গুপ্তচরের মতো নেমে এসেছে রাত। গভীর রাত। কী অদ্ভুত— তখনও মাংসের খোঁজে আকাশে উড়ছে বাজপাখি। হাইওয়ে ধরে ১২০ কি.মি. পার আওয়ারে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় এমন এক অদ্ভুত দৃশ্যই যেন দেখতে পেল অন্তু। প্রথমে নিজের দৃষ্টিশক্তির উপর আস্থা রাখলেও কিছুক্ষণ বাদে মেনে নিলো, এটা ভ্রম। বিচ্ছিন্ন অনেক কারণেই মস্তিষ্ক এখন এলোমেলো দৃশ্য দেখাতে পারে। সাইকোলজি নিশ্চয়ই এইসব হেলুসিনেশনের পেছনে চমৎকার সব ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারবে, এমনকি পারবে চ্যাটজিপিটিও— কিন্তু, গাড়ি থামিয়ে কোনো রোবটের সাথে এখন অন্তুর বকবক করতে ইচ্ছা করছে না। অন্তুর মূল লক্ষ্য গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দেয়া, যতটুকু বাড়িয়ে দিলে সে নিজের উপর এবং একই সাথে গাড়ির উপর থেকেও সকল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে।
গাড়ির জানালা খোলা। শো শো করে অস্ফুটিত বাতাস চলাচল করছে। জানালার ফাঁক গলে গাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে কয়েকটি সমুজ্জ্বল নক্ষত্র। বাইরে তাপমাত্রা কমছে। এই শীতের রাতেও অন্তুর গায়ে সামান্য একটি টি-শার্ট ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু, এই ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও তার তেমন শীত করছে না বরং কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। প্রেশার ফল করল নাকি! এমন একটা চিন্তা মাথায় আসতেই অন্তু ফুঁ দিয়ে তা উড়িয়ে দিলো পথে, প্রেশার নিয়ে চিন্তা করার সময় এখন তার নেই।
শিউলি ফুলের গন্ধে বুঁদ হয়ে আছে অদ্ভুত গৃহপালিত কুয়াশা। কিছু দেখা যায়, আবার যায় না। গাড়ির গতি বাড়ছে তবু ফুলের গন্ধ পিছু ছাড়ছে না। ফুলের তীব্র গন্ধে মাথা ভার হয়ে আসে অন্তুর। মনোযোগ অন্যদিকে সরাতেই হয়তো সে উচ্চ শব্দে গান ছেড়ে দেয়। লেড জেপলিনের ‘স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন’। গানের লিরিক অন্তুর মুখস্থ, গুনগুন করে আনমনে। তার ইচ্ছে করে গাড়ির হেডলাইট অফ করে গতি আরও বাড়িয়ে দিতে ঠিক তখনই রাস্তার পাশে দেখতে পায় একটি কুকুরছানা পড়ে আছে।
অন্তুর তেমন পশুপ্রেম নেই। অন্য কোনো রাত হলে, সে হয়তো ফিরেও তাকাতো না। কিন্তু, আজ তার কোনো তাড়া নেই, ভয় নেই, তার মনে গুপ্ত কোনো রোগ নেই— ফলে, অন্তু গাড়ির গতি কমালো, পেছনে ফিরে এলো। কুকুরছানাটির একটি পা ভেঙে গেছে। হাইওয়ে ধরে গেলে এমন দৃশ্য অহরহ দেখা যায়। তুঁতফলের মতো রাস্তায় পড়ে থাকে কুকুরের মৃতদেহ। অন্তুর কাছে ঘটনাটা স্বাভাবিক মনে হয়। সে কুকুরছানাটিকে দেখে আবারও পা বাড়ায় তার গাড়ির দিকে। স্টেয়ারিংয়ে হাত রাখতেই আবার দৃষ্টি চলে যায় কুকুরছানার দিকে, তাকিয়ে আছে, নিঃশব্দে। অন্তু আবারও নেমে আসে গাড়ি থেকে, এমন গতিতে হেঁটে যায় কুকুরছানাটির দিকে যেন দূর কোথাও ধীরলয়ে বাজছে সেতার।
