বন্ধু, তবে কি ধান, গম ভাঙানোর মতো সাহিত্যচর্চাও হয়ে যেতে পারে?
এমন প্রশ্ন করল এক বন্ধুজন। যে বন্ধু সাহিত্যচর্চা নিয়ে হঠাৎ এতো চিন্তিত হয়ে গেল, তার সাহিত্যের দৌঁড় কিন্তু ফেসবুক পর্যন্ত। তার হিসেবে যার যত ফলোয়ার, যে যত চলতি ঘটনা নিয়ে লিখে বেশি শেয়ার পায় সেই বড়ো সাহিত্যিক। তো এমন বন্ধুও আজকাল সাহিত্য নিয়ে চিন্তিত হচ্ছে। কিন্তু ওর চিন্তার গোড়া ধরে একটু নাড়া দেয়া দরকার।
আমি শান্ত স্বরে বললাম, কী বোঝাতে চাইলি?
আরে ভাই, চাল বা আটা ভাঙাতে গেলে কী হয়? মেশিনে আস্ত চাল, আটা, মশলা দিয়ে দিলেই সেটা সে গুড়া করে দেয়। আমরা রেডিমেড মশলা, আটা, চালের গুড়া, বেসন পেয়ে যাই। এখন কী দেখছি? এআই-এর নানা সফটওয়্যারকে মৌলিক তথ্যাদি দিলেই সে গল্প, কবিতা, নাটক এমনকি উপন্যাসও লিখে দিচ্ছে।
আমি আবার বললাম, চিন্তার কথা।
দেখ, চ্যাটজিপিটিকে একটা বিষয় দিলে বা দুচারটা লাইন দিলেই সে একটা পূর্ণাঙ্গ কবিতা লিখে দিচ্ছে। শুধু কবিতা নয়, চাইলে সে গল্প, একাঙ্কও লিখে দিচ্ছে। বাংলাদেশেই বছর খানেক আগে এআই দিয়ে লেখা উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। সেটা নিয়ে প্রকাশক গর্বও করেছে যে এআই দিয়ে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস তারাই ছেপেছে।
হুম শুনলাম, নোবেল বিজয়ী পোলিশ লেখিকা ওলগা তোকারচুক সাম্প্রতিককালে স্বীকার করেছেন তিনি তার নতুন উপন্যাস রচনায় চ্যাটজিপিটি’র সহযোগিতা নিয়েছেন। এখন বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়াতে অনেকেই এআই-এর সহযোগিতায় গল্প-কবিতা লিখছেন। কিন্তু সহযোগিতা নিলে দোষ কী বল তো?
প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তরটা বিস্তৃত। এতো বিস্তৃত কথার সময় কারো নেই। মানুষ শুনতে চায় না, জানতে চায় না, তবে বলতে চায়। অতএব বন্ধুকে বলার সুযোগ করে দিলাম। বললাম, তুইই বল, এখন আমরা কী করব?
আমার এ কথায় বন্ধু ক্ষেপে গেল, রীতিমতো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, আরে, প্রশ্নটা হচ্ছে এআই-এর যুগে এসে প্রকৃত সাহিত্য কি হুমকির মুখে পড়বে? মানুষ কি এখন মোবাইলে, ল্যাপটপে টাইপ করতে জানলে, এইআই-কে প্রম্পট দিতে পারলেই লেখক হয়ে যাবে?
প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তরটা বিস্তৃত। এতো বিস্তৃত কথার সময় কারো নেই। মানুষ শুনতে চায় না, জানতে চায় না, তবে বলতে চায়। অতএব বন্ধুকে বলার সুযোগ করে দিলাম। বললাম, তুইই বল, এখন আমরা কী করব?
বন্ধু বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ পেল। আমি চায়ের কাপে মন দেয়ার সুযোগ পেলাম। তার কোনো কথাই কানে ঢোকালাম না। আমার একটা অটো মুড সিসটেম আছে। কেউ বকবক করতে থাকলে আমি আস্তে করে কানটা বন্ধ রাখি, একদৃষ্টিতে তার দিয়ে তাকিয়ে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাবতে থাকে। সামনের বা পাশের লোকটি কিচ্ছু ধরতে পারে না। এতে যেটা উপকার পাওয়া যায়, নিজের চিন্তায় ডুব দেয়া যায়। মানুষকে যেমন স্নান করতে হয়, তেমনি নিজের চিন্তায়ও ডুব দিতে হয়। তাতে সতেজতা বাড়ে।
বন্ধুর তেজময় বক্তৃতা চলছে। সেগুলো সবই চলতি প্রশ্ন। সে সুযোগে আমি বরং সাহিত্যে সহি তত্ত্বের দিকে একটু ঘুরে আসতে পারি। সে তত্ত্ব বলতে আমি অবশ্য নানা রকম মতবাদ আর ইজমের জটিলতায় যাই না। বরং, খুব সরল একটা প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে থাকি।
সাহিত্য কী এবং সাহিত্য কেন?
এ বিষয়ে অনেকের অনেক মত আছে। কিন্তু আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমি মনে করি, সাহিত্য হলো মানুষের চিন্তার চর্চা করা, আর সেই চর্চাটা হবে মানুষের কাছে পৌঁছানো ভাষার মাধ্যমে। অর্থাৎ আমার কাছে সাহিত্য হলো মানুষের চিন্তা ও তার প্রকাশের যথার্থ ভাষা। সেই ভাষার উপরেই গদ্য, পদ্য নির্ধারিত। অন্যদিকে আমি যদি বলি, সাহিত্য কেন? তবে তার উত্তরটাও সহজ। মানুষকে চিন্তাকে কালে কালে অগ্রসর করা। মানুষের চিন্তাকে ধরে রাখা। এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতায় তার চিন্তাকে নিয়ে যাওয়া। মোদ্দা কথা, সাহিত্য কী এবং কেন— তার প্রয়োজন দুটো মৌলিক প্রশ্নের উত্তরে মানুষই প্রধান। মানুষ ছাড়া শিল্প-সাহিত্য-সভ্যতা সবই অর্থহীন। অন্য কোনো প্রাণীর সাহিত্য নেই, শিল্প নেই, সভ্যতাও নেই। কাজেই এইআই অর্থাৎ আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স যা কিছু করছে তা মূলত যন্ত্র সভ্যতার একটা অংশ। যন্ত্র সভ্যতার একটা চূড়ান্ত বিস্তারের অংশ হিসেবে মানুষের অনেক তথ্য বা ডেটাকে সহজে বিশ্লেষণ এবং সেই বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া হিসেবে এই আই গল্প-কবিতা-চিত্রকর্ম তৈরি করছে। তা কোনোভাবেই মানুষের তৈরি সুকুমার কার্যক্রমের (সাহিত্য, সিনেমা, চিত্রকলা ইত্যাদির) বিকল্প হবে না, সহযোগী হতে পারে। যার নামই আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স সে কীভাবে মৌলিক চিন্তা-চেতনার শিল্প সাহিত্য তৈরি করবে?
প্রসঙ্গত, বলে রাখা দরকার, সাহিত্য কী, শিল্প কী, সংষ্কৃতি কী ইত্যাদির একরৈখিক কোনো সংজ্ঞা বের করা কঠিন। নানা মুনির নানা মত রয়েছে। এর কারণও এইসব মাধ্যমের বিশাল বৈচিত্র্য। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এতোটাই বহুমূখী ও ব্যাপক যে তার একক সংজ্ঞা বের করা কঠিন। কাজেই সংজ্ঞায়নের দিকে না গিয়ে বরং আমরা খেয়াল করতে পারি, লক্ষণের দিকে। চিকিৎসক যেমন লক্ষণ বিচার করে রোগ ধরেন তেমনি একটি লেখার লক্ষণ বিচার করেই তার সাহিত্য মান-গুণ বিচার করা যেতে পারে।
অতএব শুরুতেই চলুন হাত পাতি, পরম প্রিয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুয়ারে, যিনি একাই আমাদের সাহিত্যবিশ্বের দিগন্তকে ছুঁয়েছেন অমল কলমে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘সাহিত্য মানুষের ভাবের আদান-প্রদানের একটি বিশেষ মাধ্যম’ (সাহিত্য, বিচিত্র প্রবন্ধ)। আরেক স্থানে তিনি বলছেন, ‘ব্যক্তির অনুভূতি যখন কাব্যে প্রকাশিত হয় তখন তা ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে সর্বজনের সম্পদে পরিণত হয়’ (সাহিত্যের তাৎপর্য, সাহিত্যের পথে)। এ দুটো কথাতে মানুষ বা ব্যক্তি যেমন প্রধান্য পেয়েছে তেমনি ভাবের আদান ও অনুভূতির প্রকাশ প্রাধান্য পেয়েছে। অর্থাৎ এটুকু পরিষ্কার হলো যে, সাহিত্য মানুষের ভাব বা ব্যক্তি অনুভূতি আদান প্রদানের একটা মাধ্যম।
এই যে ভাব, অনুভূতি মানুষ তো আদতে যুগে যুগে তাই প্রকাশ করতে চেয়েছে। কখনো তুলিতে, কখনো কলমে, আজকের দিনে কিবোর্ডে, মাউসে। সাহিত্যের লক্ষণ বিচারের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথেরও আগে কাছাকাছি আরেকটা ধারণা পাই উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়াথের (১৭৭০-১৮৫০) রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ম্যানিফিস্টো ‘প্রিফেস টু লিরিকাল ব্যালেড’ প্রবন্ধে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: it takes its origin from emotion recollected in tranquillity’ বাংলায় এমনটা বলতে পারি, কবিতা হলো শক্তিশালী আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্লাবন, আবেগের উৎসকে প্রশান্তির সাথে পুনসংগ্রহ করাই এর কাজ। এখানেও দেখতে পাচ্ছি, ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি ও স্মৃতিকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশই কবিতা বা সাহিত্য। আমাদের বাংলা ভাষার আরেক বহুপ্রজ লেখক বুদ্ধদেব বসু তার ‘কবিতা কী ও কেন’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু শিল্পরূপেই তার সার্থকতা।’ ম্যাথিও আর্নল্ড (১৮৮২-১৮৮৮) অবশ্য আরও আগেই আরেকধাপ এগিয়ে ‘দ্য স্টাডি অব পোয়েট্রি’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘literature is a criticism of life’ অর্থাৎ সাহিত্য হলো জীবনের সমালোচনা। তাহলে আমরা দেখলাম, রবীন্দ্রনাথ থেকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ম্যাথিও আর্নল্ড থেকে বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যকে ব্যক্তিগত অনুভূতি, আবেগ, ব্যক্তির স্মৃতি, ভাব ইত্যাদির সঙ্গে সংযুক্ত করে দেখেছেন। অর্থাৎ ব্যক্তির আবেগ, চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি, ভাব ছাড়া সাহিত্য শেষ পর্যন্ত সহি সাহিত্য হয় না, হবে না।
ভবিষ্যৎ পৃথিবী ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা আসিমভ কিন্তু সাহিত্যকে আরও সরল করে দেখেছেন। তার কথায় সাহিত্য হলো চিন্তার মাধ্যম। আঙুলে কলমই থাক আর কীবোর্ডই থাক, সাহিত্য তা দিয়ে চিন্তাকেই প্রকাশ করে।
আমাদের সময়ের মহৎ লেখক আইজাক আসিমভ বলছেন, ‘আমার কাছে লেখা হলো স্রেফ আঙুলের মাধ্যমে চিন্তা করা।’ আসিমভ যথার্থই এক শতাব্দী এগিয়ে থাকা লেখক। তার অসংখ্য সায়েন্স ফিকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমতা (আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ওরফে এআই) এবং রোবট প্রাধান্য পেয়েছে। এমনকি রোবটের নীতিমালাও তিনি তৈরি করেছেন। ৫ শতাধিক বইয়ের লেখক আসিমভ তার বিশাল লেখনি শৈলীর মাধ্যমে সাহিত্যকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। ভবিষ্যৎ পৃথিবী ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা আসিমভ কিন্তু সাহিত্যকে আরও সরল করে দেখেছেন। তার কথায় সাহিত্য হলো চিন্তার মাধ্যম। আঙুলে কলমই থাক আর কীবোর্ডই থাক, সাহিত্য তা দিয়ে চিন্তাকেই প্রকাশ করে। আর আজকের নিউরোসায়েন্সের বিকাশের দিনে এটা তো বলাই যায়, চিন্তা তো মূলত আবেগ, অনুভূতি, স্মৃতি তাড়িত।
তাহলে এটুকু ধরে নেয়া যেতে পারে যে, সাহিত্যের সারৎসার হলো, আবেগ, অনুভূতি, স্মৃতি, যা ব্যক্তি মানুষের জীবন থেকে সংগৃহীত এবং প্রকাশিত। বিবিধ উদ্ধৃতি বিশ্লেষণ, নামকরা সাহিত্যিকদের আলোচনা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, সাহিত্য সম্পূর্ণতই সৃজনশীল কর্ম এবং তার প্রকাশ মানবিক আবেগ, অনুভূতি, স্মৃতির সঙ্গে সংযুক্ত। আর এটুকু বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ, চোখের ছাপ, জিভের ছাপ এমনকি জিন যেমন আলাদা তেমনি প্রত্যেক মৌলিক লেখকের লেখার ধরন, সাহিত্য ধারণাও আলাদা। অর্থাৎ প্রজাতি হিসেবে মানুষ এক হলেও এই বিশ্বে বর্তমানে ৮০০ কোটি মানুষ আসলে ৮০০ রকমের। এটাই স্বাভাবিক। কারণ মানুষ তো কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তি নয়। কাজেই সাহিত্য একান্তই মানবিক অনুভূতি, স্মৃতি, আবেগ, সত্তার প্রকাশ, সাহিত্য জীবন প্রবাহ। সাহিত্য কোনো যান্ত্রিক ক্রিয়াকর্ম নয়। যদিও সাহিত্য প্রকাশে নানা রকমের যন্ত্রের সহায়তা আজকের দিনে প্রয়োজনীয়।
এবার আসা যাক এআই তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে। এআই হলো মূলত তথ্য নির্ভর। তার কাছে আছে অযুত, নিযুত তথ্য বা ডাটা। ডাটা ধারণের ক্ষমতা মানুষেরও আছে। কিন্তু মানুষ শুধু তথ্য, উপাত্ত দিয়ে সাহিত্য সৃজন করে না। এআই যে কবিতা, গল্প বা নাটক রচনা করে, ইতোপূর্বে লিখে ফেলা কোনো কবিতা, গল্প বা নাটককে বিশ্লেষণ করে করেই। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত কবিতা তার ভান্ডারে আছে তার থেকেই সাহায্য নিয়ে এআই কবিতা তৈরি করতে পারে। নিজে থেকে সে নতুন শব্দ তৈরি করতে পারে না, নিজে থেকে লেখার স্বতন্ত্র ভঙ্গি তৈরি করতে পারে না। এআই-এর সাহিত্য নির্মাণ এক কথায় একটি প্রযুক্তিগত কাজ, সেখানে তথ্যের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হয়, ভাষা বা ভঙ্গিমার অনুকরণ, অনুসরণ হয়।
এইখানটাতেই মানুষের তৈরি সাহিত্য আর এআই-এর তৈরি সাহিত্যের ফারাক। মানুষ যা কিছু তৈরি করে তা তার একান্ত চিন্তা ও অনুভূতির কেন্দ্র থেকে উদ্ভূত। ফলে রবীন্দ্রনাথের মতো করে নজরুল লেখেননি, নজরুলের মতো করে জীবনানন্দ লেখেননি, জীবনানন্দের মতো করে আবুল হাসান লেখেননি, লেখেন না। সত্যিকারের লেখক কেবল তার মতোই লেখেন। একই বাংলা ভাষায় লিখলেও একজন কমলকুমার মজুমদার, সতীনাথ ভাদুড়ি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা শহীদুল জহিরের ভাষা আলাদা করেই চেনা যায়। এদের যে কারো উপন্যাসের একটু অংশ পড়লেই বোঝা যাবে, তারা প্রত্যেকে কতটা নিজস্ব, কতটা স্বতন্ত্র তার ভাব, ভাষা। তাদের বর্ণনা ও প্রকাশভঙ্গি একদমই আলাদা।
এই ব্যাপারটুকু খানিকটা উদাহরণ সহযোগে অধ্যায়ন করা যাক। এতে মানুষের সৃষ্টি সাহিত্য ও তার নিজস্ব মানদণ্ড সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে আশা করি।
কমলকুমার মজুমদার তার ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ উপন্যাসের সূচনা করেছেন এভাবে, ‘আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।’ এই ভাষা ভঙ্গিমা, এই বয়ান একদিকে কাব্যিক, অন্যদিকে ধ্রুপদী। শব্দচয়নে আর ক্রিয়াপদের ব্যবহারের ভিন্নতাও কমলকুমার অন্যদের থেকে একদমই আলাদা।
আবার সতীনাথ ভাদুড়ি ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’ উপন্যাসের সূচনায় লিখছেন, ‘অযোধ্যাজী নয়, এখনকার জিরানিয়া। রামচরিতমানসে এর নাম লেখা আছে “জীর্ণারণ্য”। পড়তে না পারো তো মিসিরজীকে দিয়ে পড়িয়ে নিও। তখনও যা ছিল, এখনও প্রায় তাই। বালিয়াড়ি জমির উপর ছেঁড়া ছেঁড়া কুলের জঙ্গল।’ খানিকটা ধ্রুপদী, খানিকটা লোকজ, খানিকটা গম্ভীর, খানিকটা তীক্ষ্ণতায় সতীনাথও অন্য রকম একটি সাহিত্য ভাষা তৈরি করেন।
আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাস শুরুই করেন আঞ্চলিক সংলাপ দিয়ে, ‘তোমার রঞ্জু পড়ি রইলো কোনো বিদেশ বিভূঁয়ে, একবার চোখের দেখাটাও দেখতি পাল্লে না গো।’
শহীদুল জহির তার ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসের সূচনাটি অবশ্য আরও বেশি নাটকীয়, কিন্তু ভাষা ভঙ্গিটি একান্তই নিজস্ব, ‘উনিশ শ পঁচাশি সনে একদিন লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আবদুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেল পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ফট্ করে ছিঁড়ে যায়। আসলে বস্তুর প্রাণতত্ত্ব যদি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে হয়তো বলা যেত যে, তার ডান পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতে বস্তুর ব্যর্থতার জন্য নয়, বরং প্রাণের অন্তর্গত সেই কারণে ছিন্ন হয়, যে কারণে এর একটু পর আবদুল মজিদের অস্তিত্ব পূনর্বার ভেঙে পড়তে চায়।’
বাংলা ভাষার চারজন লেখকের চারটি উপন্যাসের কেবল সূচনা অংশ খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পারি একই ভাষা, সংস্কৃতির লেখক হয়েও তারা কতটা আলাদা এবং শক্তিশালী। এর মূল কারণ হলো, মানুষ যখন সাহিত্যচর্চা করে তা নিজস্ব আবেগ, অনুভূতি, স্মৃতি, অভিজ্ঞতার আলোকে করে। মানুষও তার লেখায় তথ্য, উপাত্ত ব্যবহার করে, কিন্তু সেটা কেবল যুক্তি বা এলগরিদমের হিসাবে করে না, বরং সেটা করে মানবিক আবেগ, স্মৃতি থেকে। ফলে এআই চাইলে মাঝারি মানের একটি সাহিত্য তৈরিও করতে পারে। কিন্তু সেটুকু তৈরি করতে হলেও, তাকে চলতে হবে একজন মানুষের নির্দেশনা, কল্পনা ও আদেশের প্রেক্ষিতে। কিন্তু মানুষ, এই মহাবিশ্বের মতো অসীম। সে কারো নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকে না। একজন গ্যাটে, রবীন্দ্রনাথ মহাবৈশ্বিক অসীম রহস্যের মতোই অসীম কল্পনা, অনুভবের রহস্যময় ফসল।
কাজেই এআই যুগে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ, ভাব, ধরণের প্রশ্নটি আসলে প্রযুক্তির সীমানায় আটকে থাকে না, বরং তা মানুষের স্বভাব ও অনুভবের অসীম প্রবাহের সঙ্গে গিয়ে মেশে। যে আত্মীয়তা, প্রাণের টান আমি শেক্সপিয়র, জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা চার্লস বুকোস্কির সঙ্গে অনুভব করি, কোনো মেশিন লার্নিং সেই প্রাণের টানকে অনুভব করবে না।
আদতে ভাষা ছিল বা আছে যোগাযোগের মৌলিক প্রয়োজনে। কিন্তু মানুষ তো নেহাত ভাষা ব্যবহার করে না, নেহাত যোগাযোগ করে না, সে বরং অর্থ খোঁজে, অর্থের ভেতরে আরও গুঢ় অর্থ গুঁজে দেয়। নিরন্তর এই অসীম মহাবিশ্ব, এই সৃষ্টিকর্ম, জন্ম, মৃত্যু, ভালোবাসা, আনন্দ, বেদনার ভাষাকে মানুষ বোঝার চেষ্টা করে। দুঃখ, প্রেম, একাকীত্ব, অহংকার, ভ্রম— এই যে সব একান্ত মানবিক অনুভূতি সেগুলোর প্রকাশ হয় সাহিত্যের মাধ্যমে। এআই যত যাই লিখুক, তাকে দিয়ে আপনি যা-ই লিখিয়ে নিন না কেন, মনে রাখতে হবে, তার নিজস্ব প্রাণ নেই, দুঃখ, প্রেম, আনন্দ অনুভূতি নেই। তার কেবল আছে এ সব বিষয়ে তথ্য। সেইসব তথ্যও পূর্ববর্তী মানুষের তৈরি করা বৃহৎ শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের জগত থেকে আহরিত। কাজেই সাহিত্যের যে একান্ত মানবিক এবং মৌলিক দিক তা কখনোই এআই ছুঁতে পারবে না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ প্রবাহমান। আজ থেকে একশ বছর আগের মানুষ আর আজকের মানুষের ভাষা, আবেগ, চিন্তার ধরন— সব বদলে যায়। ভাষা নিজেই নিরন্তর বদলায়। কাজেই মানুষ যতদিন বাঁচবে ততদিন নিজের অভিজ্ঞতায় ভাষাকে, সাহিত্যকেও নতুন নতুন রূপ দেবে।
আরেকটা বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এআই নিজে থেকে সাহিত্যচর্চা করে না। তার সাহিত্যিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা ক্ষুধা নেই, তার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার বেদনাভার নেই। আর মানুষ, যে লেখক না, সাধারণ মানুষ, সেও চিঠি লেখে, দিনলিপি লেখে। কে জানত, ষষ্ঠ শ্রেণী পাশ করা পনেরো বছর বয়সে মরে যাওয়া একজন আনা ফ্রাঙ্কের ডাইরি বিশ্ববিখ্যাত হবে! তার লেখা ‘ডায়রি অব আ ইয়ং গার্ল’ প্রমাণ করে, সাহিত্য মূলত ব্যক্তি মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি আর স্মৃতির ফসল। কোনো রকম সাহিত্যিক কলা কৌশল ছাড়াই এই কিশোরীর লেখা ডায়রি আজ বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। এর কারণ কী?
