরে যে কী চলছে তা কেবল আমি আর ঈশ্বরই জানে। যখনই বলি যে এদের দিয়ে হবে না, আমার ভেতরের সব ভেঙে যায়। নিজের কথা নিজেই বিশ্বাস করি না। আমার ভেতরে কে একজন যেন ঠিক জানে এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাই হবে, এবার এই গ্লোব ধরে থাকা সোনালি দুই মানবমূর্তি মেসির হাতেই উঠবে।
টাইব্রেকারের শেষ গোলটা যখন হলো আমার ভেতর সবকিছু মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। সেই ক্ষনিকের নীরবতার ভেতর পুরো একটা জীবন ছিল, ছিল এক দীর্ঘ অপেক্ষা। দুই চোখ এতটাই জলে ভরে এলো যে আমি কিছুই দেখছিলাম না।
অনেকটা হুট করেই যেন, আবার মনে হয় যেন খুব ধীরে সেই দিন এলো বা এলো সেই রাত। আমি বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। টিভি সেটের সামনে একা বসে। কারও সামনে নিজের হার দেখতে চাচ্ছিলাম না। ম্যাচের প্রতি পরতে যেন আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে যেতে চাচ্ছিল। আমি বদলাতে চাচ্ছিলাম না। কেউ একজন বলছিল এইবার হবে, এইবারই হবে। আবার অন্য কে যেন বলছিল, না, শেষে দেখবি কিছুই হবে না। সে যে কেমন এক স্নায়ুযুদ্ধ নিজের সাথেই নিজের, বিশ্বাসের সাথে অবিশ্বাসের, তা কখনোই কাউকে বোঝানো যাবে না। এরপরের কথা সবার জানা। টাইব্রেকারের শেষ গোলটা যখন হলো আমার ভেতর সবকিছু মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। সেই ক্ষনিকের নীরবতার ভেতর পুরো একটা জীবন ছিল, ছিল এক দীর্ঘ অপেক্ষা। দুই চোখ এতটাই জলে ভরে এলো যে আমি কিছুই দেখছিলাম না। এরমধ্যে একটা বাজি পোড়ানোর শব্দ এলো। আমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দূরের রাস্তা থেকে প্রচণ্ড হই-হল্লা আর চিৎকারের শব্দ। ডিসেম্বরের শীতের রাত। ঘন অন্ধকার আর কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আচমকা কী যে হলো, দিলাম এক দৌড় সেই অন্ধকারের ভেতরে আর চিৎকার করতে থাকলাম এলোমেলো। দৌড়াতে দৌড়াতে নিজেকে প্রচণ্ড সুখী মনে হলো। জীবনে প্রথমবারের মতো টের পেলাম সুখ বিষয়টা আসলে কেমন। কেউ বিশ্বাস করবে কি না জানি না, এটা সত্যি যে এতটা সুখী নিজেকে আমার আগে কখনোই মনে হয়নি। মেইন রোডে উঠে দেখলাম শত শত মানুষ, হাসছে, আনন্দে চিৎকার করছে। এক বুড়োকে দেখলাম রাস্তার সব ধুলা গায়ে মেখে গড়িয়ে গড়িয়ে কাঁদছে। এক কিশোর চিৎকার করে বলছে, ওরে আমারে কেউ ধর, আমারে কেউ ধর। আমি বসে পড়লাম, চারপাশে অন্ধকার। হাজারও মানুষের আবেগ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সবাই যেন সম্মোহিত হয়ে আছে। ফুটবলের ভেতর এ কোন রহস্য লুকানো জানি না। মনে হলো, দিস গেম ইজ নট অ্যাবাউট এ কাপ অর বিয়িং চ্যাম্পিয়ন। দিস ইজ নট অ্যাবাউট মেসি অর নেইমার অর ব্রাজিল অর আর্জেন্টিনা অর মেনি আদার থিংস। দিস ইজ অ্যাবাউট আস অ্যান্ড অল অ্যাবাউট আস।

জন্ম ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে হলেও ফেনীতে বেড়ে উঠা। পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে। পড়তে ভালোবাসেন। বর্তমানে একটি সরকারি দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।