শুক্রবার, জুন ১৯

কয়েক ছত্র, প্রাণের পত্র

0

১৯৮২ সাল। মাত্রই নয় বছর বয়স। দুনিয়াদারির কী বুঝি! কিন্তু তখনই, সম্ভবত বড়ো ভাই শ্রেণীয়দের সুবাদে বাতাসে একটা পরিবর্তন টের পেলাম। কিছু একটা হচ্ছে। উত্তেজনা যে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে তা অবশ্য সেভাবে বুঝিনি। ফলে জুলাইয়ের এক রাতে রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে (পশ্চিম) জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতালি যে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিলো সেটা তখন বোঝার ক্ষমতা হয়নি। তারপর ধীরে ধীরে ফুটবল-চক্ষু উন্মীলিত হলো। ফুটবল দেখা ও উপভোগের স্বাদ পেলাম। সময়ের প্রবাহে এলো ১৯৮৬। বয়সকালে সবাইকে একটা না একটা দল সমর্থনের জন্য বেছে নিতে হয়। আমিও নিলাম। দলটা পশ্চিম জার্মানি। কেন জার্মানি? কোনো ব্যাখ্যা নেই। বলা যায় এমনি এমনিই। যাই হোক, মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ নিয়ে প্রথম হৃদয়ভঙ্গের স্বাদ পেলাম। পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নিলো আর্জেন্টিনা। সমর্থক হিসেবে তখন বেশ নতুন। ফলে জার্মানদের পরাজয়টা সেভাবে কষ্ট দেয়নি। বরং উল্টো একটা ঘটনা ঘটল। সেই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে দেওয়া অতিমানবীয় এক গোলের সুবাদে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা এক লিটল মাস্টার হৃদয় জয় করে নিলেন। নাম তার দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। পৃথিবীর নতুন ‘ফুটবল ঈশ্বর’। ফলে ১৯৯০ বিশ্বকাপে দল বদলে কঠিনভাবে ভিড়ে গেলাম ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আর হোর্হে লুই বোর্হেসের দেশ আর্জেন্টিনায়। সেবারই প্রথম বিপুল উৎসাহ নিয়ে রাত জেগে ফুটবল দেখা শুরু। বলা যায় ‘পেশাদার দর্শকে’র খাতায় নাম লেখানো।

সময়ের প্রবাহে এলো ১৯৮৬। বয়সকালে সবাইকে একটা না একটা দল সমর্থনের জন্য বেছে নিতে হয়। আমিও নিলাম। দলটা পশ্চিম জার্মানি। কেন জার্মানি? কোনো ব্যাখ্যা নেই। বলা যায় এমনি এমনিই। যাই হোক, মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ নিয়ে প্রথম হৃদয়ভঙ্গের স্বাদ পেলাম। পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নিলো আর্জেন্টিনা।

৮ জুলাই ১৯৯০-এর রাত। চার বছর আগের ফাইনালেরই পুনরাবৃত্তি। ব্যতিক্রম কেবল, আমার সমর্থন এবার জোরেশোরে আর্জেন্টিনার দিকে। কিন্তু হায়! পেনাল্টি থেকে আন্দ্রেয়াস ব্রেহমার দেওয়া একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয় ভাঙল জার্মানি। কাঁদলেন ম্যারাডোনা। কাঁদালেন বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তকে। খেলার মুন্সিয়ানা, কৌশল এবং হাজারটা টেকনিক্যাল মারপ্যাঁচের পরও দিনশেষে খেলা জিনিসটার সম্পর্ক আবেগের সাথে। যে যা-ই বলুক, অত্মর্গত এক আবেগের কারণেই নির্দিষ্ট কোনো দলকে সমর্থন করে সে। কেবল মুন্সিয়ানা ও কারিগরি দক্ষতার জন্য সমর্থন করলে বছর বছর কোটি কোটি মানুষ প্রিয় দল পাল্টাত। তা কিন্তু ঘটে না। আবেগে ভর করেই দলগুলোকে সমর্থন (বা অসমর্থন) দিই আমরা। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে।

১৯৯০-এর পর একের পর এক বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে আমার একের পর এক আশাভঙ্গ। নব্বইয়ের পর ব্রাজিলের এক বিশাল উত্থান ঘটল। ৯৪, ৯৮, ২০০২— তিন বিশ্বকাপের তিনটিতেই ফাইনালে খেলে দু’বার বিশ্বকাপ জয়। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, দুঙ্গা, বেবেতো, কাফুদের জয়জয়কার চারদিকে। ১৯৭৮ থেকে ৯০-এ চার বছরে তিন-তিনবার ফাইনাল খেলা এবং দু’বার কাপ জয় করা আর্জেন্টিনা শিবিরে এক ধরনের ভাটার টান; ৯৪ বিশ্বকাপে ড্রাগ টেস্টে ব্যর্থ হয়ে ম্যারাডোনার সাসপেন্ড হওয়া থেকে যার শুরু। সত্য বটে, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হারনান ক্রেসপো, আরিয়েল ওর্তেগা আর পাবলো আইমারের মতো প্রতিভারাও ৯০-এর দশক জুড়ে আর্জেন্টিনা দলে খেলেছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যে বাড়তি ম্যাজিক, দলীয় শক্তির যে সম্মিলিত স্ফুরণ, তার কিছুই ছিল না এসময় আর্জেন্টিনা দলে। ফলে একটার পর একটা বিশ্বকাপ এসেছে আর গেছে, আমরা আর্জেন্টিনার ভক্তরা সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’-র সেই ‘ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে ভেতরে রাস উৎসব’ দেখেছি! আর অপেক্ষা করেছি নতুন কোনো ফুটবল ঈশ্বরের জন্য, এমন কেউ, প্রবল ঝাঁকি দিয়ে আর্জেন্টিনার ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগিয়ে দেবে যে।

অবশেষে সে এলো। এলো চুপিসারে। সবার অগোচরে। ২০০৬-এর ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে খেলার ৭৪ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামল ১৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সী এক প্রায়-কিশোর। একটি গোল করে ও একটি গোলে অ্যাসিস্ট করে নিজের আগমনবার্তা জানাল সে। তার নাম লিওনেল মেসি।

তারপর ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠল আর্জেন্টিনার মেসিয়া। সত্যিকারের এক ম্যাজিশিয়ান। তার পায়ের ছোঁয়া সুন্দরতম কবিতার চেয়েও সুন্দর। খেলোয়াড় শব্দটা তার জন্য রীতিমতো অশ্লীল। সে শিল্পী। জাদুকর। ঐন্দ্রজালিক। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যেমন মোহন বাঁশির সুরে ঘোর জাগাত, ফুটবল পায়ে লিওনেল মেসিও ঘোর জাগায়। ঘোরগ্রস্ত দর্শক ভাবে, চোখের সামনে যা দেখছি তা কি সত্যি? এমন অসম্ভব কোণ থেকেও গোল করা সম্ভব? এমন অনায়াস নৈপুণ্যে রাজত্ব করা সম্ভব ফুটবল মাঠে?

আমরা আর্জেন্টিনা সমর্থকরা আবার জাগলাম। আশায় বুক বাঁধলাম আবার। এলো ২০১৪। জাদুকর ঠিকই আমাদের ফাইনালে তুললেন। সামনে সেই আজন্ম নেমেসিস জার্মানি। এবং আবারও আশাভঙ্গ। মারিও গোটশের গোলে ৯০-এর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে কাপ নিয়ে গেল জার্মানি। মেসির চোখে অশ্রু। হলো না, এবারও হলো না! বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হতাশ্বাস।

তারপর ১৮ ডিসেম্বর। লুসাইল স্টেডিয়াম। সামনে পরাক্রান্ত ফ্রান্স। এমবাপ্পে নামের দুর্ধর্ষ এক সিপাহসালার। তারপর? সেকথা ইতিহাসের গল্পগাথার অংশ হয়ে আছে। নিজের চোখে যারা দেখেনি তাদের বোঝানো যাবে না সে রাতে কী ঘটল। এক অবিশ্বাস্য রাত। এমন রাত হাজার বছরে কালেভদ্রে আসে। প্রবল নাটকীয়তার পর অবশেষে সোনালি বিশ্বকাপ খুঁজে পেল তার জন্মের সার্থকতা।

তারপর ২০২২। মরুর বুকে ঘূর্ণিঝড়! শুরুটা অবশ্য প্রবল হতাশা জাগিয়ে। ফুটবল বিশ্বের ব্যাকবেঞ্চার সৌদি আরবের কাছে পরাজয়। প্রবল আশাবাদী ছাড়া বাকিরা ভাবলাম, এবারও হবে না, ফুটবল বিশ্বকাপ অধরাই থেকে যাবে জাদুকরের। কিন্তু পরের ম্যাচ থেকেই বিস্ময়ের শুরু। একের পর এক দল কুপোকাত হতে লাগল মেসি অ্যান্ড কোম্পানির হাতে। তারপর ১৮ ডিসেম্বর। লুসাইল স্টেডিয়াম। সামনে পরাক্রান্ত ফ্রান্স। এমবাপ্পে নামের দুর্ধর্ষ এক সিপাহসালার। তারপর? সেকথা ইতিহাসের গল্পগাথার অংশ হয়ে আছে। নিজের চোখে যারা দেখেনি তাদের বোঝানো যাবে না সে রাতে কী ঘটল। এক অবিশ্বাস্য রাত। এমন রাত হাজার বছরে কালেভদ্রে আসে। প্রবল নাটকীয়তার পর অবশেষে সোনালি বিশ্বকাপ খুঁজে পেল তার জন্মের সার্থকতা। ফুটবল ঈশ্বরের হাতের ছোঁয়া পেয়ে ধন্য হলো সে। ধন্য হলাম আমরা। জনজোয়ার নামল রাস্তায় রাস্তায়। অলিতে গলিতে। আকাশি-নীলের জাদুস্পর্শে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে লেখা হলো ভালোবাসার নতুন কবিতা। ধ্বনিত হলো প্রেমের নতুন শ্লোগান।

বছর ঘুরে আবার এসেছে বিশ্বকাপ। এবার খেলা দেখব নিশ্চিন্ত আর নির্ভার হয়ে। ইতিহাসের দায় শোধের তাড়া নেই আর। নেই মাথার ওপর অনন্ত চাপ। নখ কামড়ানো টানটান উত্তেজনাকে ছুটি দিয়েছি। খেলা দেখব কেবলই উপভোগের জন্য। মাঠে আবারও মেসি। জীবনের শেষ বিশ্বকাপে। বুড়ো হাড়ে আবারও কি ভেল্কি দেখাবেন? ভরসা কম।

তবু নিয়মিতই বসব টিভির সামনে। জোর গলায় সমর্থন দেব প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে। বাকিটা? দেখাই যাক!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ফেনীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একই বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। লেখালেখির শুরু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, পত্রপত্রিকায়। গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি ইতিহাস, তথ্যপ্রযুক্তি, ছোটোদের জন্য রূপকথা নানা বিষয়ে লিখেছেন। বিশেষ আগ্রহ অনুবাদে। সিলভিয়া প্লাথের ‘দি বেল জার’ ছাড়াও ইতিহাসভিত্তিক কয়েকটি বই অনুবাদ করেছেন। মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বাইশ।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।