শুক্রবার, জুন ১২

আমরা এবং এআই : দ্বিতীয় পর্ব : এআই যুগে ক্লাসিক সাহিত্য

0

ক্লাসিক বা ধ্রুপদী শব্দটা শুনতেই কেমন যেন পুরোনো পুরোনো লাগে। ক্লাসিক সাহিত্য হলো সেই বৃদ্ধ যার চলন দ্রুত গতির নয়, বয়সের ভাড়ে সে ন্যুজ। কিন্তু অভিজ্ঞতায় সে ঋদ্ধ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে ক্লাসিক। ক্লাসিক শব্দটা বাংলা ‘ধ্রুপদী’। কবি ও প্রাবন্ধিক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এই ধ্রুপদী শব্দটি উপহার দেন। অনেকে ক্লাসিককে চিরায়ত বলেন। মানে চিরকাল ধরে যা টিকে থাকবে বলে ধারণা করা হয়। একদিকে যদি বলি সমকালীন সাহিত্য, তার উল্টোপিঠে দাঁড়িয়ে থাকবে ক্লাসিক সাহিত্য। এটা ঠিক যে, সমকালেই কোনো কোনো লেখকের জীবিত কালেই তার কোনো কোনো লেখা ক্লাসিক হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রশ্ন করেন, ‘আজি হতে শতর্বষ পড়ে কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতুহল ভরে’ তখন কোথায় যেন একটা ইঙ্গিত রয়ে যায়, যে তিনি ক্লাসিক হবে, ধ্রুপদী কাল, চিরায়ত কাল ধরে তার সাহিত্যকে অগণন অচেনা পাঠক পাঠ করবে, চর্চা করবে। ইতালির লেখক ইতালো ক্যালভিনোর একটা কথা অনুবাদ করে দিচ্ছি, ‘একটি ক্লাসিক হলো সেই বই, যা কখনও তার পাঠকদের সঙ্গে যা কিছু বলার তা বলতে কখনোই ক্লান্ত হয় না’ (হোয়াই রিড ক্লাসিকস্)। ক্লাসিক সাহিত্য এক অক্লান্ত সাহিত্য যা সময়কে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকে।

প্রিয় পাঠক, আপনারা জানেন, আমার এক ঠ্যাটা বন্ধু, এআই যুগে সাহিত্য টিকবে না বলে নানা মত দিয়েছিল। তার সেই সব মত আমাকে উপকৃত করেছিল। আমি বিষয়টা নিয়ে ভাবি এবং তা নিয়ে একটি লেখাও তৈরি করি। আপনারা কেউ কেউ পড়েছেন সে লেখা। কিন্তু নিশ্চিত জানি, আমার বন্ধুটি সেই লেখা পড়েনি। কারণ ফেসবুক আর মোবাইল পড়েই তার জ্ঞানার্জন হয়। তো, সেই বন্ধুই এসে মোক্ষম প্রশ্ন করল, আরে তুই আছি বই পড়া নিয়ে, মানুষ কি আর বই পড়বে? বই পড়ার দরকার নেই, শর্টকার্ট সামারি দিয়ে দিচ্ছে নানা অ্যাপ। আর ক্লাসিক? কে যাবে তলস্তয়, দস্তয়ভস্কির ওইসব মোটা মোটা বই পড়তে? তবে না পড়লেও বইগুলো কিনবে। ওগুলো সাজিয়ে রাখার মধ্যে একটা ভাব আছে। বন্ধুর এই মনোভাবের পরই মনে হলো, এআই-এর এই যুগে মানুষ কেন ধ্রুপদী সাহিত্য পড়বে, আদৌ কোনো বই পড়বে কি না তা নিয়ে একটু ভাবা যাক। সেই ভাবনা থেকেই এই লেখা।

ইংরেজি ‘ক্লাসিক’ শব্দটি এসেছে লাতিন classicus থেকে, যার অর্থ ‘সর্বোচ্চ শ্রেণির।’ সাহিত্যে ক্লাসিকের অর্থ কেবল কোনো পুরোনো বা মর্যাদাপূর্ণ রচনা নয়, বরং এমন এক সৃষ্টি যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে মানুষের সার্বজনীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে কথা বলে। টিএস এলিয়ট বলেছিলেন, একটি সভ্যতা পরিপক্ক হলেই ধ্রুপদীর আবির্ভাব হতে পারে (A classic can only occur when a civilization is mature.) অর্থাৎ ক্লাসিক তখনই জন্ম নেয়, যখন কোনো সভ্যতা নিজেকে ও তার অতীতকে বুঝতে শেখে।

আর গ্যোথে ক্লাসিক প্রসঙ্গে বয়ান করেছিলেন, ধ্রুপদী হলো স্বাস্থ্যকর আর রোমান্টিক হলো অসুস্থ। (Classic is healthy, romantic is sick.) এখানে অবশ্য বলা দরকার, গ্যোথে নিজে ছিলেন রোমান্টিক যুগের সাহিত্যিক। রোমান্টিসিজমের অন্যতম প্রণেতার ভাষায়, ক্লাসিক সাহিত্যের প্রাণশক্তি তার ভারসাম্য ও পরিপূর্ণতায়। একটি ক্লাসিক তাই অতীতের নিদর্শন নয়; এটি যুগের পর যুগ ধরে চলমান এক জীবন্ত সংলাপ।

ভালোবাসা কীভাবে ধ্বংস করে এবং কীভাবে মুক্তি দেয়? উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য কী? মানুষের চিরন্তন ঈর্ষা, লোভ, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো বোধগুলো ক্লাসিককে মহিমান্বিত করে।

ক্লাসিক সাহিত্য টিকে আছে, থাকবে, কারণ এটি আমাদের ভেতরের অপরিবর্তনীয় সত্যগুলো প্রকাশ করে। যে প্রশ্নগুলো সোফোক্লিস বা শেক্সপিয়রকে ভাবিয়েছিল, সেগুলো আজও আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়: ন্যায়বিচার কী? ভালোবাসা কীভাবে ধ্বংস করে এবং কীভাবে মুক্তি দেয়? উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য কী? মানুষের চিরন্তন ঈর্ষা, লোভ, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো বোধগুলো ক্লাসিককে মহিমান্বিত করে।

হ্যামলেট বা মহাভারত পড়তে পড়তে আমরা তাই নিজেদের প্রতিফলন দেখি সেইসব চরিত্রের মধ্যে, যারা হাজার বছর আগে বেঁচেছিল— বা কল্পনায় জন্মেছিল। তাদের আবেগ ও দ্বন্দ্ব আজও আশ্চর্যরকমভাবে আমাদের কাছে পরিচিত ও প্রাসঙ্গিক লাগে। ক্লাসিক তাই চিরন্তন হয়েও সদা সমকালীন।

একলব্যের একনিষ্টতা, রাবনের একগুঁয়েমি, হ্যামলেটের দ্বিধা, দেবদাসের সিদ্ধান্তহীনতা আমাদের আজও আলোড়িত করে। আদতে, প্রত্যেক সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে সেই গল্প ও ধারণার ওপর, যা তার আগে এসেছে। ক্লাসিক রচনাগুলো রচিত হয় সেই গভীর মাটিতে যেখান থেকে আধুনিক শিল্প, রাজনীতি ও দর্শন বেড়ে উঠেছে। আপাতভাবে মনে হতে পারে, ক্লাসিক সাহিত্য মানে তো পুরোনো কথা। কিন্তু ক্লাসিক পুরোনো হলে তার পূর্ণ কলস শূন্য হয় না কখনও। ক্লাসিকের বয়স যাই হোক সে আদতে আধুনিক কোনো এক চিন্তার শেকড় থেকেই বেড়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করে বলি—

 

‘পুরানো জানিয়া চেয়ো না আমারে ………….. আধেক আঁখির কোণে অলস অন্যমনে।
আপনারে আমি দিতে আসি যেই ……………. জেনো জেনো সেই শুভ নিমেষেই
জীর্ণ কিছুই নেই কিছু নেই, ………………… ফেলে দিই পুরাতনে॥

আপনারে দেয় ঝরনা আপন ত্যাগরসে উচ্ছলি—
লহরে লহরে নূতন নূতন অর্ঘ্যের অঞ্জলি।’

 

