খুব ভোরে ঘুম ভাঙে। এটা আর অভ্যাসে নেই, এটা শরীরের ভেতরের ঘড়ি হয়ে গেছে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতে একই সময়ে চোখ খুলে যায়। ঘুম ভাঙলেই প্রথম কাজ এক মগ তুলসি চা। আদা দিই না। তুলসির ওই কষটে গন্ধটাই চাই। মগ হাতে টেরাসে উঠে বসি। চেয়ারটা পুরোনো, ক্যাঁচ করে শব্দ করে।
তারপর আলো ফোটে। ধীরে। চায়ের কাপে যেমন গরম জলে চা-পাতার লিকার ছাড়ে, ঠিক তেমন করে অন্ধকার থেকে আলো লিকার ছাড়তে থাকে। প্রথমে আবছা, তারপর গাঢ়, তারপর একেবারে স্পষ্ট। আমার সামনে একটা মস্ত ক্যানভাস খুলে যায় রোজ। সামনের আম-কাঁঠাল গাছ, পাশের বাড়ির টিনের চাল, গায়ে গা লাগিয়ে থাকা গ্রামের ঘরগুলো। দূরে পুকুরের জল, সাপের মতো টানটান হয়ে পড়ে থাকা সড়ক, তারও পরে ধানখেত। ধানখেতের শেষে দিগন্ত। দিগন্তের ওপারে তোমার শহর, যেখানে তুমি এখনো ঘুমিয়ে।
পাখিরা জাগে সবার আগে। একটা ডাকলে আরেকটা জবাব দেয়। তারপর সবাই মিলে অনবরত কথা। মনে হয় গতরাতে দেখা স্বপ্নগুলোই ওরা ভাগাভাগি করছে ডালে ডালে বসে। আমি শুনি। মাঝে মাঝে আমিও বলি। ‘আজ রাতে অদ্ভুত একটা নদী দেখলাম’, ‘আজ একটা পুরোনো চিঠি পেলাম স্বপ্নে’—এইসব। পাখিরা মাথা কাত করে শোনে। ওদের চঞ্চলতা দেখে মনে হয়, বোঝে। সবটুকু না বুঝলেও সুরটা বোঝে। আর সুর বুঝলেই তো মানুষ বোঝা হয়ে যায়। তখন তোমার কথা মনে পড়ে। তীব্রভাবে। কারণ স্বপ্নে তুমি খুব আসো। কিন্তু ধরা দাও না পুরোপুরি। কবিতার মতো। তীব্র, ঘোরমাখা। ব্যাখ্যা করলে হাত থেকে পিছলে যায়, আবার ব্যাখ্যার বাইরেও না। পাখিরা যা বলে তা সুন্দর, কিন্তু বোধের ওপরে। তুমিও তেমনি। ভোরবেলা টেরাসে বসেই টের পাই—বাতাস বয়ে আনছে কত কত ফুলের সুগন্ধ। উঠোনের গন্ধরাজ, পুকুরপাড়ের বেলী, বাঁশবনের ধারে নাম-না-জানা ছোটো ছোটো সাদা ফুল। রাতের শিশিরে ভেজা সুগন্ধ। সুগন্ধে ফুল নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। ‘আমি আছি’—চিৎকার করে বলে না। বাতাসে ভেসে এসে বলে। চোখ বন্ধ করে বসে থাকি। তুলসি চা হাতে, লিকারটা তখনো গরম। কোনো স্নিগ্ধ সুন্দরের অনুভব পেলেই তোমার কথা মনে পড়ে। এই নরম আলো, এই পাখির ডাক, এই ভেজা মাটির গন্ধ—সব তোমাকে মনে করায়। কারণ তুমিও তো এমনই। স্নিগ্ধ। সুন্দর। শব্দ কম, উপস্থিতি বেশি। মনের ভেতরটায় তখন দূর গ্রহ থেকে বাতাস বইতে থাকে। তোমার সুবাস নিয়ে। যে শহরে তুমি থাকো সেখানকার বাতাস না। ওটা আমার কল্পনার বাতাস। যে বাতাসে তোমার চুলের গন্ধ, তোমার গায়ের জামার ভাঁজ, তোমার হাসির শব্দ—সব মিশে থাকে বাতাসটা এসে বলে, ‘ও ভালো আছে।’ আমি বলি, ‘আমিও আছি। তার কথা ভেবে।’ ভোরের লিকারটা ততক্ষণে একটু হালকা হয়ে আসে। চায়ের রং ফিকে হয়। ঠিক যেমন রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে আলো হয়। তেমনই তোমাকে না-দেখার দূরত্বটাও ফিকে হয়ে যায়, যখন বাতাসে তোমার সুবাস পাই। পাখিরা তখনো কথা বলছে।
