শুক্রবার, জুন ১৯

গলি ও গ্যালারির আখ্যান

0

আমার বেড়ে ওঠা শহরের জীবনে। প্রত্যেক বার্ষিক পরীক্ষার শেষে ভ্রমণ হতো গ্রামে সেখানের জীবনের সাথে যে ছন্দ তাও মিলে-মিশে আছে আমার মধ্যে। তখন মোবাইল ছিল না, ভিডিও গেম ছিল না, ছিল না সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যস্ততা। আমার দুনিয়া জুড়ে তখন সাদাকালো টিভির বদলে রঙিন স্ক্রিনের টিভি আসতে শুরু করেছে। শহরে বড়োদের খেলা দেখতাম পাড়ার অলিতে-গলিতে। আর গ্রামে গেলে ধান কাটার পর দিগন্ত জোড়া মাঠ জুড়ে উৎসবে মুখর থাকত নানা খেলার আয়োজন। নিজ দলের জেতার উত্তেজনা, নানা শব্দ আর কৌতুহল। বিকেল জুড়ে সেই বিনোদন আমার স্মৃতির সাথে মিশে আছে। সবকিছুর পরও আমরা চাই নিজের একটা বল হোক তাই তো দোকানে গেলেই প্লাস্টিকের লাল-হলুদ ডোরা বলের দিকে কি তীব্র আকর্ষণ! স্কুল শেষে ব্যাগ ছুড়ে ফেলে মাঠের দিকে দৌড় দেওয়াই ছিল দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। গলির রাস্তায়, খোলা মাঠে কিংবা বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় দুই পাশে ইট বসিয়ে বানানো হতো গোলপোস্ট। খালি পায়ে খেলতে খেলতে কখন সন্ধ্যা নেমে আসত, তা টেরই পাওয়া যেত না।


Brazil

২০০২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল ফুটবল দল


ফুটবলকে আমি চিনেছি আমার শহরের পাড়ায় বেড়ে ওঠা জীবন থেকে। মূলত ফুটবলের প্রতি উন্মাদনা, দল নির্বাচন আর সেই দলকে ঘিরে তৈরি হওয়া পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান—এসবের সাথেই আমার প্রথম পরিচয়। যে সময়ে আমি বড়ো হচ্ছিলাম, তখন সাদা-কালো টেলিভিশনের দিন পেরিয়ে রঙিন টেলিভিশনের যুগে প্রবেশ করেছি। নতুন রঙিন পর্দার সাথে সাথে আমাদের জীবনে ঢুকে পড়েছিল ফুটবলের আরও বর্ণিল এক জগৎ।

আমাদের পাড়ায় নির্বাচন এলে যেমন দুই পক্ষের প্রচারণা চলত, মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যেত, আর যার যার দলকে শক্তিশালী করার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হতো, ফুটবলও ছিল অনেকটা তেমনই। শুধু পার্থক্য ছিল, এখানে ব্যালটের জায়গায় ছিল একটি গোল বল, আর প্রার্থীর জায়গায় ছিল দুটো দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল।

পাড়ার সিনিয়র ভাইয়েরা ছিলেন এই দুই দলের প্রধান সংগঠক। তারা নিজেদের দলের লোকসংখ্যা বাড়াতে যেন সবসময়ই ব্যস্ত থাকতেন। আমরা যারা খুদে শিশু-কিশোর ছিলাম, তারাও সেই দলবদলের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতাম। কেউ একজন এসে বলত, ‘তুই আমাদের দলে আয়।’ আরেকজন এসে বুঝিয়ে যেত, ‘না, ওদের দলে গেলে চলবে না, আসল ফুটবল তো আমাদের দলই খেলে।’

বাড়ি থেকে কষ্ট করে পয়সা জোগাড় করতাম। কেউ টিফিনের টাকা বাঁচাত, কেউ মায়ের কাছ থেকে বাড়তি দু-এক টাকা আদায় করত। তারপর সবাই মিলে স্টিকার কিনতাম। সেই স্টিকার নিয়ে শুরু হতো এক অভিনব অভিযান। পাড়ার কোন বাড়ি আর্জেন্টিনার, কোন বাড়ি ব্রাজিলের তা যেন চিহ্নিত করে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। দরজায় দরজায় স্টিকার লাগিয়ে আমরা নিজেদের এলাকার মানচিত্র তৈরি করতাম।

ফুটবলের কৌশল, ইতিহাস কিংবা সাফল্যের পরিসংখ্যান তখন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমি কোন দলে আর আমার বন্ধুরা কোন দলে। বিশ্বকাপ এলেই সেই উত্তেজনা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। বাড়ি থেকে কষ্ট করে পয়সা জোগাড় করতাম। কেউ টিফিনের টাকা বাঁচাত, কেউ মায়ের কাছ থেকে বাড়তি দু-এক টাকা আদায় করত। তারপর সবাই মিলে স্টিকার কিনতাম। সেই স্টিকার নিয়ে শুরু হতো এক অভিনব অভিযান। পাড়ার কোন বাড়ি আর্জেন্টিনার, কোন বাড়ি ব্রাজিলের তা যেন চিহ্নিত করে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। দরজায় দরজায় স্টিকার লাগিয়ে আমরা নিজেদের এলাকার মানচিত্র তৈরি করতাম।

তখনও বিশ্ব ফুটবলে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি ছিল। কিন্তু আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব প্রায় ছিল না বললেই চলে। পাড়ার রাজনীতির মতোই ফুটবলের মানচিত্রও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ব্রাজিল। মাঝামাঝি বলে কিছু ছিল না। তুমি হয় এপক্ষের, নয় ওপক্ষের।

যদি কেউ প্রশ্ন করে, ফুটবলে কোন দলকে সাপোর্ট করি এবং কেন করি? বর্তমানের যে সময়টায় দাঁড়িয়ে আছি, সেই সময়ে এই প্রশ্নের উত্তরে অবস্থান যদি বলি তবে অনেকটাই দুঃসাহসিক এবং শিশুসুলভ! কোন দলকে সাপোর্ট করি তার আগে কিঞ্চিৎ ধারণা দেই যে দলকে সাপোর্ট করি সেই দেশের ভৌগলিক অবস্থানে আয়তাকার দিক থেকে দুনিয়ার পাঁচ নাম্বার দেশে আখ্যায়িত করা যায়! বলা হয়ে থাকে এই দুনিয়ার প্রায় বিশ শতাংশ অক্সিজেন আমরা সেই দেশ থেকে পাই! কারণ ষাট শতাংশ গাছালির সুবিশাল আমাজন রেইন ফরেস্ট একমাত্র সেই দেশেই আছে! এখনও আমাজন অরণ্য পুরোপুরি ডিস্কোভার করা সম্ভব হয়নি। তাই সেখানে এখনও আদিম মানুষের বসবাস; যারা জানেই না দুনিয়া এখন কতোটা টেকনোলোজির উপর ভর করে এগিয়ে গেছে। যাদের ইতিহাস খুব শোষিত এবং যারা এই ফুটবলকে নিয়েই আসলে দুনিয়াতে শীর্ষে আছে, দ্যা অনলি ওয়ান, আমার প্রিয় দল ব্রাজিল!

ব্রাজিলকে আমি সবসময়ই এক অদ্ভুত, নাটকীয় আর রূপকথার দেশের মতো মনে করি। তাদের ইতিহাস পড়লে মনে হয়, এত প্রতিকূলতা, এত বৈষম্য, এত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে একটি দেশ কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ফুটবল শক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে! তাদের গল্পটা শুধুই ফুটবলের নয়, আদি সংগ্রাম, স্বপ্ন দেখা এবং আনন্দ খুঁজে নেওয়ার গল্প।

ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলারদের জীবনকাহিনি পড়লেই আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। কাকে রেখে কার কথা বলি; কিংবদন্তি খেলোয়াড় পেলে, রোনালদিনহো, রোনালদো কিংবা আরও অনেক তারকা যাদের বেশিরভাগের শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য, সীমাবদ্ধতা আর কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই তারা ফুটবলকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। সেই ফুটবলই একসময় তাদের ব্যক্তিগত জীবন বদলেছে, একই সঙ্গে বিশ্বের মানচিত্রে ব্রাজিলকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

আজও ব্রাজিলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা, বৈষম্য এবং সংকটের মধ্য দিয়েই দেশটি এগিয়ে চলেছে। তারপরও ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবলের মধ্যে এক ধরনের মুক্তি খুঁজে নেয়। ফুটবল তাদের কাছে শুধুই খেলা নয় এটি আনন্দ, পরিচয়, সংস্কৃতি এবং আশার আরেক নাম।

আমার নিজের ব্রাজিলকে ভালো লাগার অন্যতম কারণ ছিল তাদের খেলার ছন্দ। বিশেষ করে ২০০২ সালের বিশ্বকাপের কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। রঙিন টেলিভিশনের পর্দায় যখন রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহোরা খেলতেন মনে হতো ফুটবল যেন অসাধারণ শিল্প। বল যেন তাদের পায়ের সঙ্গে লেগে থাকত। পাস, ড্রিবল, আক্রমণ সবকিছুর মধ্যে ছিল এক ধরনের সৌন্দর্য। আর গোলের পর তাদের উচ্ছ্বাস, তাদের সাম্বা নাচ, তাদের উদযাপন ছিল দেখার মতো!


সাম্বা

সাম্বা শিল্পীদের সঙ্গে একজন ভক্ত


ব্রাজিলের জনপ্রিয় নৃত্য সাম্বা ও লোকসংস্কৃতির ইতিহাস জানতে গিয়ে আমি গভীরভাবে আপ্লুত হয়েছি। আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে আনা মানুষেরা ব্রাজিলে যে অমানবিক জীবন কাটিয়েছেন, তার মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। বন্দিদশায় এবং প্রভুদের নজরদারির মধ্যে তারা আত্মরক্ষার কৌশল, ছন্দ, সংগীত ও শরীরের নানান মুদ্রাকে এমনভাবে একসূত্রে গেঁথেছিলেন যে, দূর থেকে তা নিছক নৃত্য বলেই মনে হতো। অথচ সেই নৃত্যের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল যুদ্ধকৌশল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে তারা এভাবেই নিজেদের শারীরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধের শক্তি চর্চা করতেন। সেই ঐতিহ্য আজ কাপোয়েরা নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। আর আফ্রো-ব্রাজিলীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের আরেক উজ্জ্বল প্রকাশ সাম্বা নৃত্যও একই ইতিহাসের বেদনা, আনন্দ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বহন করে চলেছে। তাই ব্রাজিলের এই শিল্পধারাগুলো কেবল বিনোদন নয়; এগুলো এক জাতির সংগ্রাম, স্মৃতি ও মুক্তির ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক।

তাই ব্রাজিলকে আমার কাছে আলাদা মনে হয়। তারা কষ্টকে উৎসবে পরিণত করতে জানে, দুঃখকে ছন্দে বদলে দিতে জানে। তাদের ফুটবলেও সেই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। হারলেও তারা খেলা উপভোগ করে, জিতলে পুরো পৃথিবীকে সঙ্গে নিয়ে উদযাপন করে।

হয়তো সে কারণেই ব্রাজিল দলের প্রতিটি গোলের পর আমরা সেই বিখ্যাত সাম্বা নাচ উপভোগ করি। কিন্তু এর গভীরতাটা ভাবুন, দুঃখের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বদলে যায় কেমন বিনোদনের বাতাবরণে। আর তাই ব্রাজিলকে আমার কাছে আলাদা মনে হয়। তারা কষ্টকে উৎসবে পরিণত করতে জানে, দুঃখকে ছন্দে বদলে দিতে জানে। তাদের ফুটবলেও সেই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। হারলেও তারা খেলা উপভোগ করে, জিতলে পুরো পৃথিবীকে সঙ্গে নিয়ে উদযাপন করে।

আর আমরা যারা দীর্ঘদিনের ব্রাজিল সমর্থক, তাদের গল্পটাও কম মজার নয়। ২০০২ সালের পর দুই যুগেরও বেশি সময় কেটে গেছে। ডায়েরির ভেতরে এখনও সেই পেপারকাটিং গুলো খুঁজলে পাওয়া যাবে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহোরা কিংবা কাকার! কত বিশ্বকাপ এলো, কত আশা ভাঙল, কত নতুন তারকা জন্ম নিলো। তবুও বিশ্বকাপ এলেই বুকের ভেতর কোথাও একটা পুরোনো বিশ্বাস জেগে ওঠে— হয়তো এবার। হয়তো এইবারই সেই বহু প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা, সেই হেক্সা মিশন পূরণ হবে।

ফুটবল সমর্থনের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটিই। যুক্তি অনেক সময় ফুরিয়ে যায়, পরিসংখ্যান অনেক সময় হতাশ করে, কিন্তু আশা কখনো শেষ হয় না। আমরা জানি না কখন কোন দল হয়ে উঠবে ডার্ক হর্স; নাকি সব চাপ ভুলে নিজেদের সেরাটুকু দিয়ে আবারও বিশ্বজয়ীর নাম হবে ব্রাজিল।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১২ অক্টোবর, ঢাকায়। শৈশব-কৈশোর বেড়ে ওঠা শহরে। কবিতা, গল্প, মুক্তগদ্য ইত্যাদি লেখেন। লেখালেখির শুরু স্কুল জীবনে। তারপর ব্লগ, বিভিন্ন ছোটোকাগজ ও পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়। লেখকের প্রথম বই ‘ঘুমপত্র’ (অনুপ্রাণন, ২০১৮)। কর্মজীবনের এক অংশ কাটিয়েছেন বেসরকারি রেডিওতে প্রযোজক ও উপস্থাপক হিসেবে। ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।