রবিবার, জুলাই ২১

আয়েশা : আহমেদ খান হীরক

0

এ যুগে আর কে চিঠি লেখে!

অথচ বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম আমার নামে একটা চিঠি এসেছে। বালিশের ওপর রাখা। বাসায় আমি আর আম্মা ছাড়া অন্য কেউ তো থাকে না। দরজা খোলার সময়ও আম্মা কিছু বললেন না চিঠির ব্যাপারে। সরকারি হলুদ খাম যে এখনো টিকে আছে তা দেখে আশ্চর্যই হলাম। আগ্রহ নিয়েই খুললাম চিঠিটা। বড়ো একটা আধ-দোমড়ানো পাতার একেবারে মাঝ বরাবর লেখা—

ভাইজান,

আমি এই দুবছর অপেক্ষার কথাই বলছিলাম।

 

নিচে কারো নামটাম লেখা নাই। তবে লেখা না থাকলেও বুঝতে বাকি থাকল না কার চিঠি এটা। লিখতে তাকে আমিই শিখিয়েছিলাম। ‘প’ অক্ষরটা আমি নিজে একটু গোল করে লিখি, সেও ‘প’ লিখতে শিখল গোল করে; এখনো যে ভোলেনি তার প্রমাণ এই চিঠি।

আয়েশা।

আমাদের বাড়িতে এসেছিল বছর চারেক আগে। এসেছিল মানে তাকে নিয়ে এসেছিলেন গ্রাম সম্পর্কের এক চাচা। তার আগে অনেক দিন ধরেই আমরা কাজের লোক পাচ্ছিলাম না। আয়েশাকে পেয়ে আমরা নিজেদের মনে করেছিলাম সৌভাগ্যবান। এবং সেই সৌভাগ্য তত দিন পর্যন্ত ছিল যত দিন পর্যন্ত সেই রাত না এলো। সেই রাত, যে রাতে আয়েশা মারা গেল!

অতএব, মৃত আয়েশার চিঠি আসতে পারে না—এমন আমি ভাবতেই পারি, কিন্তু ভাবছি না। না ভাবার কারণও রয়েছে যথেষ্ট। চিঠি পরের কথা, মৃত আয়েশা যদি নিজেই সামনে চলে আসে তবু অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বরং এ দুবছর মনে মনে অপেক্ষা করেছি আয়েশার।

আম্মা, চিঠিটা দেখেছে নাকি?

খেতে বসে জিজ্ঞেস করব কি না ভাবছি। আম্মা নিজেই বললেন, তোর একটা চিঠি রেখেছি ঘরে। ওপরে শুধু তোর নাম… এ যুগে আবার চিঠি কে দিলো রে?

যাক, আম্মা বুঝতে পারেননি। আব্বার মৃত্যুর পর আম্মার হার্টটা হঠাৎ করেই বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। মৃত আয়েশা চিঠি দিয়েছে বিষয়টা তাঁর অজ্ঞাত থাকাই ভালো।

রাতে আবার চিঠিটা নিয়ে বসলাম। ক-শব্দের চিঠি এবং প্রেমিকার চিঠিও তো নয়… বারবার পড়ার অর্থ নেই একেবারে; তারপরেও পড়তে হচ্ছে। চিঠিটা পরিষ্কার, অথচ আয়েশা কী নোংরা ছিল! আম্মা তাকে প্রথম দেখেই বলেছিলেন, এই মেয়ে যাও বাথরুমে গিয়ে গোসল দিয়ে আসো। খবরদার ভেতরের বাথরুমে যাবা না!

রাতে আবার চিঠিটা নিয়ে বসলাম। ক-শব্দের চিঠি এবং প্রেমিকার চিঠিও তো নয়… বারবার পড়ার অর্থ নেই একেবারে; তারপরেও পড়তে হচ্ছে। চিঠিটা পরিষ্কার, অথচ আয়েশা কী নোংরা ছিল! আম্মা তাকে প্রথম দেখেই বলেছিলেন, এই মেয়ে যাও বাথরুমে গিয়ে গোসল দিয়ে আসো। খবরদার ভেতরের বাথরুমে যাবা না!

আয়েশা তীব্র শীতের মধ্যে ঠান্ডা পানিতে, সাবান ঘষে ঘষে গোসল করেছিল ওই সন্ধ্যায়। এতটুকু বিকার ছিল না তার মধ্যে। শুধু ঠান্ডাতেই না, কদিনের মধ্যে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করি তার যেন কোনো কিছুতেই বিকার নেই।

একদিন দেখি রান্নাঘরে শিঙ্কের ওপর আয়েশা ঘাড় কাত করে মাথাটা পেতে রেখেছে। ট্যাপ থেকে গলগল করে পানি পড়ছে। শিঙ্কের ফুটোটা বন্ধ করা আছে ছিপি দিয়ে, জমতে জমতে শিঙ্ক উপচিয়ে পানি পড়ছে। আয়েশা নির্বিকারভাবে মাথার চুল ভিজিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে পানি খাচ্ছে। এই ভঙ্গির মধ্যে পশুর পানি খাওয়ার মিল আছে। আওয়াজও হচ্ছে চুকচুক। এই আওয়াজের মধ্যে কেমন একটা অস্বাভাবিকতা আছে। যা চোখে লাগে, কানে লাগে; খারাপভাবে লাগে।

আমি বললাম, আয়েশা কী করছিস?