এই নরম আলো, এই পাখির ডাক, এই ভেজা মাটির গন্ধ—সব তোমাকে মনে করায়। কারণ তুমিও তো এমনই। স্নিগ্ধ। সুন্দর। শব্দ কম, উপস্থিতি বেশি। মনের ভেতরটায় তখন দূর গ্রহ থেকে বাতাস বইতে থাকে। তোমার সুবাস নিয়ে। যে শহরে তুমি থাকো সেখানকার বাতাস না।
আমি ওদের বলি, ‘আজ একটা দূর গ্রহের বাতাস বইছে। ওর মধ্যে একজনের নাম আছে।’ পাখিরা মাথা কাত করে। বোঝে। যখন তুমি ঘুম থেকে উঠবে। বারান্দায় যাবে। আমি জানি, তুমিও জানালা খুলে বাতাসে কিছু খুঁজবে। হয়তো পাবে, কিংবা পাবে না। কিন্তু আমি পাবো, কারণ ভালোবাসার কল্পনাকে টেরাসে বসে বসে গভীর করে নিয়েছি। তুমিও বারান্দায় বসে ভাবনায় গভীর করবে অনুভব, তখন সুগন্ধ ঠিকই টের পাবে। এই সুগন্ধটুকুই আমার চিঠি। লিখে পাঠাই না। বাতাসে ভাসিয়ে দিই। তুমি শুধু একবার গভীর করে নিশ্বাস নিও। দেখবে, আমার টেরাসের বেলীফুলের গন্ধ গিয়ে লেগেছে তোমার বারান্দায়।
এখনো ভোর। আলো এসেছে পুরোপুরি। আমি জানি তুমি তখনো কম্বলের নিচে। আর ঘণ্টাখানেক পর উঠবে। মুখ ধুয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াবে। ফোন হাতে নেবে। আর আমিও নেবো। ‘শুভ সকাল’—অল্প কয়েকটি অক্ষরের দুইটি শব্দ। কিন্তু ওই দুই শব্দেই পৃথিবীতে সত্যিকারের সকাল হয় আমার। কারণ তুমি আছো। দূরে, তবু আছো। আমরা দুজন দুজনকে বহন করি রোজ। তুমি তোমার শহরের ব্যস্ততা, আমি আমার গ্রামের নীরবতা। বিনিময়ে কী পাই! শুধু এই বহনটুকু, তাতেও সুখ আছে। ভারী, কিন্তু উষ্ণ।
বছরে দু-একবার দেখা হয়। আয়োজন করেই হয়। ট্রেনের টিকিট, হোটেলের ঠিকানা, কোথায় কোন গাছে নিচে বসবো—সব হিসাব করে। পাখির মতো উড়ে গিয়ে দেখা হয় না। মাটিতে পা রেখে, সময় নিয়ে দেখা হয়। আর ওই দেখাটুকুতে যে আনন্দ হয়, যে চঞ্চলতা আসে—ওটা পাখিদেরই দেওয়া। সারাবছর জমিয়ে রাখা সব কথা, সব না-বলা স্বপ্ন একসাথে উপচে পড়ে। হাসি, চুপ করে থাকা, পাশাপাশি হাঁটা—ব্যস। আমি বলি—থির হয়ে দাঁড়াও, তুমি বলো—থির হয়ে দাঁড়াও। ছবিতে আমরা দুজন। নিবিড় হয়ে দাঁড়িয়ে। গায়ে গা লাগেনি, তবু দূরত্ব নেই। বিকেলের শেষ আলো আমাদের মাঝখানে একটা সোনালি রেখা টেনে দিয়েছে। ‘থির হয়ে দাঁড়াও’—মানে দৌড়িও না। সময়টাকে বেঁধে ফেলো এখানে। কারণ আমরা জানি, এই দাঁড়ানোটার মেয়াদ খুব কম। আমি ফিরে যাবো সকালের ট্রেনে। বছরে দুবার দেখা। হিসাব করেই আসা, হিসাব করেই যাওয়া। তাই ‘আরও কিছু কথা বলা যাক’। বড়ো কথা না। ট্রেন কটায়, মা কেমন আছে—এইসব। কারণ বড়ো কথাগুলো বললে বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যায়। ছোটো কথার ফাঁক দিয়েই তো আসল কথাটা বোঝা যায়—যে থাকতে ইচ্ছে করছে। ‘আরও একটু ক্ষণ দেখা যাক।’ তোমার মুখটা দেখি। হাত দুটো হাতে মধ্যে নিয়ে বলা, ‘কেমন রুক্ষতা পেয়ে বসেছে হাত দুটোয়, হাতে যত্ন নিও। ময়শ্চারাইজার লাগিও।’ হাসলে আশ্চর্য এক গোধূলির আলো পড়ে তোমার মুখে, ওটা দেখি। কথা বললে, দিঘি অচল জলের মতো স্নিগ্ধতা স্পর্শ করে, সব মুখস্থ করি। কারণ পরের ছয় মাস এই ছবিটাই হবে আমার টেরাসের ভোর। নদীর পাড়, এই কাশবন, এই পড়ন্ত রোদ। তোমার কানের পাশে উড়ে আসা চুল। আমার হাতের মুঠোয় ধরে রাখা তোমার আঁচলের কোনা—না, ধরি না। শুধু দেখি। দেখাটাও এক ধরনের ছোঁয়া। আমরা নিবিড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ চুপ। কারণ সব কথা মুখে বলতে নেই। কিছু কথা বাতাস বয়ে নিয়ে যায়। কিছু কথা পাখি ডেকে শুনিয়ে দেয়। আর কিছু কথা শুধু দুজন মানুষের চোখের মাঝখানে ঝুলে থাকে, থির হয়ে।
নদীর পাড়, এই কাশবন, এই পড়ন্ত রোদ। তোমার কানের পাশে উড়ে আসা চুল। আমার হাতের মুঠোয় ধরে রাখা তোমার আঁচলের কোনা—না, ধরি না। শুধু দেখি। দেখাটাও এক ধরনের ছোঁয়া। আমরা নিবিড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ চুপ। কারণ সব কথা মুখে বলতে নেই। কিছু কথা বাতাস বয়ে নিয়ে যায়। কিছু কথা পাখি ডেকে শুনিয়ে দেয়। আর কিছু কথা শুধু দুজন মানুষের চোখের মাঝখানে ঝুলে থাকে, থির হয়ে।
ছবিটা হয়তো তুলে দিলো চায়ের দোকানের ছেলেটা। বলল, ‘ভাই, হাসেন’। আমরা হাসলাম না। কারণ এই মুহূর্তটা হাসির না। এটা ধরে রাখার। পরে যখন ছবিটা দেখব একা একা, টেরাসে বসে তুলসি চায়ের মগ হাতে—তখন বুঝব, ওইদিন আমরা সময়কে ঠকিয়েছিলাম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও, অনন্ত করে ফেলেছিলাম। থির হয়ে দাঁড়াও—তাই দাঁড়িয়ে থাকি। কথা ফুরিয়ে যাক। ক্ষণ ফুরিয়ে যাক। দৃশ্য ফুরিয়ে যাক। শুধু দাঁড়ানোটুকু ফুরোক না।
তারপর আবার দূরত্ব। আবার ভোর। আবার তুলসি চা। আবার টেরাস। আবার পাখিদের সাথে স্বপ্নের কথা। তফাৎ শুধু একটাই। এখন জানি, দিগন্তের ওপারে আরেকটা জানালা খুলছে। আরেকটা মগে লেবুজল। আর একটা কাপে চায়ের লিকার পড়ছে। আরেকজন মানুষ ‘শুভ সকাল’ লিখবে বলে ফোন হাতে নিয়েছে। এই জানাটুকুই যথেষ্ট। কারণ প্রেম সবসময় কাছে থাকা না। কখনো কখনো প্রেম মানে দুটি আলাদা ভোরকে এক সুতোয় বেঁধে রাখা। আর সেই সুতোটার নাম—অপেক্ষা।

কবি
জন্ম ১সেপ্টেম্বর ১৯৭০। সোনাপাড়া, পাঁচবিবি, জয়পুরহাট। লেখালেখির উন্মেষকাল নব্বই দশক। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে কবিতার বই ১২টি। সম্পাদক হিসেবেও যুক্ত আছেন বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে।