ভূমিকা
সাহিত্যিক ভাষা বহুরূপী—কখনো তা খেলাচ্ছলে ব্যবহৃত হয়, কখনো তা দ্যোতনায় পরিপূর্ণ; কখনো তা নির্ভুলতা দাবি করে, আবার কখনো অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ মনে হয়। পাঠক, লেখক ও অনুবাদক প্রায়ই ভাষা থেকে যা প্রত্যাশা করেন, ভাষা তা পূরণে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতাই যেন ভাষার একটি অন্তর্নিহিত সীমা—যেখানে ভাষা অর্থ প্রকাশের বদলে অর্থকে ফসকে যেতে দেয়। কখনো আবার ভাষা এতটাই বহুমুখী ব্যঞ্জনায় পূর্ণ হয় যে তা বিপজ্জনক ও অনির্ভরযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
এই প্রবন্ধে আমি অনুসন্ধান করব, কীভাবে সাহিত্যিক ভাষা আমাদের অনুভূতি ও অর্থ উপলব্ধিতে সহায়তা করে, আবার সেইসঙ্গে তা ভাঙনও ঘটায়—অর্থ সৃষ্টি করতে অস্বীকার করে বা বিভ্রান্তি তৈরি করে। অস্ট্রেলিয়ার তিনজন কবির চারটি কবিতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানো হবে, কীভাবে কাব্যিক ভাষা তার সৌন্দর্য ও জটিলতার মধ্যেও ভাষার সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে। একই সঙ্গে, প্রবন্ধটি ভাষার সীমা স্বীকার করার দার্শনিক (অন্তর্বাস্তবিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক) পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।
বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-গঠনবাদ (Poststructuralism) ভাষা নিয়ে গভীর সংশয় ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। এই তাত্ত্বিক ধারায় ভাষা—চিহ্ন, বক্তৃতা, লেখা, অনুবাদ—এক অন্তহীন অর্থ-খেলা হিসেবে বিবেচিত হয়, যা কখনোই কোনো স্থির বা চূড়ান্ত অর্থে পৌঁছাতে পারে না। জাক দেরিদার বিখ্যাত উক্তি ‘Il n’y a pas de hors-texte’ (‘টেক্সটের বাইরে কিছু নেই’) এই ধারণাকে উৎসাহিত করে যে, ভাষাই আমাদের ভাবনার সীমা নির্ধারণ করে।
সাহিত্যিক ভাষাকে তাই কল্পনা করা যায় এক শিয়ালের মতো, যে মুরগির ঘরে হানা দেয়। লেখক বা সমালোচক হিসেবে আমাদের কৌশল, উদ্দেশ্য থাকলেও, শেষপর্যন্ত ভাষার অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা সবকিছুকে এলোমেলো করে দিতে পারে। অর্থ যেন পালক উড়ে যাওয়ার মতো হারিয়ে যায়।
এই অনিশ্চয়তার আরেকটি উদাহরণ মেলে এক বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতায়। এক শিশু রানওয়ের পাশে একটি প্রাণী দেখে বলে, ‘লাল কাঠবিড়ালি!’ তার বাবা সংশোধন করে বলেন, ‘ওটা শিয়াল ছিল।’ উত্তরে শিশুটি বলে, ‘ওটা ছিল শিয়াল, যে লাল কাঠবিড়ালির ছদ্মবেশে এসেছিল!’ এই কাহিনি ভাষা ও উপলব্ধির সম্পর্ককে ইঙ্গিত করে—বাস্তবতা এক, কিন্তু ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি তার নানা ব্যাখ্যা তৈরি করে। এখানেই ভাষার সৌন্দর্য ও সীমা—মুহূর্তে তা আনন্দের উৎস, পরক্ষণেই তা হতাশার কারণ। বিশেষত অনুবাদে এই দ্বৈততা স্পষ্ট—অর্থ অনুবাদের সময়ে যেমন ধরা যায়, তেমনি আবার তা হাতছাড়া হয়ে যায়। ভাষার এই দ্বৈত প্রকৃতি নিয়েই এই প্রবন্ধের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
জুডিথ রাইটের কবিতায় অর্থ গঠনের প্রক্রিয়া:
কবিতার ভেতর দিয়ে কবি ও কবিতার ভাষা জড়িয়ে পড়ে অর্থ নির্মাণের জালে—উভয়ে শব্দে অর্থ খোঁজার চেষ্টায় মগ্ন, আবার গভীরভাবে প্রশ্ন তোলে শব্দের কার্যকারিতা নিয়েও। অস্ট্রেলিয়ান কবি জুডিথ রাইট ছিলেন এক অসাধারণ কবি, সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার এবং পরিবেশ ও বর্ণবৈষম্য বিষয়ক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তিনি ভাষার নির্ভুল ব্যবহারের ভেতর দিয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছিলেন আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের ওপর ঘটে যাওয়া বহু অবিচারের প্রসঙ্গে এবং ভূমির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তাঁর সমালোচনামূলক গ্রন্থ ‘Born of the Conquerors’-এ তিনি লেখেন:
‘যে দেশটি আমরা আক্রমণ করেছি তার প্রতি ভালোবাসা এবং আক্রমণের অপরাধবোধ, এই দুটি সূত্র আমার মনে অনুতাপের দাগ কেটে যায়। এটি একটি ভূতুড়ে দেশ। এই দেশের প্রতি আমাদের অনুতাপ প্রকাশ করতে হবে এবং যতটা সম্ভব আমাদের ভুলকে সংশোধন করতে হবে। এই ভুল সংশোধন করার একটি শেষ সুযোগ হলো যতটা সম্ভব সেই ভূমিকে তার মূল সৌন্দর্যের নিকটতম অবস্থায় রেখে দেওয়া।’ (রাইট, ১৯৯১, পৃ. ৩০)
এখানে একজন সক্রিয় কর্মী বা প্রচারকের নিবেদন আছে—তীক্ষ্ণ, ঘোষণামূলক বাক্যে; সরাসরি নৈতিক বার্তায়। তিনি আন্তরিকভাবে সত্যি বলার চেষ্টা করেন—একটি প্রামাণ্য ইতিহাসের উপলব্ধি, যা ব্যক্তিগত ও জাতীয়, উভয়ই। তবে, কবি হিসেবে জুডিথ রাইট একইসঙ্গে ভাষাকে ক্ষণস্থায়ী, স্খলিত ও অদৃশ্য, ইতিহাসে তলিয়ে যাওয়া এবং বিস্মৃত হয়ে যাওয়া হিসেবে উপলব্ধি করতেন। তার বিখ্যাত ‘South of My Days’ (১৯৪৬ সালে প্রকাশিত The Moving Image কাব্যগ্রন্থে) কবিতায় তিনি লেখেন:
আমার দিন বৃত্তের দক্ষিণে, আমার রক্তের দেশের অংশে
উঠে আসে ওই মালভূমি,
হাড়ের মতো খাড়া ঢালের সূক্ষ্ম রেখা
যা শীতে কুঁচকে ওঠে,
ছোটো ছোটো গাছ, নীল পাতা ও জলপাই-রঙা
পাথুরে গাঁথুনি স্পষ্ট, পরিষ্কার, শুকনো, ক্ষুধার্ত দেশ।
ঝরনাধারার পাশে পাতা-নীরব, উইলো গাছে রুদ্ধ, ঢালজুড়ে গুলিয়ে থাকা মেডলার আর ক্র্যাবঅ্যাপল,
উপর-নীচে ছড়ানো, সবুজ শৈবালের দাগে ভরা;
আর পুরোনো কুটিরটা আশ্রয়ের খোঁজে কুঁকড়ে গেছে।
ওহ, শীতল সেই কৃষ্ণ-তুষার রাত।
দেয়ালগুলো উষ্ণতার দিকে সেঁটে আসে
আর পুরোনো ছাদটা তার জোড়গুলোতে টনটন করে ফেটে ওঠে;
ঝুলে থাকা কেটলিটা আগুনের ওপর চুপি চুপি সিস দিয়ে যায়।
বিশ্বাস করা কঠিন যে একদিন গ্রীষ্ম আবার ফিরে আসবে
র্যাম্বলার-গোলাপের ঢেউয়ে ভেসে,
এই ঘরে গরম মুখটা গলিয়ে ঢুকবে
আর শোনাবে আরেকটা গল্প—
এক পুরোনো গল্প, যা ড্যান আবার জড়িয়ে নেবে তার শীতের কম্বলে।
সত্তর বছরের গল্প জমাট বেঁধে আছে তার হাড়ে
সত্তর বছর যেন জমে আছে তার ভেতরে পুরোনো মধুর মতো।
(রাইট, ১৯৭১, পৃ. ২০)
বয়সী ড্যান একজন গল্পকার, এক ঔপনিবেশিক চরিত্র, যে অস্ট্রেলীয় কথ্যভাষায় কথা বলে এবং যার গল্পগুলো জুডিথ রাইটের কবিতার মধ্য দিয়ে যেন শীতের প্রতিরোধে এক কম্বলের কাজ করে। যেখানে আমরা শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারীদের অভিজ্ঞতা শুনি: গরু চরানো, খরা, তুষারঝড়, আর দুর্ধর্ষ ডাকাত থান্ডারবোল্টের গল্প। সেই শিশু, যে পরবর্তীতে কবি হবে এবং যে এই গল্পগুলো শুনছে, তার স্মৃতিতে জেগে ওঠে তার রক্তের দেশ এবং ভাষার নানা অনুষঙ্গ ও ব্যবহার শেখা।
ড্যানের গল্প জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে চায়:
সে বছর গরু চরাতে বেরিয়েছিলাম, চার্লভিল থেকে হান্টার পর্যন্ত,
উনিশ শ এক সাল, খরার তখন শুরু;
ম্যাকইন্টায়ারে পৌঁছানোর পর ষাটটা গরুই ঝিমিয়ে পড়ে গেল,
চারপাশের কাদা লোহার মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল;
আর সামনের সুলকিতে সরঞ্জাম বাঁধা গাড়িতে ছিল যে হলুদ ছেলে, সে মরে গেল,
কিন্তু ঘোড়াটা চলতে থাকল,
স্যান্ডি ক্যাম্পে গিয়ে সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমরা প্রথমে মাছিগুলোকেই দেখেছিলাম, মৌমাছির মতো ভনভন করছিল।
হান্টারে পৌঁছালাম, হাজারের মধ্যে তিনশো গরু বাঁচল—
বাঁচিয়ে রাখা ছিল খুব দুষ্কর— আর নদীটা ছিল ধুলোর মতো শুষ্ক।
অথবা যখন বসন্তকালে বোগঙ পর্বতে গরু ধরতে উঠেছিলাম,
হঠাৎ বরফঝড় এসে পড়ে। নামিয়ে আনলাম তাদের;
আমরাই নামিয়ে আনলাম, যারা তখনো ঠিকঠাক নামেনি।
অথবা কবে যেন, কোব্ব’সের জন্য গরু নিয়ে যাচ্ছিলাম
তামওয়ার্থ থেকে, তখন হাংগ্রি হিলের চূড়ায় ছিল থান্ডারবোল্ট,
আর আমি তাকে চোখ মেরেছিলাম।
আমি হলে দেরি করতাম না, ফ্রেড,
তোমার জন্য ঘাড়ে ঘাড়ে চলে এসেছে ট্রুপাররা,
হিলগ্রোভের সেই কাণ্ডের জন্য।
সে উন্মাদের মতো ছুটল, তার বড় কালো ঘোড়ায় চড়ে।
আহা, তারা সব সরে যায়, মিলিয়ে যায়
যেমন করে সে বিগত বছরগুলোকে জাদুকরের তাসের মতো এলোমেলো করে ফেলে।
সত্য হোক বা না হোক, তাতে কিছু আসে যায় না;
আর ছাদের ওপরের কুয়াশা চাবুকের মতো চড় মারে,
যখন আগুনের কাণ্ড ছাইয়ে পরিণত হয়।
জেগে ওঠো, বৃদ্ধ। এখন শীতকাল, গল্পগুলো শেষ।
কেউ আর শুনছে না।
আমার দিন বৃত্তের দক্ষিণে
আমি জানি, তারা তারার বিপরীতে অন্ধকার হয়ে আছে
উঁচু শীর্ণ দেশ,
পুরোনো গল্পগুলো যা এখনও আমার ঘুমে হাঁটে।
(রাইট, ১৯৭১, পৃ. ২০)
আমরা শ্রোতা হিসেবে, শিশুটির সঙ্গে সঙ্গে, যখন স্মরণ করার, ধরে রাখার কাহিনিমূলক তাগিদে আবিষ্ট হই, তখন আমরা উপলব্ধি করি যে কবিতাটি ভাষার বিভিন্ন কার্যকারিতার মধ্যে দোদুল্যমানরত: সান্ত্বনা ও স্মৃতির বাহক হিসেবে; অতিরঞ্জিত গল্প বলার রূপে; এবং সেই সঙ্গে এই উপলব্ধি জাগে যে ‘গল্পগুলো শেষ/কেউ আর শুনছে না’। এটি ভাষাকে কখনও শক্তিশালী ও ভৌতিক হিসেবে তুলে ধরে, আবার কখনও তা ক্ষণস্থায়ী, ছায়াময় বলেই প্রতিভাত করে। কবির ভাষা যে বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করতে চায়, তার সঙ্গে একাত্ম হতে চায়। শব্দ, স্থান ও পর্যবেক্ষককে একাকার করে তুলে, যেমন—’আমার রক্তের দেশের অংশ… ওই মালভূমি, হাড়ের মতো খাড়া ঢালের সূক্ষ্ম রেখা/যা শীতে কুঁচকে ওঠে’। লেখক ও পাঠক উভয়ই এই ঐক্যের অনুভূতিতে কিছুটা মোহিত হন, যখন অনুপ্রাস, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্মৃতি এবং বর্ণনার তাগিদ আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে একত্রিত হয়। কিন্তু এরপর আসে ভিন্ন কিছু। বুড়ো ড্যান তার গল্পগুলো বলে ‘শীতের বিরুদ্ধে’, ‘সত্তর বছরের গল্প জমাট বেঁধে আছে তার হাড়ে/সত্তর বছর যেন জমে আছে তার ভেতরে পুরোনো মধুর মতো’, কিন্তু কবিতাটি শেষ হয় তাকে জাগিয়ে তোলার আহ্বানে: ‘এখন শীতকাল, গল্পগুলো শেষ।
কেউ আর শুনছে না।’ যদিও শেষ পঙ্ক্তিটি ইঙ্গিত করে গল্পগুলো হয়তো বেঁচে থাকবে—‘পুরোনো গল্পগুলো যা এখনও আমার ঘুমে হাঁটে’—এবং আমাদের পাঠে, কবি জানিয়ে দেন সেগুলো তবুও ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে, ‘যখন আগুনের কাণ্ড ছাইয়ে পরিণত হয়’। ভাষা অর্থ, স্মৃতি, মূল্যবোধ বহনের আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে সে জানে তার সীমাবদ্ধতাও—‘সত্য হোক বা না হোক, তাতে কিছু আসে যায় না’ এবং কাব্যিক ভাষা নিজেই তার ক্ষণস্থায়িতার কথা ভুলতে পারে না।
