১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ, নেদারল্যান্ডস বনাম ব্রাজিল সেমিফাইনাল। নির্ধারিত সময়ের পুরোটা গেল লোডশেডিংয়ের পেটে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে বিদ্যুৎ এলো। একটু পর টাইব্রেকার। আমি ঘুমে কাতর হয়ে ঝিমুচ্ছিলাম। নেদারল্যান্ডসের কোনো এক খেলোয়াড় পেনাল্টি শট নিলেন৷ ক্লোজ হাইলাইটসে দেখানোর সময় ঘুম চোখে হঠাৎ মনে হলো বলটা মুখের দিকে ছুটে আসছে। মুখ বাঁচাতে দুই হাত মুখের সামনে এনে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। ফুটবল নিয়ে প্রথম মনে থাকা স্মৃতি এটিই। এভাবেই আমার ফুটবল প্রেমের শুরু। আর পরের ম্যাচে বুঝলাম স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা কেমন। এখন জাতীয় দলের জন্য সেভাবে সমর্থক সত্তা জাগ্রত না থাকলেও রোনালদো নাজারিও নামের এক বারুদের প্রেমে পড়েছিলাম। যে শুধু গোলই করেন না, গোলরক্ষককে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন। এরপর ক্লাব ফুটবল ফলো করা শুরু। তারপর ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে এ নিয়ে চারটা বিশ্বকাপ কাভার করছি৷ বিশ্বকাপ দর্শক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা যেমন অনন্য, তেমনি সাংবাদিক হিসেবে কাভার করার আনন্দও অসামান্য।

২০০৬ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় ব্রাজিল
*
এবার সমর্থক সত্তা মিইয়ে যাওয়ার গল্পটা বলি, ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ, খেলাটা ব্রাজিল ও ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনাল। সমর্থক হিসেবে ব্রাজিলের জয়টাই চাইব। রোনালদো, রোনালদিনহো এবং কাকারা আছেন। জয়টা এলো বলে! কোথায় কী! সেদিন জিনেদিন জিদানের ওপর কী জানি ভর করেছিল! এ যেন ‘জোগো বানিতো’ ভুলে যাওয়া ব্রাজিলকে চোখে আঙুল দেখিয়ে বলা—পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ! ৯০ মিনিট মন্ত্রমুগ্ধের মতো জিদানের খেলা দেখলাম। বুঝলাম, আমি আসলে এই সুন্দর ফুটবলটাকেই ভালোবাসি।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপ, খেলাটা ব্রাজিল ও ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনাল। সমর্থক হিসেবে ব্রাজিলের জয়টাই চাইব। রোনালদো, রোনালদিনহো এবং কাকারা আছেন। জয়টা এলো বলে! কোথায় কী! সেদিন জিনেদিন জিদানের ওপর কী জানি ভর করেছিল! এ যেন ‘জোগো বানিতো’ ভুলে যাওয়া ব্রাজিলকে চোখে আঙুল দেখিয়ে বলা—পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ!
একইভাবে আর্জেন্টিনার সমর্থক না হয়েও ভালোবেসেছি ডিয়োগো ম্যারাডোনা নামের এক পাগলকে। তার সম্পর্কে যতই জেনেছি, এক বিস্ময়কর ঘোরের ভেতর চলে গেছি। তখন আরও ভালো করে বুঝেছি, আমি আসলে ফুটবলের সৌন্দর্যকেই ভালোবেসেছি।
যেমনটা এদুয়ার্দো গালিয়ানোও বলেছিলেন, ‘ভালো খেলা হলে আমি এই অলৌকিক ঘটনার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই৷ সে খেলা যে দল বা যে দেশই খেলুক না কেন!’
সেই ভালোবাসাকে সঙ্গী করে স্পোর্টস জার্নালিজমে আসা। এটা একই সঙ্গে আনন্দ এবং স্বস্তির। নিজের প্যাশনটাকে প্রফেশন সবাই বানাতে পারে না। সেক্ষেত্রে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলাই যায়। যাই হোক, বিশ্বকাপ শুরু হলো বলে।
*
ফুটবলের সঙ্গে আমার প্রেমের আরেকটা কারণ জায়েদ৷ তার গল্প কিছুটা লিখেছিলাম ‘সন্ধ্যায় ভুল পথে আহির ভৈরব’ নামের নভেলায়৷ সেটিই এখানে তুলে ধরছি—
‘হঠাৎ মায়ের ডাকে তোমার ঘুম ভাঙবে। তুমি জানতে পারবে, খেলার সময় দুই পক্ষের মাঝে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে মারামারি। সে সময় কারা জানি জায়েদকে ছুরি মেরেছে। খেলার মাঠেই মারা গেছে সে। শোনার পর থেকে তোমার শরীর অবশ হয়ে যেতে শুরু করে। কেউ যেন তোমার পায়ের নিচ থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছে। সেই সময়ের অনুভূতিটুকু তুমি কখনোই ভুলতে পারনি। উন্মত্ত মহিষের শিংয়ে চেপে তুমি মুহূর্তের মধ্যে জায়দদের বাড়িতে পৌঁছবে। জায়েদের মায়ের আর্তচিৎকার বাতাসকেও ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দিচ্ছে। এমন চিৎকার খোদার আরশকেও যেন কাঁপিয়ে দেয়। সেদিন জায়েদের লাশ দেখার মতো শক্তি তোমার ছিল না। জায়েদের কোনো ভাই ছিল না। তোমরা বন্ধুরাই সেদিন জায়েদের লাশ বহন করে কবর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলে। তাকে কবর দেওয়ার পর সবাই চলে আসলেও তুমি অনেক্ষণ বসে ছিলে। জায়েদের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে। কতগুলো সকাল, দুপুর, বিকেল এক সঙ্গে কাটিয়েছ তার হিসেব নেই। এমনকি একমাত্র জায়েদদের বাসাতে রাতে থাকার অনুমতি ছিল তোমার। আজ সব সম্পর্কের সুতো মুহূর্তের মধ্যে ছিড়ে গেছে। তোমার জীবনের প্রথম জুটিটাই সেদিন ভেঙে গেছে। জায়েদের মৃত্যুর স্মৃতি তুমি এখনো বুকে পুষে রেখেছ। কিন্তু আজ তোমাকে ভুলতে হবে। জায়েদের মুখ তুমি শেষবারের মতো মনে করার চেষ্টা করবে। তোমার পাস থেকে বল পেয়ে লেফট উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছে জায়েদ। ওয়ান টু ওয়ানে এখন শুধুই গোলরক্ষক। না জায়েদ শট নেবে না, চিপও করবে না। ফেনোমেনন রোনালদোর ভক্ত জায়েদ গোলকিপারকে টেনে হিঁচড়ে নাজেহাল করে পোস্টে বল ঠেলে দেবে। আর এরপরই ঝুম অন্ধকার। প্রচণ্ড ঘুমে তলিয়ে গেলে তুমি। সঙ্গে তলিয়ে গেল জায়েদের সমস্ত স্মৃতিও।’

