শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮

হান্টার থম্পসন: গনজোর স্রষ্টার শেষ অধ্যায়

0

হান্টার থম্পসন ছিলেন একজন মার্কিন সাংবাদিক এবং আলাদা ঘরানার লেখক। তাঁকে বিংশ শতাব্দীর মার্কিন সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যসব লেখক কিংবা সাংবাদিকের তুলনায় তাঁর স্বতন্ত্র শৈলী এবং সাংবাদিকতার ভিন্ন ধারার দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বিকল্প সংস্কৃতির ‘আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে ‘গনজো সাংবাদিকতা’¹ সৃষ্টি করার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়েছেন এবং তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

হান্টার থম্পসন প্রায়ই নিজের লেখায় নিজেকে মূল চরিত্রে রূপ দিতেন, যা সাংবাদিকতার নতুন ধারা তৈরি করেছে। তবে একজন লেখক হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন ১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘ফিয়ার এন্ড লোথিং ইন লাস ভেগাস: এ স্যাভেজ জার্নি টু দ্য হার্ট অফ দ্য অ্যামেরিকান ড্রিম’ গ্রন্থের জন্য। পরবর্তীতে গ্রন্থটি আধুনিক ক্লাসিক হয়ে উঠে। তিনি সাহিত্যিক হিসেবে সিলভিয়া প্ল্যাথ কিংবা এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাত্যহিক জীবনের জন্য তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) সম্ভবত এ দুজনের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক।

হান্টার থম্পসন তাঁর আলাদা ব্যক্তিত্ব ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য, বিশেষ করে মাদক ও মদ্যপানের সঙ্গে জড়িত দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি ২০০৫ সালে পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তাঁর বয়স ছিল ৬৭ বছর।


Hunter Thompson 1

হান্টার থম্পসন


`হান্টার থম্পসন: গনজোর স্রষ্টার শেষ অধ্যায়’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো তাঁর জীবনের শেষ দিন; কবে, কোথায় এবং কীভাবে মৃত্যু হয়েছে; মৃত্যুর পরের বিতর্ক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, আত্মঘাতির কারণ, আত্মহত্যার চিরকূট (সুইসাইড নোট) এবং উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। যেহেতু বাংলাদেশি পাঠকের কাছে তিনি খুব বেশি পরিচিত নন, তাই শুরুতে তাঁর জীবনী ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো।


Hunter Thompson

হান্টার থম্পসন ও তাঁর প্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র


জীবনী ও সাহিত্যকর্ম
হান্টার থম্পসন (পুরো নাম হান্টার স্টকটন থম্পসন) ১৯৩৭ সালের ১৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি রাজ্যের লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেন। তাকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যার মধ্যে ১৯৫২ সালে তাঁর পিতার মৃত্যু এবং মায়ের অতিরিক্ত মদ্যপানের সঙ্গে সংগ্রাম উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত এসব বৈরী অভিজ্ঞতার জন্য তিনি উচ্ছৃঙ্খল জীবন বেছে নিয়েছিলেন ও নেশার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

হান্টার থম্পসন ছোটোবেলা থেকেই একজন তুখোড় লেখক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন। তিনি স্কুলে অ্যাথিনিয়াম সাহিত্য সংস্থায় যোগ দেন, যেখানে তিনি দ্রুত সাহিত্য ও সাংবাদিকতার দক্ষতায় উন্নতি করতে শুরু করেন। তবে শৈশবে তিনি ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে কুখ্যাত ছিলেন। তখন থেকেই তাঁর কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। রাতের অন্ধকারে দোকানের সামনে গিয়ে ট্রাকভর্তি ময়লা ফেলে আসা, পার্কিং লট থেকে গাড়ি চুরি করা, এমনকি অস্ত্র উঁচিয়ে ডাকাতি করার কাজে পটু ছিলেন। এসব আচরণের কারণে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন এবং উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার কয়েক সপ্তাহ আগে দুমাস কারাগারে ছিলেন।

