১৯৭০-এ বিশ্বকাপ জিতলো ব্রাজিল। তারপর বিশ্ব সফরে বের হলো বিশ্বকাপাররা। একসময় তারা পৌঁছে গেল আফ্রিকায়। নাইজেরিয়া তখন প্রাণঘাতী গৃহযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত। ফুটবল ঈশ্বর পেলে ক্লাব সান্টোসের সাথে সে দেশে পৌঁছাল ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলতে। ব্যাস গৃহযুদ্ধ বন্ধ! শুধুমাত্র পেলের খেলা দেখতে শাসক আর বিদ্রোহী গোষ্ঠী প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করল!
‘বুঝলি ফুটবল এক ম্যাজিক অথবা ধর্ম। সে ধর্ম নয় যা মানুষে মানুষে বিভাজন বাড়ায়। ফুটবল হলো সেই ধর্ম যা ধারণে মানুষের মঙ্গল হয়।’ সেই কোন ছোটোবেলায় বাবা যখন কথাগুলো বলেছিলেন তখন তো স্বপ্নের ডানা মেলার সময়। সে ডানা মেলেওছিল। ভেবেছিলাম ফুটবলার হতেই হবে। নইলে এ জীবন বৃথা!
তারপর বছর গেল বছর এলো, আমাদের ফুটবল খেলাধুলো মাঠে বা মাঠের বাইরে চলতেই লাগল! যেভাবে চলে আর কী! যেভাবে মন্দিরে খুচরো ছুড়ে দেয়, সেভাবেই জীবনটাকেও ছুড়েই দিয়েছিলাম। মন্দিরে তা পৌঁছল কই! যেভাবে সন্ধানী ভিখিরী কুড়িয়ে নেয় পয়সা, সেভাবেও তো কেউ তুলে নিলো না আমায়, আমাদের। বুলেট, শতাব্দী, রাজধানী অথবা সাউথ লাইনের লোকাল ট্রেন হয়ে এগোতে শুরু করেছিলাম। লোক আসে, লোক যায়, সহযাত্রী কই? তারপর যেদিন ‘রেল রোকো’ হলো, থম মেরে দাঁড়িয়ে জীবন, হকাররাও সব ক্লান্তিতে গা এলিয়েছে, হঠাৎ দেখা তার সাথে। আলাপ ছিল, দেখা হলে কথা হয়েছিল আবহাওয়া নিয়ে যেমন হয়। এভাবে এত প্রেমে অবশ্য এই প্রথম, নাকি সেও ছিল যেমন থাকে অস্থি-মজ্জা? ফুটবল। একটা সবুজ ঘাসের গালিচায় সে কতদিন ধরেই তো দৌড়ে চলেছি, চলেছিই… বলের সাথে অথবা পেছনে, সামনে। আর কত না ফাউল আর ফাউল। ফ্রি-কিক পাই বা না পাই দৌড়তে তো হবেই।
‘বুঝলি ফুটবল এক ম্যাজিক অথবা ধর্ম। সে ধর্ম নয় যা মানুষে মানুষে বিভাজন বাড়ায়। ফুটবল হলো সেই ধর্ম যা ধারণে মানুষের মঙ্গল হয়।’ সেই কোন ছোটোবেলায় বাবা যখন কথাগুলো বলেছিলেন তখন তো স্বপ্নের ডানা মেলার সময়। সে ডানা মেলেওছিল। ভেবেছিলাম ফুটবলার হতেই হবে। নইলে এ জীবন বৃথা!
‘ফুটবল এক ধর্মের নাম। বল হলো CAUSE, আর তেকাঠি? লক্ষ্য।
চীন দেশে হ্যান রাজার আমলে কতগুলো কাগজ আর অন্যান্য জিনিস পত্র পুঁটলির মতো পাকিয়ে পা দিয়ে মারা হতো, তাকে সুজু বলা হতো। সে প্রায় খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর কথা! যেমন আমাদের আলগা সংসার আর কী! সেটাই ফুটবল হলফ করে এমন বলা যায় না! তবু…
পরে, অনেক পরে ইউরোপের দেশগুলোতে ‘মব বল’ খেলা শুরু হলো। এতে অবশ্য দল টল বলে কিছু ছিল না। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে! ধর মাঠ হাট বা বাজার—একটা বল তাতে সবাই লাথি মারতে চায়, টোটাল ক্যাওস! আমাদের উপমহাদেশে যেমন মব কালচার চালু আর কী! এতে অনেক সময়েই শক্তিশালী দুর্বলকে লক্ষ্য করে বল মারত। এটাই তো সমাজ, শাসকের ধর্ম!
অবশেষে ইংল্যাণ্ডের স্কুলগুলোতে ঠিক ঠাক স্ট্রাকচারড ফুটবলের শুরু। অংশগ্রহণ করল কেমব্রি, ইটন, হ্যারোর মতো পাবলিক স্কুলগুলো। কিন্তু ওই যে নিয়ম কানুন ঠিকঠাক না তৈরি করলে কোনো খেলাই তো সে অর্থে খেলা নয়। তাই ১৮৬৩-তে তৈরি হলো FA. ফুটবল এসোসিয়েশন। স্কুল কলেজ ক্লাবগুলো মিলেমিশে একটা স্ট্রাকচার, যেন পরিবারের অভিভাবক! আর ১৯০৪-এ তৈরি হলো FIFA এবং ১৯৩০ এ প্রথম বিশ্বকাপ। পড়শি দেশ আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় আয়োজক দেশ উরুগুয়েই।’
কী বুঝলি বল? এক নিশ্বাসে ফুটবলের ইতিহাস ভূগোল বলে এরপর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে; মাথা নিচু করে কিছু বুঝে কিছু না বুঝে বললাম—এওতো এক সমাজ বিবর্তনের কাহিনি। তখন আমি কিছুটা বড়ো। হাফপ্যান্টের নিচে পা গুলো বড়ো হয়ে যাচ্ছে দ্রুত, নাকের তলায় গোঁফের রেখা স্পষ্ট! মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল মহামেডান স্পোর্টিং, ঢাকা আবাহনী। প্রসূন, গৌতম, মনোরঞ্জন, সুব্রত, জামশিদ, মজিদ… আমাদের আশপাশটা ক্রমশ মাঠ হয়ে যাচ্ছে, দুদিকেই তেকাঠি, একদিক বাঁচাও আর একদিকে আক্রমণ…
তারপর? প্রথম প্রেম প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছিল।
ধর্ম আক্রান্ত হলে যেমন ‘মন্দির, মসজিদ ঘিরে দাঁড়ায় সম্প্রদায়’ সেভাবেই আমি, আমরাও, ফুটবলকে ঘিরেই। র্যাঙ্কিং ১৫৫ হোক বা ১ তা নিয়ে ভাববে প্রাজ্ঞজন। আমরা যা জানি খেলা চলাকালীন দাঁড়ানো নিষেধ। আলজিভ চুম্বনে তাকে সমস্ত শরীর দিয়ে… ভালোবাসায় যেমনটি হয়। ফুটবল এক লাল বর্ণ তরল, যাতে বুঁদ হয়ে আছি আজীবন নইলে মা কী করে হবে ডিফেন্ডার, বাবা স্ট্রাইকার! আর নিশীথ কাকু সুয়ারেজ। কম কামড় দিয়েছিল বাবাকে, বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শহর ছাড়বে। কিন্তু রেফারি তো আছেই, সে বাঁশি বাজাল। রেড কার্ড। শয্যাশায়ী, পঙ্গু। বাবা কিন্তু তার বন্ধুর দুই সন্তানের দায়িত্ব নিল সানন্দে। নিশীথ কাকুর স্ত্রীর চোখে জল। বাবা কিন্তু ফেয়ার-প্লের ট্রফি পাননি কখনও! পাবার কথাও নয়! সেসব পেতে গেলে সাহস-টাহস লাগে! বাবা তো আর ফুটবল রূপকথার সোনার মানুষ ছিলেন না, যে হাত দিয়ে গোল করার পরেও তা শতাব্দীর সেরা গোল হয়ে যাবে! ২২ জুন, ১৯৮৬ মেক্সিকোর এজটেকা স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যাণ্ড। ইংল্যাণ্ড এর ডিফেন্ডার ব্যাক পাশ করেছিল। পিটার শিলটন ইংল্যাণ্ডের প্রবাদপ্রতিম গোল রক্ষক লাফালেন, আট ইঞ্চি বেশি লম্বা ফুটবলের বরপুত্রের থেকে। তার থেকেও বেশি লাফিয়ে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে ঠেলে বল পাঠিয়ে দিলেন গোলে। তিউনিশিয়ান রেফারি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গোল বলে দিলেন। মারাদোনা বললেন, ‘হ্যান্ডস অভ গড!’
সে ম্যারাডোনার ফ্যান। এসব তার অপছন্দ। আমিই বললাম—আসলে অপটিক্স। তেমন কেউ হয়ে উঠতে পারলে, তার ভুলগুলোও ঠিক হয়ে যায়! যেমন রাষ্ট্রনায়করা! যদিও লাতিন আমেরিকার মানুষ, ইংল্যাণ্ড যেভাবে ফকল্যাণ্ডকে যুদ্ধে হারিয়েছিল, এটা তার মধুর প্রতিশোধ! আমার বাবা-মা তো ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষ তাদের এমন অপটিক্স সেন্সই বা কীভাবে থাকবে বলো! সে ছেড়ে চলে যায় এরপর।
প্রথম প্রেমকে এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম কী বুঝলে?
সে ম্যারাডোনার ফ্যান। এসব তার অপছন্দ। আমিই বললাম—আসলে অপটিক্স। তেমন কেউ হয়ে উঠতে পারলে, তার ভুলগুলোও ঠিক হয়ে যায়! যেমন রাষ্ট্রনায়করা! যদিও লাতিন আমেরিকার মানুষ, ইংল্যাণ্ড যেভাবে ফকল্যাণ্ডকে যুদ্ধে হারিয়েছিল, এটা তার মধুর প্রতিশোধ! আমার বাবা-মা তো ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষ তাদের এমন অপটিক্স সেন্সই বা কীভাবে থাকবে বলো! সে ছেড়ে চলে যায় এরপর। আমরা হেরো মানুষরা আর এক প্রস্তুতিতে নামি। ভাবি খেলায় হার জিত থাকেই। মোটা মাইনের পুলিশ অফিসারের থেকে সাহিত্য চর্চা করা আমি প্রেমকে ধরে রাখতে নাই পারি, আমিও মহান, দেবদাস তো হতেই পারি, পারি না?
ফুটবল এক ঈশ্বরের নাম। নইলে বিড়াল ছানার থেকেও ভীরু আমরা এত সাহসী হলাম কী করে! পদ্য লিখছি, গদ্য লিখছি আর উড়িয়ে দিচ্ছি স্টেডিয়ামের বাতাসে, জীবনটাকেও। চারদিকে এত বারুদ ও বিপদ তবু অন্ধের মতো, চোখে ঠুলি পড়া অশ্বের মতো দৌড় আর দৌড়… আষাঢ়ের ঘনঘোর মেঘের দিকে নইলে হাত বাড়িয়ে বলব কেন—এসো ফুটবল, আমাকে মুগ্ধতা দাও। আমরা শূন্যতা চিরে বানাই ময়দান, যেখানে আগামী প্রজন্ম দৌড়বে বলের সাথে, পেছনে অথবা সামনে।
জানেন ফুটবল এক গোপন পাহাড়ের নাম, যে পাহাড় আরোহণ আমাদের ঋদ্ধতা দিয়েছে চিরকাল। যার শিখরে পৌঁছলে, মধ্যরাতের গীর্জা থেকে ভেসে আসা মূর্ছনার মতো কি যেন, যা আমাদের স্নান করায়, আমরা পবিত্র হই। হ্যাঁ, ফুটবল এক ধর্মের নাম। এসো ধার্মিক হই। আর বেরিয়ে পড়ি পরিব্রাজকের মতো।
আজ বাবা নেই, মা নেই, দিদি নেই। আমার দল থেকে একে একে সরে গেছে বিশ্বস্ত ডিফেণ্ডার, স্ট্রাইকার আমি একা তেকাঠি বাঁচানোর চেষ্টায় মাঝরাতে ফোনের ওপর হুমড়ি খেয়ে দেখছি সাকিরার নাচ গান, ইউনাইট দ্য ওয়ার্ল্ড ইন আ সিংগল স্ট্রিং, ফুটবল। যুদ্ধের আবহে শান্তির শপথ। অথচ ট্রাম্প সাহেব তার ট্রাম্পেট বাজিয়েই চলেছেন—হরমুজ খুলুক। নইলে দেখে নেব। ৪৮ দেশ। জমজমাট লড়াই হচ্ছে তিন দেশ জুড়ে। আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকো। অথচ ইরানের ফুটবলারদের ঢুকতে দিয়েও অফিসিয়ালদের প্রবেশ নিষেধ। নিষেধ সোমালিয়ার রেফারির। অথচ তিনিই আফ্রিকার রেফারি অব দ্য ইয়ার।
রেফারি বলতে বুঝতাম নিয়তি নামক অদৃষ্ট! যে অলক্ষ্য থেকে নির্দেশ দেয়। তাকে আটকালো আজ, চিরকাল পারবে?
হেঁটে দেখি আদতে কলম্বাস ঠিক বলেছিল কি না? টেবিল হলো টেবিল, আর চেয়ারও চেয়ার। সে তো শুনে আসছি সেই কবে থেকে। এসো আবিষ্কার করি যে এ পৃথিবী নাকি আদতে ফুটবলের মতোই গোল। আর জীবন আসলে এক ফুটবল গ্রাউন্ড। গ্রাউন্ড জিরো। যেখান থেকে নতুন উৎক্ষেপণ হবে শ্রেণীহীন মানুষের। হবে না?
টস হয়ে গেছে। ডাগ আউটে বসে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াচ্ছেন চে। চে গুয়েভারা, পাশে রং আর তুলি হাতে বত্তিচেল্লি। মার্টিন লুথার কিং সাইড লাইন থেকে চিৎকার করে কী যেন বলছেন স্ট্রাইকারদের। গান্ধী স্থিতধী স্ট্রাটেজিস্ট। রবীন্দ্রনাথ চিৎকার করে গাইছেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে…
মাঠে এখন অনেক রোদ। যে সব সাপেরা এত দিন ছিল শীতঘুমে এখন একে একে জেগে উঠছে তারা। কিক অফ। বল গড়াচ্ছে। যুদ্ধের শুরু। ধর্মযুদ্ধ।
পুনশ্চ: বলা হয়নি মাঠের ধারে যারা সাবস্টিটিউট হিসেবে নামার জন্য ওয়ার্ম আপ করছে তাদের দেখে চমকে উঠেছিলাম। একজন আমাদের আজীবন দাদা-ভাই খেদানো আইবুড়ো তপু পিসি। কালো-কোলো-রোগা-সামনের দুটো দাঁত উঁচু, পেছনের চুলটা গার্ডার বেঁধে পনিটেল, আরেকজন সারদাদেবী অনাথ আশ্রমের হরি। রোগা লম্বা দোহারা চেহারা, মাথার চুল কদমছাঁট। হরি সাইকেল রিপেয়ারিং মিস্ত্রি।
—ও তপু পিসি, আই হরি… বলে ডাকতে গেছিলাম। পাড়ার চেনাজানা লোক দেখলে আনন্দ হয় না! এ অনেকটা তেমনই! ওরাও মাঠে নামছে? কিন্তু কেন? পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল—শ্রেণী সংগ্রাম দাদা। ফুটবল তো তাই শেখায়! আর উনি তপু পিসি নন রোনালদিনহো, আর ওই ছেলেটা যাকে হরি বলছেন সে হলো কিলিয়ান এমবাপ্পে! ব্যোমকে ঢেঁকুর তুলতে গিয়ে সামলে নিলাম, ভাবলাম অমৃত সন্ধানে এসব একটু আধটু হয়-টয়। খেলার নাম যে ফুটবল!
জন্ম ১৯৭০ সালে। বিজ্ঞানে স্নাতক, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাততকোত্তর। ‘ঐহিক’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। পেয়েছেন একাডেমি পুরস্কার-২০১৫, প্রকাশিত বই : তিতিরের নৌকো যাত্রা, হ্যালুসিনেটেড অক্ষরমালা ও নিঝুমপুরের না রূপকথা