দ্বিতীয় একটি দৃষ্টিকোণ থেকে, পাঠকেরা দেখতে পারেন যে জুডিথ রাইট-এর কবিতায় অর্থ গঠনের কেন্দ্র রয়েছে ভাষার ভেতরে যেমন, তেমনি ভাষার ক্ষমতার বাইরেও। একটি পোস্ট-কলোনিয়াল পাঠ–এখানে জুডিথ রাইট-এর ‘দিনগুলোর’ তথাকথিত অস্ট্রেলিয়ানত্ব এবং তিনি যে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগ্রাম করছেন–তা বুঝতে সাহায্য করে। প্রথম স্তবকটিকে একটি পোস্ট-কলোনিয়াল দৃষ্টিকোণে পড়লে কবিতার অবচেতনের উপাদানগুলো উন্মোচিত হয়। বর্তমান থেকে ফিরে তাকিয়ে, ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত The Moving Image পড়ে পাঠকেরা প্রশ্ন করেন: এটি কি একটি অস্ট্রেলিয়ান দৃশ্য? আপনি হ্যাঁ বলতে পারেন, এর হাড়ের মতো ঢাল ও নীল পাতার গাছের ল্যান্ডস্কেপ দেখে, এই ‘পরিষ্কার, শুকনো, ক্ষুধার্ত দেশ’ দেখে। কিন্তু একইসঙ্গে, এটি এক ধরনের ‘আসল’ অস্ট্রেলিয়ান দৃশ্য নয়, বরং Wordsworth-এর ইংরেজি রোমান্টিক কবিতার অনুকরণ—সেখানে আছে এক পাগল বয়স্ক সন্ন্যাসী, মেডলার ও ক্র্যাবঅ্যাপল ফল, বুনো গোলাপএবং শেওলাধরা পুরোনো কুটির। জুডিথ রাইট-এর শিল্পীজীবনের ধারা এই কাব্যগ্রন্থের পর পোস্ট-কলোনিয়াল ভূমিবোধ এবং নিজের ‘বিজয়ীদের সন্তান’ হিসেবে ভূমিকা অনুধাবনের দিকে এগোয়। এই উপলব্ধির আলোকে আমরা ‘South of My Days’-কে দেখতে পারি একটি স্থানান্তরধর্মী কবিতা হিসেবে—উপনিবেশিক থেকে পোস্ট-উপনিবেশিক বোধের দিকে যাত্রাপথে। আর এই মতাদর্শগত উপলব্ধি যত বাড়ে, ভাষার সীমাবদ্ধতা, এর রূপান্তরশীলতা ও ক্ষণস্থায়িতাও তত স্পষ্ট হয়। একজন লেখকের কর্তৃত্ব এবং উপস্থাপনার প্রামাণিকতা দেখা যায় সদা পরিবর্তনশীল এবং অবশ্যই পরিবর্তনশীলতলার নিয়ামক হিসেবে।
কবিতার ভাষা ও তার সীমার বিষয়ে জুডিথ রাইট ১৯৪৬ সালেই সচেতন ছিলেন এবং তখনই তিনি দেশটিকে পুরোনো গল্পে পূর্ণ করতে চাইছিলেন, কিন্তু তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে, এটি এক সাদা ইতিহাস—ড্রভিং, ডাকাত, ট্রুপারদের ইতিহাস—যা তিনি প্রচার করছেন। একই সঙ্গে তার মনে হচ্ছিল, ‘গল্পগুলো শেষ। কেউ শুনছে না’, আর ভাষা নিজেই তার অক্ষমতা উন্মোচন করে, এমনকি না করে তার উপায় থাকে না।
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত জুডিথ রাইটের আরেকটি গ্রন্থ ‘Nigger’s Leap’-এর একটি কবিতায় আমরা দেখতে পাই, সেখানে কবি নিজেকে এবং সমস্ত শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশকারীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন—অস্ট্রেলিয়া জুড়ে ঘটে যাওয়া অসংখ্য আদিবাসী গণহত্যার প্রসঙ্গে: ‘আমরা কি জানতাম না তাদের রক্তই আমাদের নদীগুলোকে প্রবাহিত করেছিল এবং আমাদের ফসলের পেটে যে কালো ধূলা তা তাদেরই ধূলা?’ (‘রাইট’, ১৯৭১, পৃ. ১৫)। এই কবিতাটি আদিবাসীদেরকে পাহাড়ের কিনারা থেকে ঠেলে নিচে ফেলে হত্যার বর্বর ঐতিহাসিক ঘটনার দিকেও ইঙ্গিত করেছে। কবিতাটিতে শ্বেতাঙ্গ বর্ণনাকারীর কণ্ঠে শোনা যায় বেদনায় ভরা একটি আকুতি: ‘ও নিঃসঙ্গ বাতাস,/হাড় আর খুলি ঢেকে দাও শীতল চাদরে,/যারা মাংসসহ পড়ে গিয়েছিল ঠোঁটসম ক্লিফ থেকে চিৎকার করতে করতে/তারপর চুপ হয়ে পড়েছিল, মাছির জন্য অপেক্ষায়।’
এখানে আছে এক ধরনের ভয়াবহতা এবং আশাহীন অনুশোচনা, যেখানে ‘শীতল চাদর’-এর অনুরোধ হয়তো অপরাধবোধের প্রতীক, আবার হয়তো এক অসম্ভব সান্ত্বনার আকাঙ্ক্ষা।
পূর্বমুখো পর্বতশৃঙ্গগুলো সূর্যের বিপরীতে ঝুঁকে আছে।
রাত্রি আবছা স্রোতের মতো ঘুরে বেড়ায় অন্তরীপ ও উপসাগর জুড়ে,
আর সাগর থেকে মেঘের নৌকা নিয়ে ধাক্কা দেয়
এই খাড়া, আলোকিত গ্রানাইট শিরে।
গিলে নাও পর্বতের মেরুদণ্ড; আঁধার হয়ে ওঠো, হে একাকী বাতাস।
একটি ঠান্ডা কম্বলের মতো ঢেকে দাও সেই হাড় ও খুলি,
যা মাংসে লিপ্ত অবস্থায় চিৎকার করে পড়ে গিয়েছিল ঠোঁটওয়ালা খাড়া পাহাড় থেকে,
আর তারপর নিশ্চুপ ছিল, মাছির অপেক্ষায়।
এখানেই রয়েছে প্রতীক, আর জেগে ওঠা আঁধারে
একটি মিলনের সময়। রাত্রি কোনো সতর্কতা দেয় না
পাথরের ওপর যে পাথর আমাদের জলযানকে চূর্ণ করবে; কোনো ঘণ্টা বাজে না নাবিকদের জন্য।
এখন আমাদের হিসেব করতে হবে
আমাদের দিন রাত দিয়ে, আমাদের গ্রীষ্ম মেরু দিয়ে,
ভালোবাসা তার সমাপ্তি দিয়ে
আর আমাদের সমস্ত ভাষা মাপতে হবে নীরবতা দিয়ে।
খেয়াল করো উপত্যকায়, ঘরের আলো কত ক্ষীণ।
(রাইট, ১৯৭১, পৃ. ১৫)
কবিতাটি ‘সময়ের সমন্বয়ের’ আহ্বান জানায়, যেখানে প্রতীক ও বাস্তবতা যেন এক হয়ে ওঠে, ভাষা যেন তার শক্তি দেখায়। কিন্তু একইসঙ্গে ভাষার সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করে—কোনো সতর্কতা নেই, কোনো ঘণ্টা বাজে না এবং ‘আমাদের সমস্ত ভাষা মাপতে হবে নীরবতা দিয়ে।’ আবার কবিতার শেষ দুটি স্তবকে তার (কবির) সমকালীন পাঠকদের প্রতি এক নৈতিক আহ্বান লক্ষণীয়—যেখানে উঠে আসে একটি ঐতিহাসিক সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা:
‘সব মানুষ অবশেষে এক মানুষ’; কবিতাটি মূলত এই উপলব্ধির ঘোষণা দেয়: ‘সেখানেই তারা পড়ে আছে, যারা আমাদেরই অপরিচিত রূপ।’ এই কবিতাটি সাদা অস্ট্রেলিয়ার একটি বিকল্প ভিত্তির বর্ণনা করে—বসতি স্থাপনকারীদের নৃশংসতা, আদিবাসী মানুষদের গণহত্যা এবং এই বাস্তবতাগুলোর সমসাময়িক দমন—যা ভাষার ক্ষমতা এবং জাতির অনুমোদিত মিথের বাইরে অস্তিত্বশীল, রক্ত ও নদী, পর্বত ও ধুলোর বস্তুগত বাস্তবতায় ভরা এবং ‘পাতলা কালো শিশুরা নাচে ছায়ার মতো’ —এক অপূরণীয় বাস্তবতায়।
আমরা কি জানতাম না তাদের রক্তই আমাদের নদীগুলোকে প্রবাহিত করেছিল এবং আমাদের ফসলের পেটে যে কালো ধূলা তা তাদেরই ধূলা?
ও, সব মানুষ অবশেষে এক মানুষ।
আমাদের বোঝা উচিত ছিল, যে রাত পাহাড়গুলোকে গুছিয়ে রেখেছিল এবং সেগুলো লুকিয়েছিল, তার জিভেও আমাদের জন্য একই প্রশ্ন ছিল।
এবং সেখানেই তারা পড়ে আছে, যারা আমাদেরই অপরিচিত রূপ।
কখনোই আর ফিরবে না পৃথিবীতে বাতাসে কাঁপতে থাকা ছায়ার নিচে ওরা, যেখানে পাতলা কালো শিশুরা নাচে ছায়ার মতো।
রাত ঠোঁট রাখে মালভূমির কঠিন পাথরে এবং ঠান্ডা করে তার গ্রানাইটকে।
রাত আমাদের উপর হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক যেমন ইতিহাস যা অনেক দ্বীপকে তার সময়ে ডুবিয়েছে।
(রাইট, ১৯৭১, পৃ. ১৫)
রাইট এমন একজন কবি যিনি ভাষার শক্তিকে উপলব্ধি করতেন এবং ভাষার মাধ্যমে ঐতিহাসিক ট্রমা প্রকাশ করেছেন, শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলিয়ার উৎপত্তির মিথকেও পুনর্লিখন করেছেন। কিন্তু এই কবিতা সতর্কভাবে পাঠ করলে বোঝা যায়, ভাষার সীমাবদ্ধতাকেও কবি অনুধাবন করেছেন। এখানে ‘রাত ঠোঁট রাখে মালভূমির কঠিন পাথরে’, ‘সেখানেই তারা পড়ে আছে, যারা আমাদেরই অপরিচিত রূপ’—এইসব বাক্য ভাষা ও লেখার রূপক, কিন্তু তারা একইসঙ্গে সেই চেষ্টারও প্রকাশ—যেখানে লেখার বাইরেও কোনো অর্থ খোঁজা, এমন কিছু উপলব্ধি করার প্রচেষ্টা থাকে,যেটা ভাষার বাইরের বিষয়। ‘রাত আমাদের উপর হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক যেমন ইতিহাস’—এই লাইন ইঙ্গিত দেয় এমন এক বাস্তবতার দিকে যা ভাষার বাইরে। কিন্তু এই ভাষার বাইরের স্থানটা আসলে কী? কেন কবিরা, ভাষার এমন দক্ষ কারিগর হওয়া সত্ত্বেও, ভাষার সীমা নিয়ে এত সচেতন?এমন প্রশ্ন ও চিন্তা নিয়েই জুডিথ রাইটের কবিতাকে অনুভব করতে হয়।
লেস মারে এবং শব্দের বাইরের স্থান:
অস্ট্রেলিয়ান কবিতার প্রেক্ষাপটে আরেকটি মৌলিক নাম হলো লেস মারে। ১৯৬৯ সালে তাঁর লেখা ‘An Absolutely Ordinary Rainbow’ কবিতায় আমাদের ভাষার সীমা এবং শব্দের বাইরের স্থান সম্পর্কে একটি ভিন্ন ধারণা প্রণয়ন করেছে।
শব্দটা ঘুরে বেড়ায় রিপিন্সে,
গুঞ্জন ছড়ায় লরেঞ্জিনিসে,
টাটারসলে, লোকেরা সংখ্যার পাতাগুলো থেকে মুখ তোলে,
শেয়ার বাজারের লেখকরা হাতে থাকা চক ভুলে যায়
আর রুটির থলে হাতে লোকেরা গ্রিক ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে আসে:
মার্টিন প্লেসে একজন লোক কাঁদছে। কেউ থামাতে পারছে না তাকে।
জর্জ স্ট্রিটে ট্র্যাফিক অর্ধ মাইল জুড়ে থেমে গেছে
এবং চলাচলহীন। ভিড় উদ্বিগ্ন গুঞ্জনে
আরও ভিড় ছুটে আসছে।
অনেকেই দৌড়ে যাচ্ছে পেছনের রাস্তায়
যেগুলো মিনিট খানেক আগেও ছিল ব্যস্ত প্রধান সড়ক, দেখাচ্ছে আঙুল দিয়ে:
ওখানে একজন লোক কাঁদছে। কেউ তাকে থামাতে পারছে না।
(মারে, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)
‘মার্টিন প্লেসে কাঁদতে থাকা একজন ব্যক্তির’ চিত্রটি এমন—
এক স্থান বা মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয় যা শব্দের গণ্ডির বাইরের, এমন এক অর্থবোধক জগৎ যা পথচারীদের কাছে ধরা পড়ে না। কাজ আর বিনোদনের, খাবার আর অর্থ উপার্জনের, যানবাহন আর ‘কথাবার্তায় উচ্ছৃঙ্খল’ জনতার জগতের বাইরে, কবিতাটি এমন এক অর্থ ও মূল্যবোধের সম্ভাবনা সম্পর্কে চিন্তা করে যা শব্দ দিয়ে ধরা যায় না, ঘোষণা করা যায় না বা স্পর্শও করা যায় না:
যে মানুষটিকে আমরা ঘিরে রেখেছি,
যার কাছে কেউ যায় না—
সে কেবল কাঁদে,যে কান্না লুকানো যায় না, তবে সে
শিশুর মতো কাঁদে না, কাঁদে না বাতাসের মতো, তার কান্না মানুষের মতো
এবং সে উচ্চারণ করে না, বুকে আঘাত করে না, এমনকি
জোরে জোরে হাউমাউ করেও কাঁদে না—তবু তার কান্নার মর্যাদা
আমাদের দূরে রাখে তার থেকে, সেই ফাঁকা স্থান থেকে যা সে সৃষ্টি করে
মধ্যাহ্নের আলোয়, তার দুঃখের পঞ্চভুজে।
আর যারা তাকে ধরতে এসেছিল, ভিড়ের ভেতর সেই ইউনিফর্ম পরা লোকেরা
তাকিয়ে থাকে তার দিকে এবং বিস্ময়ে অনুভব করে
তাদের মন কান্নার জন্য আকুল, যেমন শিশুরা রঙধনুর জন্য।
কিছু মানুষ ভবিষ্যতে বলবে,
তার চারপাশে এক ধরনের জ্যোতি বা শক্তি ছিল।
কিন্তু এমন কিছু ছিল না।
কিছু মানুষ বলবে, তারা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল এবং তাকে থামাতে চেয়েছিল,
কিন্তু তারা সেখানে ছিল না।
আমাদের মাঝে যারা সবচেয়ে কঠিন পৌরুষদীপ্ত,
সবচেয়ে সংযমী মনের মানুষ, সবচেয়ে চতুর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন—
তারা নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে,
এবং হঠাৎ শান্তির জন্যে জ্বলে ওঠে।
যারা ভাবত তারা সুখী, সেই ভিড়ে কেউ কেউ চিৎকার করে ওঠে।
শুধু ক্ষুদ্র শিশুরা
এবং তারা যেন স্বর্গ থেকে তাকিয়ে আছে, তার কাছে আসে
এবং বসে পড়ে তার পায়ের কাছে,
কুকুর আর ধুলো-মাখা কবুতরের সাথে।
(মারে, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)
এই অশ্রুবিসর্জনের মানুষটি, যার কাঁদা নিঃশব্দ অথচ দৃষ্টিনন্দন, শিশু বা বাতাসের মতো নয়, বরং এক পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো, তার কান্না এমন এক ‘খালি জায়গা’ তৈরি করে যার মধ্যে বাকরুদ্ধ শ্রোতারা প্রবেশ করতে পারে না। সেই জায়গা নিঃশব্দ, গৌরবদীপ্ত জায়গা—‘তার দুঃখের পঞ্চভুজ’, যেখানে পেছনের ভিড়ে থাকা মানুষেরাও হতভম্ব হয়ে যায়। আশ্চর্য হয়ে তারা নিজেরাও কাঁদতে চায়—যেন শিশুদের মতো, একটি রামধনুর জন্য আকুল হয়ে কান্না।আসলে এই শব্দের অতিরিক্ত স্থানটি একটি বিষাদময় পঞ্চভুজের মতো গঠিত, জ্যোতির্ময়, নীরব।তবুও এটি একটি অস্তিত্বে পূর্ণ স্থান, যেখান থেকে উপহার আবির্ভূত হয়:
হাস্যকর!শব্দটি বলেই আমার পাশে থাকা লোকটি
তার মুখ হাত দিয়ে বন্ধ করে দিল, যেন বমি করে ফেলল—
আর আমি একজন মহিলাকে দেখতে পেলাম, জ্বলজ্বল করছে, সে তার কাঁপতে থাকা হাত প্রসারিত করে দেয়
যখন সে কান্নার উপহার গ্রহণ করে;
তার পিছনে আরো অনেকেই হাত বাড়ায়
কিন্তু কাঁদতে থাকা মানুষটি
পৃথিবীর মতো, কিছুই চায় না
আমাদের উপেক্ষা করে, আর চিৎকার করে
তার কুঁচকে যাওয়া মুখ এবং সাধারণ শরীরে
শব্দ নয়, বরং শোক, বার্তা নয়, বরং দুঃখ
পৃথিবীর মতো কঠিন, নিছক, সমুদ্রের মতো উপস্থিত
এবং যখন সে থামে,
তখন সে কেবল আমাদের মধ্যে হেঁটে যায়
যে মানুষটি কাঁদে,তার কান্না একজন মুছে দেয়
যে মানুষটি কাঁদে, তার কান্না শেষ হয় মর্যাদায়।
বিশ্বাসীদের এড়িয়ে, সে দ্রুত পিট স্ট্রিটে নেমে আসে।
(মারে, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)
‘শব্দ নয়, বরং শোক, বার্তা নয়, বরং দুঃখ,/পৃথিবীর মতো কঠিন, নিছক, সমুদ্রের মতো উপস্থিত—’এখানে, কবি তার কান্নাকারী মানুষটিকে শব্দসমৃদ্ধ ব্যাখ্যাকারী দিয়ে ঘিরে রেখেছেন, যারা ‘কথা বলার জন্য উত্তেজিত’ হয়ে,শব্দের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি ‘আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম বুদ্ধিও/ নীরবতায় কাঁপতে থাকে।’ এখানে এক ধরনের অর্থ অনুভব করা হয়, কিন্তু গ্রহণকারীরাও তাদের গ্রহণ করা অর্থের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও ওয়াকিবহাল নয়। শব্দের বাইরে পবিত্র, ক্যারিশম্যাটিক, নীরব একটা বোধ, ‘শব্দ নয়, বরং শোক, বার্তা নয়, বরং দুঃখ,/পৃথিবীর মতো কঠিন, নিছক, সমুদ্রের মতো উপস্থিত’ স্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়। কান্নাকারী মানুষটি বোধের যে স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে তা পবিত্র এই অর্থে যে এটি জ্ঞানী, বিশ্বাসী, যুদ্ধবাজ, নিয়ন্ত্রক, উপহাসকারীদের চেতনার রূপান্তর ঘটায়। কখনো বলা হয়নি—ভাষাতেও বলা যায় না—এই রূপান্তরিত ব্যক্তিরা কী হয়ে উঠেছেন, কিন্তু তারা মানুষের দুঃখের সাক্ষী হয়েছেন—’বিস্ময়ের সাথে, তাদের মন/কান্না আকাঙ্ক্ষা’য়—যা তাদের কথা, তাদের বোধ ও ভাষা প্রয়োগ এবং তাদের আত্ম-নিশ্চয়তাকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। কিছু সমালোচকরা ওতো সব উপলব্ধি না করে শব্দ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন—আসলে আমরা এটাই করি, আমরা যে সাহিত্য সমালোচক!তাই না?—ব্যাখ্যা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠি — যে মানুষটি কে বা কী: তিনি খ্রিস্ট, তিনি লেখকের একটি প্রতিপুরুষ, তিনি একজন সজীব ব্যক্তিত্ব, তিনি জনমানুষের ভেতর ভিন্ন মানুষ। কিন্তু কবিতাটির প্রধান চরিত্র ‘কান্নাকারী’ মানুষটি কী বা কে হতে পারে তা ভাষা ও ব্যাখ্যায় কখনো উঠে আসে না।কবিতার সৌন্দর্য হলো নিজের ভাষা ও অবয়বের বাইরেও আরো অন্য কিছু নির্দেশ করে।
স্যাম ওয়াগান ওয়াটসন এবং নীরবতার কাব্যিক নির্মাণ:
আদিবাসী কবি স্যাম ওয়াগান ওয়াটসন রচিত ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘kangaroo crossing’ নামে একটি অনন্য কবিতার সন্ধান আমরা পাই, যা পাঠককে নীরবতা আর শব্দের সীমানার বাইরের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই পথচিহ্ন আমার রক্তে গাঁথা
এখানেই মেগালেইয়া রুফার গান
গাড়ির স্টেরিওর চেয়ে জোরে কাঁদে।
স্বপ্নটা, হঠাৎ করে, রাস্তায় উঠে আসে
আর সেটাকে
জীবিতদের জগৎ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়—
যারা চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকার কল্পনায়
স্টিয়ারিং চেপে ধরেছিল।
কিন্তু এই রাস্তার অংশে… এই পথচিহ্ন
এখানেই বহির্মুখী ফেরেশতারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়
যখন ইস্পাতের চেয়েও শক্ত এক ঝলকানি
ছুটে আসে মহাসড়কে
আর বর্তমানের মানুষদের
নিজ নিজ বিচারের দিনে পৌঁছে দেয়।
আলোর বিচ্ছুরণ
এক সেকেন্ডের ভেতর থেকে
চিরকালের দিকে।
(ওয়াটসন, ২০০৫, পৃষ্ঠা ৮৮)
এই কবিতায় ওয়াটসনের নীরবতার নির্মাণ একটি গভীর ও ভারবাহী অর্থ বহন করে। বাস্তবিকভাবে এই কবিতাটি অস্ট্রেলিয়ার প্রেক্ষাপটে একটি দুর্ঘটনার কথা বলে—একটি ক্যাঙ্গারুর সঙ্গে গাড়ির সংঘর্ষ, বিশেষত ‘মেগালেইয়া রুফা’ বা রেড ক্যাঙ্গারু, যেটিকে ইনল্যান্ড নিউ সাউথ ওয়েলস, কুইন্সল্যান্ড এবং সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়ায় প্রচুর দেখা যায়। তবে এই কবিতা বাস্তব ও অতিবাস্তব—এই দুই স্তরে কাজ করে। এই দুই স্তরের মুড বা রীতির মধ্যকার ফাঁকই তৈরি করে সেই স্থান, যেটির দিকে কবিতাটি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করে।
এই কবিতায় বক্তার পরিচয় অস্পষ্ট, কিন্তু তিনি এমন একজন, যিনি এই জায়গা এবং ক্যাঙ্গারুটিকে খুব গভীরভাবে চেনেন, যিনি আদিবাসী ‘ড্রিমিং’ (স্বপ্নচারী) এবং তার শক্তিকে জানেন, সেই স্বপ্ন যা অতীত থেকে বর্তমানের মুহূর্তে এসে কথা বলে ‘এই রাস্তার অংশে’, এই বিশেষ পথজুড়ে।
অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের প্রেক্ষাপটে ‘ড্রিমিং’ শব্দটি শুধু একটি ইংরেজি অনুবাদ নয়, একটি টার্ম, যা দিন দিন অপ্রতুল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; কারণ এই শব্দটি অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট আদিবাসী বিশ্বাস এবং চর্চা পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করে। অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে:
‘ড্রিমিং-এর অর্থ ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসী মানুষের জন্য ভিন্ন হতে পারে। এটি জ্ঞানের, বিশ্বাসের এবং চর্চার একটি জটিল নেটওয়ার্ক, যা সৃষ্টির কাহিনির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এটি আদিবাসী জীবনের সমস্ত আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত দিককে নিয়ন্ত্রণ করে। ড্রিমিং সমাজের কাঠামো নির্ধারণ করে, সামাজিক আচরণের নিয়ম নির্ধারণ করে এবং সেইসব আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করে যা ভূমির জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য।’ (অস্ট্রেলিয়ান জাদুঘর, এন.ডি.)
অতএব, আদিবাসী ড্রিমিং একটি পবিত্র এবং নৈতিক মাত্রাকে ধারণ করে, যেখানে ভূমি ও জনগণ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি এখনো একটি জীবন্ত ও শক্তিশালী বিশ্বাসব্যবস্থা, যা বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়াতেও স্বীকৃত হচ্ছে।
ওয়াটসনের কবিতায় ড্রিমিং ধরা পড়েছে এক হঠাৎ, শব্দহীন, অমানবিক শক্তি হিসেবে, যা একদিকে একটি ক্যাঙ্গারুর শরীরী রূপ এবং অপরদিকে একটি নির্দিষ্ট ভূমির মাধ্যমেও প্রকাশিত। এটি একটি আদিম শিক্ষা দেয় ‘যারা চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকার কল্পনায় স্টিয়ারিং চেপে ধরেছিল।’
কবিতায় সময় একত্রিত হয়ে যায়—ড্রিমিং থেকে শুরু করে বর্তমান মুহূর্ত এবং চিরন্তন ভবিষ্যতের দিকে। ‘বিচারের দিন’ নেমে আসে সেইসব লোকদের ওপর, যারা নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে অক্ষম।
ওয়াটসনের কবিতায় ভাষা যথেষ্ট শক্তিশালী নয় ‘ড্রিমিং’- এর শক্তিকে পুরোপুরি উপলব্ধি বা বর্ণনা করার জন্য—এই ড্রিমিং, যা মানুষের আগে থেকেই অস্তিত্বশীল, যা মানুষের অহংকারের চেয়েও বড় এক শক্তি, ক্ষণিকের একটি দৃশ্যে ধরা পড়ে, ‘আলোর বিচ্ছুরণ/এক সেকেন্ডের ভেতর থেকে/চিরকালের দিকে।’
কবিতায় ভাষার দ্বৈত ক্রিয়া:
ভাষা তার ভেতরেই বহন করে দ্বৈত ক্রিয়া—একই সঙ্গে তা অর্থ সৃষ্টি করে এবং অর্থকে অনিশ্চিত করে তোলে। জ্যাক দেরিদার ভাষা-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই দ্বৈততা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, ‘নাম দেওয়ার মাধ্যমে বস্তুসমূহ একই সঙ্গে অস্তিত্ব লাভ করে এবং অস্তিত্ব হারায়’ (দেরিদা, ১৯৭৮, পৃ. ৭০)। এই বক্তব্য ভাষার ক্ষমতা ও অসহায়ত্ব—দুইয়েরই প্রকাশ। নামকরণ একদিকে বাস্তবতার চিহ্নায়ন, অন্যদিকে বস্তুটির সীমাবদ্ধকরণ। এই দ্বৈততা থেকেই জন্ম নেয় ভাষার অস্তিত্ববিষয়ক প্রশ্ন।
দেরিদা ভাষার প্রতি তার শৈল্পিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অবিরত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। রূপক, মুছে ফেলা, পুনর্লিখন—এই প্রতিটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি দেখান, ভাষা কেবল মর্ম বোঝায় না, বরং নিজেই এক অনির্দিষ্ট খেলার ক্ষেত্র। তার দৃষ্টিতে ভাষা কখনোই সম্পূর্ণভাবে ‘হয়ে ওঠে না’, বরং নিরন্তর ‘হওয়ার’ প্রক্রিয়ায় থাকে। অর্থ সবসময়ই ফসকে যাওয়ার পথে, কিংবা অর্থই ফসকাতে বাধ্য করে ভাষাকে।
এই অবস্থানকে ভাষা ও অর্থের চূড়ান্তীকরণের বিরুদ্ধ এক মুক্তিকামী কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, অর্থ যদি স্থির হয়, তবে ভাষা হয়ে ওঠে কর্তৃত্বের হাতিয়ার; কিন্তু অর্থ যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে ভাষা হয়ে ওঠে প্রশ্নের ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি মৌলবাদী বা ফ্যাসিস্ট ভাষার ব্যবস্থার বিরুদ্ধ এক প্রতিক্রিয়া।
