এখন তো পৃথিবীর আনাচে কানাচে ফুটবল বিশ্বকাপ কেন, ইউরোপিয়ান ফুটবলেরও দর্শক আছে। অথচ আমাদের ছেলেবেলায় আমরা বিশ্বকাপের এত আমেজ টেরই পেতাম না। কোনো হাক ডাক ছিল না। কোনো হই হুল্লোরও না। এখন সবচেয়ে বেশি যা আছে তা অনেকটা লোক দেখানোর মতো, যাকে বলে শো-অফ।
আশির দশকে জন্মানোর ফলে মফস্বল শহরে আমরা শৈশবে বিদুৎ পেয়েছি বহু পরে। ১৯৯০ সালেরও পরে আমাদের অঞ্চলে বিদুৎ এসেছে থানা শহরের বাড়িগুলোয়। বিদ্যুৎ আসার আগেও কেউ কেউ বিশ্বকাপ দেখেছে, কিন্তু সেই দর্শক পুরো থানা শহরে একশজনের বেশি খুঁজে পাওয়া যেত না। আর অন্ধকার ও ঝিঁ ঝিঁ পোকার শহর থাকায় ছোটোদের সেই গল্পে প্রত্যাশিতভাবেই কোনো অবস্থান নেই। আমি প্রথম বিশ্বকাপের আমেজ পেতে শুরু করি, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে। তার আগে ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপ জিতিয়ে এলাকায় ম্যারাডোনার ভক্তদের সংখ্যা বেশ বেড়েছে। কথায় কথায় লোকজন কেবল ম্যারাডোনা। এমনকি ফুটবল খেলতে গিয়ে কেউ ব্যর্থ হলে তাকেও তিরস্কার করে ডাকা হতো মাইরাদ্যানা। এমন পরিবেশে বাড়ির বড়োদের মধ্যে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ভক্ততে ভাগাভাগি। কিন্তু পেলের খেলা দেখা কেউই নাই বাড়ির মধ্যে। যেহেতু প্রান্তিক শহর, তাই সেই আমলে টেলিভিশন তো পুরো থানায় দশ বিশজনের বেশি কারো বাড়িতে থাকত না।

ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার রোনালদিনহো ডি অ্যাসিস মোরেরা
গড়ে প্রতি ইউনিয়নে একটা বাড়িতে থাকত টিভি। আর ওখানে এত মানুষ হতো, যে আসলে ওই চৌদ্দ ইঞ্চির পৃথিবীতে ফুটবলে কোনটা কোন খেলোয়াড় তা নিয়েও একে অন্যের মতের ওপর নির্ভর করতে দেখেছি। সে যাই হোক। ’৯৪-এর বিশ্বকাপটাও এখনকার মতো আমেরিকায় হয়েছিল। ’৮৬-র বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ম্যারাডোনার নায়ক হয়ে যাওয়া, ’৯০-এর বিশ্বকাপে আবারও ফাইনালে তুলে তিনি তখন রীতিমতো বিশ্বের সেরা। এমন অবস্থায় আমেরিকা বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে পজিটিভ ধরা পরলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ততদিনে টেলিভিশন কিছুটা সহজলভ্য হতে শুরু করেছে। কিন্তু এত রাতে খেলা হয়, যে অন্যের বাড়িতে রাত-বিরেতে খেলা দেখার অনুমতি তখনও মেলেনি। আর তাই চারপাশে ম্যারাডোনাহীন বিশ্বকাপে বিষণ্ন একটা ভাব দেখতে পেরেছিলাম। যদিও সেবার ফাইনাল দেখার অনুমতি পেয়েছিলাম। তারও আগে পত্রিকার পাতায় নিয়মিত খেলার খবর পড়ায় জানতাম রবার্তো ব্যাজিও তখন বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়। আর ব্রাজিল-ইতালি ফাইনালের সেই টানটান উত্তেজনার খেলা। গোলশূন্য নব্বই মিনিট, অতিরিক্ত ৩০ মিনিট শেষে আবার টাইব্রেকার। আমার মনে আছে, প্রতিবেশী যে বাড়িতে বসে খেলা দেখেছিলাম, এক বড়ো ভাই সারাক্ষণ বকর বকর করতে থাকত। তার জন্য কমেন্ট্রির কিছুই শুনতে পারতাম না। তখন ইংরেজি শুনে বুঝতে পারা আরও পরের বিষয়। কিন্তু মাঠের উত্তেজনায় যেখানে আমার রক্ত হিম হয়ে যাবার জোগাড়, সেখানে তার বকর বকরের যন্ত্রণায় খেলাই দেখতে ইচ্ছে করছিল না। আর ব্যাজিওর সেই ঐতিহাসিক মিস, এক টাইব্রেকার শট ঠিকমতো করতে না পারায় নায়ক থেকে খলনায়কে রূপান্তর হওয়া ব্যাজিও তো এখনও বলে, সেই শট তাকে এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়।
তো টিভি রুমের নিয়ন্ত্রণ থাকত সেকেন্ড ইয়ারের এক বড়ো ভাইয়ের কাছে। সেই বড়ো ভাই ব্রাজিল সমর্থক। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ঘোষণা দিলো, ব্রাজিল ছাড়া আর কোনো দলের খেলা সে দেখতে দেবে না! আরে তাই কী হয়, সে-ই কি প্রথম ফ্যাসিবাদী মানুষের মুখ দেখেছিলাম?
তবে আমি প্রথম বিশ্বকাপ পুরোপুরি উপভোগ করতে পেরেছিলাম ১৯৯৮-এ। সেবার হোস্টেলে ছিলাম। ক্লাস নাইনে পড়ি। ময়মনসিংহ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-টিটিসির হোস্টেলে। ওখানে ক্লাস নাইনের ছেলেদের ফার্স্ট ইয়ার বলত, আর ক্লাস টেনের ছেলেদের সেকেন্ড ইয়ার বলা হতো। তো টিভি রুমের নিয়ন্ত্রণ থাকত সেকেন্ড ইয়ারের এক বড়ো ভাইয়ের কাছে। সেই বড়ো ভাই ব্রাজিল সমর্থক। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ঘোষণা দিলো, ব্রাজিল ছাড়া আর কোনো দলের খেলা সে দেখতে দেবে না! আরে তাই কী হয়, সে-ই কি প্রথম ফ্যাসিবাদী মানুষের মুখ দেখেছিলাম? আমি তো বাড়ি ও চারপাশের প্রতিবেশে ততদিনে আর্জেন্টিনা সমর্থক হয়ে উঠেছি। দৈনিক পত্রিকায় বিশ্বকাপের বড়ো তারকাদের ছবি ছাপত, পোস্টারের মতো করে।
সেবার আমরা ক্রোয়েশিয়ার উত্থান, ডেভর সুকারের বিশ্বকাপে চমক দেখানো দেখলাম। আর দেখলাম টানা দ্বিতীয়বারের ফাইনালে ওঠা ব্রাজিলকে হারিয়ে ফ্রান্সের প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়। আমাদের চারপাশে তখন জিদান, রোনালদো আর ডেভর সুকারই সবচেয়ে বড়ো তারকা!
আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের ছবি পত্রিকা কেটে পড়ার টেবিলের সামনে লাগানো ছিল। অ্যারিয়েল ওর্তেগা আর গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার সাথে সেই ক্লাস নাইনের পড়ার ছবি এখনও আছে। কিন্তু যে প্রশংসা আমি শুনে শুনে (যেহেতু দেখার সুযোগই কম ছিল) আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়েছিলাম, সেই জাদুকরি খেলা পরে আমি দেখেছি ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে রোনালদিনহোর কাছ থেকে। এবং সেই থেকে আমি রোনালদিনহোর ভক্ত। কিন্তু বাংলাদেশি ফুটবল ভক্তদের মতো আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল বলে আমি চিল্লাতে পারি না। রুচি হয় না এত ক্যাওটিক ফ্যান হবার। হ্যাঁ, ’৯৮ বিশ্বকাপে সেই বড়ো ভাইয়ের এই ফ্যাসিবাদ টেকেনি। আর্জেন্টিনা সমর্থকরা ছাড়াও এ নিয়ে হোস্টেলে ব্যাপক ক্যাওস করে শেষ পর্যন্ত সবার জন্য (যেকোনো খেলার জন্য) হলের টিভিরুম উন্মুক্ত ছিল। সেবার আমরা ক্রোয়েশিয়ার উত্থান, ডেভর সুকারের বিশ্বকাপে চমক দেখানো দেখলাম। আর দেখলাম টানা দ্বিতীয়বারের ফাইনালে ওঠা ব্রাজিলকে হারিয়ে ফ্রান্সের প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়। আমাদের চারপাশে তখন জিদান, রোনালদো আর ডেভর সুকারই সবচেয়ে বড়ো তারকা! পরে জানলাম, ডেভর সুকার বিশ্বকাপে চমক দেখানো তার জন্য প্রত্যাশিতই ছিল। রিয়াল মাদ্রিদের নাম্বার নাইন হিসেবে খেলা সুকার আসলেই বিশ্বসেরাদের একজন।
২০০২ বিশ্বকাপটা ছিল স্বপ্নের মতো। বিশেষ করে সময়। খেলা প্রচারের সময় ছিল আমাদের জন্য খুবই কনভিনিয়েন্ট টাইমে। আর সে সময় বাসায়ও টিভি চলে এসেছে। যদিও সাদাকালো, ফলে ওই সময় প্রচুর খেলা দেখা হয়েছে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলা আসলেই বাড়ির বাইরেরও দুই একজন দর্শক জুটত। ততদিনে টিভি সহজলভ্য হয়েও উঠেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও পৌঁছে যাচ্ছে টিভি। আর সেই সুযোগে বাড়ল বিশ্বকাপের দর্শকও। আর এক ব্রাজিলিয়ান জোগো বনিতার সন্ধান পেয়ে রোনালদিনহোর ভক্ত বনে গিয়ে বাংলাদেশের তথাকথিত ফুটবল সমর্থকদের মতো না থাকতে পেরে সেই বিশ্বকাপ শেষে এত আনন্দ হয়েছিল যে বলে বোঝাতে পারব না। আর তারও কিছুদিন পর থেকে যখন নিয়মিত ক্লাব ফুটবল ফলো করা শুরু হয়, তখন তো রোনালদিনহোই আসলে আমার তারকা। আমার কাছে ফুটবল উপভোগের পর যে ধরনের খেলা আমি আদতে ভালোবাসি বলে মনে করি, তা আসলে রোনালদিনহোর কাছেই প্রথম দেখি। সে-ই আমার মানদণ্ড। আর তার হাতে ২০০২-এর বিশ্বকাপ দেখেও আদতে আনন্দিত। আমার মনে হয় না, এই প্রজন্মের কোনো আর্জেন্টাইন ভক্তও রোনালদিনহোকে সম্মান কম করে। এইটাই ফুটবলের সৌন্দর্য। আর সেই সৌন্দর্যই থাকুক সব ফুটবল ভক্তদের মনে।

জন্ম ১৯৮৪; ময়মনসিংহ। শিক্ষা : স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।