১৯৯৪ সালের ১৭ জুলাই। রোজ বোলের পাসাদেনা স্টেডিয়ামের প্রায় ৯৫ হাজার দর্শক হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গিয়েছিল। নীরব হয়ে গিয়েছিলেন রবার্তো বাজ্জো নিজেই। বেদনার গাঢ় নীলের পাশে তখন হলুদ উদযাপন। আর সবকিছু ছাপিয়ে একা দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে আছেন বাজ্জো। যেন তিনি দাঁড়িয়েই মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন সেদিন। ফুটবল ইতিহাসের সেই আইকনিক দৃশ্য, সেই ট্রাজেডি নিয়ে কতো কথা, কথা লেখা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। চলচ্চিত্রের ফিতাতেও বন্দি হয়েছে এমন করুণ দৃশ্য। বিশ্বকাপ এলেই যা মনে করিয়ে দেয় সবাইকে।
মার্কিন মুলুকে ফুটবল তেমন জনপ্রিয় নয়। কিন্তু ফুটবলের বাজার কে হাতছাড়া করতে চায়! ১৯৯৪ সালে প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্র। ২৪ দলের সেই বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠে ইতালি। পুরো টুর্নামেন্টে আজ্জুরিদের যখন প্রয়োজন হয়েছে, বাজ্জো জ্বলে উঠেছেন। কিন্তু ফাইনালে তিনিই হয়ে গেলেন ‘ভিলেন’! ‘ফুটবল ঈশ্বর’ যেন ভাগ্যটা অন্যভাবে লিখে রেখেছিল বাজ্জোর কপালে।

রবার্তো বাজ্জো। ১৯৯০, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এবং ৩ বিশ্বকাপেই গোল করা একমাত্র ইতালিয় খেলোয়াড়
১৯৯০ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল ইতালি। সেবার আজ্জুরিদের নিয়ে কত স্বপ্নের জাল যে বুনেছিল ইতালিয়ানরা! কিন্তু শিরোপা পুনরুদ্ধারে নেমে ফ্রাঙ্কো বারেসি-বাজ্জোরা থেমে যান সেমিফাইনালে। ইতালিকে হারিয়ে নেপলসের ঘরের ছেলে হয়ে যাওয়া ডিয়েগো ম্যারাডোনা আবারও উঠে যান ফাইনালে। শেষ চারে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে স্বপ্নের সমাধি হয় আজ্জুরিদের।
পরের বিশ্বকাপে বাজ্জোকে নিয়ে স্বপ্ন বুনতে থাকে ইতালি। কোচ আরিগো সাচ্চির অধীনে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আজ্জুরিদের ১৪ গোলের পাঁচটিই করেন বাজ্জো। আট ম্যাচের মধ্যে করেন সাত অ্যাসিস্ট। কিন্ত সেই বিশ্বকাপে কোথায় কী! ইতালি প্রথম ম্যাচেই হেরে বসে আয়ারল্যান্ড প্রজতন্ত্রের বিপক্ষে। বাঁচামরার পরের ম্যাচে বাজ্জোর গোলে নরওয়ের বিপক্ষে জয়। গ্রুপের শেষ ম্যাচে ড্র করে বসে মেক্সিকোর বিপক্ষে।
সেবার ভাগ্যের সহায়তায় শেষ ষোলোতে ওঠে ইতালি। ‘ই’ গ্রুপের চার দলেরই পয়েন্ট ছিল সমান ৪। তবে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় সরাসরি নকআউট পর্বের টিকিট পেয়ে যায় মেক্সিকো ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র। তখন ২৪ দলের বিশ্বকাপের ৮ গ্রুপ থেকে সরাসরি শেষ ষোলোয় উঠত গ্রুপের শীর্ষ দুই দল। পাশাপাশি তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলোর মধ্য থেকে পয়েন্টের ভিত্তিতে সেরা চারটি দলও সুযোগ পেত শেষ ষোলোয় খেলার। সেবার ইতালি সেই তালিকায় চতুর্থ স্থানে থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নেয়।
এরপর তো শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে বসেছিল ইতালি! নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধে গোল হজমের পর সব আশা শেষ হতে বসে সাচ্চির শিষ্যদের। তবে শেষ মুহূর্তে জ্বলে ওঠেন বাজ্জো। ৮৮ মিনিটে সমতায় ফেরান ইতালিকে। ১০২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করেন জয়সূচক গোল।
কোয়ার্টার ফাইনালেও স্পেনের বিপক্ষে ৮৮ মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন বাজ্জো। তার আগে ম্যাচটি সমতায় ছিল ১-১ গোলে। সেমিফাইনালে ২১ ও ২৫ মিনিটে গোল করে ইতালিকে এগিয়ে দেন বাজ্জো। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে আজ্জুরিরা ম্যাচটি জেতে ২-১ গোলে।
ফাইনালের আগ পর্যন্ত ইতালির যখন প্রয়োজন হয়েছে ত্রাতা হয়ে এসেছেন বাজ্জো। কিন্তু রোজ বোলে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। ব্রাজিলের বিপক্ষে অতিরিক্তি সময়ের পরও ম্যাচটি শেষ হয় গোলশূন্য ব্যবধানে। টাইব্রেকারে ইতালির পঞ্চম শটে গোল করতে পারলে বেঁচে থাকত ইতালির আশা। কিন্তু সেই শটই কিনা কী ভেবে আকাশে পাঠিয়ে দিলেন বাজ্জো! শট নেওয়ার পর বল যখন পোস্টের ওপর দিয়ে চলে গেল, বাজ্জো মাথা নিচু করে, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। মূহূর্তে পুরো স্টেডিয়ামে নেমে এলো নীরবতা। এরপর যে দৃশ্যের অবতারণা হলো সেটিকে সুররিয়াল বলবেন নাকি ম্যাজিক রিয়ালিজম?
এতক্ষণ ধরে ইতালির প্রতি ম্যাচের বর্ণনাতেই হয়তো বুঝে গেছেন, সেই বিশ্বকাপে বাজ্জো কেমন ছিলেন! সেমিফাইনালে চোটে পড়েছিলেন। সেই চোট ফাইনালে ডানা মেলতে দেয়নি বাজ্জোকে। ইতালির স্বপ্ন তার এক শটেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার জন্য কত সমালোচনাই তো সয়েছেন। হয়ে পড়েছিলেন নায়ক থেকে ভিলেন। দেশে ফিরে একপ্রকার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। নিজ বাড়িতে গাছপালাকে বেছে নেন সময় কাটাতে। অবশ্য প্রিয় ফুটবল থেকে দূরে থাকতে পারেননি। খেলেছেন ১৯৯৮ বিশ্বকাপ। কিন্তু চার বছর আগের সেই বাজ্জো যে ততদিনে অনেক ম্লান হয়ে গেছেন!
অবশ্য এই নয় যে, বাজ্জো সেই বিশ্বকাপে জ্বলে ওঠেননি। গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে চিলির বিপক্ষে শেষ মূহূর্তে তার পেনাল্টি গোলেই হার এড়ায় ইতালি। আর শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে বাজ্জোর ৯০ মিনিটের গোলে অস্ট্রিয়াকে হারায়। গ্রুপ সেরা হয়ে শেষ ষোলোয় যায় আজ্জুরিরা। তবে বাদ পড়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। এবারও বাজ্জোদের কপাল পোড়ে টাইব্রেকারে। স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে এবার আর ভুল করেননি বাজ্জো। ইতালির হয়ে প্রথম শটেই করেন গোল। কিন্তু এবারও ভাগ্যের দেখা পাননি। বাজ্জোরও আর বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। ২০০২ বিশ্বকাপে খেলা হয়নি তার। ততদিনে যে বয়স হয়ে গেছে ৩৫ বছর!
কাঁধের কাছে ‘ডিভাইন’ পনিটেইল ও ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে রমনীদের হৃদয় হরণ করেছেন। নব্বই দশকের ‘হার্টথ্রব’ ফুটবলার ছিলেন বাজ্জো।
ইতালির এক ছোটো শহর কালদোগনোতে জন্ম বাজ্জোর। শহরটির পাশের প্রতিবেশি ভিসেঞ্জা। সেই শহরের নামেই নামকরণ করা ক্লাবের হয়ে পেশাদারি ক্যারিয়ার শুরু। এরপর মাতিয়েছেন ইতালির ফুটবল। ফিওরেন্তিনা থেকে জুভেন্তাস, সেখান থেকে এসি মিলান, বোলোনা, ইন্তার মিলান হয়ে ব্রেসিয়া—ক্লাব ক্যারিয়ারে সাফল্যের কমতি নেই। কাঁধের কাছে ‘ডিভাইন’ পনিটেইল ও ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে রমনীদের হৃদয় হরণ করেছেন। নব্বই দশকের ‘হার্টথ্রব’ ফুটবলার ছিলেন বাজ্জো। আইকন ছিলেন অনেকের। বলিউডের প্রীতি জিনতার প্রিয় ফুটবলারও ছিলেন। ‘ফুটবলের রাজা’ পেলের কাছে তিনি ‘ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়’।
মিশেল প্লাতিনির কাছে, ‘সে ৯ নম্বরও নয়, ১০ নম্বরও নয়। সে হলো সাড়ে ৯ নম্বর।’ ফরাসি কিংবদন্তির এই মন্তব্যের কারণও আছে। বাজ্জো ‘বক্স টু বক্স’ স্ট্রাইকার ছিলেন না। কখনো খেলেছেন সেকেন্ড স্ট্রাইকার বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে। কিন্তু খেলা গড়ে তোলার পাশাপাশি যখনই দলের প্রয়োজন হতো, স্কোরটাও করে দিতেন। তার বাঁকানো ফ্রি-কিক, ড্রিবলিং, গেম সেন্স—সব মিলিয়ে বাজ্জো ছিলেন পুরো একটা প্যাকেজ। পনিটেইল ঝুলিয়ে যখন বল পায়ে দৌড়াতেন, মনে হতো যেন এক ‘রোমান গড’ ভুলে মাঠে এসে পড়েছেন। কিন্তু দেবতাদেরও হয়তো সীমাবদ্ধতা থাকে। প্রতিভার সবকিছু থাকার পরও ‘ট্রাজিক হিরো’ হিসেবে রয়ে যান ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাস অবশ্য এত নিষ্ঠুর নয়। নায়কদের পাশাপাশি খলনায়কদের যেমন জায়গা দেয়, তেমনি পরিণতির নায়কদেরও।

সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পেনাল্টি মিসের পরে স্থির, নিথর, নিস্তব্ধ রবার্তেো বাজ্জো
পেনাল্টি মিস করেও ফুটবলপ্রেমীদের মনে যদি দশকের পর দশক নায়কের আসনে কেউ থাকেন, তিনি বাজ্জো। এক সময় ইতালিয়ান ফুটবলে ছিল তারকার ছড়াছড়ি। সেই সোনালি সময়ের স্বাক্ষী হয়ে আছেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে হচ্ছে বলেই, বাজ্জোকে মনে পড়ছে আরও বেশি। গত ৩২ বছরে ফুটবল অনেক পাল্টে গেছে। অনেকের অনেক কিছুর অবসান হয়েছে, অপেক্ষা ঘুচেছে। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। ৩০ বছর পর লিভারপুল প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে। ৩৩ বছর পর সিরি আ-এর স্বাদ পেয়েছে নাপোলি। গত দুই দশক ফুটবল বিশ্ব শাসন করেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি।
পেনাল্টি মিস করেও ফুটবলপ্রেমীদের মনে যদি দশকের পর দশক নায়কের আসনে কেউ থাকেন, তিনি বাজ্জো। এক সময় ইতালিয়ান ফুটবলে ছিল তারকার ছড়াছড়ি। সেই সোনালি সময়ের স্বাক্ষী হয়ে আছেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে হচ্ছে বলেই, বাজ্জোকে মনে পড়ছে আরও বেশি।
কিন্তু একটি জিনিস এখনো পুরোনো হয়নি। বাজ্জোর সেই পেনাল্টি মিসের আবেগ, বেদনা, হতাশা, আক্ষেপ যেন আগের মতোই আছে। এ দৃশ্য যেন সবসময় নতুন হয়ে ধরা দেয়। এ দৃশ্য কোনো ফরাসি পেইন্টারের আঁকা নয়। এই স্ট্যাচু কোনো ইতালিয়ান ভাস্কর্যের নয়। তবু চিরমূর্তির মতোন বাজ্জোর এই দৃশ্য অমর হয়ে আছে। এ গল্প আজ চিরায়তের আসনে, ক্ল্যাসিক। বাজ্জোর সেই গোলমুখের ব্যর্থতা যেন নীরবে বলে যায়— ‘নক্ষত্রেরও পতন হয়।’ তবে কিছু কিছু পতনের ভেতরের সৌন্দর্যও যুগে যুগে ছড়িয়ে যায় প্রেরণা। কারণ কেউ তো ইচ্ছে করে পেনাল্টি মিস করেন না, আর সেটি যদি হয় বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো মহামঞ্চে! তাই যারা জীবনের কোনো নির্ণায়ক মুহূর্তে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন, তাঁদের কাছে বাজ্জো কেবল একজন ফুটবলার নন; তিনি এক নীরব সান্ত্বনা। রোমান দেবতা ‘মিজেরিয়া’র মতো তাদেরও মাথায় যেন হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন বাজ্জো।

উপল বড়ুয়া। জন্ম: ১৯ ডিসেম্বর। রামু, কক্সবাজার। প্রকাশিত বই: কানা রাজার সুড়ঙ্গ (কবিতা), উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা (কবিতা), তুমুল সাইকেডেলিক দুপুরে (কবিতা) ও ডিনারের জন্য কয়েকটি কাটা আঙুল (গল্প)।