আয়েশা আমার দিকে তাকিয়ে তার বড়ো বড়ো চোখ কুঁচকে ফেলে। এ কথা ঠিক যে আয়েশার নোংরামি আর অস্বাভাবিকতা সরিয়ে ফেললে দেখতে সে ভালোই। বড়ো বড়ো চোখ। চোখের ভেতর পানি যেন সব সময় টলমল করছে। নাক মোটামুটি খাড়া। তবে চুলের দিকে তাকানো যায় না। জটা-টটা লেগে একেবারেই বাজে অবস্থা!

আয়েশা পানি খাওয়া থামায় না। আগের মতোই মাথাটা পেতে রাখে শিঙ্কের ওপর। তার নাকে মুখে গলগল করে পানি ঢুকছে। আমি আবার বললাম, কী করিস… পানি নষ্ট হচ্ছে না? চলে আয়।

‘তিসনা পাইছে ভাইজান… আরেট্টু খাই…!’

‘এভাবে পানি খাচ্ছিস কেন? গ্লাসে খা!’

আয়েশা এমনভাবে আমার দিকে তাকায় যেন অসম্ভব কথা শুনছে। তারপর আবার পানি খেতে থাকে।

সহ্য করতে না পেরে কল বন্ধ করে আয়েশার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসি বসার ঘরে। আয়েশা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে টিভি দেখতে শুরু করে মেঝেয় বসে। একটু আগে যে পানি-কাহিনি ঘটে গেছে সে বিষয়ে মনে হলো কোনো ধারণা তার নেই।

শীত তখন শেষ হচ্ছে। হালকা হালকা বাতাস বওয়া ছাড়া শীতের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। আম্মা গেছেন ফুপুর বাড়ি। আমি বিকেলের ঘুম শেষ করে এক কাপ চা খাব বলে অনেকক্ষণ আয়েশার নাম ধরে ডাকলাম। আয়েশার কোনো পাত্তা নেই। এত দিনে আয়েশার সাথে আমাদের একটু সদ্ভাব হয়েছে। খেয়াল করে দেখেছি আয়েশা যত নোংরাই থাক, এক বোতল শ্যাম্পু উজাড় করেও তার মাথার জট না ছাড়ুক, নিজের সাথে যতই কথা বলুক, তার মধ্যে চট করে শিখে ফেলার অসম্ভব গুণটা আছে। টিভির রিমোট তার নখদর্পণে, ফ্রিজের কোথায় কী, কোন বইটা কোন শেল্‌ফে, কোন সিগারেট আমার পছন্দের, আম্মার চা কখন কখন লাগে সবই তার আয়ত্তে। কাপড় কাচায় তার অসীম আগ্রহ। প্রতিদিনই আনন্দের সাথে সে কাপড় কাচছে।

আমাদের কাজ কমে গেছে একেবারেই। আম্মা রান্নাটা শুধু আয়েশাকে করতে দেন না, তাছাড়া পুরো সংসার আয়েশার তালুর ভেতর। পড়ালেখা না জেনেও এই মেয়ের বইয়ের প্রতি আগ্রহ তা দেখতেও ভালো লাগে!

ফলে তাকে নিয়ম করে পড়াতে শুরু করি আমি। দেখি খুব দ্রুতই অক্ষর চিনে ফেলছে সে। বাংলা বর্ণমালার প্রতি অসমান্য আগ্রহ দেখে আমরা তার নাম দিয়েছি ‘বাঙাল’!

ডেকে ডেকে আয়েশাকে না পেয়ে প্রথমে বসার ঘরটা দেখি। টিভির প্রতি অন্যান্য কাজের লোকের মতো তারও ব্যাপক আগ্রহ। সমস্যা হলো সে নাটক বা গান-সিনেমা দেখে না। তার সমস্ত আগ্রহ খবর আর টক-শোর প্রতি। বেশিরভাগ টক-শোয়ের সময় তার জানা, খাওয়াদাওয়ার পর হাতের কাজ শেষ করে টিভির সামনে বসে যায়। আমরা ঘুমিয়ে যাই, মধ্যরাত পর্যন্ত সে টক-শো দেখে।

এখন দেখি যে টিভির সামনে সে নেই। উঁকি দিলাম রান্নাঘরে এবং যা দেখলাম তাতে ঘাড়ের নিচ দিয়ে একখণ্ড বরফ নেমে গেল। একটা বড়ো রুইমাছ এনেছিলাম গতরাতে। কাটাকাটির ঝামেলা বলে রান্না হয়নি, আগামীকাল হয়তো হবে। আয়েশাকে দেখলাম ফ্রিজ থেকে সে মাছ বের করে নিয়েছে। রান্নাঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসেছে বটি নিয়ে।

