রবিবার, আগস্ট ১৬

আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ১ম পর্ব

0

রাজশাহীকে পেয়ে ওঠার আগে, এক সে যাত্রাবিরতির কাল

 

রাজশাহী যে অনেক মেলা দূরের, কোনো এক অচিন মুল্লুকের এক টাউন; সেটা তখন আমার জানা ছিলো। কিন্তু সেই দেশ যেইখানে খুশি থাকুক গা; আমার তারে নিয়া কোন দরকার!

আমি তখন কোথায় আছি?

আছি এক প্রকার যাত্রাবিরতিতে। আমি একা নই। আব্বাসহ আমরা ছয় ভাইবোনই তখন আছি ওই যাত্রাবিরতিতে। আব্বা তখন ঢাকায় হেড অফিসে, এইখানেই কয়েকটা বছর চাকুরি করে যেতে চান। স্বেচ্ছায় সেটা চাননি তিনি। চাইতে বাধ্য হয়েছেন। ঘরে তাঁর আছে অতি নম্র নরম মধুরা পত্নী। আমাদের আম্মা। সেই আম্মাটার কঠিন চাপ, কড়া জাতির ঠেলা আব্বাকে ঢাকা-থিতু হতে বাধ্য করেছে। নয়তো আমাদের আব্বা চাকুরিতে বদলি ভালোবাসেন, মফস্বলের নিরল সবুজ রাস্তার কিনারের ছায়ছোট্ট বাসায় থাকতে পছন্দ করেন, কিছুতেই ঢাকায় হেড অফিসে বদলি হয়ে আসতে চান না। তারপরেও তাঁকে তখন সেই ১৯৬৯-এ হেড অফিসেই এসে চেয়ার পেতে নিতে হলো। পাততে বাধ্য হলেন।

আব্বা তখন ঢাকায় হেড অফিসে, এইখানেই কয়েকটা বছর চাকুরি করে যেতে চান। স্বেচ্ছায় সেটা চাননি তিনি। চাইতে বাধ্য হয়েছেন। ঘরে তাঁর আছে অতি নম্র নরম মধুরা পত্নী। আমাদের আম্মা। সেই আম্মাটার কঠিন চাপ, কড়া জাতির ঠেলা আব্বাকে ঢাকা-থিতু হতে বাধ্য করেছে। নয়তো আমাদের আব্বা চাকুরিতে বদলি ভালোবাসেন, মফস্বলের নিরল সবুজ রাস্তার কিনারের ছায়ছোট্ট বাসায় থাকতে পছন্দ করেন, কিছুতেই ঢাকায় হেড অফিসে বদলি হয়ে আসতে চান না।

তার পত্নী, যিনি কিনা আমাদের আম্মা, স্কুলের চাকুরি-ফাকরি ছেড়ে তখন ছয় ছয়জন তেরেঙ্গা-ঝেড়েঙ্গা পোলাপান সামলাতে সামলাতে দিন পার করতে থাকা। হঠাৎই তার তখন একদিন খেয়ালে আসে যে, তার পোলাপানদের জন্য ভৈরব বাজারে দাদাবাড়ি আছে ঠিকই; কিন্তু এদের নিজেদের কোনো একটু ভিটি নাই। বদলিতে বদলিতে কতো না মনোহর সব একতলা একতলা অফিসের বাসা জুটছে। দেয়াল-ঘেরা আঙ্গিনায় মালি এসে বাগান করে দিচ্ছে, সবজি রুইছে, পুঁই লতা ফলিয়ে তুলছে। সব মনসুখী করা, সবকিছুতে শান্তি আর আরাম। কিন্তু হলে কী! এ তো নিজের ভিটি না। তাইলে কোন পরাণে সুখ নিথর হয় এই আম্মাটা!

কাজেই টুকুর-টুকুর জমা-জমান্তি করে-টরে, একটা জমি ঠিকই করে ফেলে আম্মা। সেই জমিরে বসতভিটি বানাতে হলে, গৃহস্থের নিজেরই তো উপস্থিত থাকা চাই। বাইরের লোক দিয়ে কাজ হবে কী, খালি পয়সা খোয়ান্তি সার। কাজেই আব্বাকে এইবার বদলি হতেই হলো ঢাকাতে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা আর তেমন কিছু দূর নাকি? না তো।

আব্বা তার বাচ্চা কয়টাকে নিয়ে, কিঞ্চিৎ আপত্তি জানাবার চেষ্টা যে চালায় নাই, সেটা নয়। চালায়। বলে যে, আত্মীয়দের কোনো একজনকে দেখভালের কর্মে লাগালেই তো ঝামেলা থাকে না। নিজেরা বরং এইবার যাওয়া যাক সিলেটে। রংপুর থেকে সোজা সিলেট। দারুণ একটা ব্যাপার হয় তাহলে। আমরা বুঝে উঠি, এইবার আমরা চা বাগান দেখতে পেতে যাচ্ছি। চাঞ্চল্যে আমরা ছয়জন, বুঝে-না-বুঝে, টলোমলো টলোমলো হতে থাকি।

কিন্তু বাসার ভেতরে, আম্মার রুমে, এমন অন্ধকার নেমে আসে যে, আমাদের খুব ভয় করতে থাকে। সেদিন সকাল থেকেই আম্মা অফিসে যাওয়ার সময়ে আব্বাকে বিদায় দিতে, দরোজার মুখে দাঁড়ান না। খেতে আসেন না, ঘরদোরের খোঁজ করেন না। আব্বার জন্য বিকেলে চিড়া-ভাজার তদারকি তো করেনই না। আমাদের রেডিও-ও বেজে ওঠে না; একবেলাও। নূরু মিয়া পাবদা মাছদের ভাজতে গিয়ে ঘ্যাটঘ্যাটা কাঁটা-ঘণ্ট বানায়ে ফেলে। সেই কাঁটারা আমাদের সব কয়জন ভাই-বোনের মুখের ভেতরটাকে থ্যাতা-খ্যাতা করে দিতে থাকে। নূরু মিয়া বলতে থাকে: ‘ভাইয়া, আফা! তোমরা মাছ নিচ্ছু কেনো? ডাইল নিলিই তো বালা। ডাইল দি খাও। ডাইল নিচ্ছু না ক্যানো?’ একটা পুরোদিন এইভাবে যায়, দ্বিতীয় দিনও যায় যায়।

আব্বা তখন বলে, ‘আচ্ছা, সিলেট বাদ। রাজশাহী চলো। তোমার তো রাজশাহী পছন্দ আছিলো।’

‘রাজশাহী একবার আছিলাম না নাকি? আর ক্যান?’ আম্মা মিশমিশিয়ে কান্না শুরু করে। সেই কান্নার ফল এই যে, আমরা নারায়ণগঞ্জে ঘরবসত করতে আসি। আমাদের জমিতে মাটি ফেলা হতে থাকে। ছাব্বিশ শতাংশের সেই জমির খানিকটা কেটে কেটে মাটি তোলা হতে থাকে। আমরা নানাবাড়ির মেহমান হয়ে থাকতে থাকতে, সেই নিচু জমিটাকে ক্রমে ভরে ভরে উঁচু হয়ে উঠতে দেখতে থাকি। সমস্ত দিন মাটি কাটা আর মাটি পড়ার দুম্মুর ধুম্মুর আওয়াজ উঠতে থাকে। শুধু আওয়াজ। আওয়াজ। আর কিচ্ছু নেই তখন সেইখানে। কিন্তু সন্ধ্যার মুখে, সকল কামলা বিদায় নিয়ে যাওয়ার পরে, ভিটি বাঁধতে থাকা মাটির চাড়গুলো থেকে নরম হালকা একরকমের তপ্ত তপ্ত গন্ধ আসতে থাকে।

যেন খেঁজুর গুড় জ্বাল দিচ্ছে কেউ, অনেক দূরের কোনো বাড়িতে। যেন বাতাসে বাতাসে ভেসে ভেসে আসছে সেই গন্ধটুকু! এমন। এমন লাগতে থাকে মাটির গন্ধটাকে। সেই গন্ধটাকে নিতে নিতে আমার মনে হতে থাকে, আব্বা আমাদের রাজশাহী নিয়ে গেলে কী ভালো না-জানি লাগতো। আব্বা আম্মা তাদের জীবনের গোড়াতে রাজশাহী ছিলেন বটে, আমি তখন কেমন? আমি তখন একরত্তি কোলের ছাও। সেই তখন, আমার রাজশাহী থাকা কী, না-থাকাই বা কী! এইবার যেতাম যদি! আম্মা যে কেমন!

তখন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে আন্জুমান আরা বেগমের গাওয়া সেই গান দিনভর বেজেই চলছিলো: ‘নামের বড়াই কোরো নাকো নাম দিয়ে কী হয়/ নামের মাঝে পাবে না কো সবার পরিচয়।’ সেই গানে আছে তো: ‘রাজা নেই শাহী নেই রাজশাহী নাম/ হাতি ঘোড়া কিছু নেই আছে শুধু আম! উফ!’ গেলে হতো না সেইদেশে? বাড়ি পরে বানাইলে হইতো না?

কিন্তু আম্মা! কেমন যে কড়্ড়া!

সকালে ওভালটিন বিকালে হরলিকস আর মোহনভোগ—আমাদের মুখে তুলতে বাধ্য করে যেতে থাকা আম্মা। মামাবাড়ির সকলে কী চমৎকার চা খেতে পায় সকালে। বিকালে তো পায়ই। আরো পায় ঝালমুড়ি অথবা পেয়াজ-মরিচে মাখা ঝাল ঝাল খুদ-ভাজা। মোহনভোগ কী ক্ষীরমুড়ি সেইখানে পছন্দের কোনো পদই না।

‘এত্তা মিঠা জিনিস এমনে খাওন যায় নি! ইছ! কিমুন মিঠা অইগিলি! কতো খাওন যায় অমুন মিঠা-কুটকুট্টা খানাদানা।’ মামাবাড়ির সকলে এইমতে আমাদের খাদ্যখানারে তাচ্ছিল্য দিয়ে দিয়ে বাতাসে উড়ায়ে দিতে থাকে। হরদম ওইই করতে থাকে। ‘চা খাইতে যেই মজা! তরা বুঝবি কেমতে? তরা ত দুধভাত পোলাপাইন, ম্যাওম্যাও।’

আম্মাকে রোজ সাহায্য করতে আসেন যেইজন, তিনি আমাদের শহরবানু খালাম্মা। লোকে জানে তিনি আমাদের মুখ-বোলা খালা; কিন্তু তারে মান্যগণ্যি করতে কিঞ্চিৎ গাফিলতি দেখলে, আম্মা আড়ালে আমাদের পিঠে ডাইল-ঘুটনির ডান্ডা ভাঙতে কুণ্ঠা করেন না। কোনো কোনোদিন একটু ভোরের বেলা আসার জন্য তাকে ডাকতে পাঠান আম্মা।

বড়ো যেহেতু আমি, তখন পুরা সাত বচ্ছর বয়স যখন অই বড়োজনের; কাজেই আমিই যাবো ওই ডেকে আনার কর্মটা সারতে, অমনই তো বিধি। যাই আমি তাঁকে ডেকে আনতে। অমন ফ্যাকা-সিমসাম কালোমতো প্রহরে; জনমনিষ্যি-অজাগনা অতি বিহানের কালে, আমি গিয়ে হয়তো তখন দাঁড়িয়ে যাই শহরবানু খালাম্মাদের উঠানে। ডাক দেওয়ার আগেই ঘরের ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা উড়ে আসে: ‘কেটায় আইছো রে উটানে? কেটায়?’

তরাসে পায়েরা কম্প দিয়ে ওঠে তখন। আম্মা নিষেধ দিছে না? কিছু সাধলে য্যান একদম না-খাই? কতো কষ্টমষ্ট কইরা শহরবানু বুঝিয়ে দিন পার করে। হের খাওনের জিনিসে ভাগ লইলে কইলাম, আল্লায় বেজার হইবো! আম্মা কড়্ড়া করে এই নিষেধ দিয়ে, তবেই তো এই ডাকতে পাঠিয়েছে। তারপর আমি বুঝি ওই খাবার হাতে নেবো!

