শুক্রবার, জুলাই ৩

নির্বাচিত দশ কবিতা

0

রক্তজবা


হাতে আঁকা রাতে একটা রক্তজবা এঁকে রাখি। এই ফুল কে ভালোবাসে তা আমিই জানি। রং চাপানোর আগে এই জবা শাদাই থাকে। কেউ ভালোবাসে বলে প্যালেটে রঙের বদলে রক্ত রাখি, বাম হাতের কবজি থেকে সবুজাভ একটা শিরা চিরে রক্তের রং নিই। তারপর আমার শাদাজবা হয়ে ওঠে নিদারুণ এক রক্তজবা।

সন্ধ্যায় একটা রাত্রি আঁকি। এঁকেই তার ভেতর ঢুকে পড়ি সন্ধ্যার সিঁড়ি ভেঙে। তারপর সেই হাতে আঁকা রাতের ভেতর বসে একটা বন আঁকি। বনকে ঘিরে আঁকি পাহাড়। বনপাহাড়ের ভাঁজে একফালি নির্ঝর, কারো চুলের ফিতে হয়ে ঝরে ঝরনার জল। ঝরনা নদী হয়ে উত্তরের দিকে ধায়। কেন ধায়? নদীকে যেতে দিয়ে আমি রক্তজবা আঁকি। তারপর এই নিত্যকুসুম যে ভালোবাসে, তার অপেক্ষায় থাকি, চিরদিন থাকি।

০৫-১১-২৫


অপেক্ষা


তুমি বনপাহাড়ে জন্ম চেয়েছিলে। গাছে গাছে পরস্পর দূরত্ব বাড়ে না বলে তুমি হতে চেয়েছিলে গাছ। আরেকটি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দেবার বাসনা এত বেশি কিছু নয়, কেবল ডালপালায় পাতায় পাতায় ছুঁয়ে আনন্দ-হাহাকারের ছোট্ট জীবন, মিলন আর বিচ্ছেদের মধ্যখানে পাশাপাশি দাঁড়ানো গাছের জীবন।

কিন্তু নির্দয় ঈশ্বর তোমাকে বানিয়ে দিলো মানুষ। এখন অবিশ্বাসী হয়েও আরেক জন্মের অপেক্ষা ছাড়া তোমার আর করবার কিছু নেই।

২৫-০১-২৫


মায়ের বলিরেখা


মা মরে যাবার কদিন আগে তার কপাল থেকে, হাত, গ্রীবা, সমস্ত শরীর থেকে বলিরেখাগুলি খুলে আমাকে দিয়েছে। আমাদের ভাইবোন সবাইকে দিতে চেয়েছে, কেউ নিতে চায়নি কেন আজও বুঝতে পারি না। আমিই সব বলিরেখা নিয়েছি। রেখে দিয়েছি খুব যত্ন করে রুমালের ভাঁজে, রুমাল রেখেছি আমার শৈশবের ডায়েরির ভাঁজে।

প্রতিটি বলিরেখা এক একটা অভিজ্ঞান, প্রতিটি বলি রেখায় লেখা আশ্চর্য সব বন ও বাগানের পথ, হরিদ্রাভ যাতনার মায়াময় শঙ্খমালা, ডোডোপাখির চঞ্চু থেকে রাহাজানি করে আনা সোনালি খড়ের রূপকথা, নদীর তলের ঘ্রাণ, জোছনার চূর্ণ, হাতির পালক, আরও যা আছে আমাদের কল্পনার অতীত।

বেশ কয়েক বছর পর পর এখন একটা করে বলিরেখা বের করে আমার কপালে বসাই। এখনও তিনটা বলিরেখা খরচ হয়েছে মায়ের। আরও অনেক বলিরেখা রয়ে গেছে শাদা রুমালের পেটে।

বাকিগুলি খরচ করতে গেলে লাগবে আমার আরও চারটা জীবন। এত জীবন কে দেবে আমাকে? কেউ দেবে না জানি, এই জেনে ভাবি, আমার মায়ের এত বলিরেখা কি তবে রুমালের ভাঁজেই রয়ে যাবে?

১৯-১২-২৪


নিহত সন্ধ্যা


যেই রাত্রি আমার সন্ধ্যা হনন করে হয়েছে ফেরারি, অনেক বহুদূর দুই নদীর পাড়ে, যেই নদীদের পাড়ে পাহাড় সমান সব বাড়ি, যেই বাড়িদের ভেতর কোনো ঘর নেই, কেবল জানালা আছে, যেই নাথাকা ঘর ভেবে আমার তৃষ্ণান্ধ চোখ বালির সমুদ্র, সেই রাত্রি ডান হাতের মুঠোয় মহাশূন্য নিয়ে আমার সন্ধ্যাকে মনে করে। আমি নিহত সন্ধ্যার পাড়ে রাত্রি জড়িয়ে থাকি, আর নিজের নাম ধরে ডাকি।

১৪-১১-২৪


সত্যিকার কবিতা


আমি তোমাকে নিয়ে কোনো কবিতা লিখিনি। ফলে অন্যরা যা লিখছে, কিছুই হচ্ছে না। তোমার নামে তারা লিখতে পারছে না একফোঁটা লেবুপাতার ঘ্রাণ। অনেক চেষ্টা করছে, ঘাস ঘাটছে, সাপ নাচাচ্ছে, জল ফেলছে, বিড়ি ও সিঁড়ি খাচ্ছে, ডালপালা নাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে রেশমপোকার দিকে। আর দেখছে জড়িয়ে যাচ্ছে লালা ও লবঙ্গে আমার ফেলে আসা ঝড়। কুশিকাঁটায় থেমে যাচ্ছে শীতকাল, উলফুলের লালে পার হচ্ছে ক্লান্তি। আর তুমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছ ধীরে অর্ধেক জীবন, একটি সত্যিকার কবিতার সামনে নিজেকে খুলে ধরবে বলে।

১৭-০৯-২৪


তোমার নাম


ভোরবেলা আমিই রুটি সেঁকতাম। একদিক তাওয়া ধুতে গিয়ে তার পিঠেও দেখি তোমার নাম। তাই এখন আর আমি রুটি সেঁকি না, তোমার নামটাকে পোড়াতে মন করে না।

কোথায় তোমার নামে কিছু নেই, বলো!
তোমার নামের অত্যাচারে ক্ষয়ে যাচ্ছে আমার অশ্রুদগ্ধ চোখ
শিরার ভেতর তোমার নামের শজারু হয়ে সন্তরণরত মাছ

কে রেখেছিল তোমার এই নাম,
এত সাধারণ নামে মুড়িয়ে তোমাকে কে বানাল খঞ্জর?

শৈশবে বাড়ি থেকে ইশকুলের হোস্টেলে যেতে যেতে তিন ঘণ্টার রাস্তায় বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে তোমার নামে কেবল ছিয়ানব্বইটা ফটো স্টুডিও গুনেছিলাম। অথচ কোনো স্টুডিওর কাচের বাক্সেই তোমার ফটো ছিল না।

এইভাবে তোমার নামের অত্যাচারে বিদীর্ণ হতে হতে শৈশব-কৈশোর পার করেছি, পার করেছি যৌবন। তুমি এসে এসে ছেড়ে গেছ বারংবার। তোমার নাম ছাড়েনি।

তোমার নামে কী নেই বলো!
তোমার নামে মুদি দোকান, বাস, ট্রাক, রিকশা, সিনেমা হল, রেস্টুরেন্ট, সবই আছে। পান বিড়ি সিগারেট চায়ের দোকান তোমার নামে হয়ে আছে চোখের বালি।

তোমার নামে সেইদিন দেখলাম একটা কফিনের দোকান। দেখে মন করল একটা কফিনের ভেতর শুয়ে থাকি জন্মাবধি।

আমি তো তোমাকে ভুলে যেতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার নাম এতই সাধারণ যে সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেন আমার চোখে নিরানব্বই দানার তসবি হয়ে গেছে। এখন না চাইতেই তোমার নাম জপতে জপতে আমি ফানা হয়ে যাই। কিন্তু তা জানতে পারো না কিছুই, কারণ তুমি তো খোদা নও। তুমি তো অতি সাধারণ একটা নাম নিয়ে মানুষ রূপে জন্মেছিলে কেবল বারংবার ছেড়ে যাওয়ার জন্য।

আমার বাড়ির পাশেই তোমার নামে একটা গোরস্তান। খুব মাঝে মধ্যে সুমসাম দুপুরবেলা মহাকাশ শূন্যতা আমাকে চুরমার করে দিতে আসে, তখন আমি প্রাণান্তকর যন্ত্রণা বুকে চেপে দৌড়তে দৌড়তে গিয়ে সেই গোরস্তানে যেকোনো কবরের পাশে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি, চুপচাপ। গাছপালা, পত্রপল্লব আর তাদের ছায়ারা গভীর মায়ায় আঙুল বুলিয়ে দেয় আমার রক্তের ক্ষতে। একদিন হয়তো এই গোরস্তানের মাটিই আমাকে নেবে।

অন্য কোনো লোকে যদি তোমার সঙ্গে পুনর্বার আমার দেখা হয়, আমি নিশ্চিত জানি কেবল তোমাকেই চাইব, ছেড়ে যাবে জেনেও।