ক্লাসিক শিল্প-সাহিত্য তাই অনন্ত ঝর্ণার জলধারা। এ জলধারা ছাড়া আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন হবে শিকড়হীন— যেন মাটিহীন এক অরণ্য।

প্লেটো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা দান্তের ধ্রুপদী সাহিত্য পড়া মানে হলো, আমাদের নৈতিক ও নান্দনিক সংবেদন কোথা থেকে এসেছে তার মুখোমুখি দাঁড়ানো। তাই, ক্লাসিক শুধু সাহিত্য নয়। মানুষের জীবন আর সভ্যতার এক দলিল।

এ এমন এক ধরনের ঐতিহাসিক সাক্ষর— এমন এক সচেতনতা যা আমরা এক বিশাল ও জটিল চিন্তার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে পেয়েছি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহমান চিরন্তন ক্লাসিকের সুধা পান করে সুকুমার মানব হয়ে ওঠে।

আমরা যতো আধুনিকই হই না কেন ধ্রুপদী বা ক্লাসিকের চর্চা হলো শেকড়ে ফিরে যাওয়া। আর শেকড়টা মজবুত হলেই আধুনিকতার বৃক্ষটি তরতাজা হবে।

এই শেকড় শক্ত করা সহজ নয়। গভীর মনোনিবেশ আর একাগ্রতায় ধ্রুপদী সাহিত্য পড়তে হয়। ক্লাসিক সুলভ বা সহজ নয়। তা পাঠ করতে সময় ও স্থিরতা লাগে। এই সময় আর স্থিরতাটুকু দিলে ক্লাসিক কখনোই নিরাশ করে। ক্লাসিক সাহিত্য তাত্ক্ষণিক তৃপ্তিকে প্রতিরোধ করে— মনোরঞ্জন তার কাজ নয়। ডিজিটাল যুগের সোস্যাল মিডিয়া কিংবা এফটিপি সার্ভার কিংবা জেমিনি আপনাকে ক্ষণে ক্ষণে মনোরঞ্জন দেবে, যতোই তৃপ্তি দেবে ততোই পিপাসা বাড়াবে। এরা ক্ষণিক। কিন্তু ক্লাসিক আপনাকে ভাবাবে। সব সময় ভাবাবে।

কোনো কোনো ক্লাসিক সাহিত্যের ভাষা আপাতত দুরূহ, কখনও ঘন, সংহত, কঠিন মনে হবে, ক্লাসিক সাহিত্যের গতি হয়তো কখনও কখনও ধীর, শান্ত মনে হবে। কিন্তু এইখানেই ক্লাসিকের আসল মূল্য। সে আপনার মনোরঞ্জনের চেয়েও, আপনাকে আকৃষ্ট করার চেয়েও গভীর প্রভাব বিস্তার করবে। ক্লাসিক বা ধ্রুপদী সাহিত্য আমাদের ধীরে পড়তে শেখায়, গভীরভাবে ভাবতে শেখায়, জটিলতার সঙ্গে লড়াই করতে শেখায়।

এভাবে তারা গড়ে তোলে এলিয়টের কথিত ‘ঐতিহাসিক বোধ’— সেই চেতনা, যা মানুষকে মানব-অভিব্যক্তির অবিরাম প্রবাহের মধ্যে নিজের অবস্থান চিনতে শেখায়।

মহান সাহিত্য যেমন মস্তিষ্ককে পরিশীলিত করে, তেমনি হৃদয়কেও। এটি আমাদের সহানুভূতি বাড়ায়— কারণ এটি এমন সব জগতে প্রবেশ করায়, যেগুলো আমাদের নিজের জগতের একেবারে বাইরের।

ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের কথায়,
‘The only true voyage of discovery would be not to visit strange lands but to possess other eyes.’

ক্লাসিক আমাদের সেই নতুন চোখ দেয় যা অন্যের জীবন, অন্যের সময়, অন্যের বেদনাকে অনুভব করার ক্ষমতা দেয়। আমরা অমল কিংবা ঈডিপাসের জন্য কাঁদি। আমরা গ্রেগর সামসা কিংবা কুবেরের জীবনকে নিজেদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। ক্লাসিক এই মিলটা ঘটায়, প্রাণে প্রাণে, কালে কালে।

আমার তো মনে হয়, অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল বিভ্রান্তির এই যুগে ক্লাসিক সাহিত্য এক বিপরীত শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। যে অস্থির, গতিময় জীবন আমরা পার করছি সেখানে ক্লাসিক আমাদের ধীরে হাঁটতে শেখাবে, শান্ত হতে শেখাবে। ক্লাসিক মনে করিয়ে দেয়, কেবল নতুনের জন্য নতুন নয়, কেবল চাকচিক্য নয়, আরও গভীর কোনো কিছু আছে এক মানব জীবনের আরাধ্য।

ক্লাসিক আমাদের শেখাবে বিবেচনা, ধৈর্য, আর সহনশীলতার। যে অসহিষ্ণুতা আর সাংস্কৃতিক বিস্মৃতির দিকে আমরা এগুচ্ছি তার থেকে আমাদের নিরত করতে পারবে ক্লাসিক।

আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে মনোযোগই নতুন মুদ্রা, যেখানে লাইক, শেয়ার আর ইমোতে আটকে আছে জীবন, সেখানে একটি ক্লাসিক বই পড়া হতে পারে এক নীরব বিদ্রোহ।

দুনিয়া এখন ভাবার চেয়ে দ্রুত স্ক্রল করে; গল্পগুলো সংকুচিত হয়ে যায় ত্রিশ সেকেন্ডের রিল-এ; ভাষা বেঁকে যায় ক্যাপশনের সীমার মধ্যে। মনের চেয়ে দ্রুত আঙুল চলে আমাদের। লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের খাঁচা বন্দি মোবাইল জীবন থেকে হাঁফিয়ে উঠলে ক্লাসিক দিতে পারে শান্তি। সেই শান্তি যা জীবনানন্দ পেয়েছিলেন বনলতা সেনের কাছে—

 

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

 

এই তাৎক্ষণিক ভোগের উন্মত্ততার যুগে ক্লাসিক সাহিত্য শুধু দু-দণ্ড শান্তি নয়, তারচেয়েও বেশি কিছু দিতে পারে। কেননা ক্লাসিক সাহিত্য একই সঙ্গে— সমাহিত, শান্ত, সত্য, এবং জীবন্ত। একজন হ্যামলেট, এগামেনন, রোমিও, নিতাই, পার্বতী, হেলেন, বনলতা সেন কিংবা অপু, দুর্গা, কুবের, কুসুমের মতো ধ্রুপদী চরিত্ররা পিয়াসী পাঠকের অপেক্ষায় থাকে—

 

এ গান যেখানে সত্য
অনন্ত গোধূলিলগ্নে
সেইখানে
বহি চলে ধলেশ্বরী;
তীরে তমালের ঘন ছায়া;
আঙিনাতে
যে আছে অপেক্ষা ক’রে, তার
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।

 

সেই প্রেয়সীর মতোই ক্লাসিক সাহিত্য অপেক্ষা করবে, মহাকালের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে মগ্ন পাঠকের আশায়। আর যে পাঠক অবগাহন করবে ক্লাসিকের অববাহিকায় তার জীবনবোধ ও চিন্তা চেতনায় আসবে এমন এক অলৌকিক ক্ষমতা, যখন সে যে জীবনের দোয়েলের, ফড়িংয়ের তার অনুসন্ধান করতে পারবে। কারণ ধ্রুপদী কোনোদিন বুড়ো হয় না, পুরোনো হয় না, সে চিরন্তন, অনন্ত। ক্লাসিক খৈয়ামের অনন্ত যৌবনা বই—

‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা— যদি তেমন বই হয়।’ ক্লাসিক তেমনই বই যা আজকেও বাংলাবাজারে, নীলক্ষেতে ছাপা হচ্ছে। ভাবা যায, কোথাকার এরিস্টটল, গ্যোথে, শেকসপিয়র, কাফকা এই ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝকঝকে নতুন সব মলাটে আর বাঁধাইয়ে! এই তো ক্লাসিকের শক্তি।

আমি মনে করি, ক্লাসিক শিল্প-সাহিত্য আদতে টাইম মেশিন। যাতে চড়ে আমরা চলে যাই সময়ের যেকোনো পলে, প্রহরে। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ বা ‘পথের পাঁচালী’ পড়া মানে হলো সেই সময়কেই পুনরুদ্ধার করা এবং এই সময়কে উপলব্ধি করা।

এই সোস্যাল মিডিয়ার লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের অবিরত ‘আপডেটেড’, ‘নোটিফিকেশনের’ চাপ থেকে দূরে রাখে ক্লাসিক আর ক্লাসিক পড়ে আমরা সত্যিকারের ‘অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ’ হই। ক্লাসিকরা কখনও ক্লিকের জন্য প্রতিযোগিতা করে না; তারা অপেক্ষা করে চিন্তাশীল পাঠকের জন্য।

ক্লাসিকের দায় নেই ‘ভাইরাল’ হবার— বরং সে অটল, স্থির হিমালয়। সংবেদনশীল, সচেতন মানুষের দায় আছে সেই হিমালয় অভিযানে যাবার।

সত্যি কথাটি হলো, মহিমান্বিত ক্লাসিকের কাছে আপনাকে যেতে হবে, যেমন আপনি গহন অরণ্যে, সুবিশাল সমুদ্রে বা উচ্চতম পর্বত শিখরে যান। তারা আপনার কাছে আসে না, আপনি যাবেন তাদের কাছে। ‘আরণ্যক’, ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘সিংহল সমুদ্র’, ‘মালয় সাগর’ আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমরা কি যাবো না ধ্রুপদি অরণ্যে, সমুদ্রে, পাহাড়ে?

হে বন্ধু আমার, আজকের দিনে তাই বারবার আমাদেরকে ক্লাসিকের কাছেই ফিরে যেতে হবে। কারণ, ক্লাসিক সাহিত্য নস্টালজিয়ার বিষয় নয়; এটি আরও গভীরতর বিষয়। এটি সংরক্ষণ করে মানব চেতনার দলিল— তার যন্ত্রণা, বিস্ময়, ও নৈতিক অনুসন্ধান।

আজকের যা ভাইরাল, তা উজ্জ্বলভাবে জ্বলে উঠে এবং দেশলাই কাঠির মতো দ্রুত নিভে যায় আর চিরন্তন যে ক্লাসিক, তা যেন শিখাঅনির্বাণ। সে আলো ছড়িয়ে দেয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেতনাকে গড়ে তোলে। হে বন্ধু আমার, আজকের দিনে তাই বারবার আমাদেরকে ক্লাসিকের কাছেই ফিরে যেতে হবে। কারণ, ক্লাসিক সাহিত্য নস্টালজিয়ার বিষয় নয়; এটি আরও গভীরতর বিষয়। এটি সংরক্ষণ করে মানব চেতনার দলিল— তার যন্ত্রণা, বিস্ময়, ও নৈতিক অনুসন্ধান।

ক্লাসিক পড়া মানে হলো অতীতের সঙ্গে কথা বলা, বর্তমানকে বুঝবার জন্য, ভবিষ্যতকে গড়ার জন্য। ক্লাসিক শুধু বই নয়, এটা ঠিক আমরা অধ্যয়ন করি; পাঠ করি; কিন্তু আদতে ওরাই আমাদেরকে অধ্যয়ন করে, ধারণ করে। ক্লাসিক হলো সেই আয়না যা আমাদের মুখের রূপ ও খুঁত তুলে ধরে অকপটে।

আর এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায়, ক্লাসিকগুলোই মনে করিয়ে দেয়— স্থায়িত্বের মানে কী। তাই বলি বন্ধু, ক্লাসিক দরকারি, আজকের দিনেও তা দরকারী। কারণ তা আমাদের নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বর এক জগতের খোঁজ দেয়।


মুম রহমানের ধারাবাহিক : আমরা এবং এআই : প্রথম পর্ব

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

মুম রহমান একজন লেখক। সার্বক্ষণিক এবং সর্বঅর্থে লেখক। যা করেন লেখালেখির জন্য করেন। গল্প, নাটক, কবিতা, অনুবাদ, বিজ্ঞাপণের চিত্রনাট্য, রেডিও-টিভি নাটক, সিনেমার চিত্রনাট্য, প্রেমপত্র-- সব কিছুকেই তিনি লেখালেখির অংশ মনে করেন। রান্নার রেসিপি থেকে চিন্তাশীল প্রবন্ধ সবখানেই তিনি লেখক।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।