শহরতলীর এক মেয়ে। কামরুন। আগাগোড়াই সে সুখবাসী। গল্পের শুরুতে কামরুন সেই দাবি করে। আরেক বোন শামসুন। ছোটো আরও ভাইবোন আছে। গ্রামের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে। গ্রামে বাবার জমিজমা আছে। তাতে চাষবাস হয়। মা বছরে একটা সময় গ্রামে যান ফসল তোলার কাজে। তখন দুই বোন মিলেঝিলে সংসার সামলায়। একবার মায়ের সঙ্গে গ্রামে গেল কামরুন। সেখানেই ঘটে বিপত্তি। সন্ধ্যাবেলা ঘরের জানালা বন্ধ করতে গিয়ে দেখে একটু দূরে কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আতিকুল ইসলাম। এইটুকু দেখাদেখি। তবু আতিকুল ইসলাম কামরুনের অন্তরে ক্রমাগত দোলা দিয়েই যায়। আরও দোলা দিতে সে একদিন শহরতলীর বাসায় হাজির হয়। এবং প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিদায় নিতে হয় তাকে। কামরুনের বিয়ে হয়ে যায়। আপাত সুখের সংসার হয় তার। কিন্তু আতিকুল ইসলামের প্রেম তাকে তাড়া করে ফেরে অন্তরে অন্তরে আড়ালে আবডালে। কামরুনের সুখের অসুখেও দেখা দেয় আতিকুল ইসলাম। এই নিয়ে আকিমুন রহমানের গল্প ‘আগাগোড়াই সুখবাসী’।

প্রিয় ১৫ গল্প | আকিমুন রহমান | প্রচ্ছদ: নাওয়াজ মারজান | প্রকাশক: ঐতিহ্য | মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা | বইটি সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন।
কৈশোরকালে নবম শ্রেণি একটা মোহ, একটা মাৎসর্যের সূতিকাগার। বন্ধু ও বান্ধবী পাঁচজন— বকুল, মীনা, হারুন, রোকন, হেনা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া-আসা করত। লেখাপড়া ছাড়াও ইত্যাকার বিনোদনের সঙ্গী ছিল তারা চারজন। কিন্তু নবম শ্রেণিতে উঠেই তারা পড়ল বিভাজনের পালায়। কে সায়েন্সে যাবে, কে আর্টসে। ওদের মধ্যে চারজন অঙ্কে ভালো। জ্যামিতি-বীজগণিত পারে ভালো রকমে। শুধু ছিটকে পড়ল হেনা। হেনা গেল আর্টসে। সেই থেকে বিরহ-বেদনা জাগে, অন্তর মরিয়া হয়ে কাঁদে। এটা ছিল সেই ১৯৭৩ সাল। অন্তরে ক্ষয়ের চিহ্ন আঁকা ১৯৭৩। এই নিয়ে আকিমুন রহমানের আরেকটি গল্প ‘একদা তোমাতে, কে বিষমধু’।
আকিমুন রহমানের আরও একটি গল্প ‘অথির পূর্বরাগ লেন ধরে যেতে যেতে শেষে’। শেষে কী? জানতে হলে পড়তে হবে গল্পটি। অনেক লোকসমাগমের মাঝে একদিন অথিকে কানাঅলায় ধরেছিল। ধরেছিল একবারে কলেজের করিডোরে। সেও কি সম্ভব? এই কানাঅলা অথিকে বেভুল করে তোলে। এই কানাঅলা ফুলস্লিভ বটল গ্রিন শার্টপরা একজন। কলেজপড়ুয়া ষোড়শী, সপ্তদশী বা অষ্টাদশীর জীবনে প্রথম প্রেম, প্রথম পুরুষ হৃদয়তন্ত্রীতে যে আলোড়ন তোলে, তার ঝরনাধারার মতো উচ্ছ্বল নৃত্যরত পথচলা। এ শুধু পূর্বরাগ নয়, গভীর অনুরাগও বটে।
আকিমুন রহমানের ‘প্রিয় ১৫ গল্প’ গ্রন্থে এরকম আরও গল্প আছে, যেমন— ওহে মোহ! আছো নাকি?; আচরিত কতক ভ্রান্তি সমাচার; একান্ত ব্যক্তিগত আলো ও অন্ধকার; দুঃখ; জলের সংসারের এই ভুল বুদ্বুদ; এই একটা বানানো গল্প; একদা এক থির জীবনে; গোপনতা তুমি রহো রহো অগোচর; হে মাঘনিশীথের কোকিল; ভাইবোন বড় ধন, রক্তের বন্ধন, তবুও—; এইসব নিভৃত কুহক ইত্যাদি।
সব শেষ গল্প ‘বাংলাদেশ’। বিদেশ বিভূঁইয়ে বাংলাদেশের দুইজন প্রবাসী। একজন শ্রমিক, আরেকজন মেধাবী ছাত্রের কাহিনি। শ্রমিক যে জন, তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন ইতালি। লোকে একে বলে টারজান ভিসা। সরাসরি বিমানে গিয়ে এয়ারপোর্টে নামা নয়। জল-জঙ্গল-সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় ইতালিতে। আর ছাত্র যে জন, তিনি প্রখর মেধাবী। ফিজিক্স তার প্রিয় বিষয়। তার যে রেজাল্ট, উচ্চশিক্ষায় যেকোনো ভালো সাবজেক্ট সে চাইলেই পেতে পারত, কিন্তু সে সেই পথে হাঁটেনি। এজন্য ভর্তির সময় থেকেই তাকে শুনতে হয়েছে অনেক গঞ্জনা। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া নিয়েও অনেক তিরষ্কারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেন সে আমেরিকা না গিয়ে ইতালি যাবে, কেন সে ‘পদার্থবিদ্যার মডার্ন ফিল্ড থিয়োরি’ পড়বে, তার নিজের যেন কোনো পছন্দ থাকতে নেই, শিক্ষকরা যা পড়তে বলবেন তাই পড়তে হবে— এসব নিয়ে অপমানের শেষ ছিল না। কিন্তু সবাই তাকে ব্যবহার করেছে, তার মেধা ব্যবহার করেছে, যমন সহপাঠীরা, তেমনি জুনিয়ররা, তেমনি শিক্ষকরা। এক সহপাঠী তো তার নোট বিক্রি করেছে, তার নামে টাকা নিয়ে নিজের পকেট ভরেছে। একজন শিক্ষক তো তাকে দিয়ে নোট করিয়ে নিয়ে তাই ক্লাসে পড়িয়েছেন। আর তার ভালোবাসার মানুষ লাবণ্য শেষে তার প্রেমকে প্রত্যাখান করেছে। এ যেন আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র, একেবারে সিনেমাটিক গল্প।
আকিমুন রহমানের গল্পের ভাষা ভিন্ন ধারার, ভিন্ন রীতির। কথ্যশব্দ, কখনো আঞ্চলিক শব্দ মিশিয়ে তিনি ভিন্ন ভাষারীতি নির্মাণ করেছেন। এ ভাষা প্রচলিত পোশাকী ভাষার সঙ্গে মেলে না। অনেক শব্দ তিনি ভিন্ন চেহারায় গল্পে আরোপ করেছেন। কিছু কিছু শব্দ নিজস্ব স্টাইলে উপস্থাপন করেছেন। ব্যাকরণবিদগণ হয়তো এতে দোষ খুঁজবেন, কিন্তু এখানেই তাঁর ভিন্নতা, তাঁর গল্পভাষার বৈশিষ্ট্য। লেখক একজন ভাষাবিদ এবং সাহিত্যের গবেষকও বটে। তাই গল্পে, গল্পের ভাষায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সহজাত, লেখকের স্বভাবজাতও বটে। লেখক হয়তো নতুন ধারার গদ্যরীতি বা গল্পভাষা উদ্ভাবনে প্রয়াসী। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাভাষা হয়তো আরও সমৃদ্ধ হবে। এমন প্রত্যাশা নিশ্চয়ই দূষণীয় নয়?
আকিমুন রহমানের গল্প তরতরিয়ে পড়া যায় না। কিন্তু গল্পের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে জুড়ে দিলে গল্পগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে, আয় আয় আয়— আমাকে পড়ে নে, আমাকে তোর জীবনগল্পের দোসর করে নে।
এসব নিয়েই আকিমুন রহমানের ‘প্রিয় ১৫ গল্প’ গ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য। প্রচ্ছদ এঁকেছেন নাওয়াজ মারজান। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৪৫০ টাকা। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন প্রিয় কথাকার আবু হেনা মোস্তফা এনামকে।

লেখক উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও শিশুসাহিত্যিক।