এখন দেখি যে টিভির সামনে সে নেই। উঁকি দিলাম রান্নাঘরে এবং যা দেখলাম তাতে ঘাড়ের নিচ দিয়ে একখণ্ড বরফ নেমে গেল। একটা বড়ো রুইমাছ এনেছিলাম গতরাতে। কাটাকাটির ঝামেলা বলে রান্না হয়নি, আগামীকাল হয়তো হবে। আয়েশাকে দেখলাম ফ্রিজ থেকে সে মাছ বের করে নিয়েছে। রান্নাঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসেছে বটি নিয়ে। মনোযোগ দিয়ে মাছটা কাটছে। বড়ো বড়ো টুকরোগুলো রাখছে পাশের বাটিতে। কিন্তু ভয়ংকর কথা হলো মাছের পেটের ভেতরের যত নাড়িভুঁড়ি সেগুলো সে গপগপ করে খাচ্ছে। খাচ্ছে আর খিকখিক করে হাসছে। হাসছে আর অদৃশ্য কারো সাথে কথা বলছে। কথাগুলো এরকম—

এখন ফাল পাড়বি না… ওই হারামি… খবরদার বেজায়গায় হাত দিবি না… হি হি হি… ওই সুড়সুড়ি লাগে জারুয়া…

পুরো দৃশ্যটার মধ্যে, আয়েশার কথা বলার মধ্যে, রান্নাঘরের মধ্যে যেন অন্য কিছু আছে, অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে, অন্য কেউ আছে! এই দৃশ্য আমি নিতে পারি না, ছুটে বেরিয়ে যাই রান্নাঘর থেকে। নিজের ঘরে ঢুকি। আয়েশার অনেক অস্বাভাবিকতা হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু মাছের নাড়িভুঁড়ি খাওয়া, কাচামাছ খাওয়া? অসম্ভব! ফুপুবাড়ি থেকে ফিরে আম্মা এ দৃশ্য দেখে ফেললে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবেন। অথচ এ ঘটনা তাকে জানানো উচিত। আয়েশাকে কাজ থেকে বাদ দেয়া উচিত।

ধীরে ধীরে মাথা ঠান্ডা হয়ে এলো। আরেকবার উঁকি দিতে গেলাম রান্নাঘরে। দেখি আয়েশা মগ ভর্তি করে চা নিয়ে আসছে, যেমন আমি খাই। চায়ে চুমুক দেওয়া ছাড়া আমার অন্য কোনো উপায় থাকল না। চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আয়েশার মুখের দিকে তাকালাম। তার ঠোঁটের কোনায় এখনো মাছের উচ্ছিষ্ট লেগে আছে। আমার গা গুলিয়ে গেল।

আয়েশার কথা আম্মাকে বলতে পারলাম না; কিন্তু কাউকে না বলে শান্তিও পাচ্ছিলাম না। শেষে বললাম রাখিকে। রাখি আমার বান্ধবী। বছর খানেক পর বিয়েশাদি করব, এসব তাকে বলা যায়। রাখি তো সব শুনে হেসে অস্থির। বলল, ভালো পাগলি আছে তো মেয়েটা…

হাসছে বলে রাখির ওপর একটু বিরক্তই হলাম। ভ্রু কুচকে তাকালাম তার দিকে; তাতে হাসির হেরফের হলো না। বলল, বললে না মেয়েটার বয়স ১৫-১৬… ওই বয়সি মেয়েদের কত কিছু মনে হয়… ওই বয়সে আমি তো গভীর রাতে ব্যালকনিতে দুপা নিচে ঝুলিয়ে বসে থাকতাম। পাশের ফ্ল্যাটের আজমল চাচা এক রাতে দেখে ফেলল আমাকে… দেখামাত্র শুরু করল আজান। সে এক যা তা অবস্থা! পরের সকালে চাচি এসে আম্মাকে যা বলে গেল তার মর্ম হলো আমার ওপর জিনের আসর আছে, ভালো কবিরাজ না দেখালে নাকি নিস্তার নাই… হি হি হি… জিনের আসর…!

আমি অবাক হয়ে রাখিকে দেখি, তার অপ্রকৃতিস্থের মতো হাসি শুনি।

রাখি হাসি থামিয়ে বলল, বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েরা কত কী যে করে!

আমি নিশ্চিত হব, না আরও ভীত হব বুঝতে পারলাম না। তবে মাথায় বয়ঃসন্ধিকাল ব্যাপারটা গেঁথে গেল। আয়েশার উদ্ভট কাজগুলোকে স্বাভাবিক চোখে দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। রান্নার সময়টুকু ছাড়া আম্মা ঘরের ভেতরই থাকতেন। নামাজ পড়তেন, দোয়াদরুদে ব্যস্ত থাকতেন; আয়েশার এসব অদ্ভুত ব্যাপারস্যাপার বুঝতে পারতেন না। আগেই বলেছি, আমি চাইতামও না আম্মা এসব জানুক।

কিছু দিন গেল এভাবেই। নতুন চাকরি নিয়ে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, আয়েশাও থাকতে লাগল তার মতো। ঘরের কাজ শেষে তাকে দেখতাম হয় টক-শো শুনছে নাহয় বই পড়ছে। সে পড়ালেখা শিখে ফেলেছিল খুব দ্রুত। আমার কখন কী লাগবে সে বিষয়ে ছিল তার বিশেষ খেয়াল। পানি গরম করে বাথরুমে দেওয়া থেকে শুরু করে চায়ের আয়োজন—সবই সে করত এক ছুটে। তার পরিবর্তনটা হয়েছিল দেখার মতো। আমাদের সাথে থাকতে থাকতে এক বছরেই তার শরীর থেকে প্রায় সমস্ত গ্রাম্যতা ঝরে গেল; অতীতের সাক্ষী হয়ে থাকল কেবল তার মাথার জটাটা। ওই জট দেখে দেখে আমরাও অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

এক রাতে তীব্র গরমে ঘুম ভাঙল। পরের দিন অফিস বন্ধ তাই এমনিতেই দেরি করে ঘুমিয়েছিলাম, এখন মধ্যরাত পেরিয়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্ত লাগছিল খুব। দেখলাম সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘাড়ের পেছনে চুলের গোড়ায় জবজবে ঘাম। ফ্যান ঘুরছে, তবে খুবই ধীরে। মেজাজটা খিচড়ে গেল। উঠে পানি খেলাম এক গ্লাস। তারপর সিগারেট খাবার ইচ্ছায় গেলাম ছাদে।

আমাদের বাড়িটা পুরোনো আমলের ভাঙাচোরা তেতলা। তিন তলায় থাকি আমরা।

সিঁড়িঘরের দরজা বন্ধ। বন্ধই থাকে সব সময়। তবে আমার কাছে চাবি আছে। তালা খুট করে খুলে ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। জ্যোৎস্নার হালকা আভা আছে, নীলাভ রাত—বাতাসও আছে। উলটো দিকে ঘুরে সিগারেট ধরাতে যাব এমন সময় দেখলাম ছাদের কোনায় আয়েশা বসে আছে। আয়েশার কথা কিছু বলা যায় না, এ রাত্রেও সে ছাদে থাকতে পারে; এমনকি ছাদের দরজা তালাবন্ধ থাকলেও। কিন্তু তার হাতে ওটা কী?

এগিয়ে গেলাম একটু। আয়েশার সারা শরীরে বেড়ালের লোম। আর সে দু’হাতে বেড়ালের একটা লেজ ধরে আছে। তবে ওই লেজটুকুই শুধু—বেড়ালটা নেই।

‘কী করছিস এখানে?’ খেঁকিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম, তবে গলা থেকে তেমন রাগত স্বর বেরুল না।

‘খিদা লাগছিল, ভাইজান। বিলাইটা খাইলাম। ল্যাঞ্জা খামু না! ল্যাঞ্জায় টেস নাই।’ বলেই লেজটা ছাদ থেকে শূন্যে ছুড়ে ফেলে দিলো। তারপর শরীরটা বাঁকিয়ে ছাদের কিনারা থেকে ঝুলিয়ে দিলো।

পড়েই গেল বোধ হয়! তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম ছাদের কিনারে। উঁকি দিয়ে দেখি বাথরুমের পাইপ ধরে অবিকল বাঁদড়ের মতো নেমে যাচ্ছে সে। ভয়ে আমার হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত ছলকে গেল। ঝিমঝিম করতে লাগল মাথা। মনে হলো এক্ষুনি বোধ হয় জ্ঞান হারাব।

কিন্তু জ্ঞান হারালে তো চলবে না। অসুস্থ আম্মা ঘরে ঘুমাচ্ছে। সেই ঘরের দিকে কি এগিয়ে গেছে আয়েশা? আমি ছুটে নিচের দিকে গেলাম। তাড়াতাড়ি বাসায় ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। দিয়েই ভাবলাম ভুল হয়ে গেল, দরজা বন্ধ করে বরং নিজেদেরই বন্দি করে ফেললাম এবার।

ঘুমাতে যাবার পর আমার মোবাইল ফোনটা সব সময় বালিশের নিচেই থাকে। ফোনটা বের করে কাকে কল দেওয়া যায় ভাবতে প্রথমেই মনে এলো ছোটো মামার কথা। ছোটো মামার নাম্বার খুঁজে ডায়াল করতে যাব ঠিক তখন পাশ থেকে আয়েশার কণ্ঠ—এত রাতে মামাকে কষ্ট দেওয়া কি ঠিক হইব ভাইজান?

চমকে উঠলাম, হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল। দেখলাম মোবাইলটা তুলে নিল আয়েশা। আমি এক ছুটে বসার ঘরে গেলাম। পুলিশকে ফোন করা উচিত। ল্যান্ডফোনের রিসিভার হাতে তুলতেই মনে হলো বাতাস থেকে আয়েশার শরীর বেরিয়ে এলো।

‘ভাইজান, পুলিশকে ফোন কইরা কী করবেন? খালাম্মা ঘুমায়া আছে, এই রাইত্তে হাঙ্গামা করেন ক্যান? ফোনের লাইন নষ্ট, তার কাটা!’

‘কী চাও তুমি? কী করেছি আমরা?’ ঘাম ছুটে যাচ্ছে আমার। কথা বলতে গিয়ে দেখলাম শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

‘কিচ্ছু চাই না, ভাইজান… আমারে শুধু থাকতে দিয়েন…’

‘এত দিন দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আজকের পর দেওয়া যায় না। তোমার এ চেহারা আম্মা দেখলে নির্ঘাত মরে যাবে।’

‘আমি আপনের পায়ে ধরি ভাইজান, আমারে দুইটা বছর থাকতে দিয়েন শুধু…’

‘আমি তোর পায়ে ধরছি আয়েশা, এই হাত জোর করছি, তুই যা… এখানে আর কোনো দিন আসিস না…’

‘আমারে থাকতে দেন, ভাইজান!’

অনেক আশা নিয়েই আয়েশা তাকিয়েছে আমার দিকে। চকিতে একটা মায়া খেলে গেল যেন আমার। মনে হলো বলি, আচ্ছা ঠিক আছে, থাক। কিন্তু না, আয়েশাকে দরজার দিকে একটা ধাক্কাই দিয়ে ফেলি আমি। চিৎকার করে বলে উঠি, যা! যা তুই!

আয়েশার মুখ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যেতে দেখলাম আমি। আমিও আর দাঁড়ালাম না। নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙে হইচই-এ।

কদিন আগে আয়েশার অল্প একটু ঘটনা শুনেছিলাম এজাজের মুখে। প্রথমবার শুনেই মনে হয়েছিল এটা একটা গল্প হতে পারে। বিস্তারিত শোনানোর অনুরোধ করতেই এজাজ সানন্দে নিজের বাসায় চায়ের আসরটা বসাল। আতিককেও ডেকে নিল।

এ পর্যন্ত বলে থামল আতিক, আমার কলিগ এজাজের বন্ধু। কদিন আগে আয়েশার অল্প একটু ঘটনা শুনেছিলাম এজাজের মুখে। প্রথমবার শুনেই মনে হয়েছিল এটা একটা গল্প হতে পারে। বিস্তারিত শোনানোর অনুরোধ করতেই এজাজ সানন্দে নিজের বাসায় চায়ের আসরটা বসাল। আতিককেও ডেকে নিল।

একটানা বলার জন্যই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক আতিক হাঁপাচ্ছে। এজাজ উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিলো। ঢকঢক করে পানি খেল আতিক, আমার দিকে তাকাল একটু। তারপর আবার শুরু করল, ‘সকালে উঠে যা জানতে পারলাম তা ভয়ংকর।’

‘জানলেন যে ছাদ থেকে পড়ে আয়েশা মারা গেছে?’ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘হ্যাঁ। বাসার সামনের খোলা জায়গাটা রক্তে ভেসে গেছে!’

‘তারপর?’

‘অপঘাতে মৃত্যু বলে আমরা একটু তাড়িঘড়ি করি। তাছাড়া আয়েশা যে কোন গ্রামের তাও আমরা জানি না—জানেনই তো মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিল গ্রাম সম্পর্কের চাচা। সেই চাচাকে খবর দেওয়ার আগেই আয়েশাকে দাফন করা হলো। হ্যাঁ, পুলিশকে কিছু ঘুস দিতে হয়েছিল…

…কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই আমার খারাপ লাগতে শুরু করল। মনে হলো আয়েশার বাবা-মাকে মেয়ের মৃত্যু সংবাদটা অন্তত দেওয়া উচিত। চাচাকে খবর দিয়ে পাঠালাম। আয়েশাদের গ্রামের ঠিকানা নিয়ে এক শুক্রবারে রওনা হলাম। ভোরবেলা বেরিয়ে সন্ধ্যার মুখে পৌঁছালাম সে গ্রামে। খুঁজে খুঁজে অবশেষে পেলাম আয়েশাদের বাড়ি। তার বাবা বাড়ির সামনে বসে বিড়ি ফুঁকাচ্ছিল। আমাকে দেখে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকল। কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। শেষে, হড়বড় করে সব বলে ফেললাম।

আয়েশার বাবা আমার কথা শুনে কোনো রকম বিকার দেখাল না। বরং বিড়িতে কষে আরও দুটো দম মেরে বলল, ‘ভাই, নিশাপানি করন বাদ দেন। কী উলটপালট কথা কন? আমার আইশা মরবে কুন দুকখে? সে ঘরেই আছে, আইজ তার গায়ে হলুদ, কাইল বিয়া। এখন কুনো গ্যাঞ্জাম কইরেন না! আপনেরা যেদিন তাড়ায়ে দিছেন—মাইয়া আমার সেদিনই কানতে কানতে এক কাপুড়ে বাড়ি আসছে! যান ভাগেন।’

আয়েশাকে নিয়ে যে কোনো ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হলে আমি আর অবাক হই না। কিন্তু তার বাবার কথা শুনে আশ্চর্য না হয়ে আর উপায় কী! আমি আয়েশার সাথে দেখা করতে চাইলাম। খেঁকিয়ে উঠল আয়েশার বাবা। জানতে চাইলাম কোথায় বিয়ে হচ্ছে আয়েশার?

রক্তচক্ষু একটু শান্ত হলো তার। হাসি মুখে বলল, ‘বিয়া তো আগেত্থেই ঠিক করা। জামাই ইন্যুয়ন চেয়ারমেন। ম্যালা বড়ো লোক। হারামিরা কইতেছে চেয়ারমেনের নাকি বয়স বেশি, আইশার নাকি কপাল পুড়ব… হ্যাহ্, পুরুষলোকের বয়স কী কন? টেকা থাইকলে সব থাইকলো!’

