শুক্রবার, জুন ১৯

ফুটবল ইজ লাইফ, ফুটবল ইজ সিরিয়াস

0

‘Football is a pleasure that hurts’—বলেছিলেন এদুয়ার্দ গ‍্যালিয়ানো। আরও একটি বিশ্বকাপ যখন দরোজায় কড়া নাড়ছে তখন ফুটবল নিয়ে ব‍্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শুরুতেই এই লাইনটি মাথায় এলো। ঘোর অন্ধকারে শূন্য পথে হাঁটতে হাঁটতে কখনও যদি কোনো স্খলিত তারার সাথে দেখা হয়, যদি কখনও মনে হয়, এই কানাগলির শেষেই আছে কাঙ্ক্ষিত প্রদীপ, যদি মনে হয় অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতার বাইরে থাকা বিপন্ন বিস্ময় হাতছানি দিয়ে ডাকছে তখন জীবনের বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজতে আমি যেসব উপাদানের দ্বারস্থ হই, ফুটবল তারমধ্যে অন্যতম। অ‍্যামেরিকান টিভি সিরিজ ‘Ted Lasso’ তে একটি চরিত্র ডানি রোহাস বলেছিল, ফুটবল ইজ লাইফ—মোটা দাগে যখন আয়োজন করে ফুটবল দেখতে বসি তখন অনুভব করি, তাই তো!


১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘Fever Pitch’-এর একটি দৃশ্য


১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘Fever Pitch’ দেখার আগেই আমি ক্লাব ফুটবলে আর্সেনালের সমর্থক হয়েছিলাম। সিনেমাটা দেখেছি অনেক পরে। সিনেমার প্রোটাগনিস্ট পল অ্যাশওয়ার্থ একজন শান্ত স্বভাবের স্কুলশিক্ষক। শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ পর্ব দিয়ে জীবনের রুঢ় বাস্তবতার সাথে তার পরিচয় হয়। সমাজ, সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণার মাঝে সে নির্মাণের পথ খুঁজে পায় একটি ফুটবল ক্লাবে। পৃথিবী যেমন সূর্যের চারপাশে ঘোরে ঠিক তেমনই পলের জীবন ঘুরতে থাকে আর্সেনালের সঙ্গে। স্কুলেই একদিন দেখা হয় সারা হিউজের সাথে, শুরু হয় তাদের গভীর প্রণয়। কিন্তু, একটা সময় পর পলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ আর্সেনালকেই সতিনের মতো মনে হতে থাকে সারার। সারা আবিষ্কার করে, আর্সেনালই পলের জীবনের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। যখনই সপ্তাহান্ত আসে, পলের সমস্ত পরিকল্পনা আর্সেনালের খেলার সময়সূচির ওপর নির্ভর করে। ছুটি, ডেট, পারিবারিক অনুষ্ঠান—সবকিছু ফুটবলের পরে। সঙ্গত কারণেই সারার মনে হয়, পলের জীবনে পরিবর্তন আনা দরকার। কিন্তু, পলের শৈশব, স্মৃতি, বন্ধুত্ব সবই ওই ক্লাবের সাথে জড়িত ফলে একটা সময় পর তাদের সম্পর্ক ক্রমেই বিচ্ছেদের দিকে ধাবিত হয়।

সিনেমা আর্সেনালের ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যেতে থাকে। পুরো মৌসুম জুড়ে পলের ব্যক্তিগত জীবন এবং আর্সেনালের শিরোপা সংগ্রাম প‍্যারালালি এগোয়। সিনেমার শেষ ক্লাইমেক্সে আর্সেনাল শিরোপা জেতে এবং জোড়া লাগে পলের সাথে সারার সম্পর্ক। এই সিনেমার অনেকগুলো লেয়ার আছে, এতো বিস্তারিতভাবে সিনেমাটা নিয়ে আলোচনা করলাম কারণ, একজন ফ‍্যান হিসেবে এই সিনেমাটা আমি অসম্ভব রিলেট করেছি।

প্রস্তুতি নিয়ে যখন আমরা টিভি স্ক্রিনের সামনে একটি ম্যাচ দেখার জন্য বসি, যখন নব্বই মিনিট দাঁত দিয়ে কেটে ফেলি হাতের সমস্ত নখ, যখন এসি রুমে বসেও দরদর করে ঘেমে যাই, যখন চিৎকার দিয়ে উঠি, যখন ক্রোধে গালাগাল দিই, যখন মনে হয়, এই ম‍্যাচ জিতলে জীবনে আর কিছুই লাগবে না, যখন মনে হয়, হেরে গেলে বৃথা হয়ে যাবে এ জীবন—তখন অনুভব করি, ফুটবল শুধু খেলা নয়, তারচেয়েও বেশি কিছু।

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের কথা, বয়স আর তখন কত ৬-৭ হবে হয়তো… পৈত্রিক সূত্রে তখন আমি ব্রাজিল সাপোর্টার। আর্জেন্টিনা টিমে তখন ওর্তেগার যুগ চলছে… ম‍্যারাডোনা তখন সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া সূর্যের আলো… বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোল করলেন ড‍্যানিস বার্গক‍্যাম্প (আর্সেনাল ফ‍্যান হওয়ার কারণে যে ভবিষ্যতে আমার অন্যতম প্রিয় ফুটবলার হবেন)। আর্জেন্টিনা বিদায় নিলো।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। শুরুটা ঠিক কবে মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে তখনও আমি ফুটবলের জিয়োগ্রাফি তেমন বুঝতাম না। দুই, একজন প্লেয়ারের নাম হয়তো জানতাম তবে তেমন চিনতামও না। ধরা যাক, ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের কথা, বয়স আর তখন কত ৬-৭ হবে হয়তো… পৈত্রিক সূত্রে তখন আমি ব্রাজিল সাপোর্টার। আর্জেন্টিনা টিমে তখন ওর্তেগার যুগ চলছে… ম‍্যারাডোনা তখন সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া সূর্যের আলো… বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোল করলেন ড‍্যানিস বার্গক‍্যাম্প (আর্সেনাল ফ‍্যান হওয়ার কারণে যে ভবিষ্যতে আমার অন্যতম প্রিয় ফুটবলার হবেন)। আর্জেন্টিনা বিদায় নিলো। আশপাশের অনেক পরিচিত মানুষের চোখে জল, এমন ছলছল চোখের দিকে তাকিয়েই হয়তো আমি নিজের অজান্তেই আর্জেন্টিনার প্রেমে পড়লাম। এরপরে এলো জেনেত্তি, ভেরন, আইমার, ক্রেসপো, বাতিস্তুতার যুগ। বাতিগোল করে করেই তখন আমাদের পাগলপ্রায় অবস্থা… এবার নিশ্চয়ই কিছু হবে… কিন্তু যা হলো, তা তো কল্পনাতীত বিষয়… গ্রুপ অব ডেথ থেকে মাত্র একটি জয় নিয়ে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ল আর্জেন্টিনা! মন ভেঙে গেল। ব্রাজিলের তখন স্বর্ণযুগ। লুসিও, রবার্তো কার্লোস, রোনালদিনহো, গিলবার্টো সিলভা, রিভালদো, রোনালদো—কী বিধ্বংসী দল! ৭ ম‍্যাচ জিতে রেকর্ড ৫ বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো ব্রাজিল। ব্রাজিল সমর্থক বন্ধুদের টিটকিরির সাথে ছিল কী দারুণ প্রলোভন, এখনই সময় চলে আসো হলুদ পতাকাতলে। ম‍্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের লেজেন্ড এরিক ক‍্যান্টনা বলেছিলেন, ‘You can change your wife, your politics, your religion. But never, never can you change your favorite football team.’ ঠিক ওই সময়, ওই অল্প বয়সে এই কথা আমি কিন্তু শুনিনি, জানতামও না… তবে, ডিপ ইনসাইড আমি জানতাম, মরে গেলেও এই দল ছাড়ব না। কোথা থেকে এতো ভালোবাসা জন্মেছিল, কে জানে!

আবার ৪ বছরের অপেক্ষা। এলো ২০০৬ সাল। তখন রিকুয়েলমের যুগ, তাকে আমরা জাদুকর বলেই জানতাম। সঙ্গে আয়লা, ক্রেসপো, তেভেজ। মেসি সর্বকনিষ্ঠ আর্জেন্টাইন প্লেয়ার হিসেবে মাঠে নামল, গোল করল সার্বিয়ার বিপক্ষে। আক্রমণাত্মক, পজিশন বেইসড ফুটবল খেলে গ্রুপ অব ডেথ থেকে টপ পজিশন নিয়ে গেল সেকেন্ড রাউন্ডে। আমাদের মনে হলো, এবার হবে, হবেই… কিন্তু হলো না। মেসিকে নামালেনই না পেকারম‍্যান। স্বাগতিক জার্মানির বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে পেনাল্টি শুট আউটে হেরে বাদ পড়ল আর্জেন্টিনা। আমরা কাঁদলাম আবারও।


messi-maradona

২০১০ সালের বিশ্বকাপে মেসি ও ম্যারাডোনা


২০১০ বিশ্বকাপের স্মৃতি অবশ্য বিস্মৃতির পথে হাঁটবে না কখনও। ফুটবলের ছলাকলা তখন বেশ ভালোই জানি। আমাদের স্বপ্নের অতিমানব তখন ডাগআউটে… স্টার প্লেয়ারে স্কোয়াড থইথই করছে… এতো দারুণ দল দীর্ঘদিন পায়নি আর্জেন্টিনা। হেইঞ্জ, ওটামেন্ডি, মাশ্চেরানো, ডি মারিয়া, ম‍্যাক্সি রদ্রিগেজ, পাস্তোরে, হিগুয়েইন, তেভেজ, আগুয়েরো, মিলিতো, মেসি—হোয়াট অ‍্যা টিম! গ্রুপ পর্বে সব দলকে উড়িয়ে সেকেন্ড রাউন্ডে গেল আর্জেন্টিনা। হিগুয়েন হ‍্যাট্রিক করল। মনে পড়ে, রাউন্ড অব সিক্সটিনে আমরা জিতেছিলাম হেসেখেলে! তারপর আবারও জার্মানি, আবারও কোয়াটার ফাইনাল। বড়ো পর্দায় খেলা দেখতে গেলাম উত্তরার আজমপুর মাঠে। হাজার হাজার লোক। গায়ে জার্সি পরে, দাঁড়িয়ে ছিলাম খোলা আকাশের নিচে। চোখের সামনে দেখলাম ভেঙে পড়ছে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স… চোখের সামনে দেখলাম, ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের স্বপ্নপুরুষের পাগলামি… দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো… মনে পড়ে!

২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করেছিল ফাইনাল ম‍্যাচে। ১৯৯০ সালের পর আর্জেন্টিনার সেরা পারফরম্যান্স ছিল ওই বিশ্বকাপেই… পুরো টুর্নামেন্টে ডিফেন্সিভ ডিসিপ্লিনকে অন‍্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলেছে প্রচুর অ‍্যাগ্রেশন নিয়ে… হিগুয়েন মিস করল, সিটার মিস করল প‍্যালাসিওস… তারপর এক্সট্রা টাইমে গোটজের অবিশ্বাস্য গোল। মনে পড়ে, তখন রোজা শুরু হয়েছে… আমরা তখন থাকি মালিবাগে… একটি মেসে। আমার রুমমেট সিয়াম ব্রাজিল সাপোর্টার… সেহেরি খেতে বসেছি একসাথে, গোটজে গোল করল, আমি আর একটা ভাতও মুখে তুলতে পারলাম না, চোখ থেকে কখন গড়িয়ে পড়ল জল টেরও পেলাম… ভাতের থালা ভরে গেল জলে। আমার ব্রাজিল সাপোর্টার বন্ধু আমাকে বুকে টেনে নিলো, সান্ত্বনা দিলো; কিন্তু হায়, ওই পরাজয়ের কষ্ট লাঘব হলো না কিছুতেই!

২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলো মেসি। মেসি, যাকে দেখে মনে হতো আমাদের মেসিয়াহ, যে আমাদের দুঃখ মুছে দেবে… যে আমাদের এনে দেবে স্বপ্নের দিন। টানা ৩ টি ফাইনাল হেরে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা… আমাদের অনেকের মতো মেসিরও হয়তো মনে হয়েছিল, আর হবে না। দুঃখ, সে তো সকলেরই হয়! সকলের অনুরোধে ফিরে এলো মেসি কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি। ২০১৮ সাল নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। ভয়ংকর বাজে ডিফেন্স এবং সাম্পাওলির এলোমেলো স্কোয়াড সিলেকশন দেখে মনে হচ্ছিল, যেকোনো সময় পিছলে যাবে পা। হলোও তাই। দ্বিতীয় রাউন্ডেই ছিটকে গেলাম টুর্নামেন্ট থেকে।


Mesi 1

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পরে ট্রফি হাতে লিওনেল মেসি


ভাগ্য বদলালো ২০২১ সালে। কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হলাম আমরা। অনেক বছর পর, অনেক খরার শেষে যেন বৃষ্টি এলো। তারপরের ইতিহাস তো সকলেরই জানা। বিশ্বকাপ জিতল আর্জেন্টিনা, ফাইনালের শেষে পিটার ড্রুরি বললেন, ‘Lionel Messi has conquered his final peak. Lionel Messi has shaken hands with paradise. The little boy from Rosario, Argentina… has just pitched up in heaven. He climbs into the pantheon. The debates about the GOAT can finally rest…’ সেদিন খেলা দেখতে গিয়েছিলাম, বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে, বড়ো পর্দায়… শেষ পেনাল্টির পর এমনভাবে পুরো মাঠে দৌড়েছিলাম যেন আমি এক বদ্ধ উন্মাদ… কখন, কার সাথে ধাক্কা লেগে ফেটে গিয়েছিল ঠোঁট—টেরও পাইনি। ওই রক্তে তখন লক্ষ প্রদীপ জ্বলছিল… কোনো অন্ধকার, কোনো ব‍্যথা তখন গ্রাস করতে পারেনি মন। সেদিন লিওনেল মেসির সাথে আমরাও যেন পেয়েছিলাম স্বর্গের দেখা।

মেসির জন্য আমরা ঝগড়া করেছি অসংখ্যবার, প্রিয় বন্ধুর সাথে মুখ দেখাদেখি বন্ধ রেখেছি মাসের পর মাস, মেসির জন‍্য গালাগাল করে নিজের তৈরি ফুটবল গ্রুপ থেকে নিজেই ব‍্যান হয়েছি… মেসির সাথে আমি কেঁদেছি, মেসির সাথে আমি বড়ো হয়েছি। জীবনের অনেক বিষাদময় রাতে আমার দু’দন্ড শান্তি দিয়েছে ফুটবল, মেসি, আর্জেন্টিনা, আর্সেনাল। অসংখ্য রাত আমাকে ঘুমাতে দেয়নি পরাজয়। কিন্ত, আমি ভোরের অপেক্ষা করেছি, প্রত‍্যেক সপ্তাহে বসেছি টিভি সেটের সামনে, নতুন জার্সি গায়ে দিয়ে বসেছি প্রত‍্যেকবার।

২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর মনে হয়েছিল, Pursuit of Happiness সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপের কথা, ‘This part of my life… this little part… is called happiness.’ ফুটবল আমাকে সুখের সন্ধান দিয়েছে, ফুটবল আমাকে দেখিয়েছে দুঃখের প্রকৃত স্বরূপ। আজ আমি জানি, ফুটবল শুধু খেলা নয়, Football is life, football is serious!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২ ডিসেম্বর, ১৯৯১; বরিশাল। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় স্নাতক। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বই : মৃত্যুর মতো বানোয়াট  [কবিতা; ২০১৭] থাকে শুধু আলেয়া  [কবিতা;২০১৯], হিম বাতাসের জীবন  [গল্প ;২০২০], উদাসীনতা, সঙ্গে থেকো; [উপন্যাস; ২০২১] ই-মেইল : dhrubonahid@gmail.com

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।