চুমুফল খসে পড়ে
বারান্দায় এক কাপ বিকেল নিয়ে বসে
সামনে দুলছে সবুজ সমুখ—হচ্ছে টক শো।
আড্ডাচ্ছি জিন্দেগীকি সাথ—
আন্ধার অন্ধ দশ পায়ে।
পিরিচে আছে এক টুকরো দুপুর চুমু চুমু।
তুলে মুখে পুরছি।
বিকেলভর্তি কাপে চুমু(ক)—
ইন্টারভিউয়ারের মুখে আমার আদল—কী রকম প্রস্থান প্রত্যাশা?
সিঁড়ি আপনাকে ভেঙে?
সকালশূন্য বৃহস্পতিবারে বিকেল খুঁজছে
সন্ধ্যার সাক্ষাৎ।
আমার পিরিচে চুমু আছে আরো বাকি—
চুমুখোর খুঁজে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি প্যাভিলিয়নে।
ব্রাহ্ম অহোরাত পেরিয়ে খসে পড়ে চুমুফল
……………………………….দ্বিধা সরোবরে।
ফেইসাবয়ব
গাছ—থমকে দাঁড়াই
কার ফেইস!
ভড়কে যায় ঝড়।
ললিতে
দ্বিভাজ পথে রক্তাবৎ
আভায় প্রেয়সী।
কুঞ্চন পরিদৃশ্যমাত্র ঠাকুরমা
ঘাম দেখলেই পিতা।
ভীড়ের সব মুখে বন্ধুর ছায়া।
মায়াব্যাপ্ত বেদনাযোগিনী মুখ
—চোখে পড়লেই মা।
সে নেই কোথাও
আমি কোথাও তাকে আর দেখি না।
‘ভ’তে নেই। ভয়ে ভরে আছে ‘ভ’।
‘ল’ আছে লয়ে সকল লিলুয়া বাতাস।
‘ব’ সেই কবে থেকে বসে আছে বিরান!
‘স’ সব সর্বনাশের মূলে।
এদের আকার নেই সাথে আর।
নিধুয়া পাথারে বাতাসের কান্না শুধু
শোঁ শোঁ ধ্বনিতে। সে নেই কোথাও।
পৃথিবী মরুকরণের পথে এগুচ্ছে
জলহীনতায়। আমি খুঁজি দুদণ্ড সময়
গাছের ছায়ায়।
জল চাই! জল চাই!
ঊর্ধ্ব মুখে জুড়ি চিৎকার।
যত রুঢ়তা যত মূঢ়তা উড়াই
আমি একযোগে দিই ফুৎকার।
জলের বীজবৃক্ষ রোপন করি ঊষর মাটিতে।
ছুটি
হিরের দ্যুতি ছড়ানো ভোর হাতে করে
হেঁটেছি সন্ধ্যা
রাত্রি নেমে এলে সেই হিরে-ঝরা ভোর
লুকিয়ে রেখেছি তার আঁচলের প্রান্তে বেঁধে।
আঁচলে বাঁধা
হীরক সকাল আলগোছে কেমন
খসে খসে পড়ে ফুসফুস থেকে আসা
গভীর বাতাসে।
রাস্তার আঁধার সরে গিয়ে
সারি সারি দোকান ছায়াদায়ী
উন্মোচিত যেন সুদক্ষ
ক্যামেরাম্যানের ফেইড আউট
সেই পাখি পরিযায়ী গেছে ফিরে
শীত শেষে
ভোরগুলো সব দুপুরশেষে বয়স্ক সন্ধ্যা।
হেমলক সভার নবীন সভ্য।
ইহকাল
মাথার উপরের বাগান—
অগুনতি আলোফুল।
পায়ের তলের নরম মাটি
তুলো তুলো হাঁটাহাঁটি।
পাখির নরম পালকের ছোঁয়া।
প্রজাপতির শরীরের রেণু।
কম্পিত কন্ঠের দ্বিধাগুলি।
পোষা প্রেম লাজুক চোখ।
সুগন্ধি বাতাসের সান্ধ্য উচ্ছ্বাস।
আমাদের গোপন খেলা।
উত্তোলিত অঙ্গভঙ্গি নমিত সাধ
অশ্লীল শ্লেষধ্বনি।
অধীর ধকল শুদ্ধ উর্ধ্বজল
বক্ষদেশে পড়ে থাক।
উন্মাদ দেহঘ্রাণ প্রসাধিত গণ্ডদেশে
সিক্ত নাকের ঘর্ষণ।
শরীরে বোনা ওষ্ঠাধারের ছাপ।
সোমরসে আননদুপুর।
বেদনা জমানো জলাধার
বিভূতি এ্যাটমোস্ফেয়ার।
এইখানে ছায়াটা চিরকাল পড়ে থাকে
কালো কালো কাক।
পলাতক
আতঙ্ক এক অচেনা শব্দ আমার।
তাই বিস্মিত হই।
কে আসে এই উদ্ভিন্ন রোদের নগরে
আমি এক তিল ছেড়ে দিতে রাজী নই।
এই সবুজ আমার দুচোখের জ্যোতি
এই অবুঝ অরণ্য চিরকালের শিশু।
আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো আমার
ভূমিষ্ঠ হবার জায়গায় হে পলাতক যীশু।
গওভর
এক একটা দিন গওভর কাটে
পাশ ফিরে শোয় মৃত্যু নাম বন্ধু
মন অন্ধ হতে চায়।
চোখ জেগে থাকে পাতার ভেতর।
পাতায় পাতায় ঘুমায় ক্লেদ ও স্বেদক।
সাইক্লোপের আত্মা।
সিসিফাস-রচিত পথে জেগে থাকে