কুকুরছানাটির পাশে দাঁড়িয়ে অন্তু অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। যেন কিছু খুঁজছে। এমন সব ঘটনায় সাধারণত কুকুরছানার আশপাশেই থাকে তার মা। এক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কোনো কিছু না দেখতে পেয়ে অন্তুর অবাকই লাগে।
কুকুরছানাটির পাশে দাঁড়িয়ে অন্তু অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। যেন কিছু খুঁজছে। এমন সব ঘটনায় সাধারণত কুকুরছানার আশপাশেই থাকে তার মা। এক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কোনো কিছু না দেখতে পেয়ে অন্তুর অবাকই লাগে। তবুও কে জানে কেন, পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশ অন করে সে হেঁটে যায় রাস্তার পাশে বেড়ে ওঠা ঝোপের দিকে, কিছুদূর যেতেই সমাধান হয় রহস্যের। কোনো এক সহৃদয় ব্যক্তি হয়তো ঝোপের মধ্যে ফেলে গেছে মা কুকুরের মৃতদেহ। হাইওয়েতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে। কিন্তু আদৌ কী একই সাথে মা এবং শাবক আক্রান্ত হয়? অন্তু মনে মনে দুর্ঘটনার ছবি আঁকার চেষ্টা করে। রং, তুলি, ক্যানভাস সব প্রস্তুত থাকলেও ছবিটা কিছুতেই আঁকতে পারে না। ব্যর্থতা ও বিরক্তির গ্লানি নিয়ে অন্তু ফিরে আসে কুকুরছানাটির কাছে।
অসংখ্য ধুলোর রেখা শরীরে নিয়ে মাটিতে শুয়ে আছে কুকুরছানাটি। মলিন খাতায় পড়ে থাকা মায়াবী চোখের ভাষা রপ্ত করেছে যেন। মুখে কোনো শব্দ নেই। যেন বোবা। অন্তু বাচ্চাটির ক্ষত পরীক্ষা করে। শব্দ নেই। অন্তু বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেয়। শব্দ নেই। অন্তু বাচ্চাটিকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। শব্দ নেই। যেন চলছে এক অদ্ভুত মুকাভিনয়, অন্তু অভিনেতা। বাচ্চাটিকে গাড়িতে তোলার পর অন্তুর মনে পড়ে পূর্বের পরিকল্পনার কথা। অন্তু গাড়ি স্টার্ট দেয়। এখন গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিতে হবে। বন্ধ করে দিতে হবে হেডলাইট।
অন্ত ঠিক তাই করত যদি বাচ্চাটা পাশে না থাকত। অন্তু হয়তো ঠিক তাই করত যা তার করার কথা। কৃষ্ণগহ্বরের মতো হয়তো এতক্ষণে গাড়িটি গিলে খেত অন্তুকে। কিন্তু এসব কিছুই হয় না। অন্তু কথা চালাচালি করতে থাকে চ্যাটজিপিটির সাথে। উদ্দেশ্য বাচ্চাটিকে সুস্থ করে তোলা। চ্যাটজিপিটির কথার আগামাথা অবশ্য অন্তু ধরতে পারছে না, এমনকি এই মুহূর্তে চ্যাটজিপিটির দেয়া পরামর্শ পালন করার মতো অবস্থাও অন্তুর নেই। উপায় না পেয়ে অন্তু কল করল ট্রিপল নাইনে। অনেকক্ষণ একঘেয়ে স্বরে কথা বলে গেল একটি মেয়ে। সমস্যার কথা শুনে মেয়েটি মোটেও বিচলিত বোধ না করে বরং আরোপিত ভঙ্গিতে গলায় সামান্য বিষাদ ঢেলে দুঃখপ্রকাশ করল এবং জানালো এখন রাত তিনটে বাজে। অন্তু ফোন কেটে দিলো। এখন রাত তিনটে বাজে এই তথ্য অন্তুর কাছে আছে, এসব জানার জন্য ট্রিপল নাইনের প্রয়োজন ছিল না। কুকুরটি সিটে বসে পিটপিট করে তাকাচ্ছে অন্তুর দিকে, শব্দ নেই।
গুগোল ম্যাপ বের করে অন্তু নিজের অবস্থান জেনে নেয় এবং আরও জানতে পারে এখান থেকে কাছের শহরের দূরত্ব প্রায় দেড়শো কিলোমিটার। গাড়ি চালিয়ে গেলে বেশিক্ষণ লাগবে না, তবে শীতের সকালে কী তেমন কোনো সাহায্য আদৌ পাওয়া যাবে! অন্তু তবু সিদ্ধান্ত নেয় শহরের দিকে যাওয়ার। গন্তব্যহীন যাত্রায় গন্তব্য খুঁজে পায়। যদিও চ্যাটজিপিটি জানিয়েছে, পা ভাঙলেও কুকুরছানা বেঁচে থাকে। অন্তু আশ্বস্ত হয় না। কুহেলী ভেদ করে সূর্যের রথের মতো ছুটে চলে গাড়ি। কোথা থেকে আবারও ভেসে আসে শিউলির ঘ্রাণ। অন্তু ছুটতে থাকে, ছুটতে থাকে গাড়ি। পাশে কুকুরছানা। শব্দহীন। রাত আরও গভীর হয়ে আসে। গাড়িতে বাজতে থাকে ভ্রমাকুল কোনো গান। অন্তু ছুটতে থাকে। গন্তব্য কাছে চলে আসে। ঠিক তখনই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। উল্টোদিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মারা যায় অন্তু। এগিয়ে আসে ফজরের নামাজ পড়তে বের হওয়া মুসল্লিরা। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে বের করে আনা হয় অন্তুর নিথর দেহ এবং একটি জীবন্ত কুকুরছানা। কুকুরছানাটির একটি পা ভাঙা। সকালের নিস্তব্ধতা ভেঙে অন্তুর মৃতদেহের পাশে বসে কুকুরছানাটি তারস্বরে কাঁদতে থাকে, কাঁদতে থাকে…
২.
ত্রস্ত বনতলে নিজের অস্তিত্ব জানান না দিয়ে টিকে থাকা কোনো আগাছার মতো কুকুরছানাটি এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকল আরও কয়েকবছর। প্রয়োজন ছিল না, এই বেঁচে থাকার, তবু থাকল। শব্দহীন। অন্তুর মৃতদেহ নিতে এলে এলাকাবাসীর মাধ্যমে এই অনাহূত কুকুরছানার সাথে পরিচয় হয়েছিল অন্তুর পরিবারের, কিন্তু তখন এমন এক দুঃসময়— কুকুরছানা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ কিংবা বিলাসিতা তাদের ছিল না। ফলে, কুকুরছানাটির শব্দহীন নতুন পঙ্গু জীবন শুরু হয় এখানেই।
অন্যসব কুকুরের সাথে এই কুকুরটির সামান্য একটু পার্থক্য ছিল বটে। অন্য কুকুর দেখলেই যেমন মানুষের বাচ্চারা গরম পানি থেকে শুরু করে গরম তেল ছুঁড়ে মারে কিংবা কখনও কখনও লাঠি হাতে তেড়ে আসে, ওর ক্ষেত্রে তেমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে হয়তো ওর অদ্ভুতভাবে বেঁচে থাকার সক্ষমতাই সাক্ষ্য দেবে— এমন মরণফাঁদ থেকে বেঁচে আসা সহজ নয়, অ্যাক্সিডেন্টের স্মৃতি মানুষের বাচ্চাদের মনে দাগ কেটে