একটাই মিনতি কেবল, সেই লোকে এমন কোনো নামে এসো যেই নাম আর কোথাও কারো বা কিছুর নাই।

০৪-০৬-২৩


দিয়ো


দিয়ো ফুল, লতাপাতা দিয়ো, পাখি দিয়ো। সাপ দিয়ো। পাপ দিয়ো। খাপ দিয়ো। দিয়ো আরো পরিতাপ। পাপ ছেড়ে যাবে পা। খাপ ছেড়ে যাবে ছুরি। পরিতাপ ছেড়ে যাবে যা ছিল তাপ। সাপ ছেড়ে যাবে খোলস। ফুল ছেড়ে যাবে স্মৃতি। লতা ছেড়ে যাবে আশ্লেষ। পাতা ছেড়ে যাবে হলুদ মর্মর। পাখি ছেড়ে যাবে ডানার ছায়া।

দিয়ো সমুদ্র। ঘর দিয়ো। পাতাল, চাতাল, কাঁকাল সব দিয়ো। শয্যা দিয়ো শরীর তলে। দাগ দিয়ো গাছের বাকলে। সমুদ্র ছেড়ে যাবে ফেনা। ঘর ছেড়ে যাবে দরজার কপাট। পাতাল ছেড়ে যাবে অন্ধকার। চাতাল ছেড়ে যাবে শূন্যতা। কাঁকাল ছেড়ে যাবে কলসির মায়া। শয্যা ছেড়ে যাবে জোড়বালিশ। দাগ ছেড়ে যাবে নামের কালি।

দৃষ্টি দিয়ো। দৃশ্য দিয়ো। দিয়ো জীবন, মৃত্যু যেমন। দৃষ্টি ছেড়ে যাবে চোখ। দৃশ্য ছেড়ে যাবে দ্রষ্টব্যের অনর্থ। জীবন ছেড়ে যাবে মৃত্যু।

২৮-০৫-২৩


জ্বর


তোমার জ্বর আসছে। তুমি খাটের তলায় লুকিয়ে থাকো। জ্বর মেঝেতে শুতে পারে না, ব্যথা পায়। তুমি মুঠোর ভেতর একটা রসুন নিয়ে জেগে থাকো। তুমি পায়ের পাতার সঙ্গে পায়ের পাতা ঘষো। তুমি দুই চোখ লাল করে অন্ধকারকে দেখাও তিতা জিভ। তুমি দুপায়ে ঠেলে জ্বরকে উঠিয়ে দাও শূন্য খাটে।

খোলা জানালা দিয়ে বাতাস এসে কুড়িয়ে নিয়ে যাবে লম্পট জ্বরের বাসা। তুমি খাটের তলায় শুয়ে ফিরে যাও শৈশবে। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরো প্রাণান্তকর।

২০-০৪-২৩


আমার নাম


প্রতিরাতেই তোমাকে আকাশে খুঁজে বেড়াই। প্রেম ধীরে মুছে যায় না, কিন্তু নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, এই জেনে ভয়ে ভয়ে খুঁজি। পেয়ে যাই, জ্বলে থাকো তীব্র, সবুজ আগুনের তারা। তারাকে বিন্দু ভেবে বৃত্ত বানাই মনে। বৃত্তে ঢুকে শান্তি হয়ে থাকি, যেন বা গাঢ় রাত্রির ভাঁজে গাঁয়ের টলটলে শান্ত পুকুর।

প্রতিরাতে তোমাকে আকাশে খুঁজে বেড়াই। প্রেম ধীরে মুছে যায় না জেনে কোটি কোটি নক্ষত্র সরিয়ে খুঁজি। যদি না পাই, ভাবি তুমি পৃথিবীতে নেমে কোথাও বনপাহাড়ের ধারে কোনো প্রেমিকের কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছো। তোমার জানালার বাইরে পাতাবনে বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাচ্ছে সকল আকাশ। তুমি আশ্লেষে প্রেমিকের পিঠের পাতায় নখের আঁচড়ে লিখে দিচ্ছ আমার নাম, আর নৈঃশব্দ্য।

৩১-০৩-২৩


চোখের দাগ


ভালোবাসা দিতে পারি, কিন্তু কেউ ধারণে সক্ষম নয়, এই জেনে ভালোবাসা ফেলে দিই, উড়িয়ে ছড়িয়ে ফেলে দিই ভুলে ও অনলে। বিনয়ও বুঝেছিল ফুল-পাতা আর পাপড়ির তলে কীট আর কণ্টক ব্যাকুল।

নেমে যায় কথাকলি রাত পাড়ার পুকুরে। পাড়া কই? এখানে চোখের দাগ ছাড়া কিছু নেই।

১৯-০৯-২২

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

  • মূলত লেখেন ও আঁকেন। জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার, বাঙলাদেশ। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭টি।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।