লেখালেখির প্রতি হান্টার থম্পসনের তীব্র ভালোবাসার জন্য তাঁকে ১৯৫৮ সালে ইউএস বিমান বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেখানে তিনি সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ফ্লোরিডার বিমান ঘাঁটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছদ্মনামে লিখেছেন। কিন্তু পরে তাঁর আসল পরিচয় পাওয়া যায় এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি অবজ্ঞা ও বানোয়াট গল্প লেখার কারণে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তিনি পেনসিলভেনিয়া এবং নিউ ইয়র্কের একাধিক ছোটো পত্রিকায় কাজ করেন। একসময় তিনি পুয়ের্তো রিকো চলে যান এবং ম্যাগাজিনে লেখার চাকরি গ্রহণ করেন।

‘দ্য টাইম’ ম্যাগাজিনে কাজ খুঁজে পাওয়ার আগে হান্টার থম্পসন কিছু সময়ের জন্য কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। কিন্তু ‘দ্য টাইম’ ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষের আদেশ মানতে অস্বীকার করায় তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে, যখন তিনি ‘মিডলটাউন ডেইলি রেকর্ড’-এ কাজ করেছেন। সেখানে তিনি একজন বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে ঝগড়া করে একটি ভেন্ডিং মেশিন ভেঙে ফেলেন। বদমেজাজ থাকা সত্ত্বেও মানুষকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা ছিল তাঁর, বিশেষ করে যাদের সমাজবিরোধী মনে করা হতো। তিনি তুমুল উত্তেজনা ও চরম পরিস্থিতিতে আনন্দ পেতেন, কিন্তু প্রচলিত নিয়ম-কানুনকে ঘৃণা করতেন। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান এবং সেখানে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার (যেমন ‘দ্য নেশন’ ও ‘এস্কোয়্যার’) জন্য ফ্রিল্যান্স লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল রিচার্ড নিক্সনের নির্বাচনে বিরোধীতা ও খোলাখুলিভাবে তীব্র সমালোচনা করা এবং কলোরাডোর পিটকিন কাউন্টির শেরিফের প্রার্থীতার জন্য ব্যর্থ প্রচার কাজে অংশ নেওয়া।

হান্টার থম্পসন হতাশা ও মানসিক অবসাদের কারণে মাদক ও মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন। সেসব অভ্যাস তাঁর লেখালেখি এবং ‘পাবলিক ইমেজ’-এ প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর অদ্ভুত আচরণ, অনিয়মিত কাজের অভ্যাস এবং আত্মবিনাশী প্রবণতা এক ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা সাহিত্যিক প্রতিভা এবং ব্যক্তিগত অস্থিতিশীলতার মিশ্রণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

হান্টার থম্পসন ১৯৬৩ সালে তাঁর দীর্ঘদিনের বান্ধবী স্যান্ড্রা কঙ্কলিনকে বিয়ে করেন এবং ১৯৮০ সালে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তাঁদের একমাত্র ছেলে জুয়ান। পরে তিনি ২০০৩ সালে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী অ্যানিটা বেজমুকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।


Hunter Thompson 3

হান্টার থম্পসন, প্রথম স্ত্রী (স্যান্ড্রা কঙ্কলিন) ও শিশুপুত্র (জুয়ান)


Hunter Thompson 4

হান্টার থম্পসন ও দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানিটা বেজমুক


হান্টার থম্পসনের প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘হেলস এঞ্জেলস: দ্য স্ট্রেঞ্জ অ্যান্ড টেরিবল সাগা অব দ্য আউটল মোটরসাইকেল গ্যাংস’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই গ্রন্থে তিনি ‘হেলস এঞ্জেলস মোটরসাইকেল গ্যাং’-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃত্ততা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গ্রন্থটি প্রকাশের পরপরই তিনি পাঠক এবং সমালোচকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন এবং তিনি দেশব্যাপী একজন উৎকর্ষ ও ভিন্নধারার লেখক এবং শক্তিশালী সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। উল্লেখ্য, গ্রন্থটি এতটাই পাঠক প্রিয় হয়েছিল যে, এক বছরের মধ্যে চারটি সংস্করণ বেরিয়েছিল। পরে তিনি এই বইয়ের অনুপ্রেরণায় এস্কোয়্যার, হারপার’স, রোলিং স্টোন এবং অন্যান্য ম্যাগাজিনে লেখালেখির সুযোগ পান।


Hunter Thompson_Book Cover-01

হান্টার থম্পসনের বইয়ের প্রচ্ছদ


হান্টার থম্পসনের গনজো সাংবাদিকতার অনন্য শৈলীর উজ্জ্বল উদাহরণ ১৯৭০ সালে প্রকাশিত নিবন্ধ ‘দ্য কেনটাকি ডার্বি ইজ ডেক্যাডেন্ট অ্যান্ড ডিপ্রেভড’, যেখানে তিনি স্বয়ং কাহিনির কেন্দ্রীয় অংশ ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পাঠকনন্দিত গ্রন্থ ‘ফিয়ার এন্ড লোথিং ইন লাস ভেগাস: এ স্যাভেজ জার্নি টু দ্য হার্ট অফ দ্য অ্যামেরিকান ড্রিম’ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে সাহিত্যিক জীবনের চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি ১৯৬০-এর দশকের পাল্টা সংস্কৃতির প্রভাব এবং মাদক ও মদিরার অপব্যবহারকে তুলে ধরেছেন এই গ্রন্থে এবং এর কাহিনির উপর ভিত্তি করে ১৯৯৮ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। সেখানে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা জনি ডেপ।

হান্টার থম্পসন পুয়ের্তো রিকোতে থাকার সময় তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘দ্য রাম ডায়েরি’ উপন্যাসের খসড়া লিখেছিলেন, যা তিনি ১৯৯৮ সালে প্রকাশ করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে মধ্যে রয়েছে ‘ফিয়ার অ্যান্ড লোথিং: অন দ্যা ক্যাম্পেইন ট্রেল ’৭২’ (১৯৭৩), যা জর্জ ম্যাকগভার্ন এবং রিচার্ড নিকসনের ১৯৭২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার ধারাবিবরণী। এই গ্রন্থে আমেরিকার রাজনীতির দুর্নীতি এবং নিন্দা তুলে ধরা হয়েছে।


Hunter Thompson 5

হান্টার থম্পসন ও হলিউড অভিনেতা জনি ডেপ


হান্টার থম্পসনের সাফল্য ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে অব্যাহত ছিল। তখন তিনি বিখ্যাত ‘রোলিং স্টোন’ ম্যাগাজিনের জন্য বিতর্কিত এবং উস্কানিমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। তবে তাঁর শেষ দিকের লেখা আগের লেখার মতো সমালোচকদের প্রশংসা পায়নি। তাঁর মাদকাসক্তি এবং ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো সম্ভবত এই পতনের জন্য দায়ী ছিল। তারপরও তিনি ‘দ্য কার্স অব লোনো’ (১৯৮৩) এবং ‘বেটার দ্যান সেক্স’ (১৯৯৪) দু’টি উপন্যাস লিখেছিলেন। উল্লেখ্য, ‘দ্য কার্স অব লোনো’ উপন্যাসটি তাঁর সবচেয়ে সফল ‘ফিয়ার এন্ড লোথিং ইন লাস ভেগাস : এ স্যাভেজ জার্নি টু দ্য হার্ট অফ দ্য অ্যামেরিকান ড্রিম’ উপন্যাসের পরবর্তী কাহিনি হিসেবে বিবেচিত হয়। জীবনের শেষ বছরগুলোতে অতিরিক্ত মদ্যপান ও মাদক ব্যবহারের কারণে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠেছিলেন এবং খুবই কম লিখেছেন।

যাহোক, হান্টার থম্পসন গনজো সাংবাদিকতার স্রষ্টা হলেও তাঁকে সত্য ঘটনার সঙ্গে কল্পনা মেশানো এবং সাংবাদিকতা নীতিমালার বিপরীতে লেখার জন্য তুমুল বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কেননা সমালোচকরা তাঁর সংবাদ পরিবেশনের নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত গল্প-কাহিনির সঙ্গে আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

 

জীবনের শেষ দিন
হান্টার থম্পসনের জীবনের শেষ দিন ছিল শনিবার এবং তারিখ ছিল ২০০৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। সেদিন সকাল থেকেই তাঁর জ্বর ছিল। তিনি একাকিত্ব অনুভব করেছিলেন এবং দীর্ঘ দিনের ব্যথায় ভুগছিলেন। এ ছাড়া তিনি ইএসপিএন-এর জন্য সাপ্তাহিক কলাম লেখা চেষ্টা করেছিলেন ।

হান্টার থম্পসন বিকাল ৫:৪২ মিনিটে স্ত্রী অ্যানিটাকে টেলিফোন করেন এবং স্ত্রীকে ব্যায়ামাগার থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে বলেন। তারপর স্ত্রীকে বিদায় না জানিয়ে তিনি ফোনটি পাশে নামিয়ে রাখেন। তখনো অ্যানিটা লাইনে ছিলেন। তিনি পিস্তল বের করে নিজের মাথায় গুলি করেন। চিকিৎসক ঘটনাস্থলে এসে সন্ধ্যা ৬:০৭-এ তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুর্ঘটনার সময় হান্টার থম্পসনের ছেলে (জুয়ান), তাঁর স্ত্রী (জেনিফার) এবং ছয় বছরের নাতি (উইলিয়াম) বাড়িতে ছিল। জুয়ানই প্রথম তাঁর বাবার মৃতদেহ দেখেছিল এবং পুলিশ তদন্ত করতে আসার আগেই সে নিজে বাবাকে সম্মান জানাতে শটগান দিয়ে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি করেছিল। পরবর্তীতে কিছু মানুষ মনে করেছে যে, প্রমাণ নষ্ট করার জন্য ফাঁকা গুলি করা হয়েছে।

 

কবে, কোথায় এবং কীভাবে মৃত্যু হয়েছে
হান্টার থম্পসন ২০০৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কলোরাডো রাজ্যের উডি ক্রিক এলাকায় অবস্থিত তাঁর বাড়িতে নিজেই মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যু ছিল এমন এক জীবনের বিরল এবং অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি, যা তাঁর লেখার মতোই যেমন বন্য এবং অপ্রত্যাশিত।

 

মৃত্যুর পরের বিতর্ক
হান্টার থম্পসন স্বেচ্ছায় পিস্তলের গুলিতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, তবে তাঁর বিধবা স্ত্রী (অ্যানিটা থম্পসন), কুড়ি বছরেরও বেশি সময় পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বামীর মৃত্যু পুনরায় খতিয়ে দেখার আবেদন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জুয়ান এবং তার স্ত্রী হান্টার থম্পসনের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু জুয়ান এবং তার স্ত্রী দুজনেই জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিল। হান্টার থম্পসন মারা যাওয়ার সপ্তাহেই তারা বেড়াতে এসেছিল।

যাহোক, অবশেষে কলোরাডো ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) প্রায় এক বছর (২০২৬ সালের জানুয়ারিতে) তদন্তের পরে তাঁদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়। তাঁদের তদন্তের ফলাফল ছিল এ রকম: ‘হান্টার থম্পসন হতাশা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় ভুগছিলেন’ এবং ‘সব ধারণাগত তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি।’ সিবিআই আরও বলেছে যে, আগের ফলাফলের মতোই কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অবশেষে অ্যানিটা থম্পসন সিবিআই-এর রায় মেনে নেন এবং বলেন, ‘আমরা যারা হান্টারকে ভালোবাসতাম, এই চূড়ান্ত রায় আমাদের সকলকে খোলা মনে এক সঙ্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’

 

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
হান্টার থম্পসনের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর শেষকৃত্য ছিল ব্যক্তিগত ও ব্যতিক্রম, কিন্তু অনুষ্ঠানটি ছিল আভিজাত্যে পরিপূর্ণ। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনি ডেপ সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে আনুমানিক পাঁচ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন। সেই খরচের মধ্যে ছিল হান্টার থম্পসনের ভস্ম দেড় শ’ ফুটের বেশি উঁচু টাওয়ার থেকে কামানের সাহায্যে নিক্ষিপ্ত করা। টাওয়ারের চূড়া থেকে ছাই বের হতে শুরু করলে লাল, সাদা, নীল এবং সবুজ আতশবাজি হান্টার থম্পসনের বাড়ির ওপর প্রায় দশ মিনিট আকাশ আলোকিত করেছিল এবং উপস্থিত দর্শকরা উল্লাস করেছিল। আসল বিস্ফোরণ ঘটতে প্রায় ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়েছিল।

প্রায় ২৮০ জন নিকট আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং গণ্যমান্য অতিথি হান্টার থম্পসনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দুজন মার্কিন সিনেটর জন কেরি ও জর্জ ম্যাকগভর্ন এবং অভিনেতা ও বিখ্যাত জাদুকর শন প্যান।

 

আত্মহত্যার চিরকুট
হান্টার থম্পসনের মৃত্যুর পরে সেখানে তাঁর স্ত্রী অ্যানিটাকে উল্লেখ করে লেখা একটি নোট পাওয়া যায়, যা তাঁর আত্মহত্যার চার দিন আগে লেখা হয়েছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, সেই চিরকুটটি আত্মহত্যারই চিরকুট ছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘ফুটবল ঋতু শেষ হয়েছে’ এবং তারপর লেখা ছিল:

‘আর কোনো খেলা নেই। আর কোনো বোমা নেই। আর কোনো হাঁটাচলা নেই। আর কোনো আনন্দ-উল্লাস নেই। আর কোনো সাঁতার নেই। ৬৭। বয়সের সংখ্যাটি ৫০-এর চেয়ে ১৭ বছর বেশি। ১৭ বেশি, যা আমি চাইনি কিংবা আমার প্রয়োজন ছিল না। বিরক্তিকর। আমি সবসময় মেজাজী, অত্যন্ত রাগী। কারো জন্য হাসি-তামাশা নেই। ৬৭। তুমি লোভী হয়ে যাচ্ছ। তোমার বয়স অনুযায়ী আচরণ করো। আরাম করো—যা কোনো কষ্ট দেবে না।’

চিরকুটের নিচে হান্টার থম্পসন একটি ‘হ্যাপি হার্ট’ আঁকেন, যা সাধারণত ভ্যালেন্টাইন ডে-র কার্ডে দেখা যায়।

 

আত্মঘাতির কারণ
হান্টার থম্পসনের আত্মহত্যার মূল কারণ ছিল গভীর হতাশা, মনোবেদনা এবং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথা। তাঁর স্বাস্থ্য ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল এবং তিনি ভীষণ নাজুক অবস্থায় ছিলেন। আত্মহননের আগে তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন, যার মধ্যে ভাঙা পা এবং কোমর প্রতিস্থাপন ছিল। তখন তিনি আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী অ্যানিটা বলেন যে, তাঁর স্বামী মৃত্যুর আগের মাসগুলোতে নিজেকে শেষ করার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর মৃতদেহ, অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম এবং সম্পদ নিয়ে তিনি কী করতে চান, তা নিয়ে মৌখিক এবং লিখিত নির্দেশনা দিয়েছেন।

হান্টার থম্পসনের পরিবারের কয়েকজন সদস্য, যার মধ্যে ছেলে জুয়ানও আছে, উল্লেখ করেছে যে, তিনি নিজের জীবন শেষ করার পরিকল্পনার সংকেত দেখিয়েছেন। আত্মঘাতি হওয়ার আগের সপ্তাহে হান্টার থম্পসন উপহার বিতরণ করেন এবং তাঁর নাতির সঙ্গে প্রিয় সিনেমা ‘দ্যা মাল্টিজ ফ্যালকন’ দেখেছেন। পিটকিন কাউন্টির শেরিফ তদন্তকারী জো ডি সালভোও উল্লেখ করেছেন, ‘হান্টার আত্মহত্যার কথা বলতেন।’ তবে হান্টার থম্পসনের অনেক প্রিয়জন বিশ্বাস করেন যে, তাঁর আত্মহত্যা পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল এবং স্বতঃস্ফূর্ত কোনো কাজ ছিল না।

 

উত্তরাধিকার
হান্টার থম্পসন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক এবং পাঠকদের জন্য নতুন পথ তৈরি করেছেন। তিনি গনজো সাংবাদিকতার স্রষ্টা ও পথপ্রদর্শক। এ কথা সত্য যে, তিনি প্রচলিত সংবাদ লেখার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছেন এবং প্রচলিত রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি মার্কিন সাহিত্য ও সাংবাদিকতার উপর অমোচনীয় ছাপ রেখেছেন। তিনি তাঁর অনন্য প্রতিভা দিয়ে সাংবাদিক এবং লেখকদের প্রভাবিত করেছেন, এমনকি এখনো অনুপ্রাণিত হচ্ছে। তাঁর আলাদা ঘরানার লেখার শৈলী ও বিপরীত মুখী দৃষ্টিভঙ্গি অগণিত লেখককে উৎসাহিত করেছে, বিশেষ করে যারা ব্যক্তিগত বর্ণনার সঙ্গে সাংবাদিকতা মেলানোর চেষ্টা করেন। এ ছাড়া তাঁর কাজগুলো এখনো সংবাদ মাধ্যম, রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।

 

শেষকথা
হান্টার থম্পসন উচ্ছৃঙ্খল জীবন, মাদক ব্যবহার, অপরিমিত মদ্যপান, রাজনৈতিক উদ্দীপনা এবং অপ্রচলিত সাংবাদিকতার পদ্ধতির জন্য অত্যন্ত বিতর্কিত ব্যক্তি ছিলেন। তবে এসব নেতিবাচক বিষয়কে তোয়াক্কা না করে তিনি নিজেকে সমকালীন সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি গনজো সাংবাদিকতার স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সত্য প্রকাশ করতে সাংবাদিকতাকে ভদ্র, নিরাপদ কিংবা নিরপেক্ষ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

হান্টার থম্পসনের উত্তরাধিকার সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্র—উভয়কেই প্রভাবিত করছে এবং নিঃসন্দেহে আগামিতেও করবে। তাঁর ভিন্ন ধরনের সাহিত্য মার্কিন সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বেঁচে থাকবে।

হান্টার থম্পসনের মৃত্যু নিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানিটা থম্পসন বলেছেন, ‘আত্মহত্যা তাঁর (হান্টার থম্পসনের) চূড়ান্ত বিজয়, কোনো হতাশ বা দুঃখজনক ব্যর্থতা নয়।’

 


পাদটীকা:
১. গনজো সাংবাদিকতা: এক বিশেষ ধরনের প্রতিবেদন, যেখানে সাংবাদিক নিজেই ঘটনা বা কাহিনির প্রধান চরিত্র হিসেবে যুক্ত হয়ে উত্তম পুরুষে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে প্রতিবেদন বা নিবন্ধ লেখার সময় প্রায়ই তিনি সত্যের সঙ্গে কল্পনা মেশান।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, ছড়াকার এবং অনুবাদক। লেখালেখির শুরু সত্তরের মাঝামাঝি। ঢাকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাহিত্য পাতায়, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তার মৌলিক এবং অনুবাদ গল্প। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে দুটি গল্পের সংকলন, চন্দ্রপুকুর (২০০৮) ও কতটা পথ পেরোলে তবে (২০১০)। এছাড়া, তার অনুবাদে আফগানিস্তানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৩), নির্বাচিত নোবেল বিজয়ীদের সেরা গল্প (২০১৩), ইরানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৪), চীনের শ্রেষ্ঠ গল্প ও নির্বাচিত ম্যান বুকার বিজয়ীদের সেরা গল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।