শুক্রবার, আগস্ট ২১

দ্যা আর্ট অভ এফর্টলেস অ্যাকশন

0

আমাদের সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাড়াহুড়ো। আমরা এমন এক সভ্যতায় বাস করছি যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত বলা হয় আরও দ্রুত চলতে, আরও বেশি অর্জন করতে, আরও বেশি উৎপাদন করতে। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাফল্যকে এক ধরনের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মনে করা হয়, যত বেশি চাপ, তত বেশি অগ্রগতি; যত বেশি প্রচেষ্টা, তত বেশি প্রাপ্তি। কিন্তু মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন একটি দর্শনও রয়েছে, যা এই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে—সবকিছু কি সত্যিই সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়? এমন কি হতে পারে যে জীবনের গভীরতম প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে অনায়াসে, স্বাভাবিকতায়, এবং অস্তিত্বের বৃহত্তর প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলার মধ্যে?

এই কারণেই লাও ৎজু বলেছিলেন, পৃথিবীতে জলের চেয়ে কোমল আর কিছু নেই, অথচ কঠিনতম বস্তুকেও অতিক্রম করার ক্ষেত্রে তার সমকক্ষও নেই।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় প্রাচীন চীনের দিকে, যেখানে Laozi নামের এক রহস্যময় দার্শনিক এমন এক জীবনদর্শনের কথা বলেছিলেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর রচিত Tao Te Ching-এ আমরা বারবার দেখতে পাই জলের রূপক। লাও ৎজুর কাছে জল ছিল কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; এটি ছিল অস্তিত্বের এক গভীর শিক্ষা। জল কখনও শক্তির প্রদর্শন করে না, কখনও প্রতিযোগিতায় নামে না, কখনও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে না। সে স্বভাবতই নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। অথচ সেই কোমল জলই দীর্ঘ সময়ে পাথর ক্ষয় করে, উপত্যকা তৈরি করে এবং সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়। এই কারণেই লাও ৎজু বলেছিলেন, পৃথিবীতে জলের চেয়ে কোমল আর কিছু নেই, অথচ কঠিনতম বস্তুকেও অতিক্রম করার ক্ষেত্রে তার সমকক্ষও নেই।

তাওবাদের কেন্দ্রীয় ধারণা Wu Wei-কে প্রায়ই ‘non-action’ বা ‘অকর্ম’ বলে অনুবাদ করা হয়, কিন্তু এই অনুবাদ পুরোপুরি যথাযথ নয়। Wu Wei অলসতা বা নিষ্ক্রিয়তার শিক্ষা দেয় না; বরং এটি এমন এক কর্মপদ্ধতির কথা বলে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় জোর, অহংকার এবং মানসিক প্রতিরোধ অনুপস্থিত। এটি এমন এক অবস্থার নির্দেশ করে যেখানে মানুষ প্রকৃতির প্রবাহের বিরুদ্ধে না গিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করে। একজন দক্ষ সংগীতশিল্পী যখন তাঁর যন্ত্র বাজান, তখন তিনি প্রতিটি স্বর নিয়ে সচেতনভাবে ভাবেন না; একজন কবি যখন তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি লেখেন, তখন অনেক সময় অনুভব করেন যেন কবিতাটি নিজেই লিখিত হয়েছে। এই অনায়াস দক্ষতাই Wu Wei-এর প্রকৃত অর্থের কাছাকাছি।

তাওবাদের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ঝুয়াংজি এই ধারণাকে আরও গভীর করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ‘প্রজাপতির স্বপ্ন’ উপাখ্যানটি দর্শনের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঝুয়াংজি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে তিনি একটি প্রজাপতি। ঘুম ভাঙার পর তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল—তিনি কি ঝুয়াংজি, যিনি স্বপ্নে প্রজাপতি হয়েছিলেন, নাকি তিনি একটি প্রজাপতি, যে এখন ঝুয়াংজি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে? এই আপাত সরল প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে পরিচয়, বাস্তবতা এবং চেতনা সম্পর্কে গভীর সংশয়। ঝুয়াংজি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে মানুষের অধিকাংশ কষ্টের উৎস বাস্তবতা নয়, বরং বাস্তবতাকে স্থির ও চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাওবাদের এই অন্তর্দৃষ্টির প্রতিধ্বনি আমরা আধুনিক যুগের চিন্তক জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি-র দর্শনেও খুঁজে পাই। কৃষ্ণমূর্তি বারবার বলেছেন, মানুষের মন ক্রমাগত অতীতের স্মৃতি, অভ্যাস, ভয় এবং আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে। ফলে আমরা বাস্তবতাকে যেমন আছে তেমন দেখি না; বরং আমাদের ধারণা ও পূর্বধারণার পর্দা দিয়ে দেখি। তাঁর ‘Choiceless Awareness’ বা নির্বাচনহীন সচেতনতার ধারণা এই অর্থে Wu Wei-এর মানসিক সমান্তরাল। এখানে কোনো জোর নেই, কোনো আত্মদমন নেই, কোনো কৃত্রিম আধ্যাত্মিকতাও নেই। আছে কেবল পর্যবেক্ষণ—বিচার ছাড়া, প্রতিরোধ ছাড়া, পছন্দ-অপছন্দের দ্বন্দ্ব ছাড়া।

