রবিবার, এপ্রিল ১৪

নূরুল হকের কবিতা : বিষয় ও শিল্পবোধ : মোহাম্মদ বিলাল

0

বাংলা কবিতায় ‘নিজের জীবনকেই আধপোড়া কায়দায় পুড়িয়ে পুড়িয়ে’ চলার অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন কবি নূরুল হক। তাঁর জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে। অনুচ্চ কণ্ঠের মর্মভেদী এই কবি মৃত্যুবরণ করেন ২২ জুলাই ২০২১)। নুরুল হকের কবিতায় যে বুননরীতি এবং শব্দ ব্যবহারের কৌশল রয়েছে তা এক রকম বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তাঁর কবিতা পাঠ করতে করতে মনে হয়, এভাবেও, এত সহজ ভাষায়, সহজ কথাটি সহজেই বলে ফেলা যায়! তিনি মূলত ষাটের দশকের কবি। কিন্তু তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্ত দানায়’ বেরিয়েছে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে। কী অন্তর্দহন রয়েছে এ রকম নামকরণের মধ্যে যা ‘ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’। আমাদের সাহিত্যে বহুলপ্রজদের দশক বলে চিহ্নিত হয়ে আছে ষাটের দশক। নুরুল হকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ বেরুলোই ২০০৭-এ! প্রথম কবিতার প্রকাশ করতে দীর্ঘ সময় নিয়েছেন কবি নূরুল হক। এতো যে বিলম্ব, এ কী শুধুই দীর্ঘ প্রস্তুতিকাল নাকি তাঁর ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ বলেই এতো সময় নেওয়া? একটি ক্ষয়িষ্ণু সময় ও স্বাধীন দেশরাষ্ট্রের পটভূমিকায় জন্ম কবি নূরুল হকের। সামন্ততান্ত্রিকতা, সামরিকতন্ত্র এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতি তখন স্বাধীনতা অর্জনের অভীপ্সায় ক্রমশ সংঘবদ্ধ। যখন নূরুল হকের কবিতার বুননকাল তখন স্বদেশভূমি আত্মপরিচয় অর্জনের সংগ্রাম করছে, জন্ম হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের। নিজে যুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে। কবি নূরুল হকের কবিপ্রাণের অস্তিত্বের সঙ্গে এই সংকট ও সংগ্রাম নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে। ছড়িয়ে আছে তাঁর কবিতায়। কবিতায় ছোটো ছেটো পর্ববিন্যাসে তাঁর সময় ও স্বদেশকে যেমন ধরেছেন তিনি তেমনি প্রকৃতির লীলাময়তায় তাঁর চিত্ত যে বিকশিত হয়েছে সতত, সেটিও ফুটিয়ে তুলেছেন সাবলীল ভঙ্গিমায় সহজ শব্দবন্ধে। তাঁর কবিতার শব্দবন্ধ, পর্ববিন্যাস এবং ভাবের চটজলদি বাঁক পরিবর্তনের কৌশলে প্রেমে পড়ে যেতে হয়! তাঁর ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ কাব্যের প্রথম কবিতার দিকে তাকালে কেমন চমকে উঠতে হয়, কী গভীর দেশপ্রেম লালন করেন কবি—

 

দেশটা এখন আমার কাছে ভীষণ ভারী লাগে। 

এর জলধারা ভারী, গাছগাছালি ভারী
পালতোলা নৌকো ভারী, ঘরদরজাও ভারী
আর ভারী পাহাড়ের বুক। 
আমি এ ভার বইতে পারি না। 
 
যদি মাঠের দিকে যাও, দেখবে নীলছায়া ভারী। 
[… … … ]
স্বপ্ন-বোঝা ভারী, হারিয়ে-আসা ভারী
সুখদুঃখ ভারী, জীবন-মৃত্যু ভারী
আর ভারী মা-জননীর নাম
আমি এ ভার টানতে পারি না। 

 

(ছায়াপাথর | সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

এটা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’-র প্রথম কবিতা। এ কবিতায় উপলব্ধি করা যায়দেশমাতৃকার বেদনা তাঁর চৈতন্যে বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি দেখতে পান-মাঠের দিকে, মুক্তপ্রান্তরেও, একরকম নীলছায়া সমগ্র প্রতিবেশ ও অস্তিত্বকেই ক্রমাগত ভারী ওদুর্বিসহ করে আছে। স্বদেশভাবনা বরাবরই যে-কোনো কবিচৈতন্যের একটি উৎসভূমি, একথা মনে রেখেও বলতে হয় যে, নূরুল হক তাঁর চৈতন্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রাম, যা তাঁর সমকালে গণমানুষের জীবনে অঙ্গীভূত ছিল, তাখুব শক্তভাবেই ধারণ করেছিলেন কবিতায়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’; ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা’; ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’; ‘এ জীবন খসড়া জীবন’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতাসমগ্রে অবশ্য সন্নিবেশ করা হয়েছে ‘অগ্রন্থিত কবিতা’, ‘কৈশোরক ও প্রস্তুতি পর্বের কবিতা’ এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনা। কবি নূরুল হকের কবিচৈতন্য ক্রমশ পরিণত হয়েছে, সমকালীন উদ্বিগ্নতা ও অন্তর্দহন থেকে বের হয়ে তিনি আলোর দীপ্তি সঞ্চার করেছেন। একথা বলা যায়, প্রথম কাব্যগ্রন্থের পর তাঁর স্বদেশবোধ আরও প্রগাঢ় হয়েছে। মুক্তিসংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, দেশবিরোধীদের চক্রান্ত, সন্ত্রাস এবং সংকট জায়গা করে নিয়েছে তাঁর সবকটি কাব্যগ্রন্থে— এক বা একাধিক কবিতায়। ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে এই স্থিতধী কবিচিত্তকে স্বদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবন ও পরবর্তী আকাঙ্ক্ষাগুলোকে নিয়ে ভাবতে দেখা যায়। কাব্যটি প্রকাশিত হয় ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে। সন্দেহ নেই, প্রকাশকাল ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ হলেও, এর অধিকাংশ কবিতার অভিজ্ঞতাকাল হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী জীবন। ঊনসত্তরে কবি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার শিরোনামই ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প’ এবং এটি সম্ভবত তাঁর রচিত দীর্ঘ কবিতাগুলোর অন্যতম। এ কবিতার পটভূমি এবং দৃশ্য-পরম্পরা স্বদেশের উদ্বর্তন ও স্বাধীনতার পশ্চাতের বিগলিত অশ্রু এবং আত্মদানের মতো ঐশ্বর্য্যে পরিপূর্ণ। যেমন—