দুই বিধাতা প্রেম ও ঈশ্বর।
দীর্ঘ দীর্ঘ কাল পড়ে থাকে এক একটা
কালো গওভর। অনায়াস।
জন্ম জন্মান্তরের সম্পাত ফেলে যায়।
আঙিনায় তারই আইসোটোপ।
ভোরকন্যা
কালো চাদর খুলে ফেলে
শীতল শুভ্র পরিচ্ছদে আবির্ভূত দেহে
কপালে লাল টিপ—ভোরকন্যা।
যত লাল এযাবৎ বিপ্লবের দোহাই
বৃক্ষসম মানুষের অলিন্দ থেকে উৎসারিত
বহুমাত্রিক শিল্পকলার লাইভ প্রদর্শনী—
রঙ ও শব্দ, রেখা ও বাক্যের বিলাপ
পৌঁছাতে থাকবে গ্রাহক স্টেশনগুলোতে।
ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে মুখর হবে অতিকায় কিন্তু—
সবগুলো অথবা খেলবে নিজেদের সুখে।
আলো গিলে খেতে আবার নামবে
কালো অবতার—
ততক্ষণে শিউলি ফুলে আঁচল ভরিয়ে দেবে
ফুটফুটে ভোর—শৈশবহীন দ্রৌপদী।
রাস্তা
১.
রাস্তা হাঁটে পথিক যদি হাঁটে
বহুগামী মনে হলেও
রাস্তা ও পথিক উভয়েই মনোগ্যামী।
২.
এক টুকরো রাস্তার মিমিক্রি
তুলে এনেছি ঘরের ভেতর—
স্টুয়ার্ট, জেমস আর ট্রেড
আমরা তিন বহুগামী।
৩.
রাস্তার চলনে রয়েছে সর্পভাব—
বাঁকে বাঁকে থাকে অবাক হবার যন্ত্র যোগাড়
আহার ও বিহার।
৪.
রাস্তা আসলে সুপ্তপ্রাণ শুকনো নদী।
৫.
শয়ন ছাড়াও রাস্তার আছে উপবেশন।
জন্ম হয় বেড়ে ওঠে।
ডালপালা ছড়ায়।
৬.
রাস্তারও অসুখ করে।
দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়। আবার সেরেও ওঠে।
৭.
রাস্তা স্বর্গের দিকে যায়।
নরকের দিকেও
নিজেকে এবং পান্থকে নিয়ে যায়।
৮.
কেউ চলে গেছে অরণ্যের দিকে।
হয়তো কোন এক অরণ্যেই তার জন্ম।
৯.
রাস্তারও মনে অসুখ।
সিজোফ্রেনিয়া হয়। সে কোন এক গর্তে
আত্মাহুতি দেয়।
১০.
অসুখী রাস্তা তার পথিককে
সুখী করতে পারে না। বিক্ষত রাস্তা পারে না
পথিককে অক্ষত রাখতে।
১১.
অধিকাংশ রাস্তাই ঘরে এসে পৌঁছয়
পিঠে বয়ে মুসাফির।
১২.
নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও রাস্তা গন্তব্যে পৌঁছয়।
নৈঃসঙ্গ
সাদা টাইলসের মেঝে। দরজা আছে। জানালাও।
আছে জামা কাপড় ঝুলাবার দড়িটাও।
আছে প্রক্ষালন কক্ষ। অতিথি কক্ষ ও রসুই ঘর।
বসবার চেয়ার আছে। কেউ বসে নেই তার উপর।
ফ্যান ঘুরছে একটা রুমে। আছে বিছানা পাতা।
পেট ফুলিয়ে উদোম পড়ে আছে বইখাতা।
দরজা জানালা খোলা আছে।
জানালার পাশে একটা পাখি নিম গাছে।
লম্বা বারান্দায় কেউ ধীর পায়ে হেঁটে যায়।
আনমনা—যেন খুব মনোযোগ নিজের ছায়ায়।

জন্ম ২১ মে, ১৯৭৬, রংপুর জেলায়। জাতীয় বিমানসংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগে কর্মরত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে এক বছর লেখাপড়া। ২০১৮ সালে প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘রোদ বুনি ছায়াপথে’ প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘লেখক প্রকাশ’ থেকে। ২০১৯ সালে কবিতাগ্রন্থ ‘বিষাদের সঞ্চয়ী হিসাব’ প্রকাশিত হয় পরিবার প্রকাশনী থেকে। ২০২২ সালে জাগতিক প্রকাশন থেকে কবিতাগ্রন্থ ‘বহুগামী রাস্তার মিমিক্রি’ প্রকাশিত হয়। বেশকিছু মননশীল প্রবন্ধ ও বই-আলোচনা ছাপা হয়েছে মুদ্রিত ও আন্তর্জালিক সাময়িক পত্রে। বেশ কিছু স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।