বাংলার মাটিতেও আমরা এই স্বতঃস্ফূর্ততার দর্শনের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। লালন শাহ-এর গান ও দর্শনে জীবনকে কোনো কঠোর মতবাদ বা প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়নি। তাঁর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ কেবল আত্মার রূপক নয়; এটি মানব-অস্তিত্বের সেই রহস্যময় দিকটিরও প্রতীক, যাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা সংজ্ঞায়িত করা যায় না। লালনের কাছে সত্য কোনো স্থির মতবাদ নয়, বরং এক চলমান অনুসন্ধান। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাওবাদের সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ, কারণ উভয়ই চূড়ান্ত সংজ্ঞার চেয়ে জীবন্ত অভিজ্ঞতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়।

লালনের কাছে সত্য কোনো স্থির মতবাদ নয়, বরং এক চলমান অনুসন্ধান। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাওবাদের সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ, কারণ উভয়ই চূড়ান্ত সংজ্ঞার চেয়ে জীবন্ত অভিজ্ঞতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়।

একইভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর রচনাতেও আমরা ‘সহজ’ জীবনের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথের কাছে মুক্তি কোনো দূরবর্তী অতিলৌকিক অবস্থা নয়; এটি জীবনের মধ্যেই নিহিত। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—’মুক্তি ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে’—তাওবাদের জীবনদর্শনের সঙ্গে এক বিস্ময়কর সংলাপ রচনা করে। উভয়েই মানুষকে জীবন থেকে পালিয়ে যেতে বলেন না; বরং জীবনের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হতে বলেন, যেখানে সংগ্রামের চেয়ে সুর, প্রতিযোগিতার চেয়ে সামঞ্জস্য এবং আধিপত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাওবাদের প্রভাব শুধু চীনা চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে স্টোইক দর্শনেরও কিছু আকর্ষণীয় মিল রয়েছে। মার্কাস অরিলিয়াস এবং এপিক্টিটাস উভয়েই এমন এক মানসিক অবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে মানুষ বাস্তবতার বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় প্রতিরোধ না গড়ে তুলে তাকে উপলব্ধি ও গ্রহণ করতে শেখে। যদিও স্টোইক দর্শন এবং তাওবাদ ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিকশিত হয়েছে, তবুও উভয়ের মধ্যেই প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জীবনযাপনের এক অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা লক্ষ করা যায়।

সম্ভবত আধুনিক মানুষের জন্য তাওবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই নিহিত। আমরা প্রায়ই মনে করি যে জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান আরও বেশি প্রচেষ্টা, আরও বেশি পরিকল্পনা এবং আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি অন্য কথা বলে। একটি বীজকে টেনে ধরলে সে দ্রুত বৃক্ষে পরিণত হয় না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেমনি মানুষের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরও ঘটে তখনই, যখন সে নিজের ওপর অপ্রয়োজনীয় জোর প্রয়োগ করা বন্ধ করে। অনায়াস কর্ম মানে কর্মহীনতা নয়; বরং এমন কর্ম, যা অস্তিত্বের গভীর ছন্দের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই কারণেই হয়তো লাও ৎজুর দর্শন আজও আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি আমাদের সাফল্য ত্যাগ করতে বলেন না, কর্ম থেকে সরে আসতেও বলেন না। তিনি কেবল স্মরণ করিয়ে দেন যে নদী কখনও সমুদ্রে পৌঁছানোর জন্য যুদ্ধ করে না। সে কেবল নিজের স্বভাব অনুযায়ী প্রবাহিত হয়। আর সেই প্রবাহের মধ্যেই তার পূর্ণতা।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে গভীর শিল্পও তাই—সবকিছু জয় করার চেষ্টা নয়, বরং কখন নিজের অহংকারকে সরিয়ে রেখে বৃহত্তর প্রবাহের অংশ হয়ে ওঠা যায়, সেই প্রজ্ঞা অর্জন করা। আর সেই প্রজ্ঞার নামই—The Art of Effortless Action।


তথ্যসূত্র:
1. Tao Te Ching
2. Zhuangzi
3. Liezi
4. Jiddu Krishnamurti, Freedom from the Known
5. Rabindranath Tagore, Sadhana, The Religion of Man
6. Lalon Shah
7. Swami Vivekananda, Karma Yoga
8. Marcus Aurelius, Meditations
9. Epictetus, Enchiridion

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

ইংরেজি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের একজন গবেষক, শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, বেদান্ত, অস্তিত্ববাদ, আধ্যাত্মিকতা এবং মানব-অভিজ্ঞতার নন্দনতত্ত্ব। বর্তমানে তিনি পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।