এর কারণ হলো, এই একটি ডায়রি শুধু সাহিত্য নয়, এটি ইতিহাসের দলিল, যুদ্ধ আর অনিশ্চয়তার বয়ান এবং সবার উপরে মানুষের আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের প্রকাশ।
মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, প্রাণের তাগিদেই। কেউ গান গায়, কেউ ছবি আঁকে, কেউ খেলে, কেউ লেখে, এমনি নানাভাবে মানুষ তার এক জীবনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও আবেগকে পূঁজি করে মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্কটা রিলে রেসের মতো। আমরা রিলে রেসে দেখি একটা কাঠি হাতে একজন দৌঁড়ায়, নির্দিষ্ট সীমার পর আরেকজনের হাতে কাঠিটি তুলে দেয়, সে আবার দৌঁড়ায়। মানব সভ্যতা, মানুষের শিল্প-সাহিত্য এই রিলে রেসের মতো। কোনো সুদূর গ্রিসের কোনো কালের এরিস্টটল, প্লাটো, সক্রেটিস যা বলেন, তার সঙ্গে আজকের এআই যুগের মানুষ সংযুক্ত হয় অদৃশ্য রিলে রেসের কাঠিতে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শক্তি তার কবিতায় যে মরণ বা প্রেমের কথা বলেন, তার সঙ্গে একজন মুম রহমান সংযুক্ত হয়ে যায়। এই অদৃশ্য মানবিক সংযোগ একটা সামগ্রিক স্মৃতি, সত্তা, চেতনাপ্রবাহ তৈরি করে। এই প্রবাহের সঙ্গে এআই-এর সংযুক্তি ততটুকুই যতটুকু তাকে আমরা দিতে পারি। হয়তো একটু মজা করেই বলতে পারি, এআই তুমি যত স্মার্টই হও, মানুষ হবা না কোনোদিন।
মানুষ নিজের ক্ষতি জেনেও আত্মহনন করে, অন্যকে ভালোবেসে প্রাণ দেয়, মুহূর্তের আবেগে দূর্বল মানুষটি বিরাট সাহসী হয়ে যায়, এইসব যান্ত্রিক অস্তিত্ব দিয়ে অনুধাবণ করা যায় না।
তারপরও এআই যে লেখা তৈরি করে দিচ্ছে একজন মানুষের চাহিদা, তথ্য ইত্যাদি দিয়ে তা কোনো কোনো পাঠক পড়বেন। কিন্তু সত্যিকার পাঠকও তো চায় লেখকের নিজস্ব জীবন, লেখকের অভিজ্ঞতা এবং লেখকের চোখ দিয়ে নিজের সময়, সমাজ, সংগ্রামকে দেখতে। সেই দেখাটা একজন মানুষই পারে আরেকজন মানুষের জন্য বয়ান করতে।
যন্ত্র অনেক সময়ই গাণিতিক, কখনোবা নিঁখুত। সেটাই তার কর্মের ধরন। কিন্তু মানুষ ভুল করে, মানুষ ঝুঁকি নেয়, মানুষ ব্যর্থ হয়। মানুষের যে গ্লানি, অপমান, অবমাননা তা কখনো যন্ত্রের কাছে পাওয়া যায় না। ফলে, এআই কেবল তার বিপুল তথ্য ভান্ডার ঘেটে যা তৈরি করে দেয়, তাতে মানবিক ভুল-ত্রুটির চেয়ে যান্ত্রিক কর্মদক্ষতার প্রয়াশই বেশি। মানুষ নিজের ক্ষতি জেনেও আত্মহনন করে, অন্যকে ভালোবেসে প্রাণ দেয়, মুহূর্তের আবেগে দূর্বল মানুষটি বিরাট সাহসী হয়ে যায়, এইসব যান্ত্রিক অস্তিত্ব দিয়ে অনুধাবণ করা যায় না।
তবে কি সাহিত্যের কোনো কাজেই আসবে না এআই? আমার ধারণা, এআইকে যদি ঠিকঠাক ব্যবহার করতে শিখি আমরা তবে বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারের বিপুল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে তাকে কাজে লাগাতে পারি। যেটা সাহিত্যচর্চায় কাজে দেবে। ওলগা তুকারচুকের মতো একজন লেখকের সহায়ক হিসেবে এআই খসড়া কোনো কিছু করে দিতে পারে। কোনো উপন্যাসের একটা প্লট বিভাজন, একটা নাটকের দৃশ্য বিভাজনের মতো কাজে সহায়তা করে দিতে পারে এআই। তবে কোনোভাবেই তার এই মত স্বতসিদ্ধ নয়। সেটাকে যাচাই বাছাই করে নিতে হবে সাহিত্যিককেই।
আমার বিবেচনায় গবেষণা কর্মে, তথ্যসূত্র সংগ্রহে এআই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আগামী দিনে। সাহিত্য কর্মেও এআই প্রভাব ফেলবে এক অর্থে। এআই সৃষ্ট সাহিত্য যদি বাড়ে, তবে সাহিত্যের মানদণ্ডের নতুন মাত্রা তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে সাহিত্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, লেখকের সততা ও স্বকীয়তা অনেক বেশি মূল্য পাবে। আগামীর পাঠক, সাহিত্যের মধ্যে ব্যক্তি মানুষের সংকট, সংকোচ, সম্ভাবনা ও দ্বিধাকেই খুঁজবে। কারণ কোনোভাবেই ব্যক্তি মানুষের আবেগ, অনুভূতির কোনো বিকল্প তৈরি হবে না। সম্পূর্ণ এআই নির্ভর লেখা যদি যথেষ্ট প্রামাণিক হয়ে থাকে, যথেষ্ট নিঁখুতও হয়ে থাকে, তবু মানবিক আবেগকে সে যথেষ্টভাবে ধরতে পারবে না। মানুষ তো দিন শেষে মানুষের মুখ দেখতে যায়, মানুষের স্পর্শ চায় এবং শিল্প-সাহিত্যেও নিজের উপস্থিতি চায়। একটা মহান সাহিত্য দিন শেষে সারা বিশ্বের মানুষকে আলোড়িত করে, নৈকট্য তৈরি করে। এই আলোড়ন, এই নৈকট্য মানবিক স্পর্শের রূপান্তরিত সংযোগ।
যখন ছাপাখানা আবিষ্কার হয়, তখন অনেকে ভেবেছিল সাহিত্য একটা সংকটের মধ্যে পড়বে। সাহিত্যের মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। একসময় টিভি আবিষ্কারের পর অনেকেই ভেবেছিল মানুষ সিনেমা দেখতে হলে যাবে না। তারও আগে সিনেমা আবিষ্কার হলে মানুষ ভেবেছিল থিয়েটার টিকবে না। কিন্তু কালের বিবর্তনে সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, চিত্রকলা সব কিছু রয়ে গেছে বহাল তবিয়তে।
আসলে মাধ্যমের বদল হয়, নতুন প্রযুক্তি আসে, কিন্তু মানুষের শিল্প-সাহিত্য পিপাসা কোনোদিন কমেনি, কমবে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যক্তিগত অনুভূতির যে শিল্পরূপ তা সার্বজনীন। তাই মানুষের চেতনার বিস্তার, মানবিকতা ও সৌন্দর্যের বিকাশ, জীবনের সঙ্গে ঐক্য ও সামঞ্জস্য তৈরি প্রক্রিয়া হিসেবে সাহিত্যচর্চা টিকে থাকবে তার নিজস্ব শক্তিতেই। এআই তার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু পরিপূরক নয়।
আগামীতে কেউ যদি এআই কেন্দ্রিক সাহিত্য করার কথা চিন্তাও করেন, তার জন্য ফরাসী লেখিকা আনা নিন ইতোপূর্বেই বলে গেছেন, ‘তুমি যদি লেখা দিয়ে নিশ্বাস না নাও, তুমি যদি লেখায় না-কাঁদো, অথবা লেখায় গান না-গাও, তাহলে লিখো না, কারণ আমাদের সংষ্কৃতিতে তার কোনো দরকার নেই।’

মুম রহমান একজন লেখক। সার্বক্ষণিক এবং সর্বঅর্থে লেখক। যা করেন লেখালেখির জন্য করেন। গল্প, নাটক, কবিতা, অনুবাদ, বিজ্ঞাপণের চিত্রনাট্য, রেডিও-টিভি নাটক, সিনেমার চিত্রনাট্য, প্রেমপত্র– সব কিছুকেই তিনি লেখালেখির অংশ মনে করেন। রান্নার রেসিপি থেকে চিন্তাশীল প্রবন্ধ সবখানেই তিনি লেখক।