এখন, যখন প্রযুক্তি আমাদের আঙুল ডগায়, স্পর্শের সীমায়, তখন থিয়েটারের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, এআই-চালিত ভিডিও এবং ডিজিটাল বিনোদনের রমরমা বিস্তারের এই ডিজিটাল কলিকালে আমরা অনেকাংশে ‘ডিজিটাল গ্লাস’ বা পর্দার আড়ালে বাস করি। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, পামটমে চলে এসেছে তথ্য আর বিনোদন। এখন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে থিয়েটার কি আজও আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকতে পারবে? সিনেমা, টিভি, অনলাইন, ইউটিউবসহ শত শত মিডিয়া লক্ষ লক্ষ কন্টেন্ট তৈরি করছে। এখনও কি তবে আমরা থিয়েটারের জন্য ভিড় করব, নতুন নাটক দেখার তাড়নায় আলোড়িত হবো?
নাকি থিয়েটার হারাবে তার হাজার বছরের গৌরব? এই যে একটি জীবন্ত মাধ্যম যা আমরা সরাসরি উপভোগ করি, অনুভব করি, যার সঙ্গে একই সমতলে শিল্পী ও দর্শক-শ্রোতা একত্রে মিলিত হতে পারে, সেই থিয়েটারকে আজকের ডিজিটাল বুমের প্রেক্ষাপটে ভেবে দেখা দরকার।
এখন, আমরা থিয়েটারের মানবিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি প্রযুক্তির যুগে এর অপরিহার্যতা বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি বিবেচনা করি। নইলে যে ‘সকলই গরল ভেল’ হয়ে যাবে!
থিয়েটার: মানবিক সংযোগের অভিজ্ঞতা
একটা সময় ছিল, যখন মানুষ আধো-অন্ধকারে থিয়েটারে আসতেন—দেখার জন্য নয়, সাক্ষী হতে। থিয়েটারে আসা ছিল নদীর ধারে বেড়াতে আসার মতো, নিজেকে প্রতিফলিত করার, নিজেকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা। অনুভব আর অভিজ্ঞতার মিলন হলো থিয়েটার। মঞ্চের পাটাতনে দর্শন, শ্রবণ, কথনসহ ইন্দ্রিয়ের অনুভব আর বোধ জাগ্রত করার নাম থিয়েটার। একটা টিনের কি কাঠের তলোয়ার কি লাঠিখেলা এখানে সামনাসামনি ঘটে। একটা গান, নাচ, সংলাপ, আলো, এমনকি হাওয়া ও ঘ্রাণ তৈরি হয় থিয়েটারে, সামনাসামনি, মুখোমুখি।
এমন জাগ্রত, জীবন্ত, অভিজ্ঞতা, বোধ কোনো ক্যামেরা বা স্ক্রিন কখনও দিতে পারে না।
থিয়েটার শুধু অভিনয় নয়; এটি উপস্থিতি। এটি কাঁপা কণ্ঠ, থেমে যাওয়া নিশ্বাস, দুই সংলাপের মাঝের নীরবতা। এটি সেই ক্ষণস্থায়ী, জীবন্ত রসায়ন যা অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে তৈরি হয়। মার্ক রাইল্যান্স একবার বলেছেন—
‘Theater is the place where we rehearse being human.’
অর্থাৎ থিয়েটার আমাদের মানবিকতা অনুশীলন করার স্থান। এটি আমাদের শেখায় অন্যের বেদনা অনুভব করতে, অন্যের আনন্দ বা দুঃখের সময়ে পা রাখতে। সহানুভূতির একটি উপায় হলো থিয়েটার, যা আজকের ডিজিটাল টাল-মাটালেরকালে আমাদের নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে, যাতে এটি বহু তথ্য, অপপ্রচার, ভুল সংবাদ, ভাইরাল কনটেন্টের হৈহুল্লোড়ের ভেতরে সংবেদনশীল মানবিক সত্তাটা জীবিত থাকে, সুন্দর থাকে।
অ্যারিস্টটল Poetics-এ লিখেছেন, নাটক হলো মানুষের নৈতিক ও আবেগীয় শিক্ষার পথ। দর্শক catharsis বা ভাববিমোক্ষণ অনুভব করে—বেদনা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে অস্থিরতা কমে আসে এবং মানবিক অনুভূতিতে সমৃদ্ধ হয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, থিয়েটার মানুষকে শুধুমাত্র বিনোদন দেয়নি, বরং তাকে মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সহানুভূতির দিকে পরিচালিত করেছে।
ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আমাদের জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে, তবে এর সাথে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত তথ্যপ্রবাহ, মিথ্যা তথ্যের বিস্তার, ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবক্ষয়—এই সবই আমাদের মানসিক এবং সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা স্ক্রল করি, লাইক করি, শেয়ার করি, কিন্তু সরাসরি সংযোগ এবং উপস্থিতি হারাচ্ছি। দ্রুত আসছে সব আর বড়ো ক্ষণিক তার আয়ু। একটা আলোচনা কিংবা ভাইরাল কন্টেন্ট ৮ থেকে ২৪ ঘন্টায় আবেদন হারায়। মুহূর্তে আরেকটা নতুন কোনো হুজুগের মতো আরেকটা কন্টেন্ট চলে আসে। কিন্তু ইবসেনের ‘নোরা’, সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ আমাদের কাছে টিকে থাকে শতাব্দী, সহস্রাব্দ পেরিয়ে।
বর্তমানে থিয়েটার দাঁড়িয়ে আছে একটি নীরব বিদ্রোহ হিসেবে। এ যেন বিরাট ডিজিটাল অস্ত্রশস্ত্রের সঙ্গে এক গেরিলা যুদ্ধ। যে যুদ্ধের শিল্পী লড়াই করে নৈকট্যের, আন্তরিকতার। থিয়েটার যেন বলে: এসো, একসাথে বসো, স্ক্রিন বন্ধ করো, একই সঙ্গে শ্বাস নাও, আর শোনো—আরেকজন মানুষ কীভাবে তার সত্য বলছে। থিয়েটার এই সরাসরি সংযোগের মাধ্যম, যা কোনো অ্যালগরিদম বা ভার্চুয়াল বাস্তবতা অনুকরণ করতে পারে না।
থিয়েটারের সামাজিক ও নৈতিক ভূমিকা
থিয়েটার শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়; এখন, এটি একটি সামাজিক শক্তি। এটি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, অস্থিরতা, এবং অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। থিয়েটার আমাদের সমাজের আয়না; এটি আমাদের দুর্বলতা, শক্তি এবং সম্ভাবনাকে প্রতিফলিত করে। এটি আমাদের সচেতন করে, চিন্তা করতে বাধ্য করে, এবং পরিবর্তনের দিকে পরিচালিত করে। একটা ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’ কিংবা ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ ইতিহাসে ন্যায় অন্যায়কে তুলে ধরে। একজন ব্রেখট, বেকেট জীবনকে নতুন করে দেখায়, সমাজকে, চলতি বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
থিয়েটার একটা পরিবার। পারিবারিক বন্ধন। এই শহরে, এখন আমাদের সামনে আছেন ড. ইনামুল হকের পরিবার। পুরো পরিবার একটি থিয়েটার। এই রকম নাটকের মানুষগুলো আমাদের শেখায়, মঞ্চ মানেই শুধু দৃশ্যায়নের পাটাতন নয়, বরং মঞ্চ, নাটক এবং থিয়েটার একত্রে জীবন যাপন করার স্থান। একটি সম্মিলিত মানবিক প্রয়াসের নাম থিয়েটার। আজকের ডিজিটাল যুগ যে নৈরাশ্য আর মেকি আবরণ তৈরি করে থিয়েটার তার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণে প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে। থিয়েটার নেহাত একটি দল, গোষ্ঠী বা পরিবার নয় বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ও মানবিক উত্তরাধিকার।
থিয়েটারের সামাজিক ভূমিকা যেমন বড়ো, তেমনি এটি শিক্ষণীয়ও। এটি মানুষকে সাহসিকতা শেখায়। আলোর নিচে দাঁড়ানো, নিজের সত্য বলা—এটি ছোটো কাজ নয়। ভুল করা, ভাঙা, আবার শুরু করা—এটাও থিয়েটারের প্রশিক্ষণ। প্রতিটি অনুশীলনে আমরা শিখি, সৃষ্টিই পরিপূর্ণতা নয়; এটি মুখোমুখি উপস্থিতি। থিয়েটার কর্মী শত মানুষের সামনে নিজেকে মেলে ধরে। ভুল থেকেও সে নিজেকে গড়ে। ক্রমাগত আত্মবিশ্বাসী, সৎ মানুষের হওয়ার কারখাননও থিয়েটার।
প্রযুক্তি এবং থিয়েটার: সমন্বয় ও বিপর্যয়
প্রযুক্তি থিয়েটারে নতুন দিগন্ত খুলেছে—প্রজেকশন, হোলোগ্রাম, সাউন্ডস্কেপ। তবে থিয়েটারের আত্মা আজও চমকপ্রদভাবে এনালগ। মঞ্চের সরাসরি উপস্থিতি এবং মানবিক সংযোগের গুরুত্ব অপরিবর্তিত। ডিজিটাল মিডিয়া থিয়েটারের উপায়কে পরিপূরক করেছে—ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শন, অনলাইন ফ্লিমিং ইভেন্ট, কিন্তু এটি মঞ্চের প্রাণের অভিজ্ঞতা প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
থিয়েটার এক ধরনের ‘প্রতিরোধ’ যা আমাদের মানবিক সংযোগ, সহানুভূতি, এবং উপস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে। যখন পৃথিবী ভার্চুয়াল হয়ে যায়, তখন বাস্তবতা পরম আকাঙ্ক্ষার বস্তু হয়ে ওঠে। যখন সময় তুচ্ছ হয়ে যায়, তখন মুহূর্ত বিপ্লবী হয়ে ওঠে। এবং যখন একাকীত্ব অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন একসঙ্গে শ্বাস নেওয়া মুক্তির অনুভূতি দেয়।
থিয়েটার যুগে যুগে টিকে থাকার কারণ
থিয়েটার যুগে যুগে টিকে আছে কারণ এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সংযুক্ত—মানবিক সংযোগ, উপস্থিতি, সহানুভূতি। এথেন্সের পাথরের অ্যাম্ফিথিয়েটার থেকে ঢাকার ছোটো ব্ল্যাক-বক্স মঞ্চ পর্যন্ত থিয়েটার আমাদের আয়না, বিবেক এবং ছোট্ট বিদ্রোহ।
থিয়েটার আমাদের শেখায় যে জীবিত থাকা মানে অসম্পূর্ণ থাকা, চলমানভাবে স্পন্দিত থাকা, পরিবর্তিত হওয়া। এটি মানুষকে শেখায় অন্যের বেদনা, আনন্দ, আনন্দহীনতা বোঝার জন্য এবং সেই অনুভূতিগুলোর প্রতিফলন নিজেদের মধ্যে অনুভব করতে। এটি কেবল বিনোদন নয়, একটি জীবনমুখী শিক্ষণীয় প্রক্রিয়া।
থিয়েটার এবং এআই যুগ
এআই এবং ডিজিটাল কনটেন্টের যুগেও থিয়েটারের প্রাসঙ্গিকতা অটুট। যন্ত্রের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা স্বয়ংক্রিয় হতে পারে, কিন্তু উপস্থিতি এবং মানবিক সংযোগ তৈরি করা যায় না। থিয়েটার মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু মানবিক সম্পর্ক ও সংযোগ আমাদের জীবনের অমূল্য রত্ন।
থিয়েটার আমাদের শেখায় কেবল কীভাবে মানুষ হতে হয় তা নয়, বরং কীভাবে মানুষের সঙ্গে মানুষ হওয়া যায়। এটি আমাদের মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বের অনুভূতি জাগ্রত করে। থিয়েটার মানবিক শিক্ষার চিরন্তন মাধ্যম।
ডিজিটাল যুগে, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে দ্রুত, সহজ, উজ্জ্বল—তবে প্রায়শই ফাঁপা করে তুলেছে। সেই সময়ে থিয়েটার দাঁড়িয়ে আছে একটি পবিত্র শর্ত হিসাবে। এটি আমাদের মানবিক সংযোগ, সহানুভূতি, সাহস এবং উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়।
থিয়েটার টিকে থাকবে, কারণ এটি মনে করায় যে জীবিত থাকা মানে অসম্পূর্ণ থাকা, পরিবর্তিত হওয়া, এবং অন্য কারো কণ্ঠের প্রতিধ্বনিতে আমাদের নিজের মানবতার কাঁপা শব্দ খুঁজে পাওয়া। ডিজিটাল যুগে থিয়েটারের উপস্থিতি শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক নয়—এটি অপরিহার্য।
মুম রহমানের ধারাবাহিক : আমরা এবং এআই : প্রথম পর্ব
মুম রহমানের ধারাবাহিক : আমরা এবং এআই : দ্বিতীয় পর্ব

মুম রহমান একজন লেখক। সার্বক্ষণিক এবং সর্বঅর্থে লেখক। যা করেন লেখালেখির জন্য করেন। গল্প, নাটক, কবিতা, অনুবাদ, বিজ্ঞাপণের চিত্রনাট্য, রেডিও-টিভি নাটক, সিনেমার চিত্রনাট্য, প্রেমপত্র– সব কিছুকেই তিনি লেখালেখির অংশ মনে করেন। রান্নার রেসিপি থেকে চিন্তাশীল প্রবন্ধ সবখানেই তিনি লেখক।