তবুও, দৈনন্দিন ব্যবহারিক প্রেক্ষাপটে আমরা ভাষাকে অর্থের ধারক হিসেবেই দেখি: ‘আমার বলতে চাওয়ার অর্থ হলো…’ কিন্তু সাহিত্যিক ভাষায় অর্থ সৃষ্টি কি কেবল ভাষার বাহ্যিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধ?
মার্ক টার্নার তাঁর The Literary Mind গ্রন্থে বলেন, ‘অর্থ কোনো মানসিক বস্তু নয়… বরং এটি হলো অনুমান, সংযুক্তি, মিলন, মিশ্রণ এবং সংহতির জটিল প্রক্রিয়া… অর্থ একটি উপমামূলক ও সাহিত্যিক বিষয়।’ (টার্নার, ১৯৯৬, পৃ. ১৩)। এই বক্তব্য ভাষার ব্যবহারিক ও সাহিত্যিক দিক—উভয়ের মধ্যকার সেতুবন্ধন তৈরি করে। অর্থ এককভাবে পাঠকের বা লেখকের মনে উৎপন্ন হয় না, বরং তা ভাষা ও প্রসঙ্গের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফল।
এই প্রেক্ষাপটে, সাহিত্যিক ভাষা হয়ে ওঠে এক দ্বৈত প্রকৃতির ক্ষেত্র—একদিকে এটি বহন করে নিরন্তর পরিবর্তনশীলতা, অন্যদিকে নিজের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকে। ফলে কবিতা বা সাহিত্যিক পাঠ হয়ে ওঠে এমন এক অনির্ধারিত গন্তব্যযাত্রা, যেখানে অর্থ কখনো নির্দিষ্ট নয়, বরং সম্ভাব্য।
এই দ্বৈততা আরও স্পষ্ট হয় ইয়ান আলমন্ডের বিশ্লেষণে। তিনি মেইস্টার একহার্ট ও জাক দেরিদার আলোচনার মধ্যে এক গভীর সংযোগ নির্দেশ করেন। আলমন্ড লিখেছেন: ‘যেখানে দেরিদার প্রকল্প ভাষার এক নতুন উপলব্ধির সন্ধান করে—যেখানে কোনো শব্দ অপরটির তুলনায় অধিক ‘মূলগত’ নয়, একহার্ট সেখানে এমন এক স্তরে পৌঁছাতে চান যেখানে শব্দই পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে’ (আলমন্ড, ১৯৯৯, পৃ. ১৬১)।
এখানে ভাষার দুটি মেরু স্পর্শ করে—একদিকে শব্দের মধ্যেই নিরন্তর অর্থচর্চা, অন্যদিকে শব্দের পরিত্যাগের আকাঙ্ক্ষা। এই টানাপড়েন থেকেই জন্ম নেয় কবিতায় ভাষার গভীর ontological (অস্তিত্বগত) দ্বন্দ্ব। ভাষা হয়ে ওঠে একত্রে প্রকাশের উপায় এবং নীরবতার ইঙ্গিত।
আলমন্ড আরও বলেন:
‘দেরিদার ভাষাতত্ত্বে শব্দগুলোকে মুছে দেওয়া (Durchkreuzung) হয় না কোনো বাহ্যিক, অব্যক্ত বা চূড়ান্ত সত্যকে প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতা থেকে; বরং এটি ভাষার অন্তর্নিহিত অর্থগত অস্থিরতার ফল। ভাষা একটি ‘সীমিত খেলা’ যেখানে প্রতিটি চিহ্নের অর্থ নির্ধারিত নয়, বরং অনির্ধারিত ও পরিবর্তনশীল। এই অনির্ধারিততা বা অর্থগত অস্থিরতাই শব্দ মুছে ফেলার কৌশলকে অনিবার্য করে তোলে। তাই, এটি ভাষার সীমাবদ্ধতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ নয়, বরং ভাষার খেলার ভেতরকার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি।’ (আলমন্ড,১৯৯৯, পৃষ্ঠা.১৬০)
আলমন্ড এখানে যে দুটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্প তুলে ধরেন: একদিকে আছে ভাষার খেলার ক্ষেত্রের আনন্দময় ব্যবহার (দেরিদা), অন্যদিকে ভাষার সীমাবদ্ধতা ও অনির্বচনীয় সত্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা (একহার্ট)। কেউ কেউ ভাষার সীমাবদ্ধতাকে দুঃখের বিষয় হিসেবে দেখেন, তবে তা অপরিহার্য নয়। এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলেও তা আনন্দহীন হতে হবে না, বা এমন কোনো শব্দাতীত সত্যের অস্তিত্ব মেনে নিতে হবে না।
এই আলোচনার বাইরেও একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ করা সম্ভব—যেখানে ভাষার খেলা বজায় থাকে, তবে একইসাথে সীমার সচেতনতাও থাকে। সাহিত্যিক ভাষার ব্যবহারকারীরা প্রায়শই উপলব্ধি করেন যে, ভাষা একদিকে যেমন আমাদের ভাবনার পরিসরকে সীমিত করে, অন্যদিকে তেমনি ভাষাই আমাদের অর্থ, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির জগতে প্রবেশের পথও তৈরি করে। এই দ্বৈত প্রকৃতির ভেতর দিয়েই ভাষা ক্রমাগত নিজেকে গঠন ও পুনর্গঠন করে—একটি ক্ষণস্থায়ী কাঠামো ও রূপের মধ্য দিয়ে অর্থের সন্ধান চালিয়ে যায়।
একহার্টের মতে, শব্দাতীত নীরবতাই (যা তিনি ‘ঈশ্বরত্ব’ বা Godhead বলে আখ্যায়িত করেন) মানব অস্তিত্বের চূড়ান্ত গন্তব্য। তিনি বলেন, ‘মানুষ ঈশ্বর সম্পর্কে যা সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে পারে, তা হলো তার ভিতরের জ্ঞান থেকে নীরব থাকা’ (Eckhart, qtd. in Davies, 1994, p. 236)। এই নীরবতার ধারণাটি বৌদ্ধ ধ্যানচর্চার সঙ্গেও এক ধরনের সাদৃশ্য বহন করে—যেখানে শব্দ ও চিন্তার কোলাহলের বাইরে, একধরনের অন্তর্মুখী প্রশান্তির সন্ধান করা হয়। একহার্ট তাঁর রচনায় শব্দের সীমাকে অতিক্রম করে নীরবতার প্রতি আনুগত্যের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, দেরিদা ভাষাকে এক ধরনের খেলা হিসেবে দেখেন, যেখানে fort-da খেলায় মগ্ন থেকেও তিনি আমাদের ভাষাকেন্দ্রিক চিন্তার (logocentricity) সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেন। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণায়—’পাঠ্য ছাড়া আর কিছু নেই’—তিনি বোঝাতে চান, আমরা ভাষার বাইরের কোনো নিশ্চিত বা চূড়ান্ত অর্থে পৌঁছাতে পারি না। অর্থাৎ, ভাষা আমাদের একমাত্র অস্ত্র হলেও, তা কখনোই পরিপূর্ণ বা নিরপেক্ষ মাধ্যম হতে পারে না।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: যদি ভাষা নিজেই সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে আমরা কীভাবে চিন্তা করি, লেখি, কাজ করি বা বিশ্বাস গঠন করি? এই প্রশ্নের উত্তরে নানা ধারা দেখা যায়। কেউ কেউ ভাষার সীমাবদ্ধতাকে বেদনাদায়ক বলে মনে করেন, আবার কেউ শিল্প ও সাহিত্যিক ভাষার মধ্য দিয়ে সত্য, সৌন্দর্য ও গভীর অর্থে পৌঁছানোর আশা রাখেন। দেরিদার মতো কেউ কেউ ভাষার সীমাকে মেনে নিয়েও ভাষার খেলায় আনন্দ খুঁজে পান—কারণ সেখানে কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই, আছে কেবল সৃষ্টিশীলতা। একহার্টের মতো আরেকটি অবস্থান হলো—ভাষার সীমাবদ্ধতাকে আলিঙ্গন করে সম্পূর্ণ নীরবতার দিকে ধাবিত হওয়া, যেখানে ভাষা আর চিন্তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
এই প্রবন্ধ যুক্তি দেয় যে—ভাষার শক্তি ও সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কবিতা, বিশেষত যেসব কবিতা নীরবতার দিকে ইঙ্গিত করে বা নিজ সীমা সম্পর্কে সচেতন, তারা আমাদের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়। কবিতার ভাষা অর্থ নির্মাণের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও সৃষ্টিশীল রূপ, কিন্তু সেই ভাষাই একপর্যায়ে নিজ সীমাকে প্রকাশ করে—ইঙ্গিত করে এমন কিছু অভিজ্ঞতার দিকে যা ভাষার বাইরের, যা নিছক শব্দের মাধ্যমে ধরা যায় না। এই দ্বৈততা আমাদের মানবিক জ্ঞানের এক বিনয়ী উপলব্ধি এনে দেয়: ভাষা অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু সবকিছু নয়। এবং এই ‘অপ্রকাশের’ মধ্যেই কবিতার গভীর সৌন্দর্য নিহিত।
গ্রন্থনির্দেশ:
Almond, I. (1999). Negative theology, Derrida and the critique of presence: A poststructuralist reading of Meister Eckhart. Heythrop Journal, 40(2), 150-165.
Australian Museum website. (n.d.). Spirituality. Retrieved from http://australianmuseum.net.au/ indigenous-australia-spirituality
Brunet, S. (1997). Rewriting the landscape: Judith Wright’s fragile land and haunted self. Jasal (Journal of the Association for the Study of Australian Literature) 1997: Land and identity: Proceedings of the nineteenth annual conference, 64-69.
Davies, O. (Trans.). (1994). Meister Eckhart: Selected writings. London: Penguin.
Derrida, J. (1976). Of grammatology (G. C. Spivak, Trans.). Baltimore: Johns Hopkins University Press.
Derrida, J. (1978), Writing and difference (A. Bass, Trans.). London: Routledge & Kegan.
Eckhart, M. (1981). Meister Eckhart, the essential sermons, commentaries, treatises and defense (B.McGinn & E. Colledge, Eds. & Trans.). New York: Paulist Press.
Harvey, 1. (1986). Derrida and the economy of differance. Bloomington: Indiana University Press.
Murray, L. (1991). Collected poems. North Ryde, Australia: Angus & Robertson.
Sherwood, Y., & Hart. K. (Eds.). (2005). Derrida and religion: Other testaments. London and New York: Routledge.
Turner, M. (1996). The literary mind. Canada: Oxford University Press.
Watson, S. W. (2005). Smoke encrypted whispers, St Lucia: University of Queensland Press.
Wright, J. (1971). Collected poems: 1942-1985. Sydney: Angus & Robertson.
Wright. J. (1991). Born of the conquerors. Canberra: Aboriginal Studies Press.

মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক; অনুবাদ ও গবেষণায় রয়েছে সমান আগ্রহ। বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে পি-এইচ. ডি সম্পন্ন করেছেন ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। তার কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারবইজানিজ, তার্কি, রোমানিয়ান, আরবি, ইতালীয়, অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত জার্নাল ও ব্লগগুলোতে নিয়মিত কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের ‘THE POET’ পত্রিকা কর্তৃক ‘International Poet of the Week’-এ ভূষিত হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা (২০১৪); উপমা সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’, ‘ধ্বনিময় পালক’, ‘ধাঁধাশীল ছায়া’, ‘জন্মান্ধের স্বপ্ন’, ‘সার্কাসের মেয়ে ও অন্যান্য কবিতা’, ‘The shadow of illusion’, ‘Blind Man’s Dream’. গল্পগ্রন্থ : ‘তামাকবাড়ি’, ‘আবার কাৎলাহার’, ‘ঢুলকিপুরাণ’, ‘নাবিকের জুতো’। প্রবন্ধ : ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’, ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা’, ‘জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য’, ‘বাংলা সাহিত্যে নারী’, ‘বাংলা উপন্যাস অধ্যয়ন’। অনুবাদ : ‘চৌদল ঐকতান’, মূল: টি. এস. এলিয়ট; ‘ধূসর বুধবার’, মূল: টি. এস. এলিয়েট; ‘বালি ও ফেনা’, মূল: কাহলিল জাফরান; ‘হল্লা’, মূল: অ্যালেন গিনসবার্গ।