গেছে। ফলে, ধারণা করা যায়, এই কুকুরছানাটিকে মানুষের বাচ্চারা সমীহ করত এবং সেখান থেকেই লাথির বদলে ওর কপালে জোটে রুটি, বিস্কুট। তবে, কোনো খাবারের প্রলোভন দিয়েও ওকে বশ করা সম্ভব ছিল না, এমনকি কুকুরছানাটি কুকুরদের স্বাভাবিক সকল ধর্ম কিংবা কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না একদমই। নির্দিষ্ট এলাকায় নয় বরং ওর বিচরণক্ষেত্র ছিল পুরো শহর। ফলে, শহরের সচেতন মানুষের চোখ ওর সান্নিধ্য পেত সহসাই এবং বিচ্ছিন্ন অনেক কারণে পরিচিতি পেয়েছিল ওর মুখ। লোকে ওকে ডাকত, বোবা কুকুর। যদিও ওকে পঙ্গু কুকুরও ডাকা যেত সহজে।
প্রতিদিন বিকেলেই ছেলেটিকে দেখা যায় ব্রিজে বসে আছে এবং তার সাথে জড়ো হয়েছে আরও কিছু যুবক। শহরের লোকজন প্রথমে বিষয়টি নিয়ে তেমন একটা চিন্তিত ছিল না, সমস্যার শুরু হয় তখনই যখন জানতে পারে, অন্তু ছেলেটির মূল উদ্দেশ্য।
বোবা কুকুরের বয়স কত, জানে না কেউ। এমনকি অ্যাক্সিডেন্টের ওই ঘটনাও ঠিক কবে ঘটেছিল, কারও মনে থাকে না। ফলে, ঠিক কতকাল পরে বোবা কুকুরটি ব্রিজে স্থায়ী আবাস গড়ে, তা ঠিক জানা যায় না। যেটা জানা যায়, তা হলো ওই ব্রিজে এই শহরেরই উঠতি বয়স্ক এক যুবক যাকে লোকে অন্তু নামে চেনে, সে আস্তানা গেড়েছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয় তবে প্রতিদিন বিকেলেই ছেলেটিকে দেখা যায় ব্রিজে বসে আছে এবং তার সাথে জড়ো হয়েছে আরও কিছু যুবক। শহরের লোকজন প্রথমে বিষয়টি নিয়ে তেমন একটা চিন্তিত ছিল না, সমস্যার শুরু হয় তখনই যখন জানতে পারে, অন্তু ছেলেটির মূল উদ্দেশ্য। অন্তু এখানে মূলত একটি কর্মশালা আয়োজন করেছে, আত্মহত্যা বিষয়ক কর্মশালা। মানুষের কেন আত্মহননের দিকে নির্দ্বিধায় হেঁটে যাওয়া উচিত কিংবা আত্মহত্যা কেন হওয়া উচিৎ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার এই বিষয়ে অন্তুকে বিস্তারিত আলোচনা করতে দেখা যায়। শহরবাসী তখনও পুরো বিষয়টি খেলাচ্ছলে নিয়েছিল কিংবা তারা অন্য সকল জটিলতাকে উপেক্ষা করার মতো এই ধরনের উটকো বিষয়কেও উপেক্ষা করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন উঠতি বয়সী দুইজন ছেলে খুব ভোরে কাউকে কিছু না বলে, প্রেমে কি বিরহে এই ব্রিজের উপর থেকে নিস্তরঙ্গ জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সফল হয়।
তখন বড়ো দুঃসময়। অন্তুর ভাষ্যমতে অর্থ, কীর্তি ও সচ্ছলতার বাহিরে যে বিপন্ন বিস্ময় আছে— তার দেখাই পেয়েছিল ছেলে দুটি। তখন বড়ো দুঃসময়। রোমান্টিক কলহে ভরে গেছে মানুষের মন। অন্তু বলত— এখনই সময়, সময়ের উল্টো দিকে চলার। কেউ হয়তো বুঝত। কেউ একদমই বুঝত না। সফল ছেলে দুটি কোন দলের সেটা জানা যায় না। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে অসচেতন তাদের বন্ধু-পরিবার সাড়াশি অভিযান চালিয়েও খুঁজে পায় না মায়াকোভস্কির মতো করে লেখা কোনো পোয়োটিক নোট। হাওয়া তবু মন দেয় পোস্টমর্টেমে। শতবর্ষী বৃক্ষ খোঁজে প্রত্যক্ষদর্শী। তবে, ঘটনা যখন ঘটে, মানে ওই গৃহপালিত কুয়াশায় মাখা কোনো ভোরে তখনও ভাঙে নাই শহরের আর্লি রাইজার কাকেদের ঘুম। এই তথ্য শুধু জানত পা হারানো বোবা কুকুর। কিন্তু, হায় অবসাদ পেয়েছে যাকে, তাকে কী আর সাক্ষী মানা যায়? কুকুরটি জানত আরও অনেককিছু। তবু সে থাকে শব্দহীন।
ঘটনার আকস্মিকতায় মানুষ ভুলে যায় ওই দিন ভোরেই একটি ট্রাক এসে ধাক্কা দিয়েছে একটি প্রাইভেট গাড়িতে, এক ধাক্কায় পুরো পরিবার শেষ। ঘটনার আকস্মিকতায় মানুষ ভুলে যায় এই জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কবেই ক্লান্ত হয়েছে মানুষের মন। কেউ কেউ তবু শীতের ঝরে যাওয়া পাতাদের উস্কানিতে ঝড় তোলে সোশ্যাল মিডিয়ায়। হ্যাশ ট্যাগ— মেন্টাল হেলথ ম্যাটার্স। কিন্তু, ট্রেন্ডিংয়ে চলে আসে অন্তু আর প্রকট হয়ে ওঠে মানুষের বাচ্চাদের সহজাত ক্রোধ। কোনো ইভেন্ট না খুলেই তাই কী করে যেন মানুষের বাচ্চারা সকলে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ইউজ না করেও বোবা পঙ্গু কুকুরটি সবকিছু টের পায়। যেমন টের পেয়েছিল বহুকাল আগে কোনো এক শীতরাতে গাড়ির সামনের সিটে বসে। কী করে, কে জানে!
নরম রোদ দুয়ারে এসে দাঁড়ালে অন্তুকে দেখা যায় ব্রিজের উপর। বসে আছে সিদ্ধার্থের মতো। ঠিক তার পাশে বসে আছে বোবা কুকুর। রিলিফের খাবারের খোঁজে ছুটে আসা মানুষের বাচ্চাদের মতো অসংখ্য মানুষের বাচ্চাদের ছুটে আসতে দেখা যায় দূর থেকে… হাতে লাঠি, হাতে মারণাস্ত্র। অন্তু চুপচাপ বসে থাকে। মুখে হাসি। বোবা কুকুরের চোখের মাঝে চাঞ্চল্য খেলা করে, যেন অস্থিরতা গ্রাস করে তার বোধ। কুকুরটি সবই জানে এবং যেন বলে দিতে পারে ভবিষ্যৎ। মানুষের বাচ্চারা এগিয়ে আসে এবং প্রথমে আঘাত করে অন্তুর মুখে, কয়েক ফোঁটা তাজা রক্ত বৃষ্টির ফোঁটার মতো এসে পড়ে বোবা ও পঙ্গু কুকুরের মুখে। বোবা কুকুরটি শরীরের সমস্ত শক্তি কন্ঠে এনে চিৎকার শুরু করে… ভাঙা পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়; যেন মিছিলের মাঝে প্রতিবাদী কোনো হাত। কিন্তু, এই শব্দ, এই দৃঢ়তা কারও ধ্যান ভাঙতে পারে না। বোবা কুকুরটি তারস্বরে কাঁদতে থাকে, কাঁদতেই থাকে…

জন্ম ২ ডিসেম্বর, ১৯৯১; বরিশাল। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় স্নাতক। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বই : মৃত্যুর মতো বানোয়াট [কবিতা; ২০১৭] থাকে শুধু আলেয়া [কবিতা;২০১৯], হিম বাতাসের জীবন [গল্প ;২০২০], উদাসীনতা, সঙ্গে থেকো; [উপন্যাস; ২০২১] ই-মেইল : dhrubonahid@gmail.com