দেখলাম চালের ঘরের দরজায় কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। আধা অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। তবে শাড়ি পরা অবয়বটা আয়েশার মতোই।

ডাকলাম, ‘আয়েশা?’

আয়েশার বাবা খেঁকিয়ে উঠল, ‘যা ভিত্তরে যা… কত্ত বড়ো সাহুস, হলুদের রাইত্তে বাইর হইছে!’

আয়েশা বা না-আয়েশা ভেতরে চলে গেল দ্রুতই। আয়েশার বাবা ঘাড় বাঁকা করে তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের উপস্থিতি তার আর ভালো লাগছে না। ফিরে আসি আমরা। কিন্তু ফিরে এলেই বা কী… আয়েশার কথা ভুললেও ভোলা যায় না। তারপরও ভুলেই তো গিয়েছিলাম… কিন্তু গত সপ্তাহে চিঠি পেলাম তার… এক লাইনের চিঠি…

‘আর কোনো খোঁজ নেননি?’ আমি জিজ্ঞেস করি। দ্বিতীয় বারের মতো চা নিয়ে আসে এজাজ।

‘খোঁজ মানে চিঠি পাওয়ার পর নিয়েছি… ওই গ্রাম্য চাচা জানাল আয়েশাদের গ্রামের চেয়ারম্যান, মানে আয়েশার স্বামী মারা গেছে গত সপ্তাহে!’

‘মানে যে সপ্তাহে আপনি চিঠিটা পান?’

‘হ্যাঁ।’

এজাজ বসল সোফায়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী, বলেছিলাম না ফাটাফাটি গল্প? বই লিখে ফেলতে পারবেন…’

আতিক মাথা নিচু করে কী যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। চায়ে চুমুক দিচ্ছে না। বললাম, ‘আপনার আম্মা সব জানেন?’

‘না আম্মা বলতে গেলে কিছুই জানে না!’ মাথা উঠিয়ে ধীরে ধীরে বলল আতিক।

এজাজ বলল, ‘গল্পটা পছন্দ হয়েছে? লিখবেন তো?’

‘কী জানি, এখনো বুঝতে পারছি না, বোধ হয় লিখব।’

‘কোত্থেকে লিখবেন? আমার নাম কিন্তু থাকতে হবে!’ এজাজের আগ্রহ সীমাহীন।

আমি হাসলাম। ‘থাকবে, আপনার নাম থাকবে!’

হঠাৎ আতিক একটু জোরের সাথে বলে উঠল, ‘না, গল্পটা লিখিয়েন না…!’

‘কেন?’ এজাজ প্রশ্ন করে।

আমি কাপটা টেবিলে রাখতে রাখতে বললাম, ‘কারণ আতিক ভয় পাচ্ছে, লিখতে গেলে না আবার সত্যটা বেরিয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে আতিক, আপনার গল্পটা বলাই উচিত হয়নি।’

‘গল্প বলতে আমিই ওকে চাপাচাপি করেছি…’ এজাজ একবার আমাকে একবার আতিককে দেখে, ‘কিন্তু সত্য… কী সত্য?’

আমি বললাম, ‘গল্পের সত্য কিংবা বাস্তবের সত্য। গল্পের সত্য আর বাস্তবের সত্য খুব কাছাকাছি… কখনো কখনো আলাদা করা যায় না।’

আতিকের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। দেখার চেষ্টা করলাম তার চেহারা কিছু বলছে কি না! আতিকের চেহারা এরই মধ্যে সাদা কাগজের মতো ভাষাহীন।

এজাজ আমার দিকে ঝুঁকে বলল, ‘সব সময় খেয়ালি কথাবার্তা বইলেন না ভাই। কী বলতে চাচ্ছেন, আমার দোস্ত মিথ্যা কথা বলতেছে, গল্প বানায়ে বানায়ে বলতেছে?’

‘বলছে…’ আমি বললাম। ‘কিছুটা বানাচ্ছে এবং বানাচ্ছে যে তাও ঠিক বুঝতে পারছে না। একটা ঘোরের মধ্যে আছে। এ-ঘোর তার শুরু হয়েছে আয়েশার মৃত্যুর পরপর।’

‘এমনভাবে বলতেছেন যেন আপনি… কী বলে… মনোচিকিৎসক… সাইক্রিয়াট্রিস্ট!’

‘লেখক মাত্রই সাইক্রিয়াট্রিস্ট এজাজ। তবে আতিকের গল্প মেলানোর জন্য সাইক্রিট্রিস্ট বা হোমস কিছুই হতে হবে না। সহজ হিসাব।’

‘সহজ হিসাব?’

‘সহজ হিসাব এজাজ। আপনার বন্ধু এখন একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ। তার আগে অবশ্য একজন খুনি।’

‘খুনি?’ এজাজ চিৎকার করে ওঠে। তবে আতিকের ভেতর কোনো ভাবান্তর হয় না অবশ্য। তার ঘাড় ঝুঁকে আছে চায়ের কাপের দিকে।

‘খুনি। তবে তারও আগে রেপিস্ট। ধর্ষণকারী। ধারাবাহিক ধর্ষণকারী।’

‘কী বলছেন আপনি? আপনাকে বড়ো ভাই বলি বলে যা খুশি বলবেন তা তো হবে না! আতিক তুই আমাকে মাফ করে দিস দোস্ত!’

‘মাফ হয়তো উলটো আতিকই চাইবে। আয়েশার কাছে মাফ চাওয়ার জন্যে সে এখন ব্যাকুল। কিন্তু যে আয়েশাকে নিজ হাতে খুন করেছে তাকে সে এ দুনিয়ার কোথায় পাবে? আতিকের সাবকনশাস জগৎ তাই আরেকটা আয়েশাকে তৈরি করে নিয়েছে। হ্যাঁ, মাফ চাওয়ার জন্যই।’

আতিক নিশ্চুপ।

আমি বললাম, ‘আয়েশা যখন প্রথম আসে আতিকদের বাসায়, আয়েশার উঠতি শরীর তখনই আতিকের ভেতরে আলোড়ন তৈরি করে। যত দিন যায় আয়েশার প্রতি তার চাহিদা ততই বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে এবং প্রথম রেপটা সে করে রান্নাঘরে, যত দূর মনে হয়।’

এজাজ আতিকের দিকে তাকাল প্রতিবাদের আশায়। আতিককে চুপ থাকতে দেখে আমাকে বলল, ‘এত নিশ্চিত করে কীভাবে বলছেন?’

আতিককে আর জোর করতে হয়নি। তাকে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে ব্যাপারটা ক্রমাগত চালিয়ে গেছে সে। গল্পে খেয়াল করবেন আতিক বলেছে তার সবকিছুর দিকেই আয়েশা নজর রাখত। গরম পানি থেকে চা থেকে সিগারেট, সবই। এতটা সাধারণত খুব কাছের মানুষই করে থাকে—স্ত্রী কিংবা হবু স্ত্রী। তারপর বছর খানেক হতে না হতে আতিক জানতে পারল আয়েশার পেটে বাচ্চা। আয়েশাও বিয়ের জন্য জোরাজোরি করে—যেমনটা হয় আর কী! মেয়েটাকে গ্রামে ফেরত পাঠানোতেও ঝক্কি ছিল।

‘আতিকের গল্পে খেয়াল করলে দেখবেন আয়েশাকে সে বেশিরভাগ সময় রান্নাঘরেই দেখাচ্ছে। আর গভীর রাত্রে কখনো কখনো বসার ঘরে। বসার ঘরে আয়েশা কী করছে? টক-শো শুনছে। টক-শো আসলে আয়েশা শুনত না, শুনত আতিক। আয়েশাকে সে সঙ্গে রাখত। কেন, আশা করি বুঝতে পারছেন! সম্ভবত প্রথম রেপের পর আতিককে আর জোর করতে হয়নি। তাকে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে ব্যাপারটা ক্রমাগত চালিয়ে গেছে সে। গল্পে খেয়াল করবেন আতিক বলেছে তার সবকিছুর দিকেই আয়েশা নজর রাখত। গরম পানি থেকে চা থেকে সিগারেট, সবই। এতটা সাধারণত খুব কাছের মানুষই করে থাকে—স্ত্রী কিংবা হবু স্ত্রী। তারপর বছর খানেক হতে না হতে আতিক জানতে পারল আয়েশার পেটে বাচ্চা। আয়েশাও বিয়ের জন্য জোরাজোরি করে—যেমনটা হয় আর কী! মেয়েটাকে গ্রামে ফেরত পাঠানোতেও ঝক্কি ছিল। গ্রাম থেকে সে এক রকম পালিয়েই এসেছিল চেয়ারম্যানের ভয়ে। আতিকের তাই অন্য কোনো উপায় ছিল না। মধ্যরাতে, ছাদের ওপর নিয়ে, আয়েশাকে তাই ধাক্কা মারতেই হয়।’

‘এতই সহজ?’ এজাজের কণ্ঠ ও চোয়াল দুটোই শক্ত।

‘সহজ না। কোনোভাবেই সহজ না। ধাক্কা মারার পরপরই আতিকের ভেতর আতঙ্ক লাফ দিয়ে ওঠে। নিচে নেমেই সে মোবাইলফোন খোঁজে; খুঁজে ছোটো মামাকে ফোন করতে উদ্যত হয়। আতঙ্ক আর ভয়ের মধ্যে খুবই অল্প একটা পার্থক্য আছে। আতঙ্কিত আতিক ফোন করতে চাইলেও ভীত আতিক তা করতে পারে না। খোঁজ নিলে জানবেন ছোটো মামার সাথে আতিকের খুব ভালো বোঝাপড়া। খুনের পর আত্মরক্ষার তাগিদে তাই প্রথমেই মামার কথা মনে আসে তার।

তারপরেই সে সারেন্ডার করতে চায়—ফোন করতে যায় পুলিশে। পারে না। বাইরে আয়েশার মৃতদেহ রেখে আতিক ঘুমাতে যায়। ঘুম তার নিশ্চয় হয় না। কিন্তু সকালে সে ওঠেও না। আতিকের গল্পে খেয়াল করেছেন কি সকালে সে সবার হইচই-এ ওঠে? আসলে সে ঘুমায়নি সারা রাত। কিন্ত সকালে, সবার আগে, যেতেও পারেনি লাশের কাছে। যেমনটা হয় আর কী, অঙ্কের মতো!’

‘কিন্তু জীবনটা অঙ্কের মতো নয়।’ এজাজ বলল। তাকে বিব্রত দেখাচ্ছে। ভাবছে ধরেবেঁধে গল্প শোনাতে চেয়ে কোনো বিপদে পড়ল! তারপর মারণাস্ত্র পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল, ‘আর চিঠিটার কথা কী বলবেন? চিঠিটা আমি নিজ চোখে দেখেছি!’

‘ওটা আতিকই লিখেছে। ওর সাবকনশাস ওকে দিয়ে লিখিয়েছে। তারপর নিজের নামে পোস্ট করেছে। খামটা ভালো করে দেখলে দেখবেন খামের প্রাপক প্রেরক একই শহরের।’

‘আপনি তো সব জেনে বসে আছেন!’ এজাজের মুখের ভেতরটা যেন তেতো কিছুতে ভরে গেছে।

আমি বললাম, আয়েশার বাবার সাথে আতিকের কখনো দেখা হয়নি। কিন্তু আতিকের অপর সত্তা… সাবকনশাস… কনফেস করতে চাচ্ছে। ফলে সে এই চরিত্রগুলো দাঁড় করিয়ে নিচ্ছে। চরিত্রগুলোর সাথে কথা বলছে। আয়েশার বিয়ে হয়েছে এমন ভেবে শান্তি পাচ্ছে, আবার পাচ্ছে না। একবার বিয়ে দিচ্ছে চেয়ারম্যানের সাথে, আবার চেয়ারম্যানকে মেরে ফেলছে। আয়েশাদের গ্রামে খোঁজ নিয়ে দেখেন গত সপ্তাহে কোনো চেয়ারম্যান টেয়ারম্যান মরেনি।

এজাজকে দেখে মনে হলো সে ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিচ্ছে। যদিও আতিক আগের মতোই ভাবলেশহীন। সে চুপচাপ আমার কথা শুনে যাচ্ছে। তার দিকে চোখ রেখে উঠে দাঁড়ালাম। তাতে এজাজ খুশিই হলো। চটপট দরজার কাছে চলে এলো। মানে বলছে, এবার বিদায় হও।

আমি বেরিয়েই যাচ্ছিলাম। এ সময় আতিক বলল, আপনিই সব সত্য জানেন? আসলে আপনি কিছুই জানেন না।

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, পূর্ণচোখে তাকালাম আতিকের দিকে। আতিকের চোখের মণি ধকধক করছে। ধীরে ধীরে বললাম, না। আমি সব সত্য জানি না, আতিক। তবে আমার গল্পের সত্যটুকু আমি জানালাম।

‘মানে?’ এজাজের প্রশ্ন।

‘আমি যদি লিখি, তাহলে এমনই লিখব’ বললাম আমি। ‘জানেন তো এজাজ, আমি ভূতের গল্প লিখি না।’

‘মানে এতক্ষণ আপনি গল্প বানাচ্ছিলেন?’ এজাজের মুখে হাসি।

আমি অবশ্য হাসতে পারলাম না। মৃদুস্বরে শুধু বললাম, গল্প… কিংবা বাস্তব… যেকোনো একটা, কিংবা দুটোই… বানাচ্ছিলাম।

 

২.

দেরি করে বাসায় ফিরলে বউয়ের মেজাজ ভালো থাকে না। আজ দশটা পার করে দেওয়ার পরও বউয়ের মন মেজাজ ভালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারলাম তার আনন্দের কারণ। গ্রাম সম্পর্কীয় এক চাচা কিছুক্ষণ আগে একটা কাজের লোক দিয়ে গেছে। ১৫-১৬ বছর বয়সি মেয়ে। সবই ঠিক আছে, কেবল বড্ড নোংরা নাকি। মাথায় এই এত জটা। বউ তাকে বাইরের বাথরুমে ঢুকিয়ে এক ঘণ্টা গোসল করার নির্দেশ দিয়েছে। মেয়ে এখন সে নির্দেশ পালন করছে।

উৎসাহে বউ এক কাপ চা নিয়ে এসে আমার হাতে দিতে দিতে বলল, জানো মেয়েটার নাম কী?

আমি বললাম, জানি।

‘কী?’

‘আয়েশা।’

গল্প আবার শুরু হলো।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮১। দশ বছরের লেখালেখির জীবনে লিখছেন মূলত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বর্তমানে কর্মরত একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে।

প্রকাশিত গ্রন্থ কবিতা :আত্মহননের পূর্বপাঠ (২০১০) রম্য সংকলন : যে কারণে আমি সাকিব আল হাসান হতে পারি নি (২০১৭) গল্প সংকলন : য পলায়তি স জীবতি (২০২০), সিলগালা মহল্লার ব্যালকনিরা (২০২১), কী একটা অবস্থা (২০২২)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।