গানের মানুষ
হেঁটে যাচ্ছে এক পাল ভেড়ার পিছনে
গান আর গানের মানুষ
আকাশ যেভাবে ধীরে নিচু হয়ে দিগন্তে মিশেছে
প্রান্তরও এখানে ক্রমে ঢালু হয়ে নদীটিকে
ছোঁয়
গান ও ভেড়ার পাল নিয়ে এক আদিবাসী মেয়ে
নেমে গেল ঘাসজমির দিকে
ওর গান আমাকে ছুঁয়েছে
শ্রোতার ব্যর্থতা এই— গানের মেয়েটির মন
কোনোদিন ছুঁতেও পাবে না
টেবিল ল্যাম্প
টেবিলে জ্বলছে একটি টেবিল ল্যাম্প
তোমার পাঠানো— তোমার মুখের মতো সুন্দর
একটি টেবিল ল্যাম্প
আলোর দুহাত দিয়ে আমাকে জাপটে ধরে চুমো খায়
সুইচ-অফ হলে
আমার বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে
তোমার চুলের ঘ্রাণে ভরে ওঠে সমস্ত সকাল
তোমার স্তনের মতো সুন্দর একটি টেবিল ল্যাম্প
আলো নয় বয়ে যাচ্ছে দুধের
প্রবাহ
প্রতিরাতে পান করে বেড়ে উঠছে আমার কবিতা
দুধের বালতিতে পিস্তল
দুধের বালতির মধ্যে কার্তুজ লোড করা
পিস্তল ডুবিয়ে
কার দরজায় গিয়ে লোকটি কলিংবেল চাপল
‘দুধ লাগবো— দুধ, খাঁটি গরুর দুধ’
তারপর দরজা খুলে গেল
তারপর গুলির শব্দ
কোন গাভীর বাট থেকে বেরিয়ে আসছে কার্তুজ
লোড করা পিস্তল
টাইম মেশিন
কফিনের মতো এক টাইম মেশিন, ঠিক কফিনের মতো নয়
জীবনের সমস্ত রাগ রিভলভারের মতো কোমরে ঝুলানো
ঠিক রিভলভারের মতো নয়
বিকেলে হেমন্তের রোদ নামছে বাড়ির উঠোনে
পাখি ডাকছে ‘বউ কথা কও’
ঠিক ‘বউ কথা কও’ নয় সুখে উঠে বসি টাইম মেশিনে
তেতাল্লিশ বছর পিছনে… আমি-ই এক আট বছর বয়সি বালক
পালিয়ে এলাম যাকে মুহূর্তেই গুলি করে
ওর লাশ হেমন্তের রোদ মেখে বাড়ির উঠোনে পড়ে আছে
ঠিক বাড়ির উঠোনে নয়
রাত এগারোটার ট্রেন
রাত এগারোটার ট্রেন, শীত আর কুয়াশার ভেতরে দিয়ে
চলে যাচ্ছে
কামরায় মৃদু আলো, জানালার পাশে তুমি বসে আছো
ভাবনা মগ্ন
তোমার মুখের ছবি অন্ধকার মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে
এক বটগাছ
শিশিরভেজা পাতা ওপরে ডিএসএলআর ক্যামেরার মতো
জুম করে তুলে নিয়ে আমাকে পাঠাল
কফির তেষ্টা পেলে, হঠাৎ কফিঅলা ফেনাতোলা গরম কফি নিয়ে
তোমার সামনে হাজির— ওকে আমিই পাঠিয়েছি
চোখে ঘুম নামলেই টানটান শুয়ে পড়ে অনুভব করো—
ট্রেনের চলার মধ্যে
সঙ্গমকালীন এক পরিচিত দোলনির সুখ
আমার কল্পনার স্যাটেলাইট রাতভর আরও কত
ছবি তুলে পাঠাচ্ছে
রাত এগারোটা কুড়ি মিনিটের ট্রেন থেকে
ম্যাজিক টাইম
দেয়াশলাই বাক্স খুলেছি— ভেতর থেকে
উড়ে গেল পাখি
গতরাতে ঝরে পড়া ফুলগুলো গাছে উঠে
পা দোলাচ্ছে
কী হচ্ছে এসব!
সন্ধ্যা ও কুয়াশার ভেতর নির্জন রাস্তায় সাইকেল আরোহী
তাঁর সিগারেটের আগুন থেকে আমার সিগারেট
জ্বলিয়ে নিয়েছি
তারপর জানতে চেয়েছি— কী হচ্ছে এসব!
কোনো উত্তর না করে লোকটি সাইকেল চালিয়ে
চাঁদে উঠে গেল
ছোটোলোকের কবিতা
ছোটো যেকোনো বিষয় কিংবা ঘটনা-ই ভালো লাগে
মোটা ভারি আর ফাঁপা বইগুলোর চেয়ে
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ ভালো লাগে
নির্জন দ্বীপের মতো চিবুকের কাছে তার ছোটো তিল
হোয়াইট হাউস কিংবা পেন্টাগনের চেয়ে ভালো লাগে
ভালো লাগে কৃষকের ধুলোমাখা ছোট্ট জীবন
বলতেও দ্বিধা নেই— আমি খুব ছোটোলোক
বৃষ্টি, শেফালী বাগানে
যখন গোসল শেষে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি
পানকৌড়ির মতো নাচের মুদ্রায়; চুলে তোয়ালে জড়িয়ে
জল ঝেড়ে ফেলো
কোনো এক মেঘ সেই বাস্পীভূত জলের উত্তরাধিকার পেয়ে
উড়ে যায়
সেই মেঘ কেবল শেফালী বনে বৃষ্টি হয়ে ঝরে
শেফালী ফুলেরা ফোটে তোমার চুলের ঘ্রাণে
২.
উৎসব অনেক হল; পূর্ণতা এলো না
শেষমেষ শ্রাবণও এসে গেল — তোমাকে ভেজাতে
তাই বলে বাগানের গাছেরা কী ভিজবে না!
ভিজে যাচ্ছে ছাদ বাগানের দুটি
রক্তকরবী চারা
তোমার শেফালীবন ভিজে যাচ্ছে গোপন শ্রাবণে
তেপান্তরের মাঠে
আমাদের ঝগড়া শেষে চুপচাপ সন্ধ্যা আসে
দিগন্তে—
তাকালে দেখি, তোমার মুখের মতো মস্ত চাঁদ
উঠে আসছে অরণ্যের কাঁধের ওপর
তুমি কী করছো তখন; আমি ঠিক বুঝতে পারি না
রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি
ডেলটন সাহেবের ভাঙা-দূর্গ পার হয়ে হেঁটে হেঁটে তেপান্তরের মাঠে
পৌঁছে যাই
ঘাসে পিঠ রেখে নিজের ছায়ার ওপর শুয়ে পড়ি
মাথার ওপরে ধীরে চাঁদ উঠে আসে
তুমি কী ঘুমিয়ে গেছো ঘুমমাখা নরম বালিশে
নাকি তুমি ঘুমহীন বারান্দায় বসে বসে আমাকে পাঠাচ্ছো
তেপান্তরের মাঠে এইসব ঝিঁঝিঁর চিৎকার
বিমান থেকে লাফ দেবার পর
বিমান থেকে লাফ দেবার পর দারুণ পুলক হচ্ছে
নিউটনের আপেল তত্ত্ব অনুভূত হচ্ছে
পাখি পাখি অনুভূতি হচ্ছে
শৌখিন স্যুটার কিংবা চোরাশিকারি
যেই হোন— গুলি ছুঁড়বেন না
প্রশ্ন করবেন না— কী হয়েছিল বিমান থেকে
লাফ দেবার পর?
এখনো আমার লাফ ভূপৃষ্ঠ স্পর্শ করেনি

কবি
জন্ম ১সেপ্টেম্বর ১৯৭০। সোনাপাড়া, পাঁচবিবি, জয়পুরহাট। লেখালেখির উন্মেষকাল নব্বই দশক। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে কবিতার বই ১২টি। সম্পাদক হিসেবেও যুক্ত আছেন বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে।