বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব ও মানববিজ্ঞানের জগতে যে কয়েকজন চিন্তাবিদ গভীর প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাঁদের মধ্যে ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদা (Jacques Derrida) অন্যতম। তাঁর প্রবর্তিত ‘ডিকনস্ট্রাকশন’ (Deconstruction) কেবল একটি সমালোচনাপদ্ধতি নয়; বরং চিন্তার প্রতিষ্ঠিত ভিত্তিকে নতুন করে প্রশ্ন করার একটি দার্শনিক ভঙ্গি। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা Structure, Sign and Play in the Discourse of the Human Sciences আধুনিক চিন্তার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রবন্ধে দেরিদা স্ট্রাকচারালিজমের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেন এবং দেখান, যে কাঠামোকে এতদিন স্থির, সুসংহত ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হতো, তার মধ্যেই অনিশ্চয়তা, বৈপরীত্য ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।
এই কারণেই তিনি ‘the structurality of structure’ বা ‘কাঠামোর কাঠামোগততা’ ধারণাটি সামনে আনেন। তাঁর মতে, স্ট্রাকচারালিজম নানা ধরনের কাঠামো বিশ্লেষণ করলেও, ‘কাঠামো’ ধারণাটিকেই কখনও গভীরভাবে পরীক্ষা করেনি।
জ্যাক দেরিদা শুধু বিভিন্ন কাঠামো (structure) নিয়ে আলোচনা করেননি; বরং কাঠামো নিজেই কীভাবে কাজ করে, সেই প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। এই কারণেই তিনি ‘the structurality of structure’ বা ‘কাঠামোর কাঠামোগততা’ ধারণাটি সামনে আনেন। তাঁর মতে, স্ট্রাকচারালিজম নানা ধরনের কাঠামো বিশ্লেষণ করলেও, ‘কাঠামো’ ধারণাটিকেই কখনও গভীরভাবে পরীক্ষা করেনি।
দেরিদা বলেন, ‘কাঠামো’ ধারণাটি মানবজ্ঞান (episteme)-এর ইতিহাসের মতোই প্রাচীন, কিন্তু এর প্রকৃতি নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। কাঠামো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি প্রথমে ‘কেন্দ্র’ (center) ধারণার কথা বলেন। কেন্দ্র হলো এমন একটি সংগঠক নীতি (organizing principle), যা কাঠামোকে স্থিতি, ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা প্রদান করে। অর্থাৎ কেন্দ্রই একটি কাঠামোকে তার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে কেন্দ্র স্বাধীন খেলার (play) সম্ভাবনাকেও সীমাবদ্ধ করে। কারণ কেন্দ্র থাকলে কাঠামোর সীমানা নির্ধারিত হয়, ফলে সেই সীমার মধ্যেই চিন্তা ও আলোচনা আবদ্ধ থাকে।
কেন্দ্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কাঠামোর অংশ হলেও কাঠামোর ভেতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের দ্বারা নিজে প্রভাবিত হয় না। অর্থাৎ কেন্দ্র একদিকে কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করে, অন্যদিকে আবার কাঠামোর বাইরেও থাকে। এখানেই একটি মৌলিক বৈপরীত্য তৈরি হয়—যে কেন্দ্র পুরো কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে, সে নিজেই সেই কাঠামোর পূর্ণতার বাইরে অবস্থান করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বহুদিন ধরে ঈশ্বরকে মানবজীবনের কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। তিনি মানুষের জীবন ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রক, কিন্তু নিজে মানবজীবনের অংশ নন। অর্থাৎ তিনি মানবজীবনের ‘খেলা’ বা পরিবর্তনের মধ্যে উপস্থিত নন। এই ধরনের কেন্দ্রকেই দেরিদা ‘transcendental signifier’ বা ‘অধিবাস্তব সংকেতক’ (অতিক্রমী সংকেতক) নামে অভিহিত করেন।
সবশেষে দেরিদা বলেন, কেন্দ্রের প্রধান কাজ হলো স্বাধীন খেলাকে সীমাবদ্ধ করা। মানুষের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে, কেন্দ্র সেই উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি স্থিতিশীলতার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
এরপর দেরিদা ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখান যে, কোনো কেন্দ্রই চিরস্থায়ী নয়। এক সময়ের কেন্দ্র অন্য সময়ে অন্য একটি কেন্দ্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। ফলে কাঠামোকে পরিচালনা করার মূল নীতিও ইতিহাসের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। যেমন, মধ্যযুগে ঈশ্বর ছিলেন সমাজের কেন্দ্র; কিন্তু রেনেসাঁ-র সময় সেই স্থান দখল করে ‘মানুষ’। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে কাঠামোর কেন্দ্র অপরিবর্তনীয় হলেও, ইতিহাসের ধারায় সেই কেন্দ্র বদলে যেতে পারে।
এরপর দেরিদা ‘rupture’ বা ‘ভাঙন’ ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। এই ভাঙন তখনই ঘটে, যখন মানুষ প্রথমবারের মতো ‘কাঠামো’ ধারণাটিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে। অর্থাৎ কাঠামোর কাঠামোগত প্রকৃতি (structurality) বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে ওঠে। এই বিশ্লেষণের ফলেই কাঠামোর স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং তার কেন্দ্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
কেন্দ্র বিলুপ্ত হলে আর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণবিন্দু বা চূড়ান্ত অর্থের উৎস থাকে না। তখন শুরু হয় ‘অসীম খেলা’ (infinite play)। প্রতিটি সংকেত (sign) তখন অন্য সংকেতের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে অর্থ লাভ করে; কোনো সংকেতের অর্থ আর স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকে না। এমনকি ‘transcendental signifier’ ধারণাটিও অন্য সংকেতের সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে হয়। ফলে আর কোনো চূড়ান্ত কেন্দ্র বা নিরঙ্কুশ সত্য থাকে না; সবকিছুই পরিণত হয় এক চলমান ভাষ্য (discourse)-এ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই ‘কেন্দ্রচ্যুতি’ (decentering) বা কাঠামোর কাঠামোগত প্রকৃতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সূচনা কোথায় এবং কীভাবে ঘটল?
দেরিদার উত্তর হলো, এর পেছনে কোনো একক ঘটনা বা নির্দিষ্ট মতবাদ কাজ করেনি। বরং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদের ভাবনা এই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ফ্রিডরিখ নীটশে: যিনি অধিবিদ্যা, বিশেষত ‘সত্তা’ (Being) ও ‘সত্য’ (Truth)-এর ধারণার সমালোচনা করেন।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড: যিনি মানুষের আত্ম-উপস্থিতি (self-presence) বা নিজেকে সম্পূর্ণভাবে জানার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
মার্টিন হাইডেগার: যিনি অধিবিদ্যা ও অস্তিত্বতত্ত্ব (ontology)-এর প্রচলিত ভিত্তিকে ভেঙে নতুনভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানান।
এই তিনজনই পুরোনো কেন্দ্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা এমন এক বৃত্তের মধ্যে প্রবেশ করেন, যেখানে ‘অধিবিদ্যার ইতিহাস’ এবং ‘অধিবিদ্যার ধ্বংসের ইতিহাস’ পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার—দেরিদা কোথাও কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কথা বলেন না। বরং তাঁর মতে, সমালোচনা করার জন্যও কাঠামোর প্রয়োজন আছে। তিনি কেবল এমন এক নতুন ধরনের ‘খেলা’ (play)-এর সম্ভাবনার কথা বলেন, যা প্রচলিত সংকেত (sign) ও অর্থের ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে না।
দেরিদা তাঁর আলোচনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান ভাষাবিদ ফার্দিনাঁ দ্য সসুর-এর (Saussure) সংকেততত্ত্ব (Theory of the Sign)-এর মাধ্যমে। সসুরের মতে, প্রতিটি সংকেত (sign) দুটি অংশ নিয়ে গঠিত—সংকেতক (signifier) এবং সংকেতিত (signified)। সংকেতক হলো কোনো শব্দ, ধ্বনি বা দৃশ্যমান রূপ; আর সংকেতিত হলো সেই শব্দ বা রূপের মাধ্যমে আমাদের মনে যে ধারণা বা অর্থ তৈরি হয়।
দেরিদা সংকেতের ধারণাকে পুরোপুরি বাতিল করতে চান না। বরং তিনি সংকেতক ও সংকেতিতের মধ্যে যে কঠোর দ্বৈত বিভাজন (binary opposition) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর মতে, এই সম্পর্ককে বোঝার দুটি প্রচলিত উপায় রয়েছে।
দেরিদা সংকেতের ধারণাকে পুরোপুরি বাতিল করতে চান না। বরং তিনি সংকেতক ও সংকেতিতের মধ্যে যে কঠোর দ্বৈত বিভাজন (binary opposition) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর মতে, এই সম্পর্ককে বোঝার দুটি প্রচলিত উপায় রয়েছে।
প্রথম উপায় হলো, সংকেতক ও সংকেতিতের মধ্যে যে সম্পর্ক প্রচলিতভাবে গড়ে উঠেছে, তাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেওয়া।
দ্বিতীয় উপায় হলো, এই সম্পর্ককেই সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে দেওয়া।
কিন্তু দেরিদা এই দুই পথের কোনোটিকেই চূড়ান্ত সমাধান বলে মনে করেন না। তিনি এমন এক নতুন চিন্তার পদ্ধতির সন্ধান দেন, যা পুরোনো কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়, আবার তাকে পুরোপুরি ধ্বংসও করে না।
এই কারণেই তাঁর মতে ফ্রয়েড, হাইডেগার এবং নীটশে-এর চিন্তাও একটি সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে যায়। তাঁরা পুরোনো কাঠামোকে ভাঙতে চাইলেও, সেই সমালোচনা করতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত একই কাঠামোর ভাষা, ধারণা ও যুক্তির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। অর্থাৎ কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়েও তাঁরা কাঠামোর মধ্যেই অবস্থান করেন।
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে দেরিদা নৃতত্ত্ব (Ethnography)-এর উদাহরণ দেন। নৃতত্ত্ব ইউরোপকেন্দ্রিক (Eurocentric) দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং দেখায় যে ইউরোপই মানবসভ্যতার একমাত্র কেন্দ্র নয়। কিন্তু এই সমালোচনাও ইউরোপীয় জ্ঞানব্যবস্থা ও ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। ফলে ইউরোপকেন্দ্রিকতাকে অস্বীকার করলেও সেই একই বৌদ্ধিক পরিসরের ভেতরেই আলোচনা চালিয়ে যেতে হয়।
এরপর দেরিদা ক্লদ লেভি-স্ট্রস-এর দ্বৈত-বিরোধ (binary opposition)-এর ধারণা বিশ্লেষণ করেন। লেভি-স্ট্রস মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রধানত দুটি বিপরীত শ্রেণিতে ভাগ করেন—প্রকৃতি (Nature) এবং সংস্কৃতি (Culture)।
তাঁর মতে, যা স্বতঃস্ফূর্ত, জন্মগত ও সর্বজনীন, তা প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। আর যা সমাজের মাধ্যমে শেখা, অর্জিত ও নিয়ন্ত্রিত, তা সংস্কৃতির অংশ।
কিন্তু দেরিদা দেখান যে বাস্তবে এই বিভাজন এতটা স্পষ্ট নয়। তিনি এর উদাহরণ হিসেবে রক্তসম্পর্কের মধ্যে যৌনসম্পর্ক বা বিবাহের নিষেধাজ্ঞা (Incest Prohibition)-এর কথা বলেন।
প্রায় সব সমাজেই নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক বা বিবাহ নিষিদ্ধ। এই অর্থে এটি একটি সর্বজনীন নিয়ম, যা প্রকৃতির মতোই সর্বত্র বিদ্যমান বলে মনে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিটি সমাজ এই নিষেধাজ্ঞাকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারণ করে।
উদাহরণস্বরূপ, অনেক মুসলিম সমাজে চাচাতো বা মামাতো ভাইবোনের মধ্যে বিবাহ বৈধ ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য; কিন্তু অধিকাংশ হিন্দু সমাজে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তাহলে এই নিষেধাজ্ঞাকে কোথায় রাখা হবে? এটি কি প্রকৃতির অন্তর্গত, নাকি সংস্কৃতির? দেখা যায়, এটি একই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য বহন করে। এই দ্বৈত অবস্থাকেই দেরিদা ‘স্ক্যান্ডাল’ (scandal) নামে উল্লেখ করেন। এই উদাহরণ দেখায় যে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির কঠোর দ্বৈত বিভাজন সব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।
এরপর দেরিদা bricolage ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি এই শব্দটি লেভি-স্ট্রসের The Savage Mind গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করেছেন।
Bricolage বলতে বোঝায়—হাতে যা উপকরণ আছে, সেগুলোকেই নতুনভাবে ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা। আর যিনি এভাবে কাজ করেন, তাঁকে বলা হয় bricoleur।
লেভি-স্ট্রস bricoleur-এর বিপরীতে engineer-এর ধারণা দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর মতে, engineer এমন একজন, যিনি সম্পূর্ণ নতুন উপকরণ ব্যবহার করে সুসংগঠিত, স্থিতিশীল, সুপরিকল্পিত এবং নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিশিষ্ট একটি কাঠামো নির্মাণ করেন।
কিন্তু দেরিদা এখানেও এই দ্বৈত বিরোধকে ভেঙে দেন। তাঁর মতে, বাস্তবে কোনো চিন্তাবিদই সম্পূর্ণ নতুন ভিত্তি থেকে কাজ শুরু করতে পারেন না। প্রত্যেকেই পূর্ববর্তী ভাষা, ধারণা, তত্ত্ব ও চিন্তার ভাণ্ডার থেকে ধার নিয়ে নিজের বক্তব্য নির্মাণ করেন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই কোনো না কোনো অর্থে একজন bricoleur।
সেই হিসেবে তথাকথিত engineer-ও আসলে একজন bricoleur। কারণ তিনিও পূর্ববর্তী ধারণা ও ভাষার ওপর নির্ভর করেই নতুন কাঠামো নির্মাণ করেন। ফলে engineer ও bricoleur-এর মধ্যকার বিরোধও টেকে না। দেরিদার ভাষায়, ‘engineer’ আসলে bricoleur-এর কল্পনায় নির্মিত একটি মিথ।
প্রবন্ধের শেষে দেরিদা বলেন, কাঠামো (structure), সংকেত (sign) এবং খেলা (play)—এই তিনটিকে বোঝার দুটি ভিন্ন পথ রয়েছে।
প্রথম পথটি এমন একটি চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান করে, যা স্থায়ী, নির্ভুল এবং পরিবর্তনহীন। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীন খেলাকে সীমাবদ্ধ করে এবং একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে।
দ্বিতীয় পথটি কোনো চূড়ান্ত সত্য বা স্থায়ী কেন্দ্রের অস্তিত্ব মেনে নেয় না। বরং এটি অর্থের অবিরাম পরিবর্তন, বহুমাত্রিকতা এবং মুক্ত খেলাকে স্বীকার করে।
দেরিদার মতে, মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু আধুনিক চিন্তায় ধীরে ধীরে দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটছে।
তাঁর মতে, ‘play’ বা মুক্ত খেলা উপস্থিতি (presence) ও অনুপস্থিতি (absence)-এর দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করতে পারে। যদি আমরা সবসময় একটি নিরঙ্কুশ সত্য, একক উৎস বা স্থায়ী কেন্দ্রের অনুসন্ধান না করি, তবে অর্থের অসংখ্য সম্ভাবনা আমাদের সামনে উন্মুক্ত হবে।
এই কারণেই দেরিদা এমন এক দর্শনের সম্ভাবনার কথা বলেন, যেখানে কোনো ধারণা চূড়ান্ত নয়, কোনো কেন্দ্র স্থায়ী নয়, কোনো অর্থ শেষ কথা নয়। দর্শন তখন হয়ে ওঠে এক অবিরাম অনুসন্ধান, প্রশ্ন এবং নতুন অর্থ সৃষ্টির ক্ষেত্র—যেখানে কাঠামোকে ভেঙে ফেলার পরিবর্তে, তার ভেতরের অসংখ্য সম্ভাবনা ও ‘খেলা’কে আবিষ্কার করাই প্রধান লক্ষ্য।

মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক; অনুবাদ ও গবেষণায় রয়েছে সমান আগ্রহ। বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে পি-এইচ. ডি সম্পন্ন করেছেন ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। তার কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারবইজানিজ, তার্কি, রোমানিয়ান, আরবি, ইতালীয়, অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত জার্নাল ও ব্লগগুলোতে নিয়মিত কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের ‘THE POET’ পত্রিকা কর্তৃক ‘International Poet of the Week’-এ ভূষিত হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা (২০১৪); উপমা সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’, ‘ধ্বনিময় পালক’, ‘ধাঁধাশীল ছায়া’, ‘জন্মান্ধের স্বপ্ন’, ‘সার্কাসের মেয়ে ও অন্যান্য কবিতা’, ‘The shadow of illusion’, ‘Blind Man’s Dream’. গল্পগ্রন্থ : ‘তামাকবাড়ি’, ‘আবার কাৎলাহার’, ‘ঢুলকিপুরাণ’, ‘নাবিকের জুতো’। প্রবন্ধ : ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’, ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা’, ‘জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য’, ‘বাংলা সাহিত্যে নারী’, ‘বাংলা উপন্যাস অধ্যয়ন’। অনুবাদ : ‘চৌদল ঐকতান’, মূল: টি. এস. এলিয়ট; ‘ধূসর বুধবার’, মূল: টি. এস. এলিয়েট; ‘বালি ও ফেনা’, মূল: কাহলিল জাফরান; ‘হল্লা’, মূল: অ্যালেন গিনসবার্গ।