১.
আমার বিশ্বকাপ দেখা শুরু ’৮৬ থেকে।
ম্যারাডোনা! লস ফাইওরিটোর সেই ছোট্ট ম্যারাডু… টিভির সামনে আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছিলাম ম্যারাডোনার ম্যাজিক আর কাপ হাতে শিশুর সারল্য মাখা হাসি।
তখন আজাদ প্রডাক্টস-এর দোকানে দারুণ সব ভিউকার্ড পাওয়া যেত। বিশ্বকাপ শেষ না হতেই ম্যারাডোনার ভিউকার্ডে সয়লাব হয়ে গেল নগর। আমি খেলোয়াড়দের ভিউকার্ড কিনতাম খুব। বার্সা, নেপোলীর ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সির ম্যারাডোনা। পাশাপাশি ক্যানিজিয়া, বুরুচাগা তারও পরে নব্বই-এর রজার মিলার, ব্রাজিলের সক্রেটিস, ক্যারেকা, আলেমাও, সাদা পেলে জিকো, আমাদের গ্যাব্রিয়েল বাতিগোল, কলম্বিয়ার পাগলাটে গোলরক্ষক রেনে হিগুয়েতা, ডাচ রুদ গুলিত, মার্কো ভ্যান বাস্তেন, দ্যা ফিনিশার রোমারিও, রোনালদো এবং ফ্রান্সের সাথে ফাইনালের দিন সেই রহস্য… ক্রীড়াজগত ও কলকাতার খেলা পত্রিকা গোগ্রাসে গিলতাম সে সময়। খবরাখবর সব ছিল নখদর্পণে।
ব্রাজিলের সেই দুর্ধর্ষ টিম সাথে গ্যালারিজুড়ে সাম্বা নাচ আর ড্রামবিট। ব্রাজিলের তীব্র বিরোধী শিবির হয়ে যাবার কথা ছিল আমার। কিন্তু সেই ’৮৬ বা ’৯০-এর ব্রাজিল ফুটবলের ক্ষুরধার আক্রমণের পর আক্রমণ দেখে আর সম্ভবত খেলা বিষয়ক পত্রিকার প্রভাবে, ব্রাজিল টিম তো বটেই ল্যাটিন আমেরিকার ধ্রুপদ ফুটবলকেই ভালোবেসে ফেলি।
কী সব অপার্থিব দিন ছিল! এত যুক্তি-তর্ক ছিল না। থাকলেও সে সব গায়ে মাখার সময়ই ছিল না আমাদের। মোহামেডান, আর্জেন্টিনা, ম্যারাডোনা—আমার ভালোবাসার প্রায় পুরোটাই দখল করে রেখেছিল।
২.
৯০ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচের কথা মনে আছে আমার।
দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা। ব্রাজিলের সেই দুর্ধর্ষ টিম সাথে গ্যালারিজুড়ে সাম্বা নাচ আর ড্রামবিট। ব্রাজিলের তীব্র বিরোধী শিবির হয়ে যাবার কথা ছিল আমার। কিন্তু সেই ’৮৬ বা ’৯০-এর ব্রাজিল ফুটবলের ক্ষুরধার আক্রমণের পর আক্রমণ দেখে আর সম্ভবত খেলা বিষয়ক পত্রিকার প্রভাবে, ব্রাজিল টিম তো বটেই ল্যাটিন আমেরিকার ধ্রুপদ ফুটবলকেই ভালোবেসে ফেলি। পরে ফ্রান্স, ডাচ ফুটবলও ভালো লেগে যায়। ওহ হ্যাঁ, রজার মিলার বা ওমাম বিয়িকের গ্রিন লায়ন ক্যামেরুনও মনে ধরে যায়। পম্পিদুর হাত ফসকে গোল খেয়ে হেরে যাবার পরেও।
যা বলছিলাম, সেই ম্যাচ। একের পর আক্রমণে আর্জেন্টিনার দিশেহারা অবস্থা। কার্লোস বিলার্দোর অধীনে চার বছর আগের চাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যেন খানিক ক্লান্ত। ফ্রাঙ্কো, ক্যারেকা, আলেমাও, জিকোর গোলা ছুটে আসছে একের পর এক। খেলা শেষ হবার মিনিট বিশেক আগে ম্যারাডোনার চতুর পাসে ক্যানিজিয়ার গোল। আর তারও পরে ফাইনালে তখনকার পশ্চিম জার্মানির লৌহমানব লোথার ম্যাথিওসদের সাথে হেরে ম্যারাডুর কান্না।
’৯০ বিশ্বকাপের আরেকটা জিনিস আমার মাথায় আর কানে লেগে আছে। তা হলো বিশ্বকাপের থিম সং। ইটালির জর্জিও মরেডোর প্রজেক্ট এর ‘টু বি নামবার ওয়ান’।
To be number one
Running like the wind
Playing hard, but always playing fair…
৩.
ক্লাব ফুটবলের ঠাঁসা ফুটবল সূচির পরিপ্রেক্ষিতে আমি ধরে নিয়েছিলাম, এ বছর ফুটবল একটু কম উত্তেজনা ছড়াবে। খেলোয়াড়রা গা বাঁচিয়ে খেলবে।
এর একটা কারণ ছিল ইউ এস-কানাডার এখনকার গরম আবহাওয়া। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমান করে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে দুর্দান্ত গতিতে, গোলের খেলায় গোল হচ্ছে বেশ। নব্বই বিশ্বকাপের মতো এক-দুই গোল দিয়ে খেলা ধরে রাখা নয়। সাথে নতুন জিনিসের সংযুক্তি। তা হলো হাইড্রেশন ব্রেক। বেশ অভিনব এক ব্যাপার বটে!
আলজেরিয়াকে মেসির হ্যাট্রিক বদৌলতে ৩-০, ব্রাজিলের ড্র, কাবো ভার্দে নামে এক দেশের লড়াই, ইরানের দারুণ ফুটবল, জার্মানির আবারও আগ্রাসী সাত গোল অথবা ফ্রান্সের এমবাপ্পে! সব মিলিয়ে মাস জুড়ে খেলা হবে অনন্য, উত্তেজনায় ভরপুর।
দুই দিকপাল মেসি আর রোনালদোর দ্বৈরথ দেখার এবারই শেষ সুযোগ। একদিকে রোনালদো ইতোমধ্যেই এক গোল করে পাঁচ-পাঁচটা বিশ্বকাপে গোল দেয়ার একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড তালিকায় নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে সর্বকালের সেরা বলপ্লেয়ার লিওনেল মেসির সামনে বিশ্বকাপে সবার চেয়ে বেশি গোল করে কীর্তি গড়ার হাতছানি।
এবারের বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে আর একটা কারণে। দুই দিকপাল মেসি আর রোনালদোর দ্বৈরথ দেখার এবারই শেষ সুযোগ। একদিকে রোনালদো ইতোমধ্যেই এক গোল করে পাঁচ-পাঁচটা বিশ্বকাপে গোল দেয়ার একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড তালিকায় নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে সর্বকালের সেরা বলপ্লেয়ার লিওনেল মেসির সামনে বিশ্বকাপে সবার চেয়ে বেশি গোল করে কীর্তি গড়ার হাতছানি। প্রথম ম্যাচেই ক্লোসাকে ছুঁয়ে ফেলেছেন। বাকি ম্যাচে অন্তত এক গোল চাই।
সেটা সহজ নয়। কিন্তু অসম্ভব?
নাহ, অসম্ভব নয়। ফুটবলে পাঁচ মিনিটেই গতিপথ বদলে যেতে পারে। হয়ে যেতে পারে অনেক কিছু।
৪.
খেলা শুরু হলে বিশেষ করে আর্জেন্টিনার খেলা হলে আমি হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে খেলা দেখতে বসি।
আজ সকালেই এক আর্জেন্টিনা ভক্তের সাথে আলাপচারিতায় ’৮৭ সালের লীগে ফিরে গেলাম। মোহামেডান-আবাহনীর ম্যাচ। আবাহনী তিন পয়েন্টে এগিয়ে। মোহামেডানকে খেলায় জিততেই হবে। তারপর প্লে-অফ ম্যাচ।
কিন্তু মোহামেডান ২-১ এ পিছিয়ে। খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে বাড়তি জ্বালানি দিতে ঢাকার ফুটবলে আলী ইমামের পাশাপাশি আমার দেখা সেরা কোচ নাসের হেজাজী নেমে পড়লেন গোলরক্ষক কাননকে রিপ্লেস করে। কিছু পরেই মোহামেডানের পেনাল্টি। আমার বুক ধুকপুক শুরু হলো। টিভিতে খেলা দেখাচ্ছে। গোল দিতে পারলে ২-২ হবে। এমেকা বল বসালেন। আমি পাশের ঘরে চলে গেলাম। যদি গোল না হয়!
একটু পরে আব্বার চিৎকার। ‘রানা কই! গোল!’ পরে শেষ সময়ে খুরশিদ বাবুলের গোলে মোহামেডান ৩-২ গোলে সেই ম্যাচ জিতে প্লে অফে চাম্পিয়ন হয়।
৫.
গতকাল আলজেরিয়ার সাথে মাঠে নামার আগে প্রায় সেই অনুভূতি ফিরে এসেছিল। যেন খেলাটা না দেখলে উত্তেজনা বশে রাখা যাবে। কিন্তু তা কী হয়, না পারব? ফুটবলের এই দুরন্ত উত্তেজনাই তো আনন্দের। আমি আশায় বসত করা মানুষ। প্রতিপক্ষ যেই হোক আর পয়েন্ট টেবিলে যে অবস্থানে থাকুক, জয়ী হবো এই বিশ্বাসে খেলা দেখতে বসি। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতি খেলায় এভাবেই বসব। তাতে উত্তেজনা এতটুকুও কমবে না যদিও। উত্তেজনা ধরে রেখেই আশা করব আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপ মাতাবে নিজের কেতাতে। ঠিক গতবারের মতো। কম্পোজিট, ব্যালেন্সড আর ডাগ আউটে আপাত শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা ক্ষুরধার বুদ্ধির কোচ লিও স্কালোনির অধীনে।
আর খেলা শেষে মেসি, ডি পল, আলভারেজ, মার্টিনেজের হাসিমুখে আরও একবার সেই নাম ফিরে ফিরে আসবে নীল-সাদা পতাকার ছায়াতলে।
ম্যারাডু…ম্যারাডু…ম্যারাডু…

জন্ম ১৯৭৫, ১৫ আগস্ট। বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বাপ্পা মজুমদারের রাতের ট্রেন অ্যালবামে প্রথম লিরিক : বিশ্বাসেতে বস্তু মেলায়। পরী, বৃষ্টি পড়ে, ফিরে পেতে চাই, মার ঘুরিয়ে (আই সি সি ২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেট এর থিম সং), সবুজ যখন, খোলা আকাশ একটি গাছ- উল্লেখযোগ্য গান। গীতিকার হিসেবে বিলেতের সংহতি সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন ২০১৫ তে। এবারডিনশায়ার এর ডেভেরন আর্টস এ গান লেখার গল্প বলায় আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ২০১৬ তে। প্রকাশিত বই : ‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’, ‘কবির তখন সওদাগরী মন’, ‘রুল টানা খাতা’, ‘টুকরো নাগরিক জার্নাল’, ‘শব্দ পাখির দল’, ‘ম্যারাডোনা’ (অনুবাদ), ‘কবিতার পোস্টকার্ড’ এবং ‘টুকরো নাগরিক জার্নাল’ (দ্বিতীয় পর্ব)।