রোনালদো নাজারিও
আমার কাছে এখনো এসব স্মৃতি জীবন্ত৷ জীবনে প্রথম তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেছিলাম ২০০২ সালের বিশ্বকাপ। একজন রোনালদো নাজারিওকে শাপমুক্ত হতে দেখেছিলাম। ফুটবল সেবার তার বরপুত্রকে দুই হাত ভরিয়ে দিয়েছিল।
সাংবাদিকতা সেই আবেগ অনেকটাই মুছে দিয়েছে। খেলার আনন্দের চেয়ে আনুষাঙ্গিক খবরই বেশি রাখতে হয়৷ আবার দিয়েছেও অনেক। কেউ যখন কোনো লেখা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটার আনন্দ আবার অন্যরকম। রাত জেগে বিশ্বকাপ কাভার করে যখন মেসির ফুটবল হেভেনে চিরন্তন হওয়ার গল্প লিখি এই অনুভূতি তুলনাহীন। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরদিন মেসিকে নিয়ে লেখা প্রতিবেদনের জন্য একের পর এক ফোন পাচ্ছিলাম, সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এইসব আনন্দকে সঙ্গে নিয়েই পথ চলছি৷
শেষ কথা হচ্ছে, আমি যা তার অনেকটাই ফুটবলের নির্মাণ। বিশ্বকাপ স্মৃতি দিয়ে গড়া। আর যা হতে চাই, তার নাম এদুয়ার্দো গালিয়ানো। ইশ, যদি গালিয়ানোর মতো লিখতে পারতাম! জানি পারব না৷ তবে আমার ভালোবাসাও গালিয়ানোর চেয়ে কম নয়৷

কবি ও কথাসাহিত্যিক
জন্ম ১৯৮৮, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বই : সূর্যাস্তগামী মাছ (কবিতা) ব্রায়ান অ্যাডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার (কবিতা) শেফালি কি জানে (না কবিতা, না গল্প, না উপন্যাস) ক্ল্যাপস ক্ল্যাপস (কবিতা) দ্য রেইনি সিজন (কবিতা) প্রিয় দাঁত ব্যথা (কবিতা) বিষাদের মা কান্তারা (উপন্যাস) সন্তান প্রসবকালীন গান (কবিতা)