দুপুর এমন যেন একটা ডিমের মধ্যভাগ নিয়ে নেমে এলো। হাইওয়ে ধরে কত কত গাড়ি চলে যাচ্ছে। শাই শাই বাতাসের শব্দে একটি নসিমন নাচতে নাচতে চলে গেল। কিছু কবুতর দেখলাম বসে আছে ‘খান ফিলিং স্টেশন’-এর টিনশেডের উপর। এই তো কিছুদিন আগেই জানলাম, কবুতরেরা নাকি পথ খুঁজতে একসাথে দুটি সূত্র ব্যবহার করে— সূর্যের অবস্থান ও পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র। সেই অভূতপূর্ব আলোর ভেতর দৈত্যের মুখও মুছে দিতে পারে তারা। কী অদ্ভুত লাগছে। মনে হলো—আমি হাঁটি আর দেখতে দেখতে দৃশ্যের অন্যরকম দৃষ্টি ফুটে ওঠে চোখের ভেতর। চোখ যেন উঁচু দুর্বা ঘাসের মতো দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত। সময়, আমি কী তোমার দল ছেড়ে একা হয়ে পড়ছি?
‘খান ফিলিং স্টেশন’-এর পাশে একটি সরু খাবারের হোটেল। এই হোটেলটায় আমি আরও দুইবার এসেছিলাম। এর নামটা সুন্দর ‘ডাল-ভাত হোটেল’। শুনলেই যেন ভাতঘুমের কথা মনে পড়ে। এখানে দুপুরে কেবল মসুরের ডাল আর ভাত ছাড়া কিছুই হয় না। সাথে পাবেন আলুভর্তা। ব্যাপারটা দারুণ না! ভাত খাওয়ার পর এখানে বসে আপনি একটা দুপুর কল্পনা করতে পারবেন— যার ছায়াজুড়ে হাওয়া আর সামনের খোলা প্রান্তরে উন্মত্ত সিম্ফনি। হোটেলটার পেছনে বড়ো বড়ো দুইটা মাটির টিলা আছে। এতে বোঝা যায়, এখানে ইটের ভাটা ছিল। হয়তো ইটের ভাটার চুল্লিটা মলিন জামা পরে কোথাও আকাশ হয়ে গেছে।
আর একটা কাক ময়লার উপরে বসে বাতাসের মুখ আবিষ্কার করছে। কাক ও ছেলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ পরপর। তখন আমার মনে হলো— একটি দৃশ্য বা বস্তুতে অনেকক্ষণ দৃষ্টি স্থির রাখতে পারছে না কেউই।স্থির নয় অপেক্ষাসমূহ, আমার ভূগোল কেন, সবখানে ধুলোময়।
০২.
তারপর একদল ভেড়া খুব ধীরে, স্থির হেলেদুলে চলে যাচ্ছে। যেন তারা এইমাত্র নেমে এসেছে লোমশ পৃথিবী থেকে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে জেনেছি, দূর থেকে গ্রাম সুন্দর। যেখানে গাছ ও পথ ঘিরে থাকে মানুষের লৌকিক আক্ষেপ। একটা ভিমরুলকে দেখলাম ভয়ার্ত কালো রঙ ছিঁড়ে পালাচ্ছে কেবল আরও আরও সবুজে। এরপর সবুজের ভেতর থেকে যে মানুষটা বের হয়ে এলো—বৃদ্ধ—খাটো-কালো। তার হাতে ছিল কালো রঙের ছাতা ধরা। তাকে কিছু বলার আগেই, সে আমাকে বলে ফেলল— আমার নাম রজব আলী। আমার গ্রাম শালিখা। তার কথা শুনে দুপুর স্বয়ং নীরব। আর আমার আত্মায় নামছে ধ্যান। একটু একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। আমি লেবু পাতার সান্নিধ্য পেতে যত এগিয়ে গেলাম, লেবুগুলো তত বেশি ঝুলে যেতে চাইল। কী মুশকিল, সে কথাই ভাবছি— আমি কী লেবু পাতা হাতে নিয়ে কচলিয়ে ঘ্রাণ নেব, নাকি সেখান থেকে ফিরে আসব! রাস্তার ওইপাশে ময়লার স্তুপ। পৌরসভার একটা নির্দিষ্ট গাড়ি এসে প্রতিদিন এখানে ময়লা ফেলে যায়। সম্ভবত শহরের যত ময়লা এখানেই ফেলা হয়। একটা ছেলে ময়লার ভাগাড় থেকে বেছে বেছে বোতল-কাগজ-লোহালক্কর সংগ্রহ করে বস্তায় ভরছে। আর একটা কাক ময়লার উপরে বসে বাতাসের মুখ আবিষ্কার করছে। কাক ও ছেলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ পরপর। তখন আমার মনে হলো— একটি দৃশ্য বা বস্তুতে অনেকক্ষণ দৃষ্টি স্থির রাখতে পারছে না কেউই।স্থির নয় অপেক্ষাসমূহ, আমার ভূগোল কেন, সবখানে ধুলোময়।
তারও পূর্বে এক হাওয়ার ঝাপটায় আমি জেনেছি—সূর্যে আমার পূর্বপুরুষের বিশ্বাসের কথা লিপিবদ্ধ আছে৷ এখান থেকে নিঃসরণ হওয়া মিথেন গ্যাস সরাসরি বাতাসে মিশছে।
০৩.
চাড়ালজানি ছোটো একটা বাজার। পৌরসভার শেষ যাকে ধরা হয়, আবার শুরুও ভাবা হয়। রাস্তার দুইপাশে স’ মিল আছে দুই চারটা। সেখানে দেখতে পেলাম, অগণ্য মানুষ বিহ্বল পৃথিবীর সমস্ত জীর্ণতা নিয়ে বসে আছে। তাদের জীবন অনেকটাই মৃত্তিকালগ্ন, যার সাথে রয়েছে প্রকৃতির নিবিড়তা। এই মানুষগুলোর চাহিদা সীমিত। ফলে জীবনের জটিলতা এতো তীব্রভাবে কখনও দেখা দেয়নি। আমার কাছে মানুষের এই ছায়াচিত্রটি ক্রমে মুছে যাবে। আমাকে ফিরে আসতে হবে। জীবনের ভেতর আরেক জীবন। অবাধ গতিময়তা আমাকে করছে অস্থির ও চঞ্চল। স্থানিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মানুষ কোথাও স্থির কি না— এ প্রশ্নে এবং চেতনাগত বিভ্রান্তিতে ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষ। এখন বিকেল, নিজের ভেতরে এক বিকেল নিয়ে হতচকিত হয়ে ছুটে যাচ্ছি। এই আমি একই রকম অথচ এখন কত আলাদা। একটা খোলা জানালার গ্রিল ধরে একটা ছোটো শিশু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে, যেন আমার দিকেই।

কবি। জন্ম মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। প্রকাশিত কবিতার বই দুইটি। ‘বিষণ্ণ স্নায়ুবন’ ও ‘দূরে, হে হাওয়াগান’। প্রকাশিত হয় যথাক্রমে প্রকাশকাল ২০২০ ও ২০২১ সালে। সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘মেরুদণ্ড’।