 

সেদিনও গেছে,
যেদিন একদিকে মৃত্যু
……….অন্যদিকে ভয়
মাঝখানে জীবন
………..শুধু কাঁপছে
থরথর করে।

 

(মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প/ মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প’ কবিতায় একটি দীর্ঘকাহিনি বিবৃত হয়েছে। কবি তখন নববিবাহিত বটে, ভয়াল পঁচিশে মার্চের বিভীষিকা পেরিয়ে কবি আপাতত স্থিতিলাভ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। স্বদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। যখন ‘যুদ্ধ সেক্টর এগারোয় সন্ধ্যা’ শীর্ষক কবিতাটি রচনা করেন সেপ্টেম্বর, ১৯৭১-এ, তখন তিনি ভারতের ডালুতে, বারেঙ্গাপাড়া ক্যাম্পে। কবিতাটিতে সে-সময়ের চিত্রই এঁকেছেন কবি। ষোলো চরণ ও চৌদ্দমাত্রার সনেটের সৌষ্ঠবে বেঁধে রেখেছেন যুদ্ধযাত্রার দিনগুলোর কথকতা—

 

পশ্চিম মেঘান্ত ঢালে ছায়া
অবনত রোদের কংকাল
তার দিকে মুখোমুখি হয়ে
হেসে ওঠে লৌহবাহু কাল।

অতর্কিতে অস্ত্র নেয় হাতে
পুরাতন স্মৃতির এমবুশ
যারা ছিল ফলবান, কাছে,
আজ তারা দূরের মানুষ।

অনিশ্চিত আতুর গোধূলি
রঙ ঢালে উঁচু অবেলার
অন্তরঙ্গ পদক্ষেপগুলি
এ দুয়ারে ফিরবে না আর।

অচেতন নৈঃশব্দ্যের মাঝে
সূদুরে একাগ্র করে কান
কেবল শুনতে হবে আজ
গৃহহীন বাতাসের গান।

 

(যুদ্ধ সেক্টর এগারোয় সন্ধ্যা/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

প্রায় একই সময়ে তিনি অন্বেষণ করেছেন জীবনের অস্তিত্ব ও তাৎপর্যময়তাকে। এ এক নিরিবিলি, যেন গুহাবাসে নিভৃত সাধনা তাঁর। না, তিনি কখনোই উচ্চকণ্ঠ বা শ্লোগানমুখর কবি নন—কেমন শান্ত, আত্মমগ্ন এবং সাবলীল! তাই তাঁর মনে হয়েছে—

 

নদীর মতোই যেন দুলছে
……………….জীবন।
আমি সামনের দিকে তাকাই
…………..সামনের দিকে চমকে উঠছে বিজলি,
পিছন দিকে তাকাই
…………পিছন দিকে জ্বলে উঠছে আকাশ
চমকে উঠি, ভাবি
কোন দিকে যে যাব?
দেখি,
হাওয়ার ওপর ভাসছে
……….একটি লতা।
সেই লতাই কি আমি?

 

(লতা/ একটি গাছের পদপ্রান্তে)

 

আত্মজিজ্ঞাসাই ছিল কবি নূরুল হকের ভাবজগতের মূল প্রেরণা। নিজের সম্বন্ধে তাঁর এ ভাবনা ক্রমশ পরিণত হয়, তিনি বুঝতে পারেন, জীবনের বেলাভূমে ক্ষয়িষ্ণুতা কীরকম ভয়ংকর! যেন শূন্যতাই সত্য— নিজের অস্তিত্বই এখানে নেতিতে পর্যবসিত। এমন অবস্থায় চারদিক তো থমথমে বটে, নীল যে আকাশ তাতেও নেই কোনো সম্ভাবনার রেখা। ‘এক মুহূর্তের ব্যবধান’ কবির নিকট এভাবেই ধরা পড়েছে, কবি যেনো ‘কোনো এক অবলুপ্ত পাখি’—

মুছে গেছি
……..একটু আগেই আমি
ছিলাম যেখানে,
সেখানে আমার কোনো চিহ্ন নেই,
…………আমি নেই,
আমি যেন কোনো এক
অবলুপ্ত পাখি,
যেখানে ডানার কোনো রেখা নেই
………………বায়ুমূলে,
চারিদিকে থমথম, অতিকায় পরিহাস
অভিমানী
…….শূন্য নীলাকাশ।

 

(এক মুহূর্তের ব্যবধান/একটি গাছের পদপ্রান্তে)

 

তবে কি মৃত্যুচেতনাই ছিল নূরুল হকের কবিচৈতন্যের সারাৎসার? প্রকৃতি-প্রেম এবং অন্যবিধ এষণাসমূহ তার চৈতন্যকে কীরকম আন্দোলিত করেছিল? সমকালীন সংঘাতময় সমাজ-রাষ্ট্রের বাইরে কবিজীবন চিন্তা করা যায় না। নূরুল হকের কবিজীবনও সমকালের ক্ষয়িষ্ণুতাকে অস্বীকার করতে পারে না। বরং একেই সবকটি কাব্যগ্রন্থে অল্পবিস্তর প্রকাশ করেছেন তিনি। যেমন—

 

চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়ে সব
শুধু ভেঙে পড়ে।
জন্ম ভেঙে পড়ে
মৃত্যু ভেঙে পড়ে,
খালবিল নদী ভেঙে পড়ে
থাকে না কিছই।
হাওয়া ভেঙে পড়ে, শূন্য ভেঙে পড়ে
থাকে না কিছুই।

 

(এসব কীসের আলামত/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল চেতনাগুলোর মধ্যে মৃত্যুচেতনা অন্যতম। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হলেও, নূরুল হকের কাব্যভুবনে শুরু থেকেই মৃত্যুচেতনা ক্রিয়াশীল। তবে তাঁর ভেতরে কীভাবে কাজ করছিল মৃত্যুভাবনা তার আরও কয়েকটি নমুনা দেওয়া যায়—

 

যাব,
     দীর্ঘনিঃশ্বাসের বাড়ি যাব।
রক্তের গভীর জলে
                 রৌদ্রস্নানে ভিজে
         খড়কুটো হাতে ধরে
কানাকড়ি সংসারের দিকে
মায়ের অগ্নিদীপ জ্বেলে নিয়ে
              নির্জনে দাঁড়াব।
[… …]
অপার দুঃখের মুক্তো ধুয়ে
দেউড়িতে থামব
               একাকী
আজন্ম ভিখিরি সত্তা এক।

 

(দেউড়িতে থামব/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

নূরুল হকের ‘এ জীবন খসড়া জীবন’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে। মৃত্যুচেতনা এ কাব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় হলেও জীবনগাঙের পারে উৎরে যাওয়াই এ কাব্যের সারকথা। মানুষ ও পৃথিবীর প্রতি গভীর গভীরতর ভালোবাসা মূর্ত হয়ে উঠেছে এর কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে। গ্রন্থটির প্রথম কবিতায় একটি মধুর সমস্যার কথা বলেন কবি যার একপ্রান্তে আছে মৃত্যু এবং এর জন্য সর্বদা সহাস্যে প্রস্তুত তিনি; অন্যপ্রান্তে আছে জীবন ও পৃথিবীর প্রতি গভীর প্রেম। এ প্রেম যেন মৃত্যুর চেয়ে কম সত্য নয়!—

 

মৃত্যুতে আমার কোনো সমস্যা নেই
কারণ
       জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে
               তাতেই তো বসবাস করি
তাই
মৃত্যুতে আমার কোনো গড়িমসি নেই
       যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি
কিন্তু
      মৃত্যু হলে
      পৃথিবীটা ঠিকঠাক চলছে কিনা
তা জানব কী করে?
এই যা সমস্যা।

 

(সমস্যা/ এ জীবন খসড়া জীবন)

 

সমাজের রূঢ়তায় কবি কী রকম ক্ষতাক্ত হয়েছিলেন? জীবনের জন্য যে মৌলিক চাহিদাসমূহ মেটানো অত্যাবশ্যক, তার আকাল অথবা সে-সব হতে বঞ্চনায় কবি বিপন্নবোধ করেছেন, বলেছেন ‘নিজের জীবনকেই আধপোড়া কায়দায় পুড়িয়ে পুড়িয়ে’ প্রাচীন মানুষ যেমন মাংসের টুকরো ঝলসে খেত, তেমনি খেতে হবে বাকি বেলাটুকু। যেমন—

 

নিজের জীবনকেই আধপোড়া কায়দায় পুড়িয়ে পুড়িয়ে
       খেতে হবে
             বাকি বেলাটুকু
                     দলিত আনন্দে,
প্রাচীন মানুষের আঙনে ঝলসানো
          শিকার-করা মাংসের টুকরোর মতো

 

(আহার/ এ জীবন খসড়া জীবন)

 

‘আহার’ কবিতায় কবি মনে করেন জীবন এরকমই এবং ‘নিজের জীবনকেই আধপোড়া কায়দায়’ পোড়ানোটা এক রকম ‘দলিত আনন্দ’। না, এরকম হতাশ্বাসই নূরুল হকের অবলম্বন নয়। এটা উপলব্ধি করা যায়, তার প্রকাশ প্রকাশও ঘটেছে নানা কবিতায়। যেমন—‘আত্মদীপ ভব’ কবিতায় কবিকে জীবনের রূঢ়তার মধ্যেও এক আশ্চর্য প্রতীতি নিয়ে উচ্চারণ করেন—

 

হতাশ হইনি।
নরকের অভ্যন্তরে,
          এই অন্ধকারে,
                 ঘোর অন্ধকারে
কলজে জ্বলে
       আলোর টুকরোর মতো।
দেখে অবাকই লাগে।
স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে
                 রাতের গভীর তারা
     যেরকম জাগে
আর ধুয়ে দেয় জগতের মুখ
     তেমনি কোন দীপায়ন
     সংগোপনে পোড়ায় আমাকে।

 

(আত্মদীপ ভব/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে ঘোর অন্ধকার হানা দেয় মনুষ্যজীবনে, তবু ‘রাতের গভীর তারার মতো’ দীপায়নের কথা শোনান নূরুল হক। এ জন্য তীব্র তমসাচ্ছন্ন সময়ে তাঁর কণ্ঠে আশার বাণী ও প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণা শুনতে পাই। ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’ কাব্যগ্রন্থে, যখন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নারকীতায় দেশমাতৃকা বিপন্ন, তখন ঠিকই তিনি আশার বাণী শোনান। যেমন—

 

আকাশে যদি কোনো তারাও না থাকে আর
না থাকে সূর্য বা প্রাণপথে অতর্কিত আলো,
না আসে ফুল বা ফল
                ডালে ও পাতায়,
না ওড়ে নীলিমা পথে
               পাখির অন্তর,
নদীজল না লেখে মাছের বর্ণমালা,
তখনো ডাকবে রাতে মোরগেরা,
                কুক্কু-রুক্কু করে,
আলোর প্রত্যঙ্গ নিয়ে শেষ অন্ধকারে,
নৈশবস্ত্র খুলে
             আমার ভিতরে।

 

(ডান হাত ময়লা করব না/ শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

মাটির পৃথিবীই তার ভালোবাসার মূলভিত্তি। তার মন বরাবর মৃত্তিকামগ্ন। প্রকৃতিই তাঁর প্রাণ বিকাশের উৎসমূল। এ জন্য তাঁর গ্রামখানাই সবচেয়ে নির্মল—এর সবকিছুই ‘মাটির মতো সরেস’, ‘হৃদয়ের মতো গভীর’ এবং ‘জন্মের মতো সুন্দর’। ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ কাব্যগ্রন্থ তাঁর প্রথম কবিতার বই হলেও এতেই নূরুল হকের ভাবনার মূল সুর ভালোভাবেই দানা বেঁধে উঠেছে। এ কাব্যের ‘গ্রামে, মাটির রাস্তায়’ শীর্ষক কবিতায় কবি বলেন—

 

গ্রামে, মাটির রাস্তায় হাঁটছি
এখানকার সবকিছই নির্মল
মাটির মতোই সরেস,
                হৃদয়ের মতো গভীর
আর জন্মের মতো সুন্দর।
               এটিই আমার গ্রাম।

 

(গ্রামে, মাটির রাস্তায়/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

প্রেম ও আর্তনাদ কি কবিমনকে আন্দোলিত করেনি? সংসার জীবন তার কবিমনে কী প্রভাব ফেলেছিল? কবি মনে করেন এ এক অন্তহীন দ্বন্দ্বের জায়গা। এ দ্বন্দ্বে জীবন সতত ক্ষতাক্ত। তবু তিনি মনে করেন ‘ছাইভষ্ম কুড়াবার জায়গা’ হচ্ছে জীবন এবং পথের ধুলো কুড়ানোতেই রয়েছে জীবনের অর্থময়তা। অনেকটা বাউলের মতো তাঁর নিকট পরমাত্মা, পৃথিবী ও ভব-সংসার সমার্থক। এছাড়া কোথাও তো ছাইভষ্ম কুড়াবার জায়গা নেই—

 

জেগে থেকে কার সঙ্গে যে জীবন কাটাই
আর ঘুমের মধ্যেই বা কার সঙ্গে
                         কে জানে?
একটা জনমই যেন পার করে দিলাম
                         অন্যমনস্ক হয়ে।
স্তূপীকৃত ইচ্ছারা
                  ফুরফুরে বাতাসে
                          উড়ে যায়।
আমি পথের ধুলায় কুড়াই
                ধুলা কুড়ানোর মানে।
আর কোথায়ই বা এমন
ছাইভষ্ম কুড়াবার জায়গা।

 

(সংসার/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

প্রেম ও রোমান্টিকতায় তার ভেতরটা গীতল, কোমল ও ভেজাভেজা। তাই জীবনের প্রান্তরে যেতে যেতে অথবা কবিতার প্রান্তরে চষে বেড়াতে বেড়াতে রচনা করেছেন আশ্চর্য সুন্দর সুন্দর প্রেমের কবিতা। যেমন—

 

                  শূন্য হাতে রাত্রি ভরে দিলে কেউ
                  ভিজে যাব,
দোয়েল রক্তের পথে
                             সামনে এসে দাঁড়ালে নির্ভয়ে
ভিজে
                      ভিজে যাব
ভিজে যাই
               জীবনে
                      জীবনে।

 

(যেতে যেতে/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

এরকম নিটোল প্রেমের কবিতার উদাহরণ অনেক রয়েছে নূরুল হকের কবিতাবলিতে। এসব কবিতায় পর্ব ভেঙে ভেঙে অগ্রসর হয়েছেন কবি আর কথার বাঁক পরিবর্তন করেছেন মুহূর্তেই। জানান দিয়েছেন নতুন অর্থময় অঞ্চলের। এ জন্য তাঁর প্রেমের কবিতা ছোটো ছোটো হলেও তাদের ব্যঞ্জনা অসীম। যেমন—

 

বুকের ভেতরে
যে নারী পথ দেখিয়ে
                    নিয়ে এলো
                   দূরে, এত দূরে
       উচ্ছ্রিত ঢেউয়ের মতো
সে নারীর যতসব ঝরাপাতা
                 আজও পিছু ডাকে
আজও কোন সর্ষেবেলা
               সূর্য থেকে চুপচাপ
      ঝরে পড়ে মাঠে,
বুকের ভেতরে।

 

(এইসব ধূম্রজাল/ সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

আটপৌরে জীবনের প্রাত্যহিকতা কবির মনোভূমে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। কবি নূরুল হকও নিত্যদিনের ঘটনাবলি দ্বারা আন্দোলিত হয়েছেন, একেবারেই সাধারণ বিষয় উঠে এসেছে তাঁর কবিতায় ‘ক্লেদজ কুসুমের’ মতো। বাজারে বাজারে মাংসের বিপণী ও তার হিংস্রলোলুপ দৃশ্য—প্রাণীদেহের বিভিন্ন অংশের এমন দৃশ্য নূরুল হকের চিত্ত ও চিন্তালোককে পীড়িত করে। এ জন্য রচনা করেছেন ‘দিল-কলজে’র মতো বিষয় নিয়ে কবিতা। যেমন—

 

কাঁচাবাজারের মাঝে
               ঘুরছি এখানে
দোকানে সাজনো আছে
দিল-কলজে,
            বাকহীন অবুঝ প্রাণীর,
রক্তাপ্লুত,
             অর্ধচন্দ্রাকৃতি।
একটি আপেল কেটে
             এখানে রেখেছে কেউ
সযত্নে, গরবে।

[… …]

আজ তাকে দেখলাম
          সম্পূর্ণ খণ্ডিত হয়ে আছে
মৃত্যুর কুৎসিত অন্ধকারে।

 

(দিল-কেজর কাহিনি/ একটি গাছের পদপ্রান্তে)

 

এরকম ছোটো বিষয় যা সাধারণের চোখে পড়েই না বলতে গেলে, নূরুল হকের নিকট তা দিব্যি কবিতার বিষয় হয়ে যায়। ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা’ নামক কাব্যের ‘তফাৎটা কোথায়’, ‘ডিম’, ‘জানি তো তোমার কেই নেই’ প্রভৃতি কবিতার দিকে তাকালে বলতে হয় যে কতো তুচ্ছ বা ক্ষুদ্রের প্রতি তার দৃষ্টি ছিল মমতাময়। বিদ্যুতের তারে শক্‌ড হয়ে নিহত একটি পাখি তাঁর অস্তিত্বকে তোলপাড় করে দেয়, তিনি এই নিহত পাখির সঙ্গে নিজের সাজুয্য দেখতে পান—

 

দেখলাম
একটা নিস্তব্দ পাখি ঝুলে আছে
              বিদ্যুতের তারে।
[… …]
মনে হলো
          আমিই তো ঝুলে আছি
                        এই তারে,
আমিই তো এই লাশ
                   পাখির এ বেশে।

 

(তফাৎটা কোথায়/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

প্রকৃতির নিয়ম বলেই হয়তো খেয়াল করাই হয় না, এমন বিষয়ের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন কবি। ডিমের ওপর সাপের তা দেওয়ার আলোকচিত্র দেখে এর চিরায়ত বোধের সঙ্গে নিজের হৃদয়ের উত্তাপ অনুভব করেন নূরুল হক। সাপের ডিম ফোটানোর দৃশ্যের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায় মাতৃ বা পিতৃহৃদয়। কিছুটা দীর্ঘ হলেও, এই আশ্চর্য সুন্দর কবিতা হতে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়া আবশ্যক মনে করি। —

 

সর্প হও, যেই হও
               প্রকৃতির অংশ তুমি
সুতার জালের মতো জড়িয়ে গিয়েছো, আহা,
                        আমারো ভিতরে
তোমাতে আমাতে তাই ভেদ রেখা নেই
স্পষ্ট দেখতে পাই
                ডিম নিয়ে বসে আছো
                            মায়ের প্রদীপ জ্বেলে

[… … …]

এই তাপ কোথা থেকে আসে?
                      এই ক্ষীর?
লাভা হয়ে ছোটে
আলো-আঁধারির পাহারা ডিঙ্গিয়ে
মানুষের জ্ঞানপ্রবাহের পথের বাইরে গিয়ে
শতদল পিতার মতন
                 ছড়ায় আকুল ডানা
                         অনন্তের রক্তস্রোত জুড়ে
                                ছোটে তীরের মতন
ভালোবাসা হয়ে
            বস্তুতে
                প্রাণীতে
                     দৃশ্যে
                            অদৃশ্যে
শুয়ে থাকে নিজ নিজ ডিমের ওপর

 

(‘ডিম’/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

অথবা কাকের জীবন নিয়ে এক আশ্চর্য বোধের কবির মর্মলোকে। তার নিকট কাকের জীবন তো এক অর্থে নিজেরই জীবন। তাই একটি ক্ষুধার্ত কাকের উদ্দেশ্যে বলেন ‘জানি তো তোমার কেউ নেই’। যেমন—

 

এসেছ আমার কাছে, কাক,
                 খাবারের খোঁজে,
বন থেকে বনে বনে
                ওড়াওড়ি করে
ক্লান্ত হয়ে,
              এইখানে এসে
ডাকছ অধীর হয়ে
               জানালার শিকে,
জানি তো তোমার কেই নেই।

 

(জানি তো তোমার কেই নেই/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

এই নিঃসঙ্গতা ও বিপন্নতাবোধ এবং সংরাগ তাঁর ভেতরে কবিজীবনের শুরুতেও ছিল। এ জন্য জীবনভর তিনি ঘুমাতে পারেন না। ‘অনিদ্রা’ কবিতায় কবি বলেন—

 

অন্ধকারে
            জানালা দিয়ে তাকাই,
                             বাইরে,
আকাশে।
দেখি
       দূর কোনো তারায়
                  উসখুস করছে
                       কেউ।
আমি ঘুমুতে পারি না।
সারারাত।
শতাব্দী শতাব্দী কেটে গেলে
                 আবার তাকাই বাইরে
আকাশে—
আবার উসখুস করে কেউ।
                 অন্যকোনো তারায়।
আমাকে ঘুমুতে দেয় না আর।

 

(‘অনিদ্রা/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

তাঁর ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’ কাব্যগ্রন্থটি যেনো হিরকখণ্ড— ছোটো ছোটো অনেকগুলো কবিতা এখানে ধারণ করে আছে হিরকচূর্ণের আভা। আর এর মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে কবির জীবনদর্শন। পরিবর্তনশীলতাই জীবনের বৈশিষ্ট্য। পদচিহ্ন রেখে যাওয়াই তো জীবনের ব্রত। ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’র কবিতাবলিতে কবি পদচিহ্নই রেখেছেন। এ কাব্যের ‘বেরিয়ে যাই’ কবিতায় তাঁর উচ্চারণ আরও স্পষ্ঠ, তিনি মনে করেন ‘পুরো জীবনটাই একটা স্বপ্ন’। সুতরাং জীবনে ‘খোলস ফেলে বেরিয়ে যাওয়ার’ মতো ঘটনা চলে সর্বদা। এ এক আশ্চর্য উচ্চারণ যেখানে কবির কাছে পুরো জীবন একটা স্বপ্ন এবং ‘ঘুমের মধ্য দিয়ে’ সে জীবনের পরিভ্রমণ সম্ভব হয়। এমন স্বপ্নের মতো করে যে কবি জীবনকে দেখেন, তিনিই পরবর্তী কবিতা ‘প্রস্তাব’-এ এক অসাধারণ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন—

 

চলো,
        কোনো জ্যোৎস্নালোকের ভেতর দিয়ে
                   শূন্য আকাশ-তলে
আমরা বিলীন হয়ে যাই,
জগতে আর ফিরব না।

 

(প্রস্তাব/ একটি গাছের পদপ্রান্তে)

 

এই পরাবাস্তবতার গূঢ় রহস্য থেকে কবি আবার বাস্তবতায় মুখ ফেরান ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’ কাব্যগ্রন্থে। কবির সমকাল কবিকে আহত করে, বেদনাবিদ্ধ করে। একইসঙ্গে উৎফুল্ল ও আশান্বিত করে। নূরল হকের চিত্ত ও বিবেকবোধ তাড়িত হয়েছিল ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে সাম্প্রদায়িক শক্তির নগ্নতায়, আর আশান্বিত হয়েছিলেন শাহবাগে প্রতিবাদমুখর মানুষের প্রতিরোধ দেখে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী জনজীবনের উপর তাণ্ডব চালায়, সেটির প্রকাশ ঘটেছে ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’য়। যেমন—

 

সৃষ্টিকর্তার কাজ যারা নিজের হাতে তুলে নেয়
তাদের সম্পর্কে সাবধান!
জন্মমৃত্যু তো সৃষ্টিকর্তার সংস্থাপনায়ই
                 প্রচলিত হয়ে আছে জগতে,
তার আসন দখল করে
যারা ছুরি হাতে জবাই করে মানুষ
                  তাদের সম্পর্কে সাবধান!

 

(সাবধান, তারা সাপ/ শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

কিংবা আরও একটু অগ্রসর হয়েও দেখা যায়, কবি তাদের তাণ্ডবকে চিহ্নিত করেছেন। ‘ঢাকো’ শীর্ষক কবিতাটি রচনা করেছেন সারা দেশে জামায়াতের তাণ্ডব ও বর্বরতা দেখে। এই কবিতায় তাঁর সাহসী উচ্চারণ—

 

এইসব দেখতে আমার ভাল্লাগে না।
                        খুকুমণির পুড়ে যাওয়া চোখ,
কিশোরের হারানো কব্জি,
বাস-হেল্পারের ভস্মীভূত অনন্ত ঘুম,

অঙ্গার হয়ে যাওয়া গরুর শরীর
                দেখতে আমার ভাল্লাগে না।
ঢাকো আমার চোখ, কালো কালো মেঘের
                পালক দিয়ে।

 

(ঢাকো/ শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

এ সময় হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক চেতনা অনুভব করেন নূরুল হক। হত্যা-নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিপক্ষে এবং প্রতিবাদী মানুষের সপক্ষে অবস্থান নেন কবি, এ সম্বন্ধে কবিতার পর কবিতা রচনা করেন। এমনকী পৃথিবীর যে কোনে প্রান্তে সংঘটিত সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞে উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠেন কবি। যেমন—

 

এক হাজার মাইল দূরে
          যে লোকটির মৃত্যু হচ্ছে
                  ঘাতকের উন্মত্ত ছোরায়
সে কি আমি নই?
[…]
আমিই কি খ– খ– হই না সে শরীরের
                                   গাঁথুনিতে?
                         কোষে কোষে
                    স্নায়ুতন্ত্রে?
       মেরু ও মজ্জায়?

 

(এক হাজার মাইল দূরে/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’ কাব্যগ্রন্থের বিষয় সমকালীন জীবনের সংঘাত ও সংগ্রামের উত্তাপ। সে উত্তাপ ছড়িয়েছে শাহবাগ থেকে মালোপাড়া পর্যন্ত। একাত্তরের ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল শাহবাগ আর মালোপাড়ার মানুষের জীবনের বিন্যাস, বিষণ্নতা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা যেনো একই সূত্রে গ্রথিত—বঞ্চনা যেনো বাংলার মানুষের নিয়তি। একাব্যগ্রন্থের কবিতার বিন্যাসরীতি পূর্ববর্তী কবিতাগুলোর মতোই, তবে অধিকাংশ কবিতা দীর্ঘ। এতে মানুষের শাঠ্য ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতায় কবিআত্মা সংক্ষুব্ধ। আবার কখনো কখনো উৎফুল্ল ও আশাবাদী। কাব্যগ্রন্থটির নামকরণ, উৎসর্জন এবং কারণ শীর্ষক মুখবন্ধ পাঠ করলে বোঝা যায়, সমাজরাষ্ট্রের পুঞ্জিভুত জঞ্জাল এবং এর বিপরীতে মানুষের বৈপ্লবিক চৈতন্যের উৎসারণই হচ্ছে এটির বিষয়বস্তু। কবিতাগুলোর রচনাকাল ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ। এসময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে ছাত্রজনতা ও সুশীলশ্রেণি আন্দোলনে ফেটে পড়ে। কবিতাগুলোর প্রেক্ষাপট বর্ণনাপ্রসঙ্গে কবি লিখেছেন—

 

প্রধানত ২০১৩-তে লেখা হয়েছে কবিতাগুলি। দেশ সমাজ রাজনীতি ও বেঁচে-থাকার গর্জমান পার্শ্বগুলি স্পর্শ করার তেমন আগ্রহ লক্ষ করা যায়নি আমাদের কবিতায়। অন্তত আমার মনে এরকম একটা বোধই হাজির থেকেছে সারা বৎসর।

অন্তরের সেই উসখুস দশা থেকেই, মুখোশ-পরা কবিতায় ছায়া এড়িয়ে জীবনের খোলা বাজার দিয়ে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এগুলোতে। (‘কারণ’, শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

কাব্যগ্রন্থটির উৎসর্জনের দিকে তাকালে সমকালীনপ্রসঙ্গ সম্মন্ধে কবির দৃঢ়চেতা বক্ত্য পরিস্কার হয়ে ওঠে। কবি বলেছেন—

 

গণজাগরণ মঞ্চ

যার উৎস-শক্তি জাতির অন্তরে
মানসসরোবর হয়ে বিরাজ করছে।
সেখান থেকেই আমাদের হারানো অগ্নিস্রোত
ফিরে ফিরে আসছে।

(উৎসর্জন)

 

‘সালতামামি’, ‘সাবধান,‘তারা সাপ’, ‘অশ্বারোহী’, ‘ঢাকো’, ‘শুয়ে আছে’, ‘শাহবাগে উচ্চারণ’, ‘মোমবাতি’, ‘টক-শোর ঠোঁটগুলিকে জিন্দাবাদ’, ‘জিনিস’, ‘রূপ’, ‘পরাবাস্তবের লাঠিসোটা’, ‘সময়’, ‘বলল’, ‘ধ্বংসযাত্রা’, ‘এইসব’, ‘হুক্কাহুয়া’, ‘বানানো কিছু নয়’, ‘হালুয়া’, ‘দাবিদার’, ‘শাপলাচত্বর’, ‘৪২ বৎসর পর’, ‘বাংলাদেশ’, ‘একটি হারানো আংটি’, ‘রক্ত আসে’, ‘আঁধারের বিরুদ্ধে’, ‘খবরের বর্ণমালা’, ‘পড়া’, ‘সেখানে আগুন খেলা’, ‘ফাঁকি ঝুঁকি দিয়ে’, ‘সাক্ষী’, ‘কেই একজন মোরগ’, ‘অট্টহাস্য’, ‘অভিমুখ’, ‘মহাসেনের রাতে’, ‘ডান হাত ময়লা করব না’, ‘সন্ধ্যার টেরাকোটা’, ‘ঋষিপল্লি, মণিরামপুর’, ‘ঘুমোতে ঘুমোতে মালোপাড়া’ প্রভৃতি কবিতা সমকালীন ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতেই লিখিত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে যখন সারাদেশে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাণ্ডব চালায় কবি তখন চুপ থাকেন কী করে? ‘ধ্বংসযাত্রা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—

 

গহ্বরে পতিত দেশ, রক্তের পাগড়ি বাঁধা ওই,
মৃত্যুর জীবিকা নাকি?
                 সারাদেশ ককটেল-বাগান?
নরমেধ যজ্ঞ নাকি?

(‘ধ্বংসযাত্রা’/ শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

কিংবা ‘শাপলা চত্বর ৫.৫.২০১৩’ কবিতায় একবারে সমকালীন প্রসঙ্গতেও কালোত্তীর্ণ আবেদন তৈরি করেছেন মাতৃভূমি, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তমনের প্রবাহে। যেমন—

 

কী হচ্ছে আজ এইখানে?
কোন দরবারে হাতজোড় করে আছে
                  মাজাভাঙ্গা দেশ?

 

(শাপলা চত্বর ৫.৫.২০১৩/শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

 

তার প্রশ্ন ‘রক্তের বাটিতে যারা […] চুমুক দিতে রোমশ জন্তুর মতো গড়িয়ে আসছে’ সময় ও স্বদেশ কি শেষমেষ তাদের ছাতার নিচে দাঁড়াতে চাইছে? এটা মেনে নেওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণবাজি রাখা কবি সেটি পারবেন কেন? তাই মুক্তিযুদ্ধের বিয়াল্লিশ বছর পর কবি ফিরে তাকান, বলেন—

 

সোনার গাছে ফুল ধরবে
                         ফুল ধরবে বলে
পুঁতেছিলাম বীচি
আজ দেখি মান বাঁচানোই দায়
জল ঢেলেছি
             হৃদয় থেকে
             এতটা কাল
শুধুই মিছিমিছি?

 

(৪২ বৎসর পর/ শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

এ জন্যই তার মনে হয় ‘জয়বাংলা একটি হারিয়ে যাওয়া হিরের আংটি’ যা ‘কোন অচিন্তিত নায়ের মাঝির রক্তঢালা ছিন্নভিন্ন আঙুল থেকে’ ছিটকে পড়েছিল। তার মনে হয় স্বাধীনতার এতবছর পরেও আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁচেছে যেখানে রক্তবাণিজ্য চলছে। —

 

রক্তবাণিজ্যের দিনে
     আমরা যেখানে এসে মিলেছি এখন
সেখানে আগুনখেলা জমে উঠেছে
ছিনিমিনি জীবনের
             শুকনো পাতায়।

 

(সেখানে আগুনখেলা/ শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

এই স্বদেশ পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে ‘গাছ’ কবিতাটির ভেতরেও। এক অশেষ বেদনায় কবিচিত্ত বিদীর্ণ হয় কবিতাটিতে। —

যখন কোনো কোনো মা মৃত সন্তান
                    বয়ে বেড়ায় পেটে
আর প্রতীক্ষা করে কোনো একটা সুন্দর মুখের
           তখনও স্বপনের মধ্যে দুলতে থাকে দিন,
কিন্তু যখন সময় হয়ে আসে
                       সহজে জানতে পায়
তার মধ্যে জীবনের লেশমাত্র নেই।

যখন নিজের দেশটাই হয়ে ওঠে
                 এরকম একজন মা
আর প্রতীক্ষা বলতে সামনে থাকে
              শুধু মৃত ভবিষ্যৎ
তখন কে আর রোপণ করে
          পুব দিগন্তে
আর কোনো সূর্যোদয়ের গাছ?

 

(গাছ/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

 

 

কবির বিশ্বাস, ‘কোথাও কিছু রয়ে গেছে সংগোপনে’ আর সেটি তার দিকে গতিমুখ করে আসছে। তা তার কবিসত্তায় আশ্রয় লাভ করতে চায়। সেটি হয়তো কোনো অনাথ হাহাকার, বেলা-অবেলার রোদন অথবা স্বদেশ। এবং সেটি—

 

                   জেলেদের জাল ফেলা থেকে
কৃষকের ধানবোনা থেকে
পাখির ঘুম আর মায়ের বুকের দুগ্ধপান থেকে
                 ফিনকি দিয়ে
পৌঁছুতে চায়
              আমার মধ্যে।

 

(অভিমুখ/শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

এ জন্য দেখা যায় তার কবিচৈতন্য জুড়ে আছে স্বদেশ। ‘মহাসেনের রাতে’ কবিতায় স্বদেশের নিকট প্রার্থনা জানান ‘একটু লবণ হয়ে রয়ে যেতে চাই তোমার ভেতরে’। কবি ভেসে যেতে চান স্বদেশের মাছ আর শিশুদের সঙ্গে। কারণ তিনি মনে করে পথের পার হতে ‘মৃত্তিকাবাহিত’ হয়ে তিনি এসেছেন স্বদেশের ঊষায় মিশে যেতে।—

 

আমি এসেছি পথের পার থেকে মৃত্তিকাবাহিত হয়ে
      মিশে যেতে ছিন্নমূল তোমার ঊষায়
       ভেসে যেতে মাছ আর শিশুদের সাথে

আমি এক প্রবীণ পথিক
                 চিনবে না কেউ
একটু লবণ হয়ে রয়ে যেতে তোমার ভিতরে

 

(মহাসেনের রাতে/শাহবাগ থেকে মালোপাড়া)

 

তাঁর ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’র মতো ‘এক ঝুড়ি নদী’ কাব্যগ্রন্থটিঅভিভূত হওয়ার মতো ছোটো ছোটো কবিতায় পরিপূর্ণ যাদের আবেদন মর্মমূল ছোঁয়ে যায়। এখানেও প্রেম-মৃত্যু-অন্তর্দহনই মূল বিষয়— কবিতাগুলোর পরিপ্রেক্ষিত ব্যক্তি অথবা সমাজরাষ্ট্রের যাই হোক না কেন! কয়েকটি কবিতার উদাহরণ দেওয়া যায়, তাতে বিষয়টি বোঝা যাবে : ‘জামাই’, ‘তার কথা’, ‘বাতাসের মালা,’ ‘এই মুহূর্তের কাজ’, ‘তুমি’, ‘থামলে চলবে না’, ‘মেঘ’, ‘সেলামি হিসেবে’, ‘কী লক্ষে’, ‘বার্ধক্য’, ‘বার্তা’, ‘দুই ভাই’, ‘নিদ্রাহীনতা’, ‘এই গাছতলে’, ‘ফুল’, ‘বলি’, ‘একদিন’, ‘পণ্য’, ‘সুপ্রভাত’, ‘নাকফুল’, ‘অহং’, ‘গলাজলে’, ‘একাকীত্ব’, ‘কলাপাতায় চড়ে’, ‘ভুল’, ‘ছবি’, ‘রহস্য’, ‘একটি ডাল’, ‘ভালোবাসা’, ‘থাকে না’, ‘এ জীবনে’, ‘বেলা চলে গেছে’, ‘কবিতা’, ‘প্রাণ’, ‘দুঃখ’, ‘রাতের অবস্থা’, ‘সম্বল’, ‘যত কথা’, ‘একবিন্দু ভরসায়’, ‘বালাই থাকবে না’, ‘কেন’, ‘বন্ধুত’, ‘দিয়ে যাই’, ‘পাহাড়ের দিকে’, ‘গাঙচিল’, ‘সমুদ্রের নেমতন্ন’ শীর্ষক প্রভৃতি। এগুলোতে কবিতা সম্বন্ধে তাঁর উচ্চারণ পাঠকের চিন্তাজগতে একধরনের অনুরণন তোলে-কবিতার অন্তর্জগত ও বহিরঙ্গ অর্থাৎ আঙ্গিককৌশল ও ভাবজগত বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতাই নির্দেশ করেন কবি।—

 

মরুভূমিতে
            একফোঁটা বৃষ্টির মতন
এই কবিতা,
আমার জীবন
ঝিলিমিলি বাতাসের মালা।

 

(বাতাসের মালা/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

কবিতায় প্রকৃতপক্ষে ‘সময় পুড়িয়ে’ একজন কবি ‘ভস্ম নিয়ে খেলা’ করেন। এই তো কবি ও কবিতার স্বরূপ! এখানেই কবির অগোচরে কবিতার একধরণের সংজ্ঞার্থ নির্ণিত হয়ে যায়, নির্দেশিত হয় জীবন ও কবিতার সম্বন্ধ। যেমন—

 

সময় পুড়িয়ে
            ভস্ম নিয়ে খেলা করি
মাঝে মাঝে।
লোকজন একেই কবিতা বলে জানে।

 

(কবিতা/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

এমন সংজ্ঞার্থ করেন কবি দুঃখ কিংবা বন্ধুত্ব নিয়েও। নিজের অভিজ্ঞানকে কবিতায় উপস্থাপন করেন স্বল্পায়তনের মধ্যে। অথবা এমন ছোটো কবিতার বিষয়কেও আস্বাদন করা যায় কবিতার অপার আনন্দে। তিনি যখন বলেন—

 

যদি
সঙ্গে বসে বিড়ি খাও
খুশি হব।

 

(বন্ধুত্ব/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

তখন মনে হয় ‘বন্ধুত্ব হচ্ছে একধরণের সমতা, যা দূরকে নিকট করে, ব্যবধান ঘোচায়-সঙ্গ ও আসঙ্গে পরিপুষ্ঠ হয়। বন্ধুত্বের অপর নাম ভালোবাসা ও আনন্দ। ‘দুঃখ’ কী? এ সম্বন্ধে কবি নিজস্ব যে অভিজ্ঞান ব্যক্ত করেন, তাতেও চমকে যেতে হয়, মনে হয়, দুঃখ যেনো বা নিজেরই ঔরসজাত, শুয়ে থাকে মানুষের বিছানায় সন্তানের মতো! কবি মনে করেন—

 

দুঃখ
মানুষের ঘরে শুয়ে থাকে বিছানায়
সন্তানের মতো।

 

(দুঃখ/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

নূরুল হকের কাব্যের বহিরঙ্গে খুব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কসরত নেই। একদম সাদামাটা শব্দে তিনি চরণ ভেঙে ভেঙে একধরণের কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন যাতে শব্দ নতুন অর্থ পরিগ্রহ করেছে। এতে কবিতার নিগুঢ় ব্যঞ্জনার জন্য পাঠক সময় পান অথবা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হন। অথবা অন্যভাবেও বলা যায়, খোঁপায় ফুল গুঁজে দেওয়ার মতো করে নূরুল হক চরণের ফাঁকে নতুন অর্থ ভরে দেন। তাঁর কবিতার আরেকটি দিক হচ্ছে, পাঠককে শেষাবধি সজাগ থাকতে হয়। কারণ কবির কথামুখ সহসাই পরিবর্তিত হয় এবং খুব পরিমিত শব্দে প্রায় বিপরীত দৃশ্যের যোজনা করেন কবি। সেই সঙ্গে আছে সাধারণ দৃশ্য বা চিত্রকল্পের প্রয়োগ যা তার হাতে অনায়াস রহস্যময়তা অর্জন করেছে। যেমন—

 

শিথিল স্তনের মতো
                   ঝুলে পড়েছে মেঘ
       শ্যামলা রমণীর গায়ে, আকাশে।

(ছবি/মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা)

 

জীবনের অপরাহ্ন বেলায় বাংলা কবিতার জগতে নূরল হক প্রকাশিত হলেন। এবং বেঁচে থাকার কৃতিত্ব অর্জন করলেন। গ্রন্থপ্রকাশ বিলম্বিত হলেও তাঁর সৃষ্টিজগত চিত্ত ও চিন্তালোকের সমাদর পেয়েছে। পুনরাবৃত্তি হলেও তাঁর কবিতার অন্তর্জগত যেনো আকাশে ঝোলেপড়া ‘শিথিল স্তনের মতো’ মেঘের রাজ্য-এক অপার সৌন্দর্য্যের আধার। এমন সহজ সুন্দরের আস্বাদনে আনন্দের শেষ নেই।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।