কিছু সম্পর্কের কথা সরাসরি বলা যায় না। বললেই তারা ছোটো হয়ে যায়। তাদের চারপাশে এত নীরবতা, এত ছায়া, এত অর্ধেক উচ্চারিত বাক্য জমে থাকে যে ভাষা সেখানে প্রায়ই অপ্রতুল হয়ে পড়ে। তাই হয়তো মানুষ গল্প লেখে, গান লেখে, কিংবা এমন কিছু সংলাপ নির্মাণ করে যেখানে দু’জন মানুষের নাম থাকলেও প্রকৃতপক্ষে কথা বলে সময়, অনুপস্থিতি এবং স্মৃতি।
আমরা সাধারণত মনে করি বিচ্ছেদ একটি ঘটনা—কোনো নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট মুহূর্ত, নির্দিষ্ট বিদায়। কিন্তু জীবনের অধিকাংশ বিচ্ছেদ কি সত্যিই সেরকম? অনেক সম্পর্কের কোনো শেষ দৃশ্য নেই, কোনো চূড়ান্ত সংলাপ নেই, কোনো পর্দা পড়ার শব্দও নেই। তারা ধীরে ধীরে বাস্তবতার মাটি ছেড়ে স্মৃতির ভেতর গিয়ে বাসা বাঁধে। মানুষটি তখন আর কেবল মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে কোনো এক ঋতুর গন্ধ, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার রং, কিংবা একটি পুরোনো গানের মধ্যে আটকে থাকা অদৃশ্য প্রতিধ্বনি।
আশ্চর্যের বিষয়, স্মৃতি কখনও সময়ের নিয়ম মানে না। দশ বছর আগের একটি বিকেল হঠাৎ আজ সকালের জানালায় এসে বসতে পারে। বহুদিন উচ্চারণ না করা একটি নাম ভিড়ের মাঝখানে হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিস করে উঠতে পারে। তখন মনে হয়, সময় সামনে এগোয় না; সে কেবল বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে একই দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।
হয়তো এই কারণেই মানুষ হারিয়ে যায়, অথচ অনুপস্থিতি থেকে যায়।
কিন্তু ভারতীয় দর্শনের প্রাচীনতম অন্তর্দৃষ্টিগুলোর একটি আমাদের অন্য কথা বলে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন—
‘অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে।
গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ।।’’ (২.১১)
অর্থাৎ, যাদের জন্য শোক করার প্রয়োজন নেই, তুমি তাদের জন্য শোক করছ; অথচ জ্ঞানীর মতো কথা বলছ। জ্ঞানীরা জীবিত কিংবা মৃত কারও জন্যই শোক করেন না।
এই শ্লোকের গভীরে কেবল মৃত্যুর দর্শন নয়, বিচ্ছেদের দর্শনও লুকিয়ে আছে। আমরা ভাবি সম্পর্ক ভেঙে গেছে, মানুষ চলে গেছে, বন্ধন ছিন্ন হয়েছে। কিন্তু কে জানে? হয়তো যা চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে, তা কেবল রূপ বদলেছে। নদী যেমন সমুদ্রে মিশে নাম হারায়, তেমনি কিছু সম্পর্কও একসময় পরিচয় হারিয়ে অস্তিত্বের বৃহত্তর নীরবতায় বিলীন হয়ে যায়। আমরা সেই নীরবতাকে বিচ্ছেদ বলে ভুল করি।
কিন্তু মানুষের হৃদয় বড়ো অদ্ভুত। সে সেই ঘোষণাকেও শেষ কথা বলে মানতে চায় না। কারণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রতিধ্বনি নয়। কিছু কণ্ঠস্বর পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেও আমাদের অন্তরে থেকে যায়। কিছু গল্পের সমাপ্তি লেখা হয় না; তারা পাঠকের মনের মধ্যে অনন্তকাল ধরে নিজেকে পুনর্লিখন করতে থাকে।
এই অনুপস্থিতির দর্শন কেবল ভারতীয় ভাবনায় নয়, বিশ্বের নানা আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি লিখেছিলেন—
‘শোক কোরো না। যা কিছু হারিয়ে যায়, তা অন্য কোনো রূপে ফিরে আসে।’
কথাটি আক্ষরিক সত্য কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু মানবস্মৃতির জগতে এর গভীর বাস্তবতা আছে। মানুষ চলে যায়, অথচ তার হাসি থেকে যায়; একটি সম্পর্ক শেষ হয়, অথচ তার প্রতিধ্বনি থেকে যায়; একটি নাম মুছে যায়, অথচ তার উচ্চারণের অভ্যাস মুছে যায় না।
স্বামী বিবেকানন্দ এক স্থানে বলেছিলেন, ‘Nothing is ever lost in the universe.’ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কিছুই সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না—রূপান্তরিত হয় মাত্র। এই ধারণা গীতার দর্শনের সঙ্গে এক অদ্ভুত সাযুজ্য বহন করে। আমরা যাকে বিচ্ছেদ বলি, হয়তো তা অস্তিত্বের কোনো বৃহত্তর পরিবর্তনের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা। একটি সম্পর্ক তার পুরোনো ভাষা হারায়, কিন্তু তার অর্থ হারায় না; একটি উপস্থিতি দৃষ্টিসীমা থেকে সরে যায়, কিন্তু চেতনা থেকে নয়।
প্রাচীন স্টোইক সম্রাট-দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াস লিখেছিলেন—
‘Accept the things to which fate binds you.’
ভাগ্য যে বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের যুক্ত করে, তাকে গ্রহণ করার মধ্যেই মুক্তি। আর আরেক গ্রিক স্টোইক দার্শনিক এপিকটেটাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—
‘মানুষ ঘটনাগুলোর দ্বারা ততটা কষ্ট পায় না, যতটা কষ্ট পায় সেগুলো সম্পর্কে নিজের ধারণার দ্বারা।’
তবু গ্রহণ মানে বিস্মরণ নয়। স্টোইকদের প্রজ্ঞা, রুমির মরমিয়া অন্তর্দৃষ্টি, বিবেকানন্দের বেদান্ত এবং কৃষ্ণের উপদেশ—সবকিছু যেন এক বিন্দুতে এসে মিলে যায়। তারা কেউ আমাদের স্মৃতি ত্যাগ করতে বলেন না; তারা কেবল স্মৃতির দাস হয়ে থাকতে নিষেধ করেন। ভালোবাসা ছিল—এই সত্যকে অস্বীকার না করে, তার অনুপস্থিতিকেও জীবনের অংশ হিসেবে ধারণ করতে শেখান।
তখন মনে হয়, কৃষ্ণের সেই প্রাচীন উপদেশ হয়তো কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য ছিল না। হয়তো তা ছিল সমস্ত হারিয়ে যাওয়ার জন্য। সমস্ত বিচ্ছেদের জন্য। সমস্ত অপ্রাপ্ত ভালোবাসার জন্য।
কারণ মৃত্যু সমাপ্তি চায়, বিচ্ছেদও সমাপ্তি চায়।
কিন্তু জীবন সবসময় সমাপ্তি দেয় না।
কিছু মানুষ চলে যায়।
কিছু নম্বর অচল হয়ে যায়।
কিছু দরজা আর কখনও খোলে না।
আর তারপর আসে সেই মুহূর্ত।
বহুদিন পর, বহু ঋতু পেরিয়ে, বহু অপ্রয়োজনীয় সাহস সঞ্চয় করে কেউ আবার ডায়াল করে একটি পুরোনো নম্বর।
হয়তো সে জানে না কেন করছে। হয়তো সে নিজেও উত্তর খুঁজছে না। হয়তো সে কেবল শুনতে চায়, পৃথিবীর কোথাও এখনও সেই কণ্ঠস্বরের অস্তিত্ব আছে কি না।
কিন্তু ওপাশে যে কণ্ঠ ভেসে আসে, তা পরিচিত নয়।
সেখানে কোনো অভিমান নেই।
কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো ভালোবাসাও নেই।
শুধু একটি যান্ত্রিক ঘোষণা—
‘এই সংযোগ আর বিদ্যমান নয়।’
তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
তবু কোনো এক গভীর, অদৃশ্য স্তরে তাদের উপস্থিতি থেকে যায়—একটি পুরোনো গানের মতো, যার সুর ভুলে গেছি, কিন্তু বিষণ্নতা এখনও মনে আছে।
সেখানে আর কেউ নেই।
তবু মনে হয়, কেউ যেন খুব দূর থেকে ডাকছে।
আর আমরা, উত্তর না পাওয়ার পরও, অদ্ভুত এক মমতায়, সেই ডাকের দিকেই কান পেতে থাকি।
তখন বুঝি, শোকেরও এক সীমা আছে। তার পরে থাকে নীরবতা। আর সেই নীরবতার গভীর থেকে ভেসে আসে একটি প্রাচীন আহ্বান—
‘কিন্তু শোক করিও না, কদাপি না।’

ইংরেজি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের একজন গবেষক, শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, বেদান্ত, অস্তিত্ববাদ, আধ্যাত্মিকতা এবং মানব-অভিজ্ঞতার নন্দনতত্ত্ব। বর্তমানে তিনি পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।