‘আমি গো খালাম্মা! আম্মায় আপনেরে অক্ষণ এট্টু যাইতে কইছে।’ এই তো বলতে থাকি আমি, কিন্তু কথা হেঁচকে-আটকে যেতে থাকে আমার। কী জিভ-কাতরে দেওয়া গন্ধ, ধোঁয়া আর ভাজা গমের গন্ধ; শহরবানু খালাম্মার ঘরের এক কোণে। ঢোকার দরোজার একপাশের কোণে! একটাই ঘর তাদের, এক কিনারে চৌকি পাতা। আর ঘরে ঢোকার মুখেই বেড়া-ঘেঁষে চুলা। সেই চুলায় জ্বাল ধরানো, অল্প আগুন। কিটকিটে কালো হয়ে আসা ছোট্ট-মোট্ট মাইট্টা হাড়িখানায় পান-খাওয়ার খয়েরের মতো খয়রা বরনের পানি বলক খায়, বলক খায়। পানি বলক খায়, আর যেন ভাজতে থাকা তেলের পিঠার গন্ধ ছুড়ে দিতে থাকে। উথলে ছলকে আসতে থাকে, তেলের পিঠার গরম গন্ধ।

‘হাড়ির কালা-কুষ্টি পানি এমুন বাস দেয়!’

‘ও জাদু! এইটা পানি নিহি! পানি না তো। এইটা তো চা-পাতি বলক দিতাছে। আউক্কা মিটাইও গলতাছে পানির ভিতরে। জ্বাল-পড়া আউক্কা-মিটাই তেনে এমুন সোয়াদের গন্ধই ত্তো ওঠে গো বাজান। খাইবা দুগা গেউ ভাজা দিয়া রং-চা? এট্টু দেই?’

না না! তরাসে পায়েরা কম্প দিয়ে ওঠে তখন। আম্মা নিষেধ দিছে না? কিছু সাধলে য্যান একদম না-খাই? কতো কষ্টমষ্ট কইরা শহরবানু বুঝিয়ে দিন পার করে। হের খাওনের জিনিসে ভাগ লইলে কইলাম, আল্লায় বেজার হইবো! আম্মা কড়্ড়া করে এই নিষেধ দিয়ে, তবেই তো এই ডাকতে পাঠিয়েছে। তারপর আমি বুঝি ওই খাবার হাতে নেবো!

কিন্তু গরম ভাজা-গেউয়ের গন্ধরা এমন ফাঁপলে-ফলকে, কেনো আসতে থাকে আমার দিকে! কুলার ওপরে ছড়ায়ে রাখা আছে ভাজা গমগুলা। সেগুলোর গন্ধ এমন এমন গরম! আমাদের মোহনভোগের গন্ধের চেয়েও বেশি ছলছলে, বেশি মিঠা, বেশি গরম গরম। খাইতে অনেক না জানি ভালা! কেমুন না জানি মজা। আউক্কা মিটাইয়ের রং-চা বেশি মজা, না এই ভাজা গম? ইস!

‘আম্মা! আমাগো একদিন গেউ-ভাইজ্জা আউক্কা মিটাই-র রং চা রানবেন? আম্মা!’

‘হায় হায় হায়! দ্যাখছো কী বেসাইরা ছ্যাচ্চড় হইছে মাইয়ায়! গেউ ভাজাও বোলে খাওনের জিনিস! পুয়ারুটি তোমার মোখে গছে না। ওভালটিন তোমার তিতা লাগে, এইর লেইগাই? আউক্কা মিটাইয়ের রং-চা আর গেউ-ভাজার লেইগা? যা দেহে হেইটাই খাওনের লেইগা তছনছ হইয়া যায়! এইটার চক্ষে ভোখ। ছ্যাচ্চড় এই মাইয়ারে লইয়া আমার উফায় কী, মাবুদ!’

 

( চলবে)

[বি. দ্র. লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।]

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।

আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধূলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।