১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দাদু দেখেছিলেন টেলিভিশনে, চেয়ারম্যান বাড়িতে গিয়ে। মাস্টারি থেকে সে বছর তিনি অবসর নিয়েছিলেন। তখনও পেনশনের টাকা হাতে আসেনি। টাকা হাতে থাকলে নিজেই টেলিভিশন কিনে ফেলতেন। কারণ পেনশনের টাকা তুলেই তিনি নাকি একটা টেলিভিশন কিনেছিলেন। ন্যাশনাল ২০ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন। দাদু সাপোর্ট করতেন আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর টেলিভিশন কিনে অপেক্ষা করছিলেন ’৯০-এর বিশ্বকাপের। কিন্তু ’৮৮-র বন্যার সময়, একরাতে নৌকা করে একদল ডাকাত এসে নিয়ে যায় নানার শখের টেলিভিশন। কী যে মন খারাপ করেছিলেন দাদু! এর সব আমার মনে নেই। কিছু মনে আছে, যেমন, ’৮৮-র বন্যার কথা মনে আছে। চার দিকে থৈথৈ পানি। মাঝরাত্রিতে মামা হাঁক ছাড়লেন, ডাকাত পড়ছে! ডাকাত! ততক্ষণে কলের নৌকা করে ডাকাতদল চলে গেছে বহুদূর।
দাদু সাপোর্ট করতেন আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর টেলিভিশন কিনে অপেক্ষা করছিলেন ’৯০-এর বিশ্বকাপের। কিন্তু ’৮৮-র বন্যার সময়, একরাতে নৌকা করে একদল ডাকাত এসে নিয়ে যায় নানার শখের টেলিভিশন। কী যে মন খারাপ করেছিলেন দাদু!
২.
নব্বইয়ের বিশ্বকাপের কথা আমার মনে আছে। তখন আমি বাবার চাকরিসূত্রে মফস্বল এক শহরে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের ছিল সাদাকালো টেলিভিশন। খেলার প্রথমদিনই দাদু চলে এসেছিলেন। রাত্রিবেলা খেলা হতো। প্রতিদিন ভাবতাম খেলা দেখব। কিন্তু কখন ঘুমিয়ে পড়তাম কে জানে! বলা হয়নি, দাদু তাঁর গ্রামের ক্লাবে ফুটবল খেলতেন। যখন বয়স হয়ে গেল, তখন মাস্টারির পাশাপাশি রেফারি হিসেবে থেকেছেন বহুদিন। কোথাও ফুটবল খেলা হচ্ছে শুনলে খেলা দেখতে চলে যেতেন। এমন ফুটবল ভালোবাসতেন দাদু! সে বছর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারল আর্জেন্টিনা। দাদু বললেন, বাজে রেফারি ছিল। খেলা কখনও কখনও খেলা থাকে না, মানুষের আবেগের সাথে মিশে যায়। মাঠের খেলোয়াড় হয়ে ওঠে নিজের প্রতিচ্ছবি, তার হেরে যাওয়া মানে নিজে হেরে যাওয়া। বিশেষ করে শোষিত দেশগুলোতে খেলা আদতে খেলা থাকেনি। খেলা হয়ে ওঠে যুদ্ধ।
গ্রিস-আর্জেন্টিনার খেলা দেখা শেষে সন্ধ্যদি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে গেলেন। তার বুকে গুঁজে রাখলেন আমার জ্বরের মাথা। সারারাত আমার ঘুম এলো না সন্ধ্যাদির শরীরের ঘ্রাণে। নাকি ঘুমিয়েছিলাম মনে নেই! শুধু মনে আছে, কত কত দিন অপেক্ষা করেছি, আমার আর একবার জ্বর আসুক, আমাকে জড়িয়ে রাখুক বাসক লতা!
৩.
’৯৪-এর বিশ্বকাপের স্মৃতি বেশ মনে আছে। সে সময় জ্বর হলো আমার। সন্ধ্যাদির বাসায় মেহমান এলো। তিনি রাতে আমাদের বাসায় থাকতে এলেন। পৃথিবীর বিশ্বকাপ ফুটবল মঞ্চে ম্যারাডোনার শেষ গোলের ম্যাচ। গ্রিস-আর্জেন্টিনার খেলা দেখা শেষে সন্ধ্যদি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে গেলেন। তার বুকে গুঁজে রাখলেন আমার জ্বরের মাথা। সারারাত আমার ঘুম এলো না সন্ধ্যাদির শরীরের ঘ্রাণে। নাকি ঘুমিয়েছিলাম মনে নেই! শুধু মনে আছে, কত কত দিন অপেক্ষা করেছি, আমার আর একবার জ্বর আসুক, আমাকে জড়িয়ে রাখুক বাসক লতা!
৪.
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে আমি ব্রাজিল সাপোর্ট করেছিলাম। ব্রাজিলের খেলার নৈপুণ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল সে বছর। ফুটবলের সৌন্দর্য মূলত দলের প্রতিটি সদস্যের পারস্পারিক বোঝাপড়ায় তৈরি হয়। ব্রাজিলের খেলা দেখে আমার তেমনটা মনে হয়েছিল। এ ছাড়া সে বছরের আর কিছুই মনে পড়ছে না এ মুহূর্তে। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সে বছর অরুণা আত্মহত্যা করেছিল। আমি তাকে চিনতাম না। মরে যাওয়ার আগে কখনও দেখিনি। অঙ্ক প্রাইভেট পড়ে ফিরছিলাম। সন্ধ্যার পর। খুব সম্ভবত রাত নয়টায় ছিল ফাইনাল। আমি তাই দ্রুত হেঁটে ফিরছিলাম। একবাড়িতে জটলা দেখে, বাড়ির ভেতর থেকে হাহাকার শুনে গিয়ে দেখি একটা কিশোরী মেয়ে ঝুলে আছে ঘরের আঁড়ে। এই দৃশ্য কখনও আমি ভুলতে পারিনি। কী কষ্টে কে জানে বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন মানুষ নিজে নিজে মরে যেতে পারে!
৫.
এরপর বড়ো হয়ে যেতে থাকি। ২০০৬-এর বিশ্বকাপের পর দাদু মারা গেলেন। ফুটবল আমাকে আর টানেনি সেরকম। আদতে প্রচলিত যাবতীয় খেলার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ থাকেনি আর। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলের বছর শেষ হলে, আঙুলে জীবন গুনি। মনে হয়, পরের বিশ্বকাপে কি আমরা সবাই থাকব? কে কে হারিয়ে যাবে জীবন থেকে কে জানে! নাকি জীবনই খোয়ায়ে বসব! এখন আমি একেক বিশ্বকাপে একেক দলকে সাপোর্ট করি। খেলা দেখলে পরাজিত দলের জন্য ভীষণ মন খারাপ হয়। জীবনে জেতার জন্য কত কষ্ট করে দৌড়ায় মানুষগুলো! তারপরও হেরে যেতে হয়! এ কারণে আমার খেলা ভালো লাগে না। মনে হয়, সকলেই খেলল, কিন্তু কেউ হারল না কোনদিন! এমন হলে ভালো হতো।
৬.
একটা কথা বলিনি, এক বিশ্বকাপের সময় আমি প্রথম চুমু শিখেছিলাম গোপনে।

জন্ম বাংলাদেশে। প্রকাশিত গল